Showing posts sorted by date for query label:chotto_lekha|label:notes. Sort by relevance Show all posts
Showing posts sorted by date for query label:chotto_lekha|label:notes. Sort by relevance Show all posts

Saturday, June 25, 2022

Abortion Ban in the USA

সালটা ১৯৯১, সারা বিশ্বের টালমাটাল ছাড়িয়ে এক অভ্যন্তরীণ সমস্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল আমেরিকা। গতকাল যে আমেরিকায় কেন্দ্রীয় স্তরে গর্ভপাত বা abortion ব্যান করা হল, সেই ঘটনার সাথে ১৯৯১-এর এই সমস্যার একটা যোগসূত্র আছে। ১৯৯১ সালে তখনকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (সিনিয়র) মনোনীত করলেন Clarence Thomas-কে সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি হিসেবে। মনোনয়নের পর্যালোচনা যখন চলছে, তখনই এক বিস্ফোরক তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হল। ক্ল্যারেন্স-এর বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ আনলেন ওকলাহোমা ইউনিভার্সিটির আইনের অধ্যাপক অনিতা হিল। এই অভিযোগ সারা আমেরিকাকে তোলপাড় করে দিয়েছিল এবং প্রচুর বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

অনিতা যে সব অভিযোগ প্রকাশ্যে, সেনেট হাউসে লাইভ টেলিকাস্ট-এ বলছিলেন, তা সেই সময়ে কেউ বলার কথা ভাবতে পারতো না। এই ঘটনার প্রায় ২৫ বছর পরে MeToo মুভমেন্ট হয়েছে। তাই সেই সময়ে একজন মহিলা যৌন নিগ্রহের কথা প্রকাশ্যে জানাচ্ছেন, সেটা আমেরিকার ঘরের অন্দরে শোরগোল ফেলেছিল। আর এই অভিযোগ যেহেতু সুপ্রিম কোর্টের সদ্য মনোনীত একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে, তাই এর গুরুত্বও ছিল বেশি। এর সাথে অনিতা এবং ক্ল্যারেন্স দুজনেই কৃষ্ণাঙ্গ, তাই নিয়েও মানুষের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল, যে কাকে সমর্থন করা উচিত।

আমেরিকার সাংসদরা অনিতা হিলের কথা বিশ্বাস করেননি। অন্য দু-একজন একই অভিযোগ করলেও, ক্ল্যারেন্সকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হওয়া থেকে আটকানো যায়নি। সাংসদরা ক্ল্যারেন্স-এর মনোনয়নে সিলমোহর দেন ১৯৯১ সালেই, এবং তিনি বিচারপতি হন আমেরিকার সর্বোচ্চ কোর্টের।

সেই ক্ল্যারেন্স গত ৩১ বছর ধরে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এবং আমেরিকার ইতিহাসে সব থেকে বেশি সময় ধরে বহাল থাকা বিচারপতি। এখন যে ছয়জন বিচারপতির রায়ে আমেরিকাতে গর্ভপাত ব্যান হয়ে গেল, তার মধ্যে অন্যতম হলেন ক্ল্যারেন্স। ক্ল্যারেন্স এও বলেছেন যে সমলিঙ্গের বিবাহ, গর্ভনিরোধের ব্যবহার, এই সব বিষয়েও পরবর্তীকালে চিন্তা ভাবনা হওয়া দরকার এবং প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা দরকার। সুপ্রিম কোর্টে ক্ল্যারেন্স-এর সাথে আছেন পাঁচজন অন্য বিচারপতি, যারা প্রত্যেকেই নির্বাচিত হয়েছেন রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট দ্বারা। তাঁদের তিনজন তো ট্রাম্পের মনোনয়নেই নির্বাচিত। এরা প্রত্যেকেই গোঁড়া, দক্ষিণপন্থী। বিপক্ষে যে তিনজন বিচারপতি আছেন, তারা অনেকটাই সংখ্যালঘু। তাই ভবিষ্যতে হয়তো আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে।

এই abortion ban কে শুধু মহিলাদের অধিকারের ওপর আক্রমণ ভাবলে ভুল হবে। আমেরিকায় এই ব্যান দক্ষিণপন্থীদের বেশ অনেকদিনের লক্ষ্য ছিল। কারণ এই ব্যানের মাধ্যমে একদিকে সমস্ত শ্রমিক শ্রেণীকেই বার্তা দেওয়া গেল, সতর্ক করা গেল। এছাড়া এর দ্বারা সব থেকে ক্ষতিগ্রস্থ হবেন প্রান্তিক মহিলারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। যারা উচ্চশ্রেণীর তারা কোনো না কোনোভাবে abortion এর সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন (রাজ্যের মাধ্যমে)। কিন্তু পারবেন না পিছিয়ে থাকা মানুষেরা। ১৯৯১ সালেই কিন্তু এই ব্যানের আভাস ছিল, ক্ল্যারেন্স তাঁর মনোনয়নের সময়ই এই আভাস দিয়েছিলেন। তবুও আমেরিকার সাংসদরা তাঁকে নির্বাচিত করেন। এই পুরো ঘটনা এটা দেখিয়ে দেয়, কিভাবে দশকের পর দশক ধরে পরিকল্পনা করে গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তম্ভ, বিচারব্যবস্থা, এটাকে রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার করা যায়। সেই দিক থেকেও এই ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, সারা বিশ্বেই।

Thursday, July 02, 2020

... মতোই ভালো

ওভেনের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ফিসফিসিয়ে কানে কথা এলো। বাড়িতে কারো থাকার কথা নয়, মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করলাম, কিন্তু তেমন কিছু শুনতে পেলাম না। সন্তর্পনে মাইক্রোওয়েভের কাছে যাচ্ছি, আবারো শুনি, কারা যেন কথা বলছে। একটু দাঁড়িয়ে মনোযোগ দিয়ে শুনে বুঝলাম, আসলে কারো স্মৃতিচারণ চলছে, ব্যস্ততার, নিয়মিত ব্যবহারের। তক্ষুনি অন্য ঘরে যাওয়ার করিডরে আলো জ্বলে উঠলো, একটা কোমলতা নিজস্ব এক ছন্দে হেঁটে আসছে। তাকে আসতে দেখে মনে শান্তি পায়, চারিদিকে এই তুমুল অস্থিরতার সময়তেও ছায়ার মত আরাম লাগে। কিন্তু সেই চলনও তো ছায়াই, ছায়ার মায়ায় মিলিয়ে যায়। চারিদিক তারপরে খালি, শূন্যতা, নিস্তব্ধতা। সারি সারি গাড়ি চলে যাওয়া বিকেলটা একদম নিশ্চুপ হয়ে আমার দিকে চেয়ে আছে। কিচেন থেকে আর কোনো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে না, ঘরের দরজায় কোনো ঠকঠক নেই। অথচ ঠান্ডা বাতাস বইছে, সমুদ্রের পারের বাতাস, সেই বাতাসের শব্দ এবার পরিষ্কার হচ্ছে। বাতাসও আরাম দিচ্ছে বটে, কিন্তু আন্তরিকতা নেই। ক্লান্তিময় স্বাচ্ছন্দ্য, কোথাও কোনো স্পর্শ নেই, একটুকু ছোঁয়া নেই। শুধু একজনকে একটা তিনতলা বাড়ির জানালায় চশমা পরে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। তার চোখ, মুখ, মুখের ভাব, ভাবনা - সব ঝাপসা।

Friday, May 08, 2020

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৫

জানালা দিয়ে তাকালে এখন নীল আকাশে পেঁজা তুলো দেখা যাচ্ছে, রোদ ঝকঝকে চারপাশে বাংলার শরতের ছায়া। তবে বাইরে বেরোনো গেলে কম তাপমাত্রা আর আরামদায়ক ঠান্ডা বাতাস পেতাম। কিন্তু বাইরে বেরোনোর উপায় না থাকায়, বড় জানলাটা দিয়ে মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে সময় কাটানো যায়, তখন রোদ্দুর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে গায়ে। মানুষের ছোঁয়া বহুদিন পাওয়া হয়ে ওঠে না। অন্য কারোর সরাসরি দৃষ্টিও আমার ওপর পড়েনি বহুদিন, তাই ভাবি, মেঘগুলোই বিভিন্ন রূপ নিয়ে আমাকে দেখে উধাও হয়ে যায়। ওরা কি বলতে চাইছে বুঝতে পারিনা, ভীষণ রকম নীরব। ওদের গতিও ভীষণ মন্থর। আমিও নীরব চোখে চেয়ে থাকি, নীরবতার ভাষায় আমরা কথা বলি। এটা হয়তো কোনো ক্রিয়েটিভ প্রসেস নয়, কিন্তু আমাদের এই যোগাযোগে সৃজন আছে, বহুদূরের বন্ধন তৈরী করা আছে। এই মেঘটাই তো উড়ে উড়ে অন্য কোনো মানুষকেও আমার সাথে বেঁধে ফেলছে। এই সৃষ্টিতে, এই বন্ধনে, এই কথোপকথনে কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। 

অথচ চারিদিকের শিল্পে শুধুই যেন প্রাতিষ্ঠানিকতা, মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগে। শিল্প বিষয়টার মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা, কোথায় যেন তা ভীষণরকম ভাবে হাঁসফাঁস করতে থাকে। কিছুদিন আগের সত্যজিৎ-এর জন্মদিন উদযাপনে আর তারপরের রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনে বারবার সেই প্রাতিষ্ঠানিকতার আড়ম্বর। প্রাতিষ্ঠানিকতা শব্দতে স্বততঃই একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু সংখ্যক সমমনস্ক মানুষকে কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়। সেটা শুধু যে সেই মানুষদের মধ্যে অন্তরঙ্গতা তৈরী করে তা নয়, সেটা একটা শিল্পচর্চার প্ল্যাটফর্ম তৈরী করে, একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরী হয়। কিন্তু সমস্যার শুরুও হয় ঠিক সেখান থেকেই। 

সেই ফ্রেমওয়ার্ক এবং প্ল্যাটফর্মের অনুরাগীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি যত্নবান হতে গিয়ে রক্ষণশীল হয়ে পড়েন। তার থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আত্মম্ভরিতা, এলিটিসম এবং কোথাও গিয়ে এনটাইটেলমেন্ট। শিল্প তার বিবর্তনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে, বিবর্তনের শিল্পীদের একঘরে করে দেওয়া হয়, জর্জ বিশ্বাসের "ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত" লিখতে হয়। যে কোন প্রতিষ্ঠানের যে প্রকৃত ভালো দিকগুলো, যার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান "প্রতিষ্ঠান" হয়ে ওঠে, তা কোথায় যেন হারিয়ে যেতে থাকে। আমরা ভুলে যেতে থাকি, আসলে এসব প্রতিষ্ঠান তো স্রেফ একেকটা "tag", এর থেকে বেশি তো কিছু নয়। কোনো "জাতে" ওঠার একটা রাস্তা মাত্র। আসল বিষয়টা হল তো সৃষ্টিটা, তার ভালো-খারাপ দুইই থাকে। প্রাতিষ্ঠানিকতা তার বিশালত্বের নেশায় খারাপ দিকগুলো ছুঁড়ে ফেলতে থাকে বিস্মৃতিতে, পড়ে থাকে শুধু একটা ঝাঁ-চকচকে bubble। 

শুধু শিল্পে তো নয়, এই প্রতিষ্ঠানের আমদানি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজ-অফিস। অথচ আমরা যদি পারতাম নিজেদের গর্বটাকে একটু সরিয়ে রাখতে, তাহলে প্রতিষ্ঠান শুধুই অন্তরঙ্গতার জায়গা থাকতে পারতো। কোনো প্রতিষ্ঠানই নিজের চারিধারে অহং-এর বেড়াজাল তৈরী করতে পারতো না। শিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ করে তা তৈরী করতো স্বচ্ছ নদীর মতো বহমানতা। সেই নদীতে সাদা মেঘের ছায়া পড়তো, যে মেঘেরা নতুন রূপে উড়ে যেত নতুন নতুন মানুষের কাছে, অদৃশ্য বন্ধনে আমরা নিজেদের বেঁধে নিতাম।

Monday, April 20, 2020

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৪ | Notes on Arts - 4

শিল্পের উৎস নিয়ে ভাবনার কথা হয়েছিল। সেই উৎস বা অনুপ্রেরণায়, শিল্পকে প্রাথমিকভাবে মানুষের অনুভূতির প্রকাশ হিসেবেই দেখা যায়। এই ফর্মে শিল্প বাস্তবতা, সমাজ, সময় কোনোকিছুকেই তোয়াক্কা না করতে পারে। অথচ এই সমাজ ও সময়েই তো শিল্পের অবস্থান, তাই তাদের প্রভাব শিল্পের ওপর পড়েই। এবং বিপরীতে সমাজ ও সময়কে শিল্পের পরোক্ষে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া থাকে, কিছুটা প্রভাবিত করা থাকে। এই ধরনের এক দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে দিয়ে শিল্প, সমাজ ও সময়ের একটা সিম্বায়োটিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

খুব ইন্টারেস্টিংলি, সমাজের ঐতিহাসিক যাত্রা যখন প্রগতির দিকে, শিল্পের একটা বড় অংশ সমাজ এবং সময়ের অন্ধকার দিকগুলোর ওপর ফোকাস করে। এটা হয়তো causation, correlation নয়। হয়তো সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশগুলোর বেদনাদায়ক বিবরণী আমাদের সেই খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে বেশি করে অবহিত করে রাখতে চায়। আমাদের মনে সচেতনতা, সতর্কতা যোগায়, সাবধানবাণী দিয়ে যায়। শিল্প যেন প্রানবন্তভাবে বুঝিয়ে দিতে চায় সমাজের সেই দুরুহ অবস্থার তীব্রতা ঠিক কতটা। যাতে সমাজ সেই অন্ধকার সময়গুলোতে ফিরে না গিয়ে উজ্জ্বলতার দিকে যাত্রা করে, প্রগতিশীল হয়।

কিন্তু দুঃখ দুর্দশা তো আমাদের মনে হতাশা, সংশয়, ভয় ডেকে এনে। এরকম কঠিন সময়ে, শিল্প কি বিলাসিতা নয়! এখানে মূলত দুটো যুক্তি পাচ্ছি। প্রথমত, শিল্পীর অর্থনৈতিক অবস্থান বা শ্রেণী। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দুর্দশার প্রাথমিক আঁচ থেকে শিল্পীরা একটা দূরত্বে থেকে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ করে তাঁদের শিল্পরচনা করে থাকেন। এখানে আমরা সত্যজিৎ থেকে সলিল চৌধুরী, অনেককেই পাবো, যারা প্রধানত মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ। দ্বিতীয়ত, শিল্পীর দুরবস্থাই কখনো কখনো শিল্প হয়ে কথা বলে। সেখানে দুর্দশাটার সরাসরি প্রকাশ হয় শিল্পে। এবং অনেক সময় তা শিল্পের সাধারণ পরিশীলন, আঙ্গিককে ভেঙে দেয়। যেমন আমরা ঋত্বিক ঘটকের ভারতভাগ নিয়ে সিনেমাগুলোতে ধারাবাহিক ভাবে দেখি।

এই দুটো যুক্তি ছাড়াও একটি তৃতীয় বক্তব্য রাখা যায়। যে কোন কঠিন সময়েরই একটা প্রাথমিক অভিঘাত থাকে। অযাচিত বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার দরুন, মানুষের বিচলিত হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। যেমন কাছের কোন মানুষের মৃত্যু বা এমনকি এই অকস্মাৎ করোনাভাইরাস নামক মহামারী নেমে আসা। ঘটনার প্রাথমিক চমক কেটে যাওয়ার পরই হয়ত আমরা মানসিকভাবে এমন এক জায়গায় আসতে পারি, যেখানে নতুন শিল্প তৈরী হতে পারে।
(চলবে)

Sunday, April 05, 2020

আমাদের আসা-যাওয়ার-মাঝে

এক প্রবল ঝড় এসে সব ওলোটপালোট করে দেওয়ার পরে, চারিদিক ভীষণ শান্ত হয়ে উঠছিল, যেমনটা হয়ে থাকে। কিন্তু মনের ভিতরে তখনও ছিল উথালপাথাল করে দেওয়া শূন্যতা। পৃথিবীটাকে চিনতেই যেন খুব অসুবিধে হচ্ছিল। হয়তো তার সাথে নিজের ভিতরের খানিকটাও হারিয়ে গিয়েছিলো।

গল্পটা এরকম চলতে পারতো, এবং ধীরে ধীরে এই অচেনা পরিচয়ই হয়তো আপন হয়ে উঠতো। কিন্তু গল্প আর জীবন তো এক নয়, তা আমরা জানি। কিন্তু যেটা আমরা অনেকসময় ভুলে যাই - জীবন গল্পের থেকেও বেশি আদরের। সে যেমন সজোরে ধাক্কা দেয়, তেমনি সর্বাত্মক ভালোবাসায় সেই জীবনেরই প্রেমে পড়তে শেখায়।

তাই জীবন তৈরী করলো নতুন আখ্যান - ঝড়ের শেষে যে গুমোট আবহাওয়া ছিল, সেই মেঘ কেটে গেল, সূর্য ঝলমল করে উঠলো, গাছের পাতায় দেখা গেল অকাল সবুজ, প্রচন্ড শীত উপেক্ষা করে পাখিরা তাদের বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো ভীষণ কলরবে, সব ক্লীবতা দূর হয়ে গেল, আর শুরু হল নতুন চর্যা। সেই চর্যায় না থাকলো কোনো চাপানো বাঁধন, না কোনো আড়াল, না কোনো মলিনতা, না কোনো অন্ধকার। 

অথচ বন্ধন তো তৈরী হল, যে বন্ধন পশমের আদর লাগিয়ে নিজেকে হারিয়ে যেতে দেয় না। যে বন্ধন কোন নিয়মের বিধিনিষেধ না মেনেই ভীষণ জোরালো হয়। যে বন্ধন দূরত্বকে অবজ্ঞা করে অনায়াস পারদর্শিতায়। সেই বন্ধন অচিরেই এনে দেয় আরাম, অভ্যাস, দৈনন্দিন রুটিন। কিন্তু সেই প্রাত্যহিকতা এতটাই সহজাত, যে তা একেবারেই উহ্য। তার অনুভব আছে, উচ্চারণ নেই।

সেই অনুভবে, এক প্রান্তের সকালের রোদে অন্য প্রান্তের বিকেলের পাখিদের ঘরে ফেরার ডাক শোনা যায়। তারপর কিছুটা সময়কে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে আদানপ্রদান করে নেওয়া, অন্তরঙ্গতা। একটু বাদে দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততায় ডুব দেওয়া। তবু "মাঝদুপুরে হঠাৎ সেদিন আচমকা সব পড়লো মনে", এবং সেই বিষাদকে নদীর ধারে হাঁটতে গিয়ে জলের সাথে ভাগ করে নেওয়া। এরপরে কাজ শেষে, আবারো কিছু সময়ের ভাব, কিছু ভাবনার প্রকাশ। এই আসা যাওয়ার মাঝে যে সময়টুকু পড়ে থাকে, সেখানেই তৈরী হয়ে গেল কত রঙিন স্বপ্ন। মেঘের গায়ে নকশা আঁকা হল কত কল্পনার। জলের বুকে খেলে গেল কত তরঙ্গ, ভরসার দেওয়াল পেল হৃদয়ের প্রত্যেক নিলয়-অলিন্দ, সব জটিল সমীকরণ সমাধান খুঁজে পেল। বোধ হয় এরই অপেক্ষা ছিল চিরটাকাল, বহুযুগ, শুধু সমাপতন হয়নি সময়ের। কিন্তু ভাবনা, চিন্তা ও সর্বোপরি হৃদয়ের সমাপতনের কাছে সময়ের হার তো ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা। সেই অপেক্ষার শেষেই শুরু নতুন সময়ের, নতুন পথচলার।

Tuesday, December 31, 2019

২০১৯

একেকটা বছর আসে, যারা অন্ধকারকে চেনায়, যারা রজনীগন্ধার গন্ধে ভাসায়, টেনে হিঁচড়ে নিচে নামাতে থাকে। কিন্তু বরাবর দেখেছি, খারাপ এই সময়গুলোকে মিথ্যে করে দিয়ে, আশার বাতাস আদরের প্রলেপ জমাতে আসে। যখন অসময় ঠেলতে ঠেলতে আলোকবিহীন খাদের কিনারায় নিয়ে চলে যাচ্ছিল, তখনই অপ্রত্যাশিতভাবে সুসময় হাত বাড়িয়ে ভালোবাসায় বিশ্বাস ফিরিয়ে দেয়। চারিদিকে সেসময় ঘৃণা, অবসাদ, ধর্ষণ। কিন্তু তার মাঝেই উঠছে অন্য ঢেউ, অন্য অকাসিও-কর্টেজ, অন্য ছাত্র-জনগন জমায়েত। এই সামাজিক পরিসর পেরিয়ে, ব্যক্তিগত পরিশ্রম পেয়ে যাচ্ছে সামান্য স্বীকৃতি, বহু টালবাহানার পরে। ব্যক্তিগত ভরসা তার নতুন শ্রী খুঁজে পাচ্ছে। পৃথিবী নতুন উদ্যমে পাড়ি দিচ্ছে তার সূর্যকে প্রদক্ষিণ করার কক্ষপথে, আবারও।

Friday, December 20, 2019

Internet blockade in Howrah

After three days of Internet blockade by the state -

It feels like times have figuratively gone back. It's not too bad, since people anyway like to reminisce nostalgic past. I'm back at my pre-secondary and -higher-secondary days, listening to Radio (See Sinchan and Ashish, Radio is important). The added bonus now is the lack of television, because we disconnected our TV cable a few years back, thinking too progressively at that point of time. It's an interesting time to live.

Some people are comparing the current situation with the situation under the Fuhrer. This kind of simplification sometimes dilutes the significance of the concerning situation, by exaggerating it too far. But, even if we agree that the recent days in India has similarity to the Third Reich, there is a stark difference.

When Hitler was building his torturous empire, the economy was actually on the rise. It was recovering from the disaster of the World War I. It was a fully state-sponsored development for the private enterprises, with heavy spending on military, motorways and other public infrastructures. It also improved the unemployment by a good margin. All these apparent economic progress helped the Nazi agenda of ethnic cleansing by showing a false development and promising a bright future to the German people. Finally, the tragedy of mass killings was carried out.

The amazing achievement of the Modi government is that it is able to propagate its extremist, religious, conservative propaganda, in spite of an ongoing economic recession. People are jobless; common food prices are going up; economy is going downturn for quite a while. However, people are more engrossed into the non-economic issues. They are conveniently confronted with new social concerns which had nothing much to do with fundamental progress or economic growth.

As we discover similarities of our current times to the Nazi state, we should also recognize the difference. As the old man said, "history repeats itself, first as tragedy, then as farce." We have possibly gone back, but with a new vigor of ignorance. We are living our own farce. The technological advancement helped it by both providing right information faster and also spreading misinformation quicker. But it is clear from the recent surge of protests all across India and some parts of the world that people ultimately sift through the garbage and side with progressive, humane cause. The state consequently abides by its mass.

Thursday, August 22, 2019

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৩ | Notes on Arts - 3

ক্লাসিকাল ইকোনোমিক্স তত্ত্বে শিল্প একটি কমোডিটি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আদপে শিল্প তো শুধু তাই হতে পারেনা, শিল্পের একটা দ্রব্য ধর্ম ছাড়া তাতে পুঞ্জীভূত থাকছে আমাদের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা জাতীয় আপাতভাবে বায়বীয় কিছু বস্তু। আবার আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা শিল্পকে আহরণ করতে পারারও উপযোগী করে তুলছে। তাই শিল্প শুধু সৃষ্টিকর্তার হয়ে থাকছে না, তা দর্শক, শ্রোতা বা পাঠকের হয়ে উঠছে। মানে শিল্প সৃষ্টির বিপরীত প্রান্তে যারা শিল্পকে ভোগ করছে, শিল্প তাদের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সেদিক থেকে দেখলে ক্লাসিকাল ইকোনমিক্সের তত্ত্ব ভুল কিছু নয় - শিল্পের একটা উৎপাদন (production) এবং ব্যবহার (consumption) আছে। এই অর্থনীতিকে ভিত্তি করে ভাবতে শুরু করলে আমরা শিল্পের সামাজিক বাস্তবতার আলোচনায় ঢুকে পড়তে পারি - যেটা আপাতত করতে চাইছি না। আমরা শিল্পের বিমূর্ত দিকটার গভীরে ঢুকবো।

শিল্পের এই যে দ্বিমাত্রিক ক্ষমতা - উৎপাদন এবং আহরণ - মানবপ্রজাতির এক স্বতন্ত্র উদ্ভাবন। দুটো কাজেই মানুষ কিছু আনন্দ, দুঃখ বা অন্য অনুভূতি পেয়ে থাকে। সুতরাং, শিল্পের দু' প্রান্তেই মানুষের কিছু পাওয়ার আছে। অবশ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে শিল্পীর তার শিল্পের ব্যবহার সম্পর্কে ভাবিত থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু শিল্পের এই যে বহুমাত্রিক ভূমিকা, তা মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী বিকশিত করতে পেরেছে কি না, সে আমার জানা নেই। মানুষের চিন্তা এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা শিল্পকে মানুষের জীবনে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। সাথে বিজ্ঞানের অগ্রগতি নতুন ধরণের শিল্পমাধ্যম তৈরী করছে - যেমন সিনেমা, ফটোগ্রাফি, ইত্যাদি। 

আবার বিজ্ঞানের এই প্রগতির মাধ্যমেই এখন আমরা আমাদের এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা অনু-পরমাণুর মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছি। যেখানে বহু ইলেকট্রন দৌড়াদৌড়ি করে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বিশ্লেষণের ক্ষমতা পাচ্ছে। যদিও এই প্রযুক্তি এখনও শিশুসুলভ, কিন্তু আমরা সহজেই মেশিনপ্রদত্ত গভীর বিশ্লেষণের অনুমান করতে পারছি। এই ধরনের সন্ধিক্ষণে আমি মানবসৃষ্ট শিল্পের আরো গোড়ায়, আরো ফান্ডামেন্টাল-এ ঢুকতে চাইছি। আমি খুঁজে পেতে চাইছি সেই শিল্পমাধ্যমকে যার জন্য মানুষ শুধু নিজেই মাধ্যম, তার আর অন্য কোন মাধ্যম লাগছে না। মানে ধরা যাক, আঁকতে গেলে লাগছে কাগজ, পাথর, রং, তুলি বা পেন্সিল; সাহিত্যে কালি ও কাগজ। সিনেমা বানাতে ক্যামেরা। কিন্তু এমন কোন শিল্প তো আছে, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতিপ্রদত্ত শক্তিই শিল্প তৈরী করছে। 

এখানে আমরা একাধারে পাচ্ছি গানকে। এখানে সংগীতের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে শব্দ নামক শক্তি, যা রূপান্তরিত হচ্ছে অন্য কোনো শক্তি থেকে। এই শব্দশক্তিই অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে শিল্প হয়ে এবং মানুষ তা আহরণ করছে। সংগীতের বিমূর্ততা গানের মাধ্যমে এভাবেই মানুষের কাছে  ভীষণ বাস্তব হয়ে উঠছে, খুব গভীরে থেকে। 

অন্যপাশে আমরা পাচ্ছি নাচকে - যার মাধ্যম মূলত মানুষের পার্থিব অবস্থান ও রূপ এবং আলোকশক্তি। আলোর মাধ্যমে নাচ পৌঁছে যাচ্ছে অন্য মানুষের উপলব্ধিতে। সুতরাং গান এবং নাচকে আমরা শিল্পের একদম ফান্ডামেন্টালে পেয়ে যাচ্ছি। এছাড়া অন্য কিছু আছে কিনা, আপাতত মনে পড়ছে না। তবে গানের সাথে মানুষের এই যে আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক যোগ - এটা নিজে যেমন অনুভব করেছি, তেমনি এটাও বুঝতে পারছি যে গান এভাবেই ভীষণ বিমূর্ত হয়েও মানবসত্ত্বার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। নাচ ছাড়া, গান শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে একটা স্বকীয় জায়গা করে নিচ্ছে - এভাবে আমি আমার সংগীতপ্রীতির একটা ব্যাখ্যা তৈরী করছি।

Saturday, April 27, 2019

ডি. এন. এ - DNA

পাড়ার একটা রাস্তার ধারে খুব ছোট্ট মতন একটা মুদিখানার দোকান ছিল আগে, যখন স্কুলে পড়তাম। ওখানে এক ধরণের বিস্কুট পাওয়া যেত, নারকেলের স্বাদ থাকতো তাতে। ওই বিস্কুটটা ভীষণ ভালো লাগতো। হাইস্কুল যখন চারটে বা পাঁচটায় ছুটি হত, সেকেন্ড ব্রিজের উপর থেকে বাস ধরতে যেতাম। শীতকালে সূর্য তখন পশ্চিমাকাশের মায়া ত্যাগ করতো, আকাশটা খানিকটা লাল। নিচ দিয়ে শালিমার থেকে মালগাড়ি যাওয়া-আসা করতো খুব ধীরে ধীরে। ওই চিত্রকল্পটা এখনো মনে পড়ে যায় বারবার, ওই ছবিটা ভালো লাগে। হয়তো অপুর জন্যই রেলগাড়ির প্রতি একটা অমোঘ গ্রাম্য মায়া থেকে এই ভালোলাগা। গ্রামের দিকে যে টালির চালের বাড়ি দেখা যেত, ওগুলো আঁকতে ভীষণ ভালো লাগতো। রুলটানা খাতার পিছনে অথবা মার্জিনের ওপরে-নিচে বাড়ি এঁকে ফেলতাম, ৯-১০ টা পেন্সিলের টানেই। প্রাইমারি স্কুলে টিফিনের সময় একজন দাদু একটা চুরান বিক্রি করতো, ওটা খেতে খুব ভালো লাগতো। টিফিনের সময় যে ঘরটাতে আমরা বোতলে জল ভরতে যেতাম, সেখানে একটা স্বতন্ত্র গন্ধ পেতাম, জানিনা কিসের, হয়তো ছোট অনেক বাচ্চার সরলতার গন্ধ। এখন বেসমেন্টে যখন লন্ড্রির জন্য যাই, সার্ফ, হিটারের গ্যাস - এ সবকিছুর মেশানো অদ্ভুত গন্ধ পাই, ওটা খুব ভালো লাগে। গন্ধকে তো ডিজিটাইজ করা যায়না, তাই অন্যকে সহজে বোঝানোও কঠিন। কাচা জামাকাপড়ে হালকা জল ছিটিয়ে যখন গরম ইস্ত্রিটাকে রাখা হয়, তখন যে শব্দটা পাওয়া যায়, সেটা শুনতে ভাল্লাগে। সকালবেলা এক ধরণের পাখি ডাকতো ছোটবেলায়, সেই পাখির ডাকটা এখনো শুনতে পাই কল্পনায়, ওটা ভালো লাগে। মামাবাড়িতে গরমের দুপুরে লোডশেডিং থাকা অবস্থায়, দাদু ঘুমপাড়ানি গান গেয়ে ঘুম পাড়াবার চেষ্টা করতো, "আয় ঘুম, যায় ঘুম, পাঁজা পাড়া দিয়ে", ওই গানের যে টান, তা অন্য কোনো গানে আর হয়তো পাবো না। ওই গানের ভালোলাগায় ছোটবেলা জড়িয়ে আছে। মাঝে মাঝে পুকুরের দিক থেকে হাওয়া এসে, পিঠের ঘামে লেগে আরাম দিতো, গান শুনতে শুনতে চোখ বুজে যেত। আমাদের নিজেদের বাড়িতে দাদু চোখ বুজে সন্ধ্যা আহ্নিক করতো, সেই সুরটাও খুব মনকেমন করানো ছিল - আমার ওই মন-কেমন ভালো লাগতো। কোনো কোনো দিন বিকেলে ক্রিকেট খেলা মিস হয়ে গেলেও খুব মন খারাপ করতো। তবে রোববার কখনো ক্রিকেট মিস হত না, কখনো চড়া রোদ্দুরে ৩টে থেকে খেলা শুরু করে দিতাম, মা দুপুরের দিকে ক্লান্তিতে তখন ঘুমোতো। আবার রোববার সকালে যখন পাড়ার কাকু চুল কেটে দিতো, ওই কাঁচির আওয়াজটা বেশ অন্যরকম লাগতো। সোমবার দিন সকালে যখন ইউনিভার্সিটির ফুটপাথ দিয়ে হাঁটি, প্রচুর মানুষ, ছাত্রছাত্রী একটা তালে হাঁটে - কাজের তাল, পড়াশোনার তাল। ওদেরকে একসাথে যখন দেখি, ওদের কোথাও আলাদা করতে পারিনা। কিন্তু সকলেরই তো একটা হারিয়ে যাওয়া প্রিয় বিস্কুট আছে, একটা হারিয়ে যাওয়া গাড়ি আছে, ছবি আছে, গন্ধ আছে, শব্দ আছে, গান আছে। সেগুলোই তো ওরা। কিন্তু এরপরে ওরা সব্বাই কোনো ছোট-বড় কোম্পানিতে কাজ করা লোক হয়ে যাবে। অথবা নতুন কোনো জিনিস উদ্ভাবন করা গবেষক বা শিক্ষক বা অন্য কোন পেশার মানুষ হয়ে যাবে। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মনস্কতার মানুষ বলে আমরা তাকে চিনবো। ওদের ডি. এন. এ-কেও আমরা ডিজিটাইজ করে ফেলবো, কিন্তু ওদেরকে তো আমরা ওদের মতো করে কখনোই ধরতে পারবো না, ভাববো না এবং জানবোও না। জানার সুযোগও হবে না। তাদের ভালোলাগাগুলোও বায়বীয়তায় বিলীন হয়ে যাবে।

Saturday, February 09, 2019

Alexandria Ocasio-Cortez

Alexandria Ocasio-Cortez - নামটা যদি এখনো না শোনা হয়ে থাকে, তাহলে চটপট এনার ব্যাপারে কিছু তথ্য জেনে নেওয়া প্রয়োজন। নিউ ইয়র্ক শহরে পুয়ের্তো রিকান পরিবারে জন্ম, প্রসঙ্গত পুয়ের্তো রিকো আমেরিকার দক্ষিণে একটি আমেরিকান কলোনি রাজ্য। Alexandria বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন ও অর্থনীতি নিয়ে অনার্স পাশ করেন ২০১১ সালে। সেই সময়টায় সারা বিশ্বেই মন্দা চলছিল আর তাই চাকরি-বাকরির অবস্থা ছিল খুব খারাপ। Alexandria পড়াশোনার পর bar-এ, ফুড-স্টল-এ কাজ করা শুরু করেন, বাড়ির অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। এর কিছুদিনের ভিতরেই বার্নি স্যান্ডার্স ঘোষণা করেন যে, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য তিনি লড়বেন। অনেক তরুণ- তরুণীর মতোই বার্নির হয়ে প্রচার শুরু করেন Alexandria। বার্নি শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। কিন্তু ২০১৮ সালে Alexandria নিজে ভোটে দাঁড়াবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন।

নিউ ইয়র্কে শহরের যে অংশের বাসিন্দা ছিলেন Alexandria, সেখান থেকে ভোট দাঁড়াতেন ডেমোক্রেটিক পার্টির এক অন্যতম প্রভাবশালী, উচ্চপদের নেতা। Alexandria অভাবনীয়ভাবে সকলকে চমকে দিয়ে সেই নেতাকে হারান, আর আমাদের ভারতের ভাষায় বললে এম.পি নির্বাচিত হন। তার পরের গল্পটা কিছুটা রূপকথার আকার নিচ্ছে। সারা দেশেই বিপুল জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন ২৯ বছরের এই মেয়েটি। ক্লাইমেট চেঞ্জ, সরকারি-সহযোগিতা-প্রাপ্ত স্বাস্থ্যব্যবস্থা, ফ্রি কলেজ এডুকেশন - এই জাতীয় নীতিগুলিকে শুধু প্রথম সারির রাজনৈতিক আলোচনাতে নিয়ে আসেন তাই নয়, যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিষয়গুলিকে তিনি ইতিমধ্যেই mainstream করে ফেলেছেন। কিন্তু Alexandria সম্পর্কে আমার এভাবে লেখার কারণ ওর অন্য একটি ব্যাকগ্রাউন্ড এবং অবশ্যই অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি।

Alexandria একটি রাজনৈতিক সংস্থার সদস্য। এই রাজনৈতিক সংস্থাই Alexandria-এর নির্বাচনের সময় তৃণমূল স্তরে জনসংযোগ আর প্রচারের কাজ করেছিল। সংস্থার নাম Democratic Socialists of America. এই সংস্থা কোনো রাজনৈতিক দল নয়, কিন্তু একটি পলিটিকাল অ্যাকশন গ্রূপ। এরা বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রার্থীদের সমর্থন করে ও প্রচার করে। এদের ওয়েবসাইট থেকে এদের রাজনৈতিক ও অর্থনীতিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে খুব ছোট্ট করে বললে, এরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। তবে সোভিয়েত থেকে শিক্ষা নিয়ে এরা সমাজতন্ত্রের প্রশাসন থেকে গণতন্ত্রকে মুছে দিতে চাননা, তাই "ডেমোক্রেটিক"। তবে অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে এরাও মনে করেন, সমাজতান্ত্রিক ভাবেই অর্থনীতির গঠন হওয়া উচিত, অনেকটা কো-অপারেটিভ মডেলে। নিও-লিবারেল ইকোনোমি এবং গ্লোবালাইজেশন-এর প্রবলভাবে বিরোধী এরা। Alexandria নিজেও এই মতবাদেই বিশ্বাস করে থাকেন। তাই Alexandria-এর এই জনপ্রিয়তা এবং সাফল্য এক নতুন দিশা দেখাচ্ছে।

আমেরিকার অর্থনীতি আমেরিকার নিচের সারির মানুষকে (৯৯%) যে তলানিতে ধীরে ধীরে নামিয়ে চলেছে, তাতে Alexandria-এর জনপ্রিয়তা বাড়াটা স্বাভাবিক। ছাত্রদের লোনের পরিমান আমেরিকায় নতুন নতুন রেকর্ড ছুঁয়ে চলেছে। যত কষ্ট করে মানুষ কলেজ ও ইউনিভার্সিটিতে পড়ছেন, সেই পরিমান লোন শোধ দেওয়ার মতো চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রান্তিক মানুষেরা স্বাস্থ্য পরিষেবার সুযোগ নিতে গিয়ে প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর কাছে দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছেন। এই অবস্থায় Alexandria-এর মতো তরুণীর মূল রাজনীতিতে আসাটা একটা আলাদা উত্তেজনা নিয়ে এসেছে রাজনৈতিক বৃত্তে। ওঁকে দেখে যদি আরো নতুন মুখ এই আদর্শকে পাথেয় করে তোলেন, তাহলে আশ্চর্যের কিছু থাকবে না। 

Sunday, January 06, 2019

ভারতের অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জয়

ভারতীয় সময় ভোর থেকে সকালের দিকে অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়ার ক্রিকেট হচ্ছিল, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। বেশ কয়েকবছর পর এভাবে সকালের দিকে খেলা দেখছিলাম। আর সাথে সাথে স্বাভাবিকভাবেই মনে পড়ে যাচ্ছিল, কয়েকবছর আগের এইভাবে সকালবেলা খেলা দেখা। এই বর্ডার-গাভাস্কার ট্রফিতে প্রকৃত ক্রিকেটীয় স্কিলের একটা লড়াই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি। ইন্ডিয়া-পাকিস্তানের ক্রিকেটে যে একটা মেকি লড়াইয়ের আবহ থাকে, অস্ট্রেলিয়ার সাথে এই সিরিজে সেটা থাকে না। তাই সেই প্রথম থেকেই এই সিরিজের প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল। শীতের সকালে উঠেই খেলা দেখার মধ্যেই একটা মজা ছিল, কারণ ভারতে শীতের ক্রিকেট অবধারিতভাবে শিশির, কুয়াশার কারণে দেরিতে শুরু হয়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় সেই সমস্যা নেই। ফলে সকালে পড়তে বসার আগে খেলা দেখা যেত, আর অঙ্ক করার সাথে সাথেও খেলা দেখার অনুমতি পাওয়া যেত। কিন্তু এগারোটার স্কুলের জন্য বেরিয়ে যেতে হতো দশটার মধ্যে, তার আগে খেতে খেতে যতটা পারা যায় ক্রিকেটের সাথে ভাত মিশিয়ে খেয়ে বেরিয়ে যেতাম। রাস্তায় বাসে বেশিরভাগ সময়ই রেডিও চলতো, সেখানে গানের মাঝে মাঝে স্কোর বলতো। কখনো হয়তো মীর-ই বলতেন। সেটা শুনতে শুনতে স্কুলে পৌঁছতাম। ওটাই মোটামুটি শেষ খবর পাওয়া, তারপর আর বিশেষ খবর পাওয়া যেত না। এখন মনে পড়ছে না, তবে টিচার্স রুমে একটা ছোট টিভির ব্যবস্থাও মাঝে হয়ে থাকতে পারে। মোবাইল ফোনের কোনো অস্তিত্ব স্কুলজীবনে ছিল না, ফলে ক্রিকেটীয় লড়াইটাকে অনেক বাধা আর সংশয় নিয়ে মনের মধ্যে বন্ধ করে রাখতে হতো। আর সংশয়ের যথেষ্ট কারণও ছিল। 

২০০৩-০৪-এ সৌরভের সেঞ্চুরি দিয়ে টেস্ট সিরিজ শুরু হচ্ছে। পরে জানা যাচ্ছে, গ্রেগ চ্যাপেলের ব্যাটিং টিপস-এই সৌরভের অমন দুর্দান্ত ব্যাটিং, এমনকি অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিং-এর বিরুদ্ধেও, যেটা দাদার কমফোর্ট জোন একেবারেই নয়। সেই সেঞ্চুরিই ওই সিরিজের মুড্ ঠিক করে দিলো। পরে আমরা সিরিজে ১-১ করে এই আজকের সিডনিতেই খেলতে নামলাম, মনে একরাশ আশা আর সংশয় নিয়ে। স্টিভ ওয়ার ফেয়ারওয়েল ম্যাচ, কিন্তু খেললেন ক্রিকেটের ভগবান। এই এবারের সিডনি টেস্টের মতোই আমরা প্রচুর রান করেছিলাম, ৭০০-এর ওপর। কিন্তু বাকিটা খানিকটা উৎকণ্ঠা আর কিছুটা সাদামাটা, সেখানে স্টিভ ওয়ার শেষ ইনিংসের ম্যাচ বাঁচানো আছে। সিডনিতে ড্র হওয়ার জন্য আমরা সিরিজ ড্র-ই করতে পারলাম, জেতা হলো না। কিন্তু ২০০৩ ওয়ার্ল্ড কাপে যে একটি টিমের বিরুদ্ধে আমরা হেরেছিলাম, সেই তাদের দেশের মাটিতে এসেই তাদের অন্যতম সেরা টিম লাইন-আপের বিরুদ্ধে কতৃত্বের সাথে সিরিজ ড্র করার মানে - ক্রিকেটে ভারতের গরিমা অন্য স্তরে পৌঁছলো। ২০০৪-এ সিডনিতে এরকম একটা জায়গায় আমরা শেষ করলেও, ২০০৭-০৮-এর সময়ের সিডনি খুব একটা সুখকর ছিল না। 

তখন আমাদের উচ্চমাধ্যমিকের সময়। দাদার ক্যাপ্টেন্সি চলে যাওয়ার বেদনা কাটিয়ে উঠেছি অনেকটাই। দ্রাবিড়ের থেকে বেরিয়ে এসে কুম্বলের অধিনায়কত্ব মেনে নিচ্ছি মনে মনে। লোকটাকে বেশ ভালোমানুষ মনে হচ্ছে। সাথে ক্রিকেটীয় বুদ্ধিতে তো শানিত বটেই। সেবারে সিডনিতে ০-১ অবস্থাতে আমাদের প্রবেশ। সেই ম্যাচের মধ্যেই এতো নাটকীয়তা, সাইমন্ডস-হরভজন-মাঙ্কিগেট-রেসিজম। এবং এসবের পরেও অস্ট্রেলিয়ার প্লেয়ার এবং আম্পায়ারদের চূড়ান্ত অপেশাদারিত্ব। আম্পায়ার রিকি পন্টিংকে জিজ্ঞেস করছেন, সৌরভ আউট কিনা, এবং পন্টিং "হ্যাঁ" বলাতে আউট দিয়ে দিচ্ছেন। সে এক হাস্যকর এবং সাথে সাথেই প্রচন্ড রেগে যাওয়ার ঘটনা। আমরা সেবার দুই ইনিংসেই বেশ ভালো খেলছিলাম (এক্ষেত্রে "আমরা" মানে দাদা)। সেবারে হেরে যাওয়ায় কুম্বলের জন্য আরো বেশি করে খারাপ লেগেছিল, অন্তত ওঁর জন্য ম্যাচ আর সিরিজ দুটোই জিতলে ভালো লাগতো।

তবে সেবারের ইচ্ছে প্রায় দশ-এগারো বছর পরে এবারে সম্পূর্ণ হল। ভিরাট কোহলি যোগ্য ক্যাপ্টেন-ব্যাটসম্যান হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতলেন। সেটা ঘটলো এই সকালের খেলা দেখার মাঝে মাঝেই, কিছুটা কো-ইনসিডেন্টালি। মাঝের কিছু "ঠান্ডা" কর্তৃত্বে ভারত টেস্ট ক্রিকেটে কিছুটা ঠান্ডাই হয়ে গেছিল, তখন ক্রিকেট দেখতামও না। সেই শীতলতা অবসর নেওয়ার পর, ভিরাট আমাদের পুরনো আগ্রাসনের দুনিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন। এটাই ২০০৩/০৪ এবং ০৭/০৮-এর সঠিক গতিময় ভবিষ্যত, যার মধ্যে শীতকাল থাকলেও কোনো "ঠান্ডা" আবহাওয়া নেই। শীতের কুয়াশা কেটে গিয়ে উজ্জ্বল রোদ উঠছে।

Tuesday, December 25, 2018

জৈবিক নোটস

প্রত্যেকদিন, প্রতি মুহুর্তে একইভাবে দেখে চলেছি পৃথিবীটাকে। মোটামুটি ছ'ফুট উপর থেকে যেভাবে দেখা যায়। একরকম ভাবে দেখতে দেখতে দুটো আলাদা দিনের মধ্যে তফাৎ কমতে থাকে ধীরে ধীরে। কিন্তু যদি কয়েক হাজার ফুট উপরে চলে যাওয়া যায়, তাহলে আর একেকটা দিনকে সূক্ষভাবে আলাদা করার দরকার পড়ে না। তখন বিমূর্তভাবে আরো বড় সময়ের স্কেলে ঘটনাপ্রবাহকে দেখা যায়। সেই সময়ের স্কেলে, অন্ততপক্ষে একটা বৈচিত্র্য ফুটে ওঠে - কিন্তু সেই বৈচিত্র্য-এর উদ্দেশ্য কি - তা ঠিক বুঝতে পারিনা। 

একটা ফুটপাথ দিয়ে বাড়ি ফিরছি, চারপাশে অল্প কিছু ছাত্রছাত্রীরাও হাঁটছে। আমি ক্লান্ত কিন্তু পরিতৃপ্ত সারাদিনের কাজের পরে। তাহলে কি এটাই সব? এরই জন্য এতো আয়োজন? এরই জন্য সকাল ৬টায় তাড়াতাড়ি মুখ-ধোওয়া? তারপর জলদি সাইকেল করে সাড়ে ছ'টার মধ্যে গেস্টকিন বাজারে ফিজিক্স পড়তে ঢোকা? এরই জন্য সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার ফাঁকা হলদিয়া লোকালের জন্য বাগনানে অপেক্ষা করা? চেঙ্গাইলে দিলখুশ ওঠার জন্য আশা করা? এরই জন্য নন্দন, নিউটাউনে হলুদ আলোয় স্নান? এই হেঁটে ফেরার জন্যই এতো কিছু নাকি, এই হেঁটে ফেরার আগে অতো কিছু? কয়েকহাজার ফুট উপর থেকে জীবনের স্কেলে বৈচিত্র্য দেখতে পেলেও উদ্দেশ্য পাচ্ছি না - কেন হচ্ছে এসব! এই সবগুলোই তো নাহলে চলতো।

আমি এখন লেখাটা না লিখলে, আমি জয়েন্ট না দিলে, আমি চাকরি না করলে - বেশ চলতো। কিন্তু তারপরেও এসব হল, আমি আমার এখনকার "আমি" হলাম। আমি আছি, আমি থাকছি, আমি থাকবো। বুঝতে পারছি এর পরে কি হবে, বন্ধুরা দেখিয়ে দিচ্ছে - বিয়ে হচ্ছে, একটা সংসার হচ্ছে, তাতে বাদলবাবুর "মানবী"-ও হয়তো থাকছে, পরবর্তী প্রজন্ম হচ্ছে। একটা ফর্মুলায় খেলা চলছে, আমি সেই ফর্মুলা মেনে খেলছি। "এক-দুই-তিন।" চাকরি করা, চাকরি ছাড়া, পড়াশোনা, ঘুরেবেড়ানো! ফর্মুলা-ভাঙার যে ফর্মুলা সেটাকেও প্রয়োগ করতে ছাড়ছি না। "দুই-এক-তিন"। কোথাও গিয়ে বেশ রঙীন লাগছে পৃথিবীটাকে, কি বিচিত্র এই পার্থিব জীবন ! কিন্তু বৈচিত্র্য দেখতে দেখতে হঠাৎ আবার ঢুকে পড়ছি সেই একঘেয়েমি কল্পচিত্রে। কারণ সবটাই তো সেই ফর্মুলার বৃত্তে আবর্তিত। আর এই একঘেয়েমিই আমার অতীত পেরিয়ে বাস্তব ছুঁয়ে আবার অতীত হবে। কিন্তু ঠিক সকলের আর পাঁচটা অতীতের মতোই তার পরিচিতি। তার মধ্যে বিশেষ কোনো স্বকীয়তা নেই, নিজস্বতা নেই, আছে সময়ের প্রতিফলন, সমসাময়িক সমাজের এক চলচ্ছবি। আমি একটা সমাজ, আমার জীবন একটা সমাজ, আমার ছ'ফুটের দৃষ্টিভঙ্গি একটা সমাজ, মানুষ সমাজবদ্ধ জীব, আর আমি সেই সমাজে আবদ্ধ জীবাশ্ম!

Friday, September 21, 2018

মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা প্রলম্বিত জেটল্যাগ চলছে - Sometime it feels like a long jetlag

মাঝে মাঝে মনে হয়, একটা প্রলম্বিত জেটল্যাগ চলছে। গভীর রাত্রে অনেকসময় যখন ঘুম ভেঙে যায়, তখন মনে হয়, কেন ঘুমোবো ! আমার তো এখন জেগে থাকবারই সময়। আমার নিজের যারা - বন্ধু, শত্রু, আত্মীয়, ইত্যাদি - তারা তো সকলেই এখন জেগে, দিনের ব্যস্ততম সময়ে তারা ব্যস্ততায় বন্দী। তাহলে আমি কেন এই নিকষ কালো মুক্তদশার কবলে থাকবো ! এইরকম প্রশ্নই সমস্ত ঘরজুড়ে ঘুরপাক খেয়ে প্রতিফলিত হওয়ার পরে সত্যের সন্ধানী হওয়ার ইচ্ছে হয়। সেই সত্যের খোঁজেই বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমকে আপন করে নেওয়া - গান, লেখা, কবিতা। এসব কিছুতেই সেই সত্যকে তুলে ধরার এক যারপরনাই চেষ্টা। কিন্তু সেই সত্যানুসন্ধান আসলে একটা ঢাল। প্রকৃতপক্ষে এসব শিল্প যে সৃষ্টি করছি, এগুলো পুরো ট্র্যাশ, বোগাস, গার্বেজ। স্রেফ কোনো মূল্য নেই এগুলোর। এগুলো শিল্প বলে ভাবার নূন্যতম স্তরেও পৌঁছনোর যোগ্য নয়। তাই জন্যই সত্যানুসন্ধানের একটা ভেক ধরতে বাধ্য হতে হয়, নাহলে তো সৃষ্টির কোনো সার্থকতা থাকেনা। তবে এই সত্য-মিথ্যার আড়ালেই অন্য যে উদ্দ্যেশ্য অজান্তে সাধন হয়, সেটাই পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা -আত্মানুসন্ধান। আত্মায় বিশ্বাস নেই, কিন্তু তাকে সন্ধানে যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। নিজের অন্তরটাকে খুঁড়ে বের করার মধ্যে এক পাশবিক আনন্দ যেমন আছে, তেমনি মহাজাগতিক এক তৃপ্তি আছে - হয়তো বা পাশবিক আনন্দটাতেই তৃপ্তি। তবে নিজের ভিতরে সম্পূর্ণ প্রবেশ করার মানে, গভীরে লোকানো আশঙ্কাগুলো - যা কিনা দৈনন্দিন নাওয়া-খাওয়ায় চাপা পড়ে ছিল - সেগুলোকে এক অন্ধকার ঘর থেকে সর্বসমক্ষে আলোয় নিয়ে ফেলা। মৃত্যুচিন্তা তার মধ্যে প্রথম সারির। অধিকাংশ অন্তরখননেই তার প্রমাণ পাওয়া যাবে। সামান্য ভাবনার বারুদেও, এই চিন্তার ফুলকি বিধ্বংসী আগুনের ধ্বংসলীলা চালায়, মনের অলিতে-গলিতে, মস্তিকের পাড়ায় পাড়ায়। স্রেফ রাস্তায় হাঁটতে থাকা থেকে ল্যাম্পপোস্ট, ট্রাফিক লাইট, স্ট্যান্ডার্ড, আমেরিকা, ভারত, ইতিহাস, সমাজতন্ত্র, স্বাধীনতা, পৃথিবী, প্রক্সিমা সেন্ট্যুরি, মহাজগত, বিগব্যাং, ব্ল্যাক হোল এবং... আমি। আসলে তো আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। অস্তিত্ব নেই এই ভাবনাটারও। মৃত্যুর যদিও অস্তিত্ব আছে, আমাদের একমাত্র নিশ্চয়তা। সেটারই স্থায়িত্ব নির্ধারিত। আর একটা প্রচণ্ড চিৎকার, এবং শুধুই তার থেকে যাওয়া আছে, তারও অস্তিত্ব আছে। গান, লেখা - এসবের কোনো অস্তিত্ব নেই, লেখার কোনো মূল্যও নেই। কারণ লেখা অনেক সহজ, বাঁচা অনেক কঠিন।
মাঝে মধ্যে মনে হয়, একটা প্রলম্বিত জেটল্যাগের মধ্যে রয়েছি, গত চার বছর ধরে।

Sunday, September 16, 2018

মন তরে কেবা পার করে

ভীষণ গোলাপী মতন হয়ে আকাশের গায়ে সন্ধ্যের ছায়া পড়তে শুরু করেছে। বোম্বে রোড ধরে চলে এসে কিছুক্ষনের ভিতরেই কলকাতাকে পেরোনো হয়ে গেছে। সেখানকার মেকী মনুষ্যত্ব, নাক-উঁচু স্বভাব গা থেকে ঝরে গেছে। মাটির কাছাকাছি, খুব খুব কাছাকাছি যাওয়া হচ্ছে। আকাশ গোলাপী রঙে সেজে উঠে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছে। যে নদীকে একটু আগেই অচেনা মহিলা লেগেছিল, এখন সে যেন কত চেনা পুরনো বান্ধবী। এইভাবে শ্রান্ত সন্ধ্যের মাঝে ওর সাথে বসে থাকতে থাকতে, হয়তো এই পুরনো বান্ধবীর প্রেমে পড়বো। এরই তো প্রেমে পড়া যায়। কি হবে আর বন্ধুত্বের দূরত্ব রেখে! ওই তো, একটা নৌকো দেখা যাচ্ছে। ওতে করে বেরিয়ে পড়ছি দুজনে মিলে। এরই মধ্যে,  ভাটিয়ালি গান শুরু হয়েছে। মাঝিভাই এক প্রান্তে বসে গানের ভেলায় দাঁড় বাইছেন। আমি আর নদী একদিকে শুয়ে আছি, পাশাপাশি। অকূল দরিয়ার গান শুনতে শুনতে উপরে দেখছি, কিভাবে তারারা একের পর এক কালো হতে থাকা আকাশের প্রান্তরে অবিন্যস্ত ভাবে দাঁড়াচ্ছে। এরই মাঝে আমার সদ্য হওয়া প্রেমিকা নদী গেয়ে উঠছে, "মাঝি তোর নাম জানিনা, আমি ডাক দিমু কারে, মন তরে কেবা পার করে"। এত বেদনা, কিন্তু তার মধ্যেও জীবনতরী বেয়ে চলার কি ভীষণ আর্তি! নদীর কণ্ঠ্যে যে কি আছে! দেহে শিহরণ হচ্ছে, কিন্তু চোখে জল, ভীষণ কাঁদতে ইচ্ছে করছে। নদীকে জিজ্ঞাসা করতে গেলাম, "মেঘে ঢাকা তারাতে এই গানটা..."। নদী গান থামাল না, সদর্থক মাথা নাড়লো। আকাশ থেকে দূরে পাড়ের দিকে চোখ নেমে এলো, ছোট্ট ঘুপচির ভিতর টিমটিমে হলদে বাল্ব গুলো জ্বলে উঠছে, একের পর এক। কেউ হয়তো তুলসিতলায় সন্ধ্যাপ্রদীপ দিচ্ছে, আজান শেষে কেউ ঘরে ফিরছে। শাঁখ বাজলেও শব্দ এসে পৌঁছায় না নদীর মাঝখানে।

আচ্ছা নদী, ওপারে যাওয়া যায় না? - আমার কৌতুহল। নদী বলছে, "আমি তো যাই। আমার তো তোমাদের মতন বাঁধন নেই। আমি স্বাধীন।" - নদীর মুখে মৃদু হাসির স্রোত খেলে গেল। কিন্তু সেই স্রোতই আমার মনের ভিতর কি ভীষণ রকম মোচড় দিচ্ছে। এতগুলো মানুষকে একটা পেনের আঁচড়ে ঘর ছাড়া করে দেওয়া হল, আলাদা করে ভেঙে দেওয়া হল। চাইলেও আর যাওয়া যাবে না, শুধু হয়তো কিছু ঘুপচির ক্ষীণ, শান্ত, নিরস্ত্র আলো দেখা যাবে, এপার থেকে। তবু যেতে আমাকে হবেই; তাই উপায় বের করে নদীর দেহে ডুব দিচ্ছি আমি, নদীর সাথে মিশে যেতে। তখন তো আর কোনো বাধা থাকবে না। নদী তো আমার প্রেমিকা, আমাকে নিশ্চই ফিরিয়ে দেবে না। দিচ্ছেও না, ডুবে যাচ্ছি আমি। মুক্তি হচ্ছে আমার, দেশীয় বাধা, বন্ধন, পার্থিব শৃঙ্খল থেকে মুক্তি, কি ভীষণ আনন্দ, কি দারুন পরিতৃপ্তি! কি মিঠা জল, কি শীতল, কি স্নিগ্ধ! আমি বুঝতে পারছি, আমার মৃত্যু হচ্ছে, আরো গভীরে চলে যাচ্ছি নদীর, কিন্তু কোন কষ্ট হচ্ছে না। সমস্ত দুঃখ আমাকে, এই প্রথম বোধ হয়, ছেড়ে চলে যাচ্ছে। গলার কাছে বিশালাকৃতির দলাটা নেমে যাচ্ছে। কিন্তু নিশ্বাস নিতে পারছি না যে! দমটাই শুধু বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। জৈবিক বাস্তবতা আঁকড়ে ধরছে আমায়। কেউ আমাকে একটু অক্সিজেন দিন না, দাদা একটু অক্সিজেন? - আমি ভিক্ষা চাইছি। কিন্তু কেউ যে নেই নদীতে, সকলে কোনো না কোনো পাড়ে ঠাঁই নিয়েছে, কাউকে পাচ্ছি না। দাদা একটু কেউ সাহায্য করুন না, প্লিজ। দাদা আমি যে বাঁচতে চেয়েছিলাম, দাদা আ আ আ আ আ.... 

উঠে বসলাম, হাঁপাচ্ছি, ভীষণ ভয় করছে, চারিদিক অন্ধকার, শুধু বিছানার একটা কোণে রিডিং ল্যাম্পের আলোটা তাক করা আছে। চারিদিক অন্ধকারের ভিতরে, বিছানায় রাখা বুকমার্ক করা বইটার ওপর ল্যাম্পের আলোটা পড়ে, বইটার নামটা যেন একটু বেশি জ্বলজ্বল করছে, "পূর্ব-পশ্চিম" - আমাদের অবশিষ্ট আইডেন্টিটি।

Friday, August 31, 2018

"অরাজনৈতিক" আন্দোলন ও কলকাতা-কেন্দ্রিক নাগরিক সমাজ (~৫ মিনিট) । Apolitical Movements and Kolkata-based Civil Society

একবিংশ শতকের বয়েস বাড়ার সাথে সাথেই বাঙালির একটা প্রবণতা বেশি বেশি করে চোখে পড়ছে, "অরাজনৈতিক" হতে চাওয়ার প্রবল চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থাই হয়তো এর মূল কারণ। কিন্তু এই "অরাজনীতি" তাঁদের সাময়িক আরাম ছাড়া আর কিছু দিচ্ছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু এই "অরাজনীতির" সুযোগ যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারছে, তখন তারা লাভবান হচ্ছে। আর যখন তা হচ্ছে না, তখন কিছু গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা ক্ষণিকের জন্য সমাধান হচ্ছে। অথচ "রাজনীতি" যদি সত্যিই দক্ষ এবং দায়িত্বপূর্ণভাবে করা যেত, তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না, বরং একটা বৃহত্তর সমাজের ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে মেডিকেল কলেজের ঘটনা নিয়েও এই "অরাজনৈতিক" আকাঙ্খা আবারো দেখা গেল। মেডিকেল কলেজের হোস্টেল নিয়ে ছাত্ররা একটি আন্দোলন করছিলেন। তাঁদের দাবি না মানায় তারা একটি পলিটিকাল টুল হিসেবে "অনশন"-কে ব্যবহার করেন। দিন বাড়ার সাথে সাথে, কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো থেকে অনেক মানুষ এই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে আসেন। তাঁরা মেডিকেলে কলেজে উপস্থিত থেকে ছাত্রদের সমর্থন জানান। শেষ পর্যন্ত কতৃপক্ষ ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়। তবে এই আন্দোলনের পিছনের রাজনৈতিক চরিত্রটা কলকাতার মানুষ বুঝতে চাইলো না। আন্দোলনটাকে একটি "অরাজনৈতিক" চরিত্র দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো হল। 

এই আন্দোলনকে একটু গভীর ভাবে দেখলে অন্য চরিত্র বেরিয়ে আসে। মেডিকেল কলেজের যে ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনটা পরিচালনা করছিলো, ডিএসএফ, তাঁদের দাবিতে এও ছিল যে, তৃণমূলের প্রাক্তন ছাত্রকে যে সুপার করা হয়েছে, তাঁকে রাখা যাবে না। বদলে ছাত্র-শিক্ষকের কাউকে রাখতে হবে। অন্তত ন্যায়সঙ্গত দাবি, এবং রাজনৈতিকও। দাবিটাকে একটু বড় করে দেখলে বোঝা যায়, সব জায়গায় তৃণমূলের পোষ্য লোক বসিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এই দাবি। অনেক জায়গাতেই এখন এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন মানুষ। কিন্তু সব আন্দোলনকে "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া যায় না, সব আন্দোলনের এলিটিজম থাকে না, যা মেডিকেল কলেজের আছে। ফলে সেইসব আন্দোলন কোনো স্বীকৃতি বা বৃহৎ আকৃতি পায়না। অথচ মানুষের এখনই দরকার ছিল, এই ধরণের আন্দোলনগুলোকে একত্রিত করার। কিন্তু তা না হয়ে, এটা স্রেফ মেডিকেলের ছাত্রদের সাময়িক উপশম ঘটালো।

এখনকার এই ঘটনা যেমন দেখায় যে অরাজনৈতিক আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা, তেমনি উল্টো পিঠও আছে। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন হয়, তাকেও প্রথমদিকে এক "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া হয়েছিল। কলকাতার সাধারণ মানুষ এবং "বুদ্ধিজীবী", শিল্পী সমাজ সেই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে এসেছিলেন। যদিও এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন একেবারেই ছিল না, পিছনে খুব ক্ষুরধার রাজনৈতিক মাথারা কাজ করছিলেন। মমতা ব্যানার্জি এই আন্দোলন থেকে নিজের পলিটিকাল মাইলেজ উদ্ধার করেন। আবার মাওবাদীরা - যাদেরকে দেশের সব থেকে বড় ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী - এই আন্দোলনের পিছনে তাঁদের অক্সিজেন খুঁজে পেয়েছিলেন। বাংলার সাধারণ মানুষ অজান্তে দেশের "বৃহত্তম ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট"-কে সমর্থন করেছিল। এরপরে মমতা ব্যানার্জির শাসক চরিত্র উদ্ঘাটিত হওয়ার পরে, সেই বাংলাবাসীই হাত কামড়েছে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য। 

মূলত যেটা দেখা যাচ্ছে, বাঙালী "অরাজনৈতিক" হওয়ার চক্করে কখনো সুযোগ হারায়, কখনো ব্যবহৃত হয়। সম্ভবত ৭০-এর দশকে ছাত্রদের চরম রাজনৈতিক চরিত্রের ফলে যে করুন পরিণতি হয়, এবং হাজার হাজার ছাত্র-যুবরা মারা যান, তার কারণেই বাঙালী এখন রাজনৈতিক হতে ভীষণ ভয় পায়। বাড়ির বড়রাও বলেন ছাত্রদের রাজনীতির দিকে না এগোতে। যদিও এই ঘটনা খুব নতুন নয়, কিন্তু এর ফলগুলো নতুন নতুন করে বাঙালীকে সমস্যার মধ্যে রেখে দিচ্ছে। আমাদের শিবপুরে আমরা দেখেছি, কিভাবে কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের অরাজনৈতিক করার মাধ্যমে সমস্ত ধরণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। আমরা না বুঝেই "অরাজনৈতিক" হয়েছিলাম, তবে পরে উপলব্ধি করেছিলাম যে আমাদের বক্তব্য বলার মতো প্ল্যাটফর্মটা আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হল। সে কারণেই মনে হয়, "অরাজনীতির রাজনীতি"-এর এই ধোঁকাটা বন্ধ হওয়া দরকার। "অরাজনীতি" বলে যে কিছু হয়না - সেটা বোঝা দরকার।বাঙালী যদি রাজনীতিটাকে অস্পৃশ্য করে না রেখে, সুস্থ এবং দায়িত্বশীল একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো, তাতে তাঁদের নিজেদেরই মঙ্গল হত। আশা রাখবো, ভবিষ্যতের আন্দোলনগুলো গঠনমূলক রাজনৈতিক পরিচিতি পাবে, এবং সেখান থেকে এক বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের পরিসর গড়ে উঠবে।

Thursday, August 30, 2018

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ২ | Notes on Arts - 2

আগের নোটে শিল্পের ক্লাসিকাল এবং মর্ডান ধারার মধ্যে একটা মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে, শিল্পের বিষয়বস্তু বোধগম্য না হওয়ার একটা কথা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। সেটা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

শিল্পকে বুঝতে পারার জন্য যেমন নমনীয়, অনুভূতিপ্রবণ একটা মনন দরকার হয়, তেমনি একটা বিশ্লেষণী ক্ষমতাও লাগে। তবে সেই বিশ্লেষণী ক্ষমতার কথা বেশি করে ভাবলে শিল্প আর শুধু অরগ্যানিক একটা বস্তু থাকে না, যার সৃষ্টি নাকি কোনো এক অদৃশ্য শক্তি, ক্ষমতা বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা শিল্পকে কিছুটা যান্ত্রিক বা মেকানিকাল করে ফেলে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

কোনো "ভালো" গানের কথা ধরা যাক, যেমন অঞ্জন দত্তের "বেলা বোস" বা ক্যাকটাসের "হলুদ পাখি"। আমরা যদি ভেবে নিই, এই গানগুলোর সুর তৈরি হয়েছে শুধুমাত্রই অনুভূতি দিয়ে, মানে অঞ্জনবাবু কোন মনখারাপের বিকেলে "বেলা বোস"-এর কথার সাথে সুর তৈরি করেছেন, তাহলে হয়ত শিল্পের একটা আলাদা বায়বীয়তা, মাধুর্য, স্বর্গীয় ভাব তৈরি হয়। কিন্তু আমরা একটু গভীরে গিয়ে দেখবো যে, এই দুটো গানেই শুধুমাত্র ডি মেজর key-এর বিভিন্ন কর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। হয়তো অঞ্জনবাবু বা ক্যাকটাসের মনে মনে হৃদয় থেকেই ডি মেজরের কর্ড গুলোই এসেছে। কিন্তু আমাদের এটাও দেখতে হবে যে, এরকম একটি স্কেলের মেজর কর্ড গুলো মানুষের কানেও শ্রুতিমধুর হিসেবে শোনায়। সেই সূত্র ধরেই এনারা পুরো গানের সুরটাকে বেঁধে ফেলেছেন।

এভাবে শিল্পের বিশ্লেষণ করতে বসলে দেখা যায়, প্রত্যেক শিল্পেরই কিছু ব্যাকরণ আছে। গানের যেমন major বা minor key-এর কর্ডস। এই ব্যাকরণ দিয়েই প্রত্যেক শিল্পের আলাদা কিছু ভাষা তৈরি হয়। যখন কোনো শিল্পী সেই ভাষায় কথা বলে কোনো শিল্প সৃষ্টি করছেন, তখন আমাদের কাছে তা ভীষণ ভালোলাগার এনে দিচ্ছে, যদি আমরা সেই ভাষা বুঝতে পারি। কিন্তু যখন আমরা সে ভাষা বুঝতে পারছিনা, তখন সেই শিল্পকে আমাদের গ্রহণ করতে সমস্যা হচ্ছে। সে জন্য পন্ডিত আমীর খাঁ-এর "সাহানা" রাগ আমাদের কারো কারো কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ওই রাগের যে ভাষা, তার স্বাদ বুঝতে পেরে তার শিল্পরসে ভেসে যাচ্ছেন।

শিল্পের এই ভাষা শেখানোর জন্যই আজকাল বিভিন্ন আর্ট স্কুলগুলো তৈরি হয়েছে। এই স্কুলগুলিতে প্রচলিত শিল্প-ভাষাগুলি শেখানো হয়ে থাকে। তাই কেউ যদি কোনো শিল্পের সম্পূর্ণ মাদকতা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে সে এই আর্ট স্কুলগুলোর শরণাপন্ন হতে পারে, অথবা নিজে থেকে সেইসব ভাষাকে রপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে প্রচলিত ভাষা যেমন আছে, তেমনি সেই ভাষাকে ভেঙে দেওয়াও আছে।

আমরা যদি সত্যজিত কে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো, সিনেমার ভাষা মেনে নিয়ে তিনি অকল্পনীয় কিছু সিনেমা তৈরি করে গেছেন। তার সিনেমাগুলো তখনকার ওয়েস্টার্ন ফিল্মের যে ভাষা, তার সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ। সত্যজিৎ নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে তার এই ওয়েস্টার্ন ফিল্মের অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন। বিপরীত দিকে আছেন ঋত্বিক। তিনি সিনেমার সব প্রচলিত নমনীয় ভাষা, ন্যারেটিভ ভেঙে দিচ্ছেন। ফলত প্রথমে মানুষ সেই ভাষাকে নিতে পারছেনা। কারণ একটা নতুন ভাষা বুঝতে পারা তো বেশিরভাগ জনগণের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা ঋত্বিক-এর বেশিরভাগ ফিল্মকে পছন্দ করেছেন না। কিন্তু "যুক্তি তক্ক গপ্প" একটা ল্যান্ডমার্ক ফিল্ম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, আর এ জন্যই ঋত্বিক এর ছবিগুলোকে এখন বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়ে থাকে। যাতে শিক্ষার্থীরা এই ভাষা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।

এর পরে প্রশ্ন আসতে পারে, শিল্পীরা তাদের শিল্পের উৎস ঠিক কোথা থেকে পেয়ে থাকেন। যে কোনো শিল্পের উৎকর্ষতা তো সেই শিল্পের সততা আর তার ভাষার উপর নির্ভর করলো। কিন্তু সেই উৎকর্ষ শিল্পের অনুপ্রেরণা কোথায়? এ নিয়ে পরের নোটে ভাবার চেষ্টা করবো।
(চলবে)

Sunday, August 19, 2018

শিল্পের আধুনিকতা নিয়ে নোটস - ১ | Notes on Modernity of Arts - 1

ভাবনাগুলোকে অক্ষরে চালান করতে করতে বুঝতে পারছি এগুলো মূলত নোটস। সেরকমই শিল্প আর তার আধুনিকতা নিয়ে বহুদিন ধরেই মনের মধ্যে ভাবনার অযাচিত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। তা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে বেশ ক্লান্ত। এ নিয়ে বেশ কয়েকজনের সাথে অনেক বার আলোচনাও হয়েছে। এবার বোধ হোয় এই ভার নামিয়ে রাখার সময় হয়েছে, সুতরাং লিখন।

শিল্পকে এক হাজার ফুট উঁচু থেকে মূলত দুই ধারায় ভাগ করে নেওয়া যায় - ক্লাসিকাল আর মডার্ন। ক্লাসিকাল এর কথায় পরে আসছি। আধুনিক এর কথা দিয়ে শুরু করি, খুব সাবজেক্টিভ একটা ব্যাপার। বাংলা গানের আধুনিকতা নিয়ে লেখাটায় বলেছিলাম যে, সমসাময়িকতা আমার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা বয়ে আনে। তাই সলিল চৌধুরী যখন কৃষকদের জমির অধিকারে স্বাধীনতার পরেই "হেই সামালো ধান" লিখছেন, আমার কাছে উনি ভীষণ আধুনিক হওয়ে উঠছেন। বব ডিলান যখন বিশ্বের নাগরিক অধিকারের জন্য, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লিখছেন, "টাইমস দে আর চেঞ্জিং", তিনি আমার কাছে ভীষণ পরিমাণে "আধুনিক"। আমি প্রধানত আধুনিক শিল্পকেই ভালোবাসি। ক্লাসিকাল এর প্রতি আমার তেমন আসক্তি নেই।

ক্লাসিকালকে এ হেন বুড়ো আঙুল যখন দেখাচ্ছি, তখন তার পিছনে অনেকগুলো কারণও আছে। নিখিল ব্যানার্জী যখন "মেঘ" রাগে পরিবেশমন্ডলীতে গভীর নিম্নচাপ তৈরি করেছেন, আমি আধঘন্টার জন্য সেই আবহাওয়াতে মিশে যাচ্ছি বটে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না, কি হচ্ছে! উনি যে কোথা দিয়ে আমাকে নিয়ে চলেছেন, সেই রাস্তাই চিনতে পারছি না। এই যে বিমূর্ততা, এটাই তো ক্লাসিকাল শিল্পের প্রাণ ভোমরা। এই বিমূর্ততা কে আমি ধরতেই পারছিনা, আমার অপারগতা। তাই ক্লাসিকাল শিল্পকে আমি আমার শিল্প বলে ভাবছিনা। ঠিক পছন্দ করতে পারছিনা।

এসব বলার পরে, জর্জ বিশ্বাস যখন "আকাশভরা" শুরু করছেন তখন তো আমি মহাবিশ্বের সাথে নিজেকে আর আলাদা করতে পারছিনা। তখন আমি, রবীন্দ্রনাথ, জর্জদা - একসাথে বসে আছি আমরা। সকলে মিলে পথের পাঁচালী দেখছি। যা কিনা আদ্যন্ত একটি ক্লাসিকাল ছবি, অন্তত আগে বলা আধুনিকতার সংজ্ঞা অনুযায়ী। তাহলে আধুনিকতার একটা নতুন সংজ্ঞা বানাতে হয়, কারণ শুধু সমসাময়িকতা দিয়ে আধুনিকতাকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। এই নতুন সংজ্ঞায় নিয়ে আসতে হচ্ছে "খোঁজ"।

চন্দ্রিলবাবুর বক্তব্যকে একটু বিস্তৃত করে বলা যায়, যে শিল্পের মধ্যে এক নিরন্তর সন্ধান চলেছে, সেই শিল্পই আধুনিক। সে খোঁজ নিজেকে চিনতে পারার হতে পারে, বা শিল্পকে উত্তরণের হতে পারে অথবা কোনো এক বিমূর্ত খোঁজ, যা কিনা আসলে সন্ধান পাবার পরও বিমূর্ত থাকবে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্লাসিকাল শিল্পভাবনা এক চূড়ান্ত আধুনিকতায় পরিবর্তিত।

পন্ডিত আমীর খান "বসন্ত" রাগে যখন বিস্তার করছেন, তখন তো মনে হচ্ছে উনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই সর্বশেষ অনুভূতিকে যা বসন্তকে বয়ে আনবে। যে বসন্তের ছায়াছবি তাঁর মনে, হৃদয়ে, মস্তিষ্কে খেলা করছে, সেটাকেই সুরের মধ্যে প্রকাশের এক সর্বোত্তম চেষ্টা। সেই আল্টিমেট অনুভূতিকে নিরন্তর রূপ দেওয়ার চেষ্টাই সার্থক করে তুলছে ক্লাসিক্যাল শিল্পকে। কিন্তু কোনো শিল্পই তো সার্থক নয় এই সন্ধানটুকু ছাড়া। সত্যজিৎ- এর অন্যতম "আধুনিক" কীর্তি, প্রতিদ্বন্দ্বীর শেষ দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। সেই ছোটবেলার নাম-না-জানা পাখির ডাকটা। সেটারই তো খোঁজ সারা ছবিটা জুড়ে। ওই মিষ্টি ডাকটা, ওই সরল ডাকটা, যেটার মধ্যে লুকিয়ে আছে সব অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান। সেটার সন্ধানেই তো কি ভীষণ আধুনিকতা সত্যজিৎ-এ।

এই পর্যন্ত এসে ক্লাসিকাল আর আধুনিক সম্পূর্ণ মিলিয়ে মিশিয়ে ফেলেছি। নবারুণ এর ছোট গল্প কিস্যু বুঝতে পারছিনা। অথচ মানুষটি কি ভীষণ "আধুনিক"। ওনার কবিতা দিয়েই তো আশা নিয়ে বাঁচছি, চেষ্টা করছি, যেন "একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে" পড়ে, হোক সারা সহর উথাল পাথাল। আধুনিকতা তছনছ করে দিক চারপাশের এই মেকী পরিপাট্য। এবং তার পরেই হয়ত একটা নতুন সূর্য উঠবে, "লাল সূর্য" পূর্ব দিকে। সব কিছু তখন কোমলতায় ভরে গেছে। পন্ডিত আলী আকবর খাঁ তখন ভৈরবী বাজাচ্ছেন। রাগেদের সাথে নাকি অনেকটা সময় কাটাতে হয়, তবেই নাকি তাদের বোঝা যায়। আমিও হয়ত একটু একটু করে বেশি সময় কাটিয়ে, রাগসহ অন্যান্য ক্লাসিকাল শিল্পের বিমূর্ততা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করবো। যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্বের সাথেই সহাবস্থান করবে পরিতৃপ্তি বা রেসোলিউশন।
(চলবে)

Sunday, June 03, 2018

সংরক্ষণ বন্ধ করার আগে - Before abolishing caste-based Reservation

দীপক মন্ডল ক্লাসের মাঝারি মাপের ছাত্র। প্রথমবার সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসে ভালো ফল করতে পারেনি। যদিও সংরক্ষণের সুবিধা অনুসারে তার চাকরি হয়ে যায়, কিন্তু সে কখনোই ওই সুবিধে নেয়নি। তাই অনেক খেটে, পড়াশোনা করে দ্বিতীয়বার আবার চাকরির পরীক্ষা দেয় এবং ভালো ফল করে। তারপর সরকারি দপ্তরে জেনারেল কোটাতেই তার চাকরি হয়। সরকারি চাকরি পাবার পর খুব খুশি ছিল দীপক। ভেবেছিল এবার সে সুলগ্নাকে বিয়ে করতে পারবে। সুলগ্না তার কলেজের প্রেম, সুলগ্না চক্রবর্তী। কিন্তু সুলগ্নার বাড়ি থেকে এই বিয়েতে রাজি হয় না। কারণ দীপক SC, আর সুলগ্নারা ব্রাহ্মণ। সুলগ্নার বিয়ে ঠিক হয় সপ্তর্ষি ভট্টাচার্যের সাথে। সুলগ্না দীপককে ভালোবাসলেও বাবা-মা-র ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পারেনি, সপ্তর্ষিকেই বিয়ে করে ও। সুলগ্না এখন ভালই আছে।

সুলগ্নার স্বামী সপ্তর্ষি একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে। সেই ফার্মেরই রাইভাল ফার্মে দীপকের বন্ধু আলাউল কিছুদিন আগে অ্যাপ্লাই করেছিল। আলাউল অ্যাপ্লাই করার পরেও কল পায়নি ফার্মটা থেকে। দীপক জানত আলাউল-এর যা প্রোফাইল, অন্তত ইন্টারভিউর জন্য ওকে ডাকা উচিৎ। দীপকের অন্য কিছু বন্ধুও ওই একই ফার্মেই কাজ করতো। দীপক তাদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আলাউল-এর শুধুমাত্র নামটা দেখেই নাকি ওকে বাছাই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছ।

আগে আপনারা দীপক মন্ডল আর সুলগ্না চক্রবর্তীর ভালোবাসার বিয়ে সুরক্ষিত করুন। আগে আলাউল ইসলামকে সমাজে প্রাপ্য সম্মান আর মর্যাদাটা দিন, তারপর না হয়, আমরা সরকারি ক্ষেত্রে ওদের সংরক্ষণ তোলার ব্যাপারে ভাববো।

আগে আমাদের রাজ্যের পার্টি, সরকার এবং অন্যান্য প্রভাবশালী জায়গায় দীপক মন্ডল আর আলাউল ইসলামদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ুক, আগে বুদ্ধদেব "ভট্টাচার্য", মমতা "ব্যানার্জী"-এর ব্রাহ্মণ্য এলিটিজম বন্ধ হোক, তারপর নয় সংরক্ষণে ঠিক কি কি সুবিধে SC/ST-রা বেশি পাচ্ছে, সেটা ভাবা যাবে।

Sunday, May 13, 2018

পশ্চিমবঙ্গ - এবিপি গ্রুপ - পরিবর্তন

কিছু বলছিনা, স্রেফ কিছু ঘটনা তুলে দিচ্ছি। ভাবনাটা পাঠকের দায়িত্ব।

২০০৫ সালে জুন মাসে "ষ্টার আনন্দ" বলে একটি বাংলা খবরের চ্যানেল শুরু হয়। সেই চ্যানেলটির একটি ভাগ থাকে এবিপি গ্রুপের হাতে, বাকিটা থাকে ষ্টার গ্রুপের হাতে। ষ্টার গ্রুপ হল Fox News-এর একটি সাবসিডিয়ারি সংস্থা, যার মালিক হলেন রুপার্ট মার্ডক নামক আমেরিকান businessman. ২০১২ সালে "ষ্টার আনন্দ" নাম বদলে নতুন নাম হয় "এবিপি আনন্দ", কারণ রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ওই চ্যানেলটি চালাতে আর রাজি হয় না; যদিও ভারতে এখনো অব্দি সবথেকে বেশি লাভবান নিউজগ্রূপ ষ্টার নেটওয়ার্কের। ২০১২-এর পরে, এবিপি গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে এবিপি আনন্দকে নিজের আয়ত্তে নেয়। 

এই ঘটনা মাথায় রেখে, আরো কিছু ঘটনা দেখে নেওয়া যাক ২০০৫-২০১২-এর মধ্যে।

২০০৫ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ও এবিপি গোষ্ঠী "ষ্টার আনন্দ" নামক বাংলা ২৪-ঘন্টার নিউজ চ্যানেল তৈরী করে। 
২০০৫ - রিপাবলিকান পার্টির আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। 
২০০৬ - বামপন্থী দলগুলো UPA সরকারকে বলে যে, এই চুক্তি হওয়ার আগে পার্লামেন্টে গভীর আলোচনা করার প্রয়োজন আছে, কারণ এটা ভারতের স্বায়ত্ত্ব শাসন, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার উপর প্রশ্ন তোলে। 
২০০৭ - মনমোহন সিং নিউক্লিয়ার চুক্তি করার জন্য নিজে থেকেই অনেকটা এগিয়ে যান, পার্লামেন্টকে ধোঁয়াশায় রেখে। 
২০০৭-০৮ - পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হয়। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজারের আনন্দ-প্রকাশনীর বিশিষ্ঠ লেখকগোষ্ঠী এবং অন্য বুদ্ধিজীবীরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জন্য পথে নামেন। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজার, এবিপি আনন্দ-সহ এবিপি গ্রুপের সমস্ত প্রিন্ট ও নিউজ মিডিয়া পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আনন্দবাজার-গোষ্ঠীর বিশিষ্ঠ লোকেরা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত কথা বলেন। এবিপি আনন্দতে মমতা ব্যানার্জি নিজেও কয়েকবার একান্ত সাক্ষাৎকার দেন। 
২০০৮ - বামফ্রন্ট কেন্দ্রের UPA-সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেয়, কারণ কংগ্রেস নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করতে বদ্ধপরিকর ছিল। বামফ্রন্ট এই চুক্তিকে কখনোই স্বীকৃতি দিতে চায় না। 
২০০৮ - UPA তাও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখে, অন্য দলগুলির সাহায্যে। 
২০০৮ - UPA-সরকার আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করে। 
২০০৯ - বামফ্রন্ট লোকসভা নির্বাচনে মাত্র ১৫টি আসন পায় পশ্চিমবঙ্গে (আগে ছিল ৩৫টি)। 
২০১১ - বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারায়। 
২০১২ - হিলারি ক্লিনটন তার ৩-দিনের ভারত সফরে, পশ্চিমবঙ্গে এসে নতুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে দেখা করেন। হিলারি ক্লিনটন ছিলেন তখনকার আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট্। তাঁর আগের সেক্রেটারি অফ স্টেট্ ছিলেন কন্ডোলিজা রাইস, যিনি ভারত এবং আমেরিকার নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করেছিলেন ২০০৮ সালে।
২০১২ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ এবিপির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার শেষ করে দেয়, ষ্টার আনন্দ বন্ধ হয়ে গিয়ে এবিপি আনন্দ শুরু হয়।

আবারো বলি, কিছু বলছিনা, এগুলো শুধুই ঘটনা, হয়তো শুধুই সমাপতন। কিন্তু ভাবতে পারেন, বা ভাবা প্র্যাকটিস করতে পারেন। 
লাস্ট নোট:  পৃথিবীর মধ্যে এখনো একটি মাত্র দেশই সবথেকে বেশি মাত্রায় অন্য দেশের সরকার বদলেছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, সেটা কখনো সামরিকভাবে, কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে, বা কখনো অন্য কিছু উপায়ে। তবে শাসন বদলানোর পরে প্রায় সবকটা দেশেরই অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে, আর সে ব্যাপারে তারা একদমই care করেনি। 

Monday, February 26, 2018

বামপন্থী বিশ্ব-মানবিকতা ও সচেতনতা

"নিকারাগুয়ায় নিঃসহায় নিম্নবিত্ত নিঃস্ব মানুষদের নিখিরি বানানো চলছে না, চলবে না। গুয়েতেমালায় গণতান্ত্রিক গরীব-গুর্বোদের জোর করে গণধর্ষণ, ওয়াক থু, ওয়াক থু। ... প্রলেতারিয়েতদের পাশে পলিটব্যুরো লড়ছে লড়বে। হনুলুলুতে হারেরেরে হার্মাদদের হুঙ্কারের হামলাবাজিকে, ওয়াক থু, ওয়াক থু।" - ওপেন টি বায়োস্কোপ সিনেমাতে, ঠিক এভাবেই বামপন্থীদের এককালের বিদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধের স্লোগানগুলোকে উপহাস করা হয়েছিল। বিদ্রুপ করতে গিয়ে সামান্য অতিরঞ্জনের দরকার পড়ে, সেটুকু পরিমাণমতোই ছিল। কিন্তু সিনেমাতে এটা উপহাস হলেও, পরের দিকে এই মনোভাবটাই মেইনস্ট্রিমে উঠে আসে। কলেজে পড়াকালীন বেশি মাত্রায় শুনতে শুরু করি যে, কোনো একটা বাইরের দেশে কি হয়ে গেলো, সেই নিয়ে আমরা কেন মাথা ঘামাবো ! আমাদের চাকরি পেতে হবে, রাজ্যে আরো শিল্প দরকার - এসব না ভেবে, কেন আমরা "আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম"-এর মতো স্লোগানের পিছনে নিজের সময় ব্যয় করবো !

গত কিছুদিনে সিরিয়ায় বম্বিং-এর তীব্রতা বাড়ায়, দেখলাম অনেক মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছেন। সেখানে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলছেন। অন্তত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ নিয়ে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন, সমবেদনা অনুভব করেছেন। শেষবার কলকাতা গিয়ে দেখে এসেছি, সিপিএম পার্টিটার শেষটুকু চিহ্নও প্রায় আর নেই। খুব আশাব্যঞ্জক অবস্থা ! কিন্তু এককালে পার্টিটার যে মনোভাবকে উপহাস করা হতো, সেই ভাবধারাকে ভিত্তি করেই যে আজ সিরিয়ার যুদ্ধের প্রতিবাদ করতে বলছে খুব সাধারণ মানুষও - সেটাও কম আশাব্যঞ্জক নয় (হয়তো ওটাই একমাত্র আশা)। ওখানে (এবং অন্যান্য জায়গায়) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির যে শক্তি প্রদর্শন চলছে, তা নিয়ে আগে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আলাদা আলাদাভাবে মিটিং মিছিল করতো। এখনো হয়তো ছোট করে কোথাও কোথাও হয়। অচিরেই কিছুদিনের মধ্যে সেই ছোট সভাও বন্ধ হয়ে যাবে। তখনও আশা করি, বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তের নিপীড়িত মানুষদের জন্য বাঙালির সহমর্মিতা একইরকম থাকবে। তবে সেই আবেগের সাথে রাজনৈতিক সচেতনতাও যেন থাকে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের geo-political অবস্থানগুলো বেশ জটিল, সেইটুকু বাস্তববুদ্ধি বাঙালির কাছে প্রত্যাশিত। বিশ্ব-মানবতার সাথে এই সচেতন একাত্মতাই বাঙালিকে বিশ্বের নাগরিক করে তোলে, পৃথিবীর ছবিতে "ব"-লাগানো কোনো লোগো নয়।