Showing posts with label politics. Show all posts
Showing posts with label politics. Show all posts

Sunday, May 18, 2025

পশ্চিমবঙ্গের "অরাজনৈতিক" ধর্মীয় ভাঁড়ামো

এই বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ অব্দি, প্রায় দেড়মাস, বাড়িতে ছিলাম। প্রচুর বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা হল, বেশ অনেকটা সময় নিয়ে সবার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে আড্ডা হল। আত্মীয়স্বজনদের সাথে গল্প করে সময় কাটলো, অনেকের বাড়ি গেলাম, বেশিরভাগেরই যাওয়া হল না। প্রচুর খাওয়া দাওয়া হল, বেশি করে বিরিয়ানি, কারণ এর মাঝে বেশ অনেকদিন দেশে ফেরা হয়নি। একদিন আরশিকে নিয়ে বইমেলায়ও গেছিলাম। সলিল চৌধুরীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে যে বইটা প্রকাশিত হয়েছে, সেটা পেয়েও গেলাম। যদিও আমাদের বাংলায় বই পড়ার লোকের সংখ্যা এখন খুব কম। কেউ আলোচনাও করে না বই নিয়ে। অথবা কেউ নিজের কাজকর্ম নিয়েও খুব একটা কথা বলে না। মাইনে বা রিমোট ওয়ার্ক কিনা - কাজের কথা বলতে ওটুকুই। তবে তাই বলে কথা বলার বিষয়ের অভাব নেই।


খাওয়া দাওয়া চিরকালই অন্যতম প্রধান আলোচনার বিষয় ছিল আমাদের কথাবার্তায়। সাথে ছিল রাজনীতি, সেটা নিয়ে এখন আর কারোর বোধ হয় বিশেষ কিছু বলার নেই। তাই কথা বলার বিষয়ের একটা অভাব ছিল, সেটা অচিরেই পূরণ করে দিয়েছে নতুন করে আলোচ্য এক বিষয় - ধর্ম। দুর্গাপুজো ছাড়া কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠান বা ঘটনা নিয়ে বাঙালির এতো আলোচনা হতে, এর আগে দেখিনি বা শুনিনি, যা দেখলাম এবারের কুম্ভ মেলা নিয়ে। দুর্গাপুজোকে তো বাংলায় ধার্মিক অনুষ্ঠান বলাও যায়না, সর্বজনীন সামাজিক অনুষ্ঠান এটা - সুতরাং বলাই যায়, কোনো ধার্মিক অনুষ্ঠান নিয়ে এই প্রথম এরকম একটা পাগলামি দেখলাম। সব থেকে আশ্চর্যের, এই আদ্যন্ত ভাঁড়ামোটা নিয়ে বড় থেকে ছোট সকলে সিরিয়াস আলোচনা করছে। মানে কুম্ভের মানে কি, মহা-ছোট-মেজ কুম্ভের কোনটা কত বছর পর আসে, কত বার মাথায় জল ঢালতে হয় - এসব কিছু। আগে এসব আলোচনায় কেউ কিছু একটা বলে ব্যাপারটা খিল্লি করে দিতো, এখন আর সেসবের ব্যাপার নেই।


এই কুম্ভের আলোচনা ছাড়া, চাকরি কাজকর্ম ভবিষ্যৎ - এসব নিয়ে একটা অসম্ভব আত্মবিশ্বাস সকলের মধ্যে আছে যে - বাংলায় কোনো কিচ্ছু হওয়া সম্ভব নয়। হয় অন্য রাজ্য, নতুবা সুযোগ বা সংস্থান থাকলে বিদেশ। যেটা আগেই অন্য একটা লেখায় বলেছি যে - মনে মনে বেশিরভাগ বাঙালি অনেক আগেই রাজ্যত্যাগ করেছেন, দেহটা পড়ে আছে কোনো একটা পিছুটানের জন্য। সেই বাঙালি এখন আবার ধর্ম নিয়ে আচ্ছন্ন - আমরা সোজা একেবারে পিছনে দিকে ছুটছি, বিংশ শতাব্দীরও আগে চলে যাচ্ছি। আধুনিক বাংলার এই যে সামাজিক ভিত্তি একদম গোড়া থেকে বদলে গেছে, এটাই মমতা ব্যানার্জির সব থেকে বড় লেগাসি হতে চলেছে। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে যে কোনো সমাজবিজ্ঞানের ক্লাসের বিষয় হবে পশ্চিমবঙ্গের ২০০৮ পরবর্তী সময়। এই সময় দেখিয়ে দেয় যে, কিভাবে অর্থনৈতিক উন্নতিকে পিছনে ফেলে রাখলে, ধর্মান্ধতা যেকোনো জাতিকে, তা সে যতই সংস্কৃতি বা বিজ্ঞান-মনস্ক হোক না কেন, গ্রাস করতে পারে।


লেখার এই অংশে একটা "নবারুণ" কোট করাই যেতে পারে, "এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়" ইত্যাদি, বহুদিন বাইরে থাকি বলে অযাচিতও লাগবে না, কিন্তু সেটা খুব ধূর্ত পলায়ন হয়ে যাবে। বরং বলব, এইটাই আমার দেশ। আমি আগে যে বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়দের কথা বলছিলাম, তাঁদের প্রতিচ্ছবিতেই দেখছি আজকের বাংলাকে। কিন্তু তার মাঝে থেকেই বলতে হবে, কুম্ভ মেলা আর দীঘার মন্দির একটা বড়সড় ভাঁওতা আর খিল্লি। বিজেপি ও তৃণমূলের নেতারা এখন এই ধর্মের রাজনীতিটি চালাচ্ছেন। এতে হয়তো অনেকের খারাপ লাগতে পারে। কিন্তু যখন তাঁরা গত ১৫ বছর ধরে "অরাজনীতি" আর "লেসার ইভিল"-এর খেলা খেলে "এই দেশেতেই" থাকবেন বলছিলেন, তখন অনেক রাজনৈতিক কথাই তাঁদের পোষায়নি। তাঁদের এই অরাজনীতি করা থেকে তৃণমূল হয়ে বিজেপি/আর.এস.এস/হিন্দুত্ব সফরটা খুব ভালো করে দেখে আসছি। 


এখন তাঁদের বোঝা দরকার যে, তাঁদের ধর্মীয় কথাবার্তাই তাঁদের রাজনীতিকে প্রকাশ করছে। আর তাঁদের প্রত্যেকটা রাজনীতির বিরোধিতা, ভোটের হারজিত ব্যতিরেকে, বহুকাল আগে থেকেই আমার মতো অনেকেই করে আসছে। তাই রাজনৈতিক ময়দানের মতপার্থক্য মেনে নিয়েই তাঁদের সহাবস্থান করতে হবে। উপত্যকা মৃত্যুর হোক বা জীবনের, আমরা মৃত্যু অব্দি এখানেই আছি, ময়দানেই - সে আপনারা অরাজনৈতিক, তৃণমূল বা বিজেপি - যাই হোন না কেন।

Sunday, September 08, 2024

বাঙালি মধ্যবিত্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া | The Funeral of Bengali Middle Class

কয়েক মাস আগে পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী একটি অসম্ভব ভালো KCC Baithakkhana-র বক্তৃতায় বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। তাঁর বক্তব্যের বিষয়কে আরেকটু বিস্তার করলে পশ্চিমবঙ্গের এখনকার দুরবস্থা ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎকে খানিকটা দেখা যায়। শ্রেণীচরিত্র অনুযায়ী বাঙালি মধ্যবিত্ত বেশ ছোট একটি সমষ্টি হলেও, বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তাঁদের প্রভাব এবং দখলদারি অনস্বীকার্য। অথচ এখন যে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করে, তাঁরা যে সবদিক থেকে বেশ কোণঠাসা সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


একদিকে, গত ১০-১২ বছর ধরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড় অংশ চাকরির তেমন কোনো সুযোগ পশ্চিমবঙ্গে পায় না। প্রাইভেট সেক্টরের অনুপস্থিতি এবং সরকারি চাকরিতে ঘুষ-সর্বস্ব পরিস্থিতি মধ্যবিত্তের জন্য কিছু রাখেনি। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে তাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ক্রমাগত বাইরে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলা মৌলিক গানের যে পরিসর এমনকি আগের দশকের প্রথমার্ধেও ছিল, তা বিলুপ্তপ্রায়। শুধুমাত্র বাংলা ছায়াছবির গানেই বাংলা সঙ্গীত ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলা সিনেমার কথা যত না বলা যায়, ততই ভালো। কয়েকটি ভালো সিনেমা ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে সফল অথবা বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমা বাংলায় দেখা যায়না। 

মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম ইন্টারেস্টের জায়গা ছিল পলিটিক্স। মধ্যবিত্তের একটা বিশ্বাস অন্তত ছিল যে, তাঁদের মানসিকতা দিয়ে বাংলার রাজনীতির বিন্যাস হয়। সিপিএম-এর আপাত মধ্যবিত্তপ্রীতি, ভদ্রতার আভরণ, জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেববাবুর পরিশিলীত ভাষ্য - এসব কিছুই বাঙালি মধ্যবিত্তকে মনে করাতো যে রাজনীতির জল যতই ঘোলা হোক, তাঁদের একটা নিয়ন্ত্রণ এবং বক্তব্য আছে এই রাজনীতিতে। তৃণমূলের জামানায় সেই মধ্যবিত্তই আস্তে আস্তে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেখেছে, দেখেছে কিভাবে গুন্ডামি ও দুর্নীতিই হয়ে উঠেছে রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য। আজকের রাজনীতি ও মুখ্যমন্ত্রীর সাথে তাঁদের যে কোনো যোগাযোগই নেই, তাঁরা তা বিলক্ষণ জানে। সবসময় হয়তো মুখ ফুটে বলে উঠতে পারেনা রাজনীতিরই বাধ্যবাধকতায়, কিন্তু তাঁদের নিরুপায় হাত-পা-বাঁধা অবস্থা তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী।


এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পশ্চিমবঙ্গের, এবং বিশেষত বাঙালি মধ্যবিত্তের, এই অবস্থার দায় কার। অবশ্যই তাঁদের নিজেদেরই, কিন্তু চিত্রটা আর একটু জটিল। তৃণমূলের সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বাঙালি মধ্যবিত্তর দায়িত্ব ছিল পরের নির্বাচনেই তাঁদের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার যে, সরকার এবং প্রশাসন কেমন চলছে, তাঁর দুর্নীতি এবং নীতির সমস্যা নিয়ে। অথচ সে তখন এতটাই ট্রমাটাইজড এবং আলসেমির ঘুম দিতে ব্যস্ত যে, সারদা-নারদার মতো কেলেঙ্কারির দিকে তাকাতে চায়নি। পরবর্তীকালে সিন্ডিকেট, সরকারি চাকরির বিক্রিবাটা, স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, পরের পর ছাত্রমৃত্যু - এসব কিছুই সে শুধুই বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খাতিরে উপেক্ষা করে গেছে। এদিকে তৃণমূল তার নীতির ভিতকে, মানে দুর্নীতিকে, মজবুত করে গেছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের এই রাজনৈতিক উদাসীনতা কিন্তু একটি সামান্য ভুল ভাবলে ভুল হবে, এটা তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। 


তৃণমূল সরকারের প্রথম দিকেই পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ কি হতে চলেছে তার আভাস পাওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে প্রান্তিক এবং সংখ্যালঘু মানুষ তৃণমূলের দলদাসে পরিণত। মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে তখন বাংলার এই সঙ্কট অপরিষ্কার হলেও কিছুটা অনুমেয়, কিন্তু সে এই সঙ্কট নিজের মনে করে গায়ে মাখেনি। কারণ মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ কখনোই পশ্চিমবঙ্গের ওপর বিশেষ কোনো "বাজি" রাখেনি। ইন্দ্রনীল তাঁর বক্তৃতায় একটি অসাধারণ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, "বাঙালির গর্ব ছিল, স্টেক ছিল না", বিশেষত মধ্যবিত্তের। আমরা একটু গভীরভাবে বাঙালির মধ্যবিত্তের দিকে দেখলে বুঝতে পারবো, তাঁদের একটা বড় অংশ কলকাতার নিজের লোক নয়, তাঁরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। তাঁরা কলকাতাকে নিজের করে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের বাবা-মা-ঠাকুরদা-ঠাকুমার কাছে শুনেছেন সব কিছু ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে আসার কাহিনী। ফলে তাঁদের কাছে আরো একটি জায়গায় রিলোকেট করে যাওয়ার চিত্র অপরিচিত নয়। তাই অশনি সঙ্কেত দেখে, এই দলের মধ্যবিত্ত বাঙালির (যাদের বাঙাল বলা হয়) কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যেতে নস্টালজিয়া আর দুঃখ হয় ঠিকই, কিন্তু সময়ের দাবিতে তারা সেটা করতে প্রস্তুত। এই মধ্যবিত্তের কিছু অংশ পশ্চিমবঙ্গে থাকে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা সুযোগ পেলেই পশ্চিমবঙ্গ ছাড়বেন। কোনো বাধ্যবাধকতা আছে বলেই পশ্চিমবঙ্গে আছেন। প্রকৃতপক্ষে হাতে গোনা কিছু মধ্যবিত্ত ছাড়া প্রায় কেউ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে পশ্চিমবঙ্গে কল্পনা করতে পারেন বলে মনে হয়না। 

পড়ে রইলো কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বাইরের মধ্যবিত্ত - এই শ্রেণী বহুকাল আগে থেকেই হয় কলকাতায় ও মধ্যপ্রাচ্যে অথবা দিল্লি ও কেরলে কাজের সূত্রে যেতে অভ্যস্ত। চাষের কাজে লভ্যাংশ কমার সময় থেকেই, মানে ভূমি সংস্কার সফলতা পাওয়ার পর পরই, এরাও যাযাবর। তাই এদেরও পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বাজি যৎসামান্যই। আর বাঙালি শিল্পীকুলের কথা না বললেও চলে, কারণ বাঙালি শিল্পীরা মুম্বইতে বহুকাল আগে থেকেই স্বচ্ছন্দ, তাই সময় আসলে তারাও পাততাড়ি গুটোতে প্রস্তুত।


এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিও যে মধ্যবিত্ত দ্বারা নির্ধারিত নয়, সেটাই স্বাভাবিক। আর প্রান্তিক মানুষেরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে তৃণমূল নিয়ে তিতিবিরক্ত হলেও, আর কোনো সুযোগ দেখেন না। তাঁদের বেঁচে থাকার সম্বলও তৃণমূলের লোকাল দাদাদিদিরা। যদিও পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্র যে দুর্নীতির গভীর বাসা - তা সকলের জানা। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তার বিপক্ষে বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া বারণ - কারণ আগেই বলেছি, তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে কোনো স্টেক নেই। তাঁরা বহুদিনই পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করেছেন, এবং যারা সশরীরেও ওখানে আছেন, তাঁদের সেটা নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তাঁরা সেটা নিজেদের অসহায় পরিণতি বলেই মনে করেন। এমতাবস্থায় কতিপয় মধ্যবিত্তের এক শেষ আর্তনাদ এই জুনিয়র ডাক্তার মৃত্যু ও "তিলোত্তমা"র আন্দোলন। এটা ঠিকই যে এই আন্দোলন সর্বাত্মক এবং বিশাল আকার ধারণ করেছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক দিশাহীনতা বাঙালির ভীত, সন্ত্রস্ত ও বাজি-না-রাখা মনোভাবেরই বাহ্যিক রূপ। তাছাড়া প্রান্তিক মানুষ ইতিমধ্যে তৃণমূলের যে অত্যাচার দৈনন্দিন জীবনে সহ্য করেছে এবং করে চলেছে, তার তুলনায় এই মৃত্যু ও দুর্নীতি কিছুই নয়। আজকে ডাক্তারদের মতো উচ্চ শ্রেণীতে বাঘ পড়েছে বলে উপর থেকে আন্দোলনের চাপ এসেছে ঠিকই - কিন্তু সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক কোনো ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে না। এরপর এই আন্দোলন মধ্যবিত্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আর শবদেহ যাত্রায় পরিণত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এরকম পরিণতিতে যদি মনখারাপ করে, তাহলে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা বা বিহারের মতো মূলত গান-গল্প-হীন দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আখড়ার দিকে তাকালে খানিকটা ধাতস্থ হওয়া যাবে।

Wednesday, August 09, 2023

ওপেনহাইমার নিয়ে কিছু কথা (নো স্পয়লার)

চারিদিকে খুব একটা বেশি আর কোনো কথাবার্তা নেই, "ওপেনহাইমার" রিলিজ করার পর। অভিনয়ের প্রশংসা, চিত্রায়নের মুগ্ধতা, বিশাল স্ক্রিনের চমক - ছবির মূলত এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বেশ অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েছে। কিন্তু চলচিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে তেমন সাড়াশব্দ নেই। আসলে নোলানের মতো এতটা মেইনস্ট্রিম, পপুলার, "অরাজনৈতিক" একজন পরিচালক এমন একটা ছবি বানিয়ে ফেলেছেন, যা দেখে অনেকেই একটু হতভম্ভ হয়ে গিয়েছেন। তার ওপর ছবিটা মূলত ওপেনহাইমার এবং অ্যাটম বম্ব নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদপে ছবিটায় ম্যাকার্থি যুগের কলঙ্কের ঝলকই বারবার বেরিয়ে এসেছে। সেই কারণেও বোধ হয় এই আপাত নিস্তব্ধতা।

ম্যাকার্থি যুগ আমেরিকার একটা ওপেন সিক্রেট বলা যায়। অনেকেই বিষয়টা সম্পর্কে জানে, কিন্তু সেই নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায়না। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে লিবারাল ডেমোক্রেসি বা উদার গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা হয়ে আমেরিকা নিজেকে দেখতে চেয়েছিল, তার ঠিক বিপরীতটাই ভিতরে ভিতরে ঘটেছিল। ১৯৪০ এর দশকের শেষের দিক থেকে প্রথম ১০ বছর প্রবলভাবে ম্যাকার্থি যুগের কর্মকাণ্ড চলেছিল এবং প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে এর জের ছিল, কিছুটা হালকা চালে। এই যুগের প্রধান যে বক্তব্য ছিল, তা হল যে কোনো বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষকে হেনস্থা করা। সরকারের বিভিন্ন শাখা থেকে এই স্ট্যান্ড নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বিভিন্ন আইন পাশ করে সোশ্যালিস্ট এবং কম্যুনিস্টদের কার্যত ব্যান করা হয়েছিল, সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থায়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির সময় থেকে এই পলিসি দ্রুতগতিতে সরকারের বিভিন্ন শাখায় ও অফিসে ছড়িয়ে পড়ে। উইকিপিডিয়াতে এই সম্পর্কে আরও খুঁটিনাটি পাবেন।

এবার এই সময়ের বড় একটা মুস্কিল ছিল এই যে, বড় বড় বিজ্ঞানী, অভিনেতা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা সেই সময় বেশিরভাগই সমাজবাদী ভাবনাচিন্তায় প্রভাবিত ছিলেন, সে আইনস্টাইনই হোক, বা চার্লি চ্যাপলিন, বা ওপেনহাইমার। মনে রাখা দরকার, নাৎসী জার্মানি প্রথম যাদের ওপর আক্রমণ করে তারা কম্যুনিস্ট ছিলেন, ফলে ইউরোপের বড় বড় বিজ্ঞানী এবং পন্ডিতরা, যারা সমাজবাদী চিন্তাধারা নিয়ে চলতেন, তারা অনেকেই আমেরিকায় পালিয়ে আসেন। আমেরিকাও ১৯৪০ এর আগে তাঁদের সাদরে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই আমেরিকাই পরে এই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষদের হেনস্থা শুরু করে।

এই পুরো কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন ছিল সেই সময়। কারণ সেই সময়ে আমেরিকাতেও সমাজবাদী চিন্তাভাবনার বেশ ভালো প্রসার ছিল। ইউজিন ডেবস সোশ্যালিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়েছিলেন বেশ কয়েকবার, যদিও জিততে পারেননি একবারও, কিন্তু ওনার জনপ্রিয়তা ভালোই ছিল। ইউনিয়ন বা কর্মী সংগঠনগুলোও তখন বেশ শক্তিশালী ছিল। এমনকি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাংকলিন রোসভেল্ট যখন নিউ ডিল প্রণয়ন করে প্রচুর সরকারি সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করেন, তাও সম্ভব হয়েছিল কারণ সাধারণের মধ্যে একটা প্রবল বামপন্থী ও ইউনিয়ন ধর্মী হাওয়া ছিল। তাছাড়া আমেরিকার বড় বড় কলেজগুলোতে অধ্যাপক ও ছাত্ররা মূলত বামপন্থীদের পক্ষে ছিলেন এবং বেশ খোলামেলাভাবেই তাঁদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করতেন। ফলত এই পুরো ব্যাপারটাকে বন্ধ করার জন্য এক বড়সর কর্মকাণ্ডের দরকার ছিল, এবং সেটাই সেনেটর ম্যাকার্থি এবং পরে FBI প্রধান হুভার তদারকি করেছিলেন।

আমরা নোলানের "ওপেনহাইমার" সিনেমায় দেখতে পাচ্ছি, যে এত বড় একজন বিজ্ঞানী, যাঁকে father of atomic bomb বলা হচ্ছে, যার খ্যাতি বিশ্বজোড়া, তাঁকেও কি ধরনের হেনস্থা সহ্য করতে হচ্ছে। তাহলে এটা কল্পনা করতে কষ্ট হয় না, যে সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা সামান্য বামপন্থী ধারণাতেও বিশ্বাস করতেন, তাঁদের সাথে কি করা হয়েছিল। প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে চলা এই ক্রমাগত অত্যাচার, হত্যা, টর্চারের পরে এই ধরনের চিন্তা সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলগুলো থেকেও এই ধরনের পড়াশোনা সিলেবাস ও ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। আমেরিকার পপ কালচার ও সাম্প্রতিক ইতিহাসে শ্রমিকদের যে বিশাল পরিমান প্রভাব ছিল, তার কিছুই প্রায় অবশিষ্ট ছিল না এই সময়ের পরে। আমাদের অনেকেই এ বিষয়ে কিছু জানিনা, কারণ সযত্নে এই বিষয়টাকে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, ফুকুয়ামার ভাষায় বললে end of history ।

সবথেকে বড় পরিহাস বোধ হয় এটাই, নাৎসী জার্মানির হাত থেকে বাঁচতে যে উদার আমেরিকায় দেশবিদেশের বিজ্ঞানীরা তাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা করার পরিসর পাবেন ভেবেছিলেন, সেই আমেরিকাই তাঁদের ওপর গোপন আক্রমণ শানিয়েছিল। আজ বার্নি স্যান্ডার্স এর হাত ধরে গত এক দশকে যে এখানে আবার কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে সোশ্যালিজম, ম্যাকার্থি যুগের ৫০ বছর পরেও, সেটা একটা বিস্ময়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে নোলানের এই সিনেমা সত্যিই বেশ সময়োপযোগী। নোলানকে বিশেষ ধন্যবাদ যে উনি এরকম একটা বিষয় নিয়ে ছবি করেছেন, এবং উনি করেছেন বলেই কাতারে কাতারে মানুষ দেখছে। বেশ অনেকদিন টিকিট না পাওয়ার পরে শেষ অব্দি বড় স্ক্রিনে সিনেমাটা দেখে ভালো লেগেছে। কিছু কিছু অভিযোগ থাকলেও, এখন সেসবের সময় নয়। এখন সময় বুঝে নেওয়ার যে, এই মতাদর্শকে মুছে ফেলার চেষ্টা বারবার করা হলেও তাকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়, ম্যাকার্থি, হুভার বা অন্য কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়।