Showing posts with label projukti. Show all posts
Showing posts with label projukti. Show all posts

Sunday, February 19, 2023

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৫ (AI in the Wild)

ChatGPT সম্বন্ধে এতদিনে অনেকেই জানেন। যদিও এই সফ্টওয়্যারের পিছনে যে প্রযুক্তি রয়েছে, তার অন্দরের খবর তেমন পরিষ্কার নয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য technological product। ChatGPT একটি conversational robot (অথবা bot), যাকে একটি ওয়েবসাইটের (chat.openai.com) মাধ্যমে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এই ওয়েবসাইটে একটি চ্যাটবক্সের মাধ্যমে আপনি এই bot-এর সাথে যে কোনো বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন ও একে প্রশ্ন করতে পারেন। এই bot-টির পিছনে কাজ করছে একটি Artificial Intelligence (AI) ইঞ্জিন, যা ইন্টারনেটের বিভিন্ন অন্দরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্যকে বিশ্লেষণ করে তৈরী করেছে একটি সফ্টওয়্যার মডেল। সেই মডেলটিকে ব্যবহার করে ChatGPT কথোপকথনের মতো করে উত্তর দিতে পারে আপনার যে কোনো প্রশ্নের।

ChatGPT-র সঙ্গে Google-এর মতো সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের বিস্তর পার্থক্য আছে। Google শুধুমাত্র আমাদের দেওয়া কিছু শব্দের ভিত্তিতে ইন্টারনেট থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক ওয়েবসাইটের খোঁজ দিতে পারে। কিন্তু ChatGPT-কে আমরা কোনো প্রশ্ন করলে, সে তার সঞ্চিত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে সক্ষম। সবথেকে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ChatGPT-র বিশ্লেষণী ও সৃষ্টিশীল ক্ষমতার সংমিশ্রণ। মানে এটি তথ্যকে বিশ্লেষণ করে এমন অভিনব আঙ্গিকে উত্তর দিতে পারে, যে উত্তর হয়তো আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। ফলতঃ খানিকটা একজন প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের মতোই, ChatGPT তার সফ্টওয়্যার মডেলকে সম্বল করে নতুন বিশ্লেষণ তুলে আনতে পারে, এবং সেটা প্রায় যে কোনো বিষয়েই। Google-এর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলোর এই ক্ষমতা এখনো নেই। 

তবে ChatGPT-এর উত্তরকে সব বিষয়ে যে সর্বক্ষণ ভরসা করা যায়, এমন নয়। যেমন কোনো গাণিতিক প্রশ্নে এর উত্তর অনেক সময়ই ভুল হতে পারে। আবার ChatGPT-র সাথে বেশিক্ষন ধরে কথাবার্তা চালিয়ে গেলে, কিছু সময় পর থেকে সে প্রাসঙ্গিক উত্তর হয়তো নাও দিতে পারে। এতদসত্ত্বেও ChatGPT-এর মূল কার্যকারিতা একটি Knowledge Synthesis Assistant-এর মতো। মানে কোনো বিষয়ে আপনি যদি সংক্ষেপে কিছু জানতে চান, সেক্ষেত্রে ChatGPT খুবই উপকারী। যেমন ধরুন, সত্যজিৎ রায় এবং মৃনাল সেনের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল, সেই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত একটা ধারণা আপনাকে দিয়ে দিতে পারে। কিংবা মোদী সরকারের আমলে ভারতের অর্থনৈতিক হাল কেমন, সে বিষয়ে ছোট্ট একটি ধারণা দিতে পারে। এছাড়া, ChatGPT computer programming বা coding-এর জন্য ভীষণরকমভাবে উপকারী। ইন্টারনেটের বিভিন্ন কোণ ঘেঁটে, বিশ্লেষণ করে coding-এর বিষয়ে খুব প্রাসঙ্গিক উত্তর দিতে এটি সক্ষম। ChatGPT-এর মতো উন্নত একটি সফ্টওয়্যার-এর উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে একটু চোখ ফেরানো যাক। 

গত এক দশকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের জীবনের বিভিন্ন দিকেই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে এক বিশেষ ধরণের অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, যাদের মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম বলা হয়ে থাকে। গুগল ফোটোস যে আমাদের পরিবার পরিজন এবং বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সকলকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখতে পারে, তা কিন্তু হয় মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যেই। ইউটিউব খুললেই আজকাল আমরা আমাদের পছন্দমতো ভিডিও রেকমেন্ডেশন পেতে থাকি। এর পিছনেও আছে মেশিন লার্নিং। তবে মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণা কিন্তু চলছে প্রায় ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তবে এক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট ২০১২ সাল।

২০১২ সালের আগে মেশিন লার্নিং নিয়ে বহু রিসার্চ ল্যাবে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হতো ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগ গবেষণা শুধুই গাণিতিক কিছু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তাদের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেত না। এর মূলত দুটো কারণ ছিল: data এবং computing power। আমাদের কাছে ডিজিটাল ফর্মে যথেষ্ট data ছিল না, যা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলি কার্যকরী হওয়ার জন্য অপরিহার্য। মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলি ডেটা বা তথ্য থেকেই কোনো প্রশ্নের সমাধান অনুমান করার চেষ্টা করে, data-ই তাদের মূল চালিকাশক্তি। ২০০০ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই digitally data ধরে রাখার কাজটা মোটামুটি জোরকদমে এগোচ্ছিল, এবং ২০১০-এর মধ্যে মেশিন লার্নিং প্রয়োগ করার জন্য বেশ ভালোরকম datasets তৈরী হয়ে গেছিল। 

কিন্তু যেদিকটায় তখনো খামতি ছিল, তা হল কম্পিউটিং পাওয়ার। মানে মেশিন লার্নিং প্রয়োগ করার জন্য যে কম্পিউটার দরকার হতো, তা সাধারণভাবে পাওয়া যেত না। এই পুরো চিত্রটা বদলে গেল ২০১২-এর সেপ্টেম্বরে। ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোর তিনজন বিজ্ঞানী দেখালেন যে, মেশিন লার্নিং-এর ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত যে CPU (Central Procesing Unit) ব্যবহার করি, তা কার্যকরী নয়।। বরং যদি Graphics Processing Unit বা GPU ব্যবহার করা যায়, তাহলে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম খুব দ্রুত কাজ করতে পারে। ইতিমধ্যে ভিডিও গেম, ভিডিও প্রসেসিং এবং সিনেমার কাজে GPU-র ব্যবহার খুবই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এরপর থেকে মেশিন লার্নিং-এও ব্যাপক হারে GPU-র ব্যবহার শুরু হয়। গবেষণাও তীব্র গতিতে এগোতে থাকে, সাথে সাথে AI-বিষয়ক পরীক্ষা-নিরিক্ষাও। গত এক দশকের ব্যাপক এবং বিবিধ AI গবেষণার অন্যতম সফল সফটওয়্যার হল ChatGPT । 

ChatGPT নিয়ে এতো উত্তেজনার কারণ হল যে, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য তৈরী নয়। যেমন এটি শুধুমাত্র একটি computer programming assistant নয়, বা এটি শুধুমাত্র একটি ছবির ভিতর কি কি বস্তু আছে তা চিহ্নিত করছে না। এর আগে বিভিন্ন মেশিন লার্নিং সফ্টওয়্যার কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরণের কাজের বিষয়ে বেশ কার্যকরী হয়েছে। কিন্তু এই আগের সফ্টওয়্যারের তুলনায় ChatGPT অনেক বেশি সাধারণ কাজ করতে পারে, কতকটা মানুষের মতোই। কোনো বিশ্লেষণ থেকে আমরা যেমন কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছোই, সেরকম বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির ক্ষমতাও ChatGPT-র আছে, বরং মানুষের থেকে কিছুটা বেশিই আছে। এর একটা মূল কারণ হল, বিশ্লেষণের জন্য সে আর এখন আমাদের উপর বা আমাদের দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভরশীল নয়। মনে রাখতে হবে, নতুন বিশ্লেষণের উদ্ভাবনী ক্ষমতাও আছে ChatGPT-র কাছে। সে নিজেই নতুন নতুন বিশ্লেষণ তৈরী করে সেখান থেকে নতুন উপলব্ধি করতে পারে। সেটা স্বভাবতই মানুষের উপলব্ধির গতিবেগের থেকে কয়েক গুন্ বেশি। ChatGPT-এর এই বিশ্লেষণ এবং সেখান থেকে উপলব্ধিতে উত্তরণের যে শেষ কোথায়, তা হয়তো মানুষ হিসেবে আমাদের উপলব্ধির বাইরে।

নোট: লেখক এই লেখার সময় GPU-র সর্ববৃহৎ কোম্পানি Nvidia-তে চাকরিরত

Saturday, December 31, 2022

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৪ (Mass Tech Layoff)

ভালো-মন্দ মিশিয়ে ২০২২ শেষ হল। প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে, এবছর যেমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে বহু উল্লেখযোগ্য ভালো ঘটনা ঘটেছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলিতে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাইও আমরা দেখেছি। সারা বিশ্বে প্রায় ১.৫ লক্ষ লোক Tech Sector-এ চাকরি হারিয়েছেন এই বছর। এর মধ্যে প্রচুর startup দেউলিয়া হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধরণের ব্যাপক হারে ছাঁটাই-এর পিছনের কাহিনী নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার, তাহলে প্রযুক্তির ব্যবসা ও তার কার্যপ্রক্রিয়াটা একটু হলেও পরিষ্কার হবে।

সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু করতে গেলে, COVID-19 Pandemic- কে সময়ের axis-এ রাখতেই হবে। তাই এক্ষেত্রেও ঘটনার সূত্রপাত সেই ২০২০-এর মার্চ মাসে। সেই সময় আমরা যে শুধু দীর্ঘদিনের জন্য ঘরবন্দী হয়ে পড়লাম তাই-ই নয়, প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরতাও এক ধাক্কায় বেশ অনেকটা বেড়ে গেল। তার আগেই যদিও জীবনের প্রায় সবক'টা দিকেই সফ্টওয়্যারের প্রবেশ ঘটে গেছে। বড় শিল্পে বিদ্যুৎ যেমন অপরিহার্য, বিভিন্ন কাজের জায়গাতেও সফ্টওয়্যারের ভূমিকা ঠিক তেমনই হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কোভিডের প্রকোপের ফলে, সফ্টওয়্যারের ব্যবহার কয়েক গুন্ বেড়ে গেল। এমনকি যে কাজগুলি সফ্টওয়্যার দিয়ে করা খানিকটা কষ্টকর অথবা কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্যের ছিল, সেগুলিও আমরা সফ্টওয়্যার দিয়ে করতেই বাধ্য হলাম। অনলাইন মিটিং, বাড়িতে বসে অফিসের কাজ, দীর্ঘক্ষণের ভিডিও কল, এমনকি জিনিসপত্র চোখের সামনে পরখ না করেই অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার করা - এসব কিছুই আগের থেকে অনেক বেশি মানুষ দৈনন্দিনভাবে করতে শুরু করলো। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এতো দ্রুত সফ্টওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি কি করে এতো বিপুল পরিমান কাজের চাপ মেটাতে পারলো? সেই বিষয় নিয়ে সবার প্রথমে ভাবা যাক।

আমরা জানি যে, কোনো গাড়ি কারখানায় একদিনে কতগুলো গাড়ি তৈরী হবে, তার একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং পরিমাপ থাকে। কোনো জরুরী অবস্থা তৈরী হলে, সেই সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু রাতারাতি তাকে কয়েক গুন্ বাড়িয়ে ফেলা কষ্টকর। তেমনি যে কোনো সফ্টওয়্যারেরই সুষ্ঠুভাবে কাজ করার একটা সীমা থাকে। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। Zoom নামটার সঙ্গে আমরা এখন সকলেই পরিচিত। সেই Zoom অ্যাপ্লিকেশনটি প্রতি মিনিটে একটি সীমিত সংখ্যক ভিডিও কল একসাথে চালিয়ে যেতে পারে। ধরা যাক, সেটা ২০ লক্ষ। এবার যদি দিনের কোনো এক সময়ে প্রতি মিনিটে ২০ লক্ষের বেশি Zoom ভিডিও কলের চেষ্টা করা হয়, তাহলে Zoom-এর সার্ভারে সমস্যা হতে পারে, এমনকি সেই সার্ভার বন্ধও হয়ে যেতে পারে। 

কোভিড-এর সময়ে বেশিরভাগ সফ্টওয়্যার কোম্পানিকেই অচকিতে আসা বিপুল কাজের চাপ সামলাতে হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফ্টওয়্যার উন্নত করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নতুন ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করে সফ্টওয়্যার আপগ্রেডও করেছেন। এবং এই কাজটা করতে হয়েছে খুব দ্রুত, যাতে আমাদের কোনো সমস্যা না হয়। কোভিডের সময় আমরা কিছু কিছু সফ্টওয়্যার নিয়ে সমস্যায় ভুগেছি ঠিকই, কিন্তু মোটের উপর আমাদের অসুবিধা হয়নি। অথচ ভাববার বিষয় এই যে, সফ্টওয়্যার কোম্পানিগুলি নতুন পরিকাঠামো তৈরির জন্য নতুন ইঞ্জিনিয়ার বা রিসার্চার নিয়োগ করার মূলধন পেলো কোথা থেকে, বা শুধুমাত্র পরিকাঠামো উন্নতি করার জন্যও যে মূলধন দরকার হয়, তার সংস্থানই বা হলো কোথা থেকে? এটা বুঝতে গেলে সফ্টওয়্যারের ব্যবসার দিকটা একটু বোঝা দরকার। 

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা, বেশিরভাগ সফ্টওয়্যার কোম্পানি কিন্তু কোনোরকম লাভের মুখ না দেখেই এগিয়ে চলে বছরের পর বছর। বরং অধিকাংশই বিপুল পরিমান ব্যবসায়িক ক্ষতি বহন করে, যাকে আমরা বলি loss-এ run করা। যেমন ধরুন, উবার (Uber)। আমরা সকলেই এদের কথা জানি, ব্যবহারও করি হরবখত, প্রত্যেকদিন। কিন্তু গত ১৩ বছর ধরে ব্যবসা চালানোর পরেও, এখনো অব্দি তারা মাত্র ১ বছরই (২০১৮) কোনো প্রফিট বা মুনাফা করতে পেরেছে। অন্যান্য বছরে তারা Billions of dollars শুধু loss করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এসব কোম্পানিগুলো টিকে আছে কি করে?

এরা মূলতঃ টিকে আছে ঋণ বা ডেট (debt) নিয়ে এবং এই আশায় যে ভবিষ্যতে হয়তো কখনো তারা লাভজনক হবে। এই ধরণের কোম্পানিদের কিছু আয় থাকে ঠিকই, কিন্তু এদের খরচের পরিমান এতটাই বেশি, যে ঋণ ছাড়া এদের পক্ষে চলা অসম্ভব। কিন্তু ঋণ তো কিছু নতুন নয় - আধুনিক অর্থনীতি দাঁড়িয়েই আছে ঋণের উপর - তবে অসুবিধাটা অন্য জায়গায়। সাধারণত ঋণ বা ধার নিলে, তা সুদসমেত ফেরত দেওয়ার ব্যাপার থাকে। তবে সফ্টওয়্যার-জামানায় ব্যাপারটা বেশ অন্যরকম।

সফ্টওয়্যার-সম্পর্কিত কোম্পানিগুলি বিশ্বের প্রথমসারির এবং সবথেকে বড় কোম্পানিগুলির তালিকায় ঢুকতে শুরু করে মূলতঃ ২০১০ এর পর থেকে। তার আগে Microsoft, Intel, IBM জাতীয় কিছু প্রযুক্তি কোম্পানি থাকলেও, সফ্টওয়্যার দিয়ে বড় স্কেলে ব্যবসা শুরু হয়নি। অথচ সেই ২০১০-এর আগেই সারা বিশ্বে ঘটে গেছে ২০০৮-এর Global Financial Crisis (বা Great Recession), যা আমেরিকা-সহ সমস্ত উন্নত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দিয়েছিলো। এতো বড় মন্দা গত ৭৫ বছরে সারা বিশ্ব দেখেনি। এই ঘটনার ফলে বিশ্বের GDP এতটাই ধাক্কা খেয়েছিল, যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমান ব্যাপক হারে কমে যায়। Economic activity নূন্যতম স্তরে চলে যায়। যার জন্য পৃথিবীর সবক'টা উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি তাদের সুদের হার (interest rate) শূন্য (০%) শতাংশ বা তার কাছাকাছি করে দিয়েছিল। যাতে সকলে অন্তত টাকা ধার করে ব্যবসাবৃত্তি করতে পারে এবং দেশে দেশে টাকার লেনদেন বাড়ে। 

সেই সময়ই, সফ্টওয়্যারও বিশাল আকার ধারণ করতে শুরু করে, কারণ প্রযুক্তি ততদিনে তৈরী ছিল। আর যেহেতু সুদের হার ছিল শূন্য শতাংশ, তাই ঋণ নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। সফ্টওয়্যার ব্যবসা একেই মূলধন করে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় বা scale করে। এছাড়া সফ্টওয়্যার ব্যবসার এক বিশেষ সুবিধা হল, সেটা একবার তৈরী হয়ে গেলে খুব দ্রুত অনেক জায়গায় বিপুল সংখ্যক ক্রেতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এবং কিছু ক্ষেত্রে তাই-ই হলো। আমেরিকার সবথেকে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে তেল, ব্যাঙ্ক, বীমা - এসব সেক্টরকে পিছনে ফেলে প্রথমে চলে এলো Apple, Google, Microsoft, Amazon, Facebook-এর মতো নতুন কিছু নাম। 

২০২০-এর কোভিড লকডাউনের সময়, এসব প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই আরো বেড়ে গেলো। মুশকিল শুরু হল দুই বছর বাদে, ২০২২-এ। ইউক্রেনে যুদ্ধ, কোভিডজনিত supply chain-এর সমস্যা এবং চিনের লকডাউনের জন্য দ্রব্যমূল্য বাড়তে শুরু করলো। এছাড়াও গত দু'বছর ঘরবন্দি থাকায়, মানুষের খরচ করার সুযোগ ছিল কম। ফলে ২০২২-এ মানুষ বেশি হারে তাদের জমানো মূলধন খরচ করছিল। এই ধরণের বিবিধ কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গাতেই শুরু হল মুদ্রাস্ফীতি (inflation)। দ্রব্যমূল্য যখন প্রায় ৮-৯ শতাংশ হারে বাড়তে শুরু করলো, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো বাধ্য হল, সুদের হার শূন্য থেকে বাড়িয়ে তুলতে। বেশ অনেক বছর বাদে এই প্রথম বার সুদের হার অনেকটা বেশি বাড়তে শুরু করলো। এবং এখন ২০২২-এর ডিসেম্বরে সেই হার প্রায় ৪.৫%। 

সফ্টওয়্যার কোম্পানিগুলি তাদের জন্মলগ্ন থেকে কখনোই এইরকম বেশি সুদের হারের সময়ে ব্যবসা করেনি। তারা শুধুই ভেবেছে কি করে নতুন ব্যবহারকারীদের (user) কাছে পৌঁছনো যায়, তা সে ব্যবসায় লাভ হোক বা না হোক। তারা ভেবেছে বিশাল সংখ্যক কাস্টমারের ভিত্তি তৈরী করতে পারলে, কোনো না কোনোদিন লাভ ঠিক হবে। সেই জন্য তারা বিশাল আকার ধারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ধারণা নেই, এই রকম অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে কিভাবে হয়, কি রকম পরিকল্পনা করতে হয়। উপরন্তু কোভিডের জন্য অতিরিক্ত কাজ সামাল দিতে, তারা অনেক অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে, যা এ লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে। এই সমস্ত কারণে, তাদের বেশিরভাগের পক্ষেই এই অতিরিক্ত খরচ চালিয়ে যাওয়া এই সময়ে আর সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে তাদের খরচ কমানোর প্রথম পদক্ষেপই হল কর্মী ছাঁটাই। 

Tech কোম্পানিগুলোর এই দিশেহারা দশার জন্য প্রথমে ভুগতে হচ্ছে সেই কর্মীদেরই। কারণ এই কোম্পানিগুলোর পাওয়ার স্ট্রাকচার সামান্য আলাদা হলেও, ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাকচার মোটামুটি অন্য সেক্টরের কোম্পানিগুলোর মতোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু এখানে এ কথা উল্লেখযোগ্য যে, এর মধ্যে অনেক কোম্পানিই কর্মীদের পিঙ্ক স্লিপ দেখানোর সময়, তাদের প্রায় ৩ থেকে ৬ মাসের স্যালারি এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ বাতলেছে - এটা একটুখানি সিলভার লাইনিং। ২০২৩ হয়তো দেখাবে, সফ্টওয়্যার ব্যবসা কিভাবে বিবর্তিত হয় এই অনবরত বদলে চলা প্রযুক্তির দুনিয়ায়।

Sunday, March 01, 2020

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৩ (মেশিন লার্নিং ও অর্থনীতি)

গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রয়িকার কথা আমরা অনেকেই মোটামুটি জানি - সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার প্রধান দুটি কারন বলা হয় থাকে এ দু'টিকে। বাংলায় এদের নিয়ে অনেক ঠাট্টা, মস্করা, এমনকি গান পর্যন্ত লেখা হয়েছে - "...এমনকি পেরেস্ত্রয়িকাও থাকেনা" - চন্দ্রবিন্দুর "মঙ্গল গ্রহে" গানে। কিন্তু সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পিছনে অর্থনৈতিক কারণগুলো স্রেফ এই দুটি বিষয় ঘিরেই নয়। কয়েকটি মূল কারণ স্বরূপ বলা হয় - মিলিটারিতে অতিরিক্ত খরচ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েতের নিজের অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় অক্ষত এবং শক্তিশালী আমেরিকার বিনিয়োগের সাথে অসম লড়াই, ইত্যাদি। আর একটি কারণও ভীষণ জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকাংশে মুখ্য - যেটা কিনা "সেন্ট্রাল প্ল্যানিং"-এর ব্যর্থতা।

সেন্ট্রাল প্ল্যানিং - যার অর্থ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। সোভিয়েতের "ঘোষিত কম্যুনিস্ট" বা "স্টেট্ ক্যাপিটালিজম"-এর মডেলে সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এর মস্ত বড় ভূমিকা ছিল। রাষ্ট্র ঠিক করতো কোথায় কত পরিমান খাদ্য এবং দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন হবে ও সরবরাহ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারেনি, এর কারণ যেসব আধিকারিকরা ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের এই তথ্য রাষ্ট্রর কাছে পাঠাতেন - তাতে গলদ থাকতো। তাঁরা নিজেদের গা বাঁচাবার জন্য অনেকসময় ভুল তথ্য নথিভুক্ত করতেন। এছাড়া মূল অভিযোগ করা হয় যে, রাষ্ট্রের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় - কোন্ কোন্ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন কাঁচামাল কোথায় পাঠানো উচিত, বা কোনো সামগ্রী কতটা উৎপাদন করা উচিত। রাষ্ট্র এতসব তথ্য জোগাড় করতে এবং অনুমান করতে অক্ষম। তাই রাষ্ট্রের পক্ষে এরকম কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করাটা অবাস্তব। মার্কেট বা বাজারের হাতেই অর্থনীতির এই কাজটাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে দাবী করা হয়। 

এবার আমরা চলে আসি আজকের যুগে, এখনকার বাস্তবে। এখন আমাদের কাছে ডিজিটাল মিডিয়ামের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই data analyze করা খুবই সহজ থেকে সহজতর হতে শুরু করেছে। মূলত কম্পিউটারের বিশাল উন্নতির কারণে এই কাজ খুব সহজেই করে ফেলা যাচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামে কতটা ধান উৎপাদন বা আলু চাষ করলে, বড় বড় শহরের খাবারের চাহিদা মেটানো যাবে, সে সম্পর্কে অনেক বেশি সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মানুষ ঠিক কোন ধরণের খাবার, সামগ্রী বেশি কিনছেন, চাইছেন, সে সম্পর্কেও আমরা খুব সহজে তথ্য পেয়ে যাচ্ছি আজকের ডিজিটাল যুগের কারণে। আপনি বিগ বাজার থেকে যখন মাসে ১ কেজি ডাল বা ৫ কেজি চাল কিনছেন, তখন তা একটি সার্ভারে ক্রমাগত নথিভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই তথ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোও যাচ্ছে খুব দ্রুত। তবে এর পরেও অনেক কিছুই শুধুমাত্র মানুষের খাতা-পেনের ক্যালকুলেশনে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এখানেই সহায়তা করতে পারে মেশিন লার্নিং। মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে মানুষের কেনাকাটার তথ্য থেকে অনুমান করা যেতে পারে জনগণের চাহিদার প্রকৃতি কিরকম, তাদের জিনিসপত্র কেনার প্যাটার্ন কিরকম। তারপর আমরা সেরকম দ্রব্যসামগ্রী তৈরী করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি। 

এটা যে আমি কোনো বায়বীয় তত্ত্ব বলছি, তা নয়। ওপরে বলা আমার বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ করে চলেছে, আমার-আপনার চেনা একটি জনপ্রিয় কোম্পানি। Amazon। Amazon-এর একটি বিজনেস মডেলের ব্যাপারে সে জন্য জানা দরকার। Amazon-এ বিভিন্ন বিক্রেতা তাঁদের জিনিস বিক্রি করে থাকেন। ধরুন একটা ফ্রিজ। বিভিন্ন বিক্রেতা বিভিন্ন ধরণের ফ্রিজ বিক্রি করে থাকেন Amazon.com-এ। মানুষ তাঁদের চাহিদা মতো বিভিন্ন ধরণের ফ্রিজ কিনে থাকেন। কোনোটায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের উপায় থাকে, কোনোটায় ফ্রিজারটা বড় হয় - এরকম হাজারো প্যারামিটার থাকে। কোন্ ক্রেতারা কোন্ ফ্রিজ কিনছেন, কোন্ ধরণের বৈশিষ্ট্যের ফ্রিজ তাঁদের ভালো লাগছে, তাঁরা ফ্রিজটিকে কেনার আগে কতক্ষন ধরে পরীক্ষা করছেন - Amazon এইসব তথ্যই জোগাড় করতে থাকে। এরপরে মোটামুটি সর্বাধিক ক্রেতাদের চাহিদা মতো একটি ফ্রিজ Amazon নিজেই বানানো শুরু করে। এই নতুন ফ্রিজটিকে তারা নিজেদের একটি ব্র্যান্ড দেয় - AmazonBasics. এরপর Amazon এই নতুন ফ্রিজটিকে অন্য সব বিক্রেতাদের থেকে একটু কম দামে বেচতে শুরু করে। সাথে সাথেই Amazon সম্ভাব্য ক্রেতাদের AmazonBasics-এর তৈরী করা সামগ্রীই কেনার জন্য রেকমেন্ড করতে শুরু করে তাদের প্ল্যাটফর্মে। আর যেহেতু Amazon-এর কাছে তাঁদের ক্রেতাদের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ডেটা আগে থেকেই আছে, তাই তারা খুব সহজে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছেও যেতে পারে, মেশিন লার্নিং-কে কাজে লাগিয়ে। ফলত অন্য সব বিক্রেতা বাজার থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়, কারণ তাঁরা Amazon-এর সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না। Amazon খুব সহজেই ক্রেতাদের মনের মতো সামগ্রী, তাঁদের সূক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে, ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। এভাবে বাজারে তারা একরকম মনোপলি তৈরি করে।

এই একই মডেল যদি আমরা এনে ফেলি সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এ, তাহলে দেখবো তা Amazon-এর strategy-এর থেকে খুব একটা আলাদা তা নয়। Amazon তার সফল মডেলের জেরে বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলার কোম্পানি। কিন্তু আমাজন একটি প্রাইভেট কোম্পানি, ফলে তার লভ্যাংশ শুধু কোম্পানির মালিকেরাই পেয়ে থাকেন - প্রধানত জেফ বেজোস। অথচ সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এ যদি আমরা মেশিন লার্নিং-এর মডেল আনতে পারি, তাহলে সেটা একটা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তখন আমাদের খাদ্য, ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর অহেতুক অপচয় বন্ধ হতে পারে। আমাদের খুব দক্ষ প্রোডাকশন সিস্টেম মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে যতটা দরকার ঠিক ততটাই দ্রব্য উৎপাদনের উপযুক্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, আমরা যদি আবহাওয়ার কথাও এখানে চিন্তা করি, তাহলে কিভাবে প্রকৃতিকে নষ্ট না করে দ্রব্য উৎপাদন করা যেতে পারে, সেদিকেও মেশিন লার্নিং যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে। যেমন করে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মেশিন লার্নিং এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে Bill and Melinda Gates Foundation পোলিও এবং অন্য রোগ দূরীকরণের কাজ সাফল্যের সাথে করেছেন। তাই আমাদের কাছে জনসাধারণের উন্নতির উদাহরণও যে নেই তা নয়। 

বর্তমানে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলি বিভিন্ন ইকোনোমিক ডেটা সংগ্রহ করে' দেশীয় ব্যাঙ্কগুলির বেস ইন্টারেস্ট রেট নির্ধারণ করে। চীন একধাপ এগিয়ে তাদের দারিদ্র্য দূর করার জন্য মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার করা শুরু করেছে, খাদ্য সরবরাহ এবং উৎপাদনের জন্য। আমাদের লক্ষ্য থাকা উচিত যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেসব দেশগুলি চলছে, সেগুলির সরকারও ক্রমশ যাতে জনগণের জন্য টেকনোলজির ব্যবহার করা শুরু করে। যে প্রযুক্তির ব্যবহার আমরা প্রতিরক্ষা এবং মিলিটারি ক্ষেত্রে খুব সহজেই করে থাকি, সেই প্রযুক্তিই দ্রুত সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক এবং দৈনন্দিন স্বার্থে ব্যবহার করা দরকার। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দের আমলে Project Cybersyn নামক এক পরিকল্পনায় অনেকটা এই কাজটাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তখন প্রযুক্তি এবং ডেটা সংগ্রহ আজকের স্তরে না পৌঁছানোয়, সেই কাজ পুরোপুরি সফল হয়নি। আজ আমাদের প্রযুক্তি এবং সমাজ এই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য মূলত প্রস্তুত। বামপন্থী দলগুলোর এই ধারণাগুলোকে আবার একবার তাই ফিরে দেখা দরকার। যেভাবে প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ মেশিন লার্নিংকে কাজে লাগাচ্ছে, সেভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও যদি মেশিন লার্নিং-এর সাহায্য নিয়ে ইকোনোমিক প্ল্যানিং-এর দিকে এগোতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে টেকনোলজির এক বিরাট প্রয়োগ ও ফলস্বরূপে সাধারণের উন্নতির প্রভূত সম্ভাবনা আছে।

Friday, March 23, 2018

Ticking Time Bomb - Part 2 (~১৫ মিনিট)


মার্ক জাকারবার্গ প্রথমে নিজেও মানতে চাননি যে, ফেসবুককে এভাবে অন্য কোনো দেশ নির্বাচনী কৌশলে কাজে লাগাতে পারে। তবে তিনি আঁচ করতে পারছিলেন ফেসবুকের বিশাল manipulating power-টাকে। এমনকি তাঁর নিজের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা তৈরী হয়েছিল, আর তাই জন্যই ২০১৬-১৭-তে তিনি আমেরিকার ৫০টা রাজ্যের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্য ঘুরে ফেলেন। আসলে যে দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, সেখানে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা সকলের মনেই জন্মায়। আর মার্কের হাতে তো ছিল আমেরিকার প্রায় সকল মানুষ সম্পর্কে খুব বিস্তারিত তথ্যভান্ডার। সিলিকন ভ্যালিতে কানাঘুঁষো শোনা যায়, সেই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেই জাকারবার্গ বুঝেছিলেন যে ট্রাম্পের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তাঁরও যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। কিন্তু রাশিয়ান গ্রূপের খবর চাউর হওয়ার পর পরই জাকারবার্গ বুঝতে পারেন, ফেসবুকের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় নির্বাচনের মতো বিষয়ে অংশ নেওয়াটা অসম্ভব। তাই তিনি তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা মুলতুবি রেখে ফেসবুকে মনোনিবেশ করেন। তবে এই রাশিয়ানদের কথা জানাজানি হওয়ার পরও নাটকের কিছু অংশ বাকি ছিল।

ফেসবুকের কাছে আছে বিশাল তথ্যভান্ডার, তাতে আছে হাজারো মানুষের হাজারো গতিবিধি-সম্পর্কিত data। এবং এই তথ্য ভীষণ সেনসিটিভ। ফেসবুক জানে আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কাকে পছন্দ করছেন। ফেসবুক তার অজান্তেই তৈরী করে ফেলেছে ভয়ানক এবং দুরন্ত একটি মাধ্যম। এই যে বিপুল পরিমাণ তথ্য ফেসবুকের কাছে গচ্ছিত আছে, তা দিয়ে যে ঠিক কি কি করা যেতে পারে, তার আর কোন সীমা নেই। আপনি ফেসবুককে data দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকছেন, কিন্তু আপনার data থেকে আপনার বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন যে প্রভাবিত হতে পারেন, সেটা ভাবেননি হয়তো। বিজ্ঞাপন থেকে নির্বাচন ম্যানিপুলেশন - সমস্ত রকম কাজেই ব্যবহার করা যায় এই data। কিন্তু এই বিপুল তথ্য কি আদৌ সুরক্ষিত?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের চলে আসতে হবে 2018-এর মার্চ মাসে। তবে তার আগে বলুন, আপনি ফার্মভিল খেলেছেন ফেসবুকে বা এমন কোনো কুইজ খেলেছেন যেটা বলে দেবে আপনার প্রিয় বন্ধু কে, বা আপনার প্রোফাইল কোন বন্ধু কত বার চেক করেছে - এই ধরণের কিছু? তাহলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি - এসব আদৌ সুরক্ষিত কিনা সে বিষয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কেন? তার জন্য একটি ছোট্ট গল্প জানা দরকার।

কোগান নামের একজন বিজ্ঞানী মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে কয়েক বছর আগে। যারা গবেষণা করেন, তাদের জন্যে ফেসবুক এক ধরণের স্পেশাল অ্যাপ্লিকেশন (app) তৈরি করার পারমিশন দিত। রিসার্চাররা গবেষণার খাতিরে প্রচুর তথ্য ফেসবুক থেকে ডাউনলোড করতে পারেন সেই app-এর মাধ্যমে। তবে শর্ত একটাই, গবেষণা শেষ হওয়ার পরে সব তথ্য মুছে ফেলতে হবে। কোগান তাঁর রিসার্চের জন্য একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন, ফেসবুকের ভিতরে, অনেকটা ফার্মভিল গেম অ্যাপ্লিকেশন বা ওই কুইজ অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মতো, যেগুলো আপনারা অবসর সময়ে খেলে থাকেন। তিনি একটি নিরীহ প্রশ্নোত্তর app তৈরি করেন। কোগান তাঁর research grant থেকে কিছু টাকাও বরাদ্দ করেন কিছু লোকের জন্য, যারা প্রশ্নগুলোর সম্পূর্ণ উত্তর দেবেন। প্রায় ২,৭০,০০০ জন মানুষ সেই অ্যাপ ব্যবহার করেন।

এই অ্যাপ যখন কেউ ফেসবুকে খেলবে, সে তার নিজের ফেসবুকের data access-এর পারমিশনও দিয়ে থাকে সেই অ্যাপ টিকে। ফলত কোগান শুধু প্রশ্ন আর উত্তর নয়, সব অ্যাপ ব্যবহারকারীর ফেসবুক ডাটা-ও access করতে পারেন। বলা হচ্ছে, কোগান-এর সাথে এই সময়েই যোগাযোগ হয় একটি কোম্পানির, যার নাম Cambridge Analytica. এই কোম্পানিটি বিভিন্ন দেশে ভোটারদের প্রভাবিত করার কাজ করে থাকে, রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে। তারা কোগানের গবেষণার স্বার্থে ডাউনলোড করা ফেসবুক data কিনে নেয়। তবে তারা মাত্র ২৭০, ০০০ জন মানুষেরই data পেয়েছিলেন, তা নয়।

সেই সময়কালে ফেসবুকের সুরক্ষায় আরো গাফিলতি ছিল। কোনো একজন user-এর data-access permission পাওয়া গেলে, তার প্রায় সমস্ত বন্ধুদের অনেক তথ্যই পাওয়া যেত ফেসবুক থেকে। ফলত ২,৭০,০০০ জন মানুষের বন্ধুবান্ধবের নেটওয়ার্ক মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের data কোগান ডাউনলোড করে ফেলেন। Cambridge Analytica এই বিপুল তথ্য পাওয়ার পরে, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে খুব সুক্ষভাবে ভোটারদের প্রোফাইল, তাদের রাজনৈতিক পক্ষ সম্পর্কে ধারণা তৈরী করে। এর জন্য তারা সাইকোলজির আর এক প্রফেসরের গবেষণাকেও কাজে লাগায়, যাতে প্রায় নিপুনভাবে বলে দেওয়া যায়, কোন ভোটার মোটামুটি কি রকম ভাবছে। এর পরে যারা swing voter (নিরপেক্ষ অথবা দ্বিধাগ্রস্থ), তাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া হয় কার্যকরী বিজ্ঞাপন। Cambridge Analytica officially ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইলেকশন ক্যাম্পেইন-এ কাজ করে। আর এর ফল আমাদের সবার প্রাপ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে Cambridge Analytica বলছে, তারা শুধু আমেরিকা নয়, অনেক দেশেই তাঁদের data model-কে কাজে লাগিয়েছে, যেমন ব্রেক্সিটের সময় ব্রেক্সিটের পক্ষে, এমনকি ভারতেও।

নিউজ এজেন্সি চ্যানেল-৪ বলে একটি মিডিয়া এই সব তথ্য ফাঁস করে এই মার্চ মাসে, মাত্র কয়েক দিন আগেই। ফেসবুকের মার্কেট ভ্যালু এর পরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার নিচে নেমে যায় (যদিও শোনা যাচ্ছে, এসব আগে থেকে বুঝে মার্ক জাকারবার্গ তাঁর অংশের শেয়ারগুলি বেচে দিয়েছিলেন কিছুদিন আগে )। এই ঘটনার পরে মার্ক জাকারবার্গ একটি নিরামিষাশী ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। অবশ্য এর থেকে বেশি আর করারও কিছু নেই। কারণ ফেসবুক এই পুরো ঘটনা সম্পর্কে অনেক দিন আগে থেকেই জানতো। তারা নাকি Cambridge Analytica-কে "অনুরোধ"-ও করেছে বারবার data delete করে দেওয়ার জন্য। Cambridge Analytica এখন বলছে যে, তারা সেটা delete করেও দিয়েছেন। এই ছেলেভোলানো কথায় মার্ক ভুলতে পারেন, কিন্তু আপনি ভুলবেন কি? এতো সূক্ষাতিসূক্ষ মানুষের প্রোফাইলিং data কেউ মুছে ফেলবে? ডেমোক্রেসিকে নিয়ন্ত্রণ করার এতো সহজ উপায় হাতছাড়া কেউ করবে?

এই ঘটনায় ফেসবুকের data সুরক্ষা তো প্রশ্নের মুখে পড়েছে বটেই। কিন্তু ফেসবুকের হাতে যে এতো বৃহৎ একটা সম্পদ এসেছে, এর ঠিক ভবিষ্যৎটা কোথায়, আমার মনে হয় সে সম্পর্কেও ভাবার সময় এসেছে। আসলে ফেসবুক নিজেকে ধীরে ধীরে এতটাই বৃহৎ একটি মেশিনারিতে পরিণত করেছে যে, ক্রমশঃ তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। ফেসবুক শুধু এখন যোগাযোগের মাধ্যম তো নয়ই, এখন ফেসবুক দাঁড়িয়ে আছে মানসিক ব্যবহার ও গতিবিধি সম্পর্কে বিপুল তথ্যের সাগরের মাঝে। এই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত? কোন বেসরকারি সংস্থা - ফেসবুকের মত? তাহলে তার অবস্থা তো এরকম হবে, সে তথ্য বেচে দেবে নিজেদের মুনাফার স্বার্থে। তাহলে কি সরকার এই তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে? তাহলে তো সে তার নিজের জনগণকেই ম্যানিপুলেট করতে কাজে লাগাবে এই তথ্যকে? তবে এই তথ্যের সঠিক অধিকারী কার হওয়া উচিত? কোনো নন-প্রফিট, জনগণের একত্রিতভাবে অধিকৃত সমবায় সংস্থার? কিন্তু তার পরিচালন পদ্ধতিই বা কি হবে? এমনকি আরো বড় প্রশ্ন সমাজে ফেসবুকের ভূমিকাটা ঠিক কি হওয়া উচিত?

আমরা কেউই ঠিক জানিনা। ফেসবুক বলেছিলো আমাদেরকে আরো বেশি যুক্ত করবে একে অপরের সাথে। কিন্তু ফেসবুকের filter bubble-এর জেরে, আমরা একে অপরের আরো দূরে সরে গেছি। শুধু পছন্দ করছি যে মতাদর্শগুলো আমাদের মনোপূতঃ। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে তৈরি করেছি আরো বৈরিতা হিংসা ঘৃণা indifference। ফেসবুক যারা তৈরী করেছিলেন, (মার্ক বাদে) তাঁদের অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন ফেসবুক ছেড়ে দেওয়ার। ফেসবুক সামাজিক ও ব্যক্তিগত মানসিক দিকেও তর্কসাপেক্ষে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এখানে আমরা নিজেদের ইগোকে এক অসম উচ্চতায় নিয়ে চলেছি। অতীতকে পিছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে সাধারণ অগ্রগতিকে রোধ করে দিয়েছি। মাঝে মাঝেই ফিরে যাচ্ছি অতীতের প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে, যাদের অনেকদিনই ফেলে আসা উচিত ছিল, তারা এখনো পড়ে থাকছে জীবনে। আর এসবের মাঝে ফেসবুক গুঁজে দিচ্ছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী, রাজনৈতিক সংস্থার প্রোপাগান্ডা। আপনি আপাতভাবে ভাবছেন যে আমার data নিয়ে ফেসবুকের কিছুই করার নেই। অথচ, ফেসবুক তার থেকে ঠিক খুঁজে বের করে নিচ্ছে কোনটা দরকারি। আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতির পথে ফেসবুক ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা কেউ জানিনা। তবে এতো বিপুল তথ্যের মালিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনাটা বোঝা যাচ্ছে।

আর বোঝা যাচ্ছে যে, বোমাটা কিন্তু আমরা তৈরী করে ফেলেছি। ক্রমাগত শান দিয়ে চলেছি সেই বোমায়, যাতে ওটা আরো শক্তিশালী হয়। চীনারা এই বোমাটা এড়াতে পেরেছে, কিন্তু বাকি বিশ্ব এই বোমার মোহতে এগিয়ে চলেছে। আর আমরা সবাই অপেক্ষা করছি এর পরের বিস্ফোরণটা কখন হয়। তবে ম্যাজিকটা এখানেই যে, এই বোমার বিস্ফোরণের তীব্রতা খুব বেশি হয়েও, এটি অতি সুক্ষভাবে মানবসভ্যতাকে আক্রমণ করছে। তাই এই বোমাটা সঠিকভাবে যখন তার ভয়াবহ রূপ দেখিয়ে ফাটবে, তখন আমরা বোধ হয় নিজেদেরকে বোঝার অবস্থাতেও থাকবো না। ঠিক যেমনভাবে আমেরিকানরা পারেননি। স্রেফ অপেক্ষা করে যাবো পরবর্তী বিস্ফোরণটার জন্য।

Ticking Time Bomb - Part 1 (~১১ মিনিট)

চলুন একটা গল্প বলি। গল্পটার বাস্তবতাটা যদিও খানিকটা বেশিই, তবুও এটাকে গল্পের ছলে সামনে আনাই শ্রেয়। সময়গত দিক থেকে সামান্য অবিন্যস্তভাবে গল্পটা বলবো। যারা ক্রিস্টোফার নোলান-এর স্টোরিটেলিং স্টাইলের সাথে পরিচিত, তাদের কাছে এই সময়ের দৌড়াদৌড়ি নস্যি। তবে বাকিরাও সহজে মানিয়ে নিতে পারবেন বলে মনে হয়।

যে সময়কালটা ধরবো, তা মোটামুটি ২০০৪-০৫ থেকে এই ২০১৮-এর মার্চ অব্দি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, বেশ সাম্প্রতিক অতীতের কথা, তাই মাঝে মাঝেই গল্প তার কল্পনার বেড়া পেরিয়ে বাস্তবের আঙিনায় ঢুকে পড়বে। আর আপনারাও তখন আপনাদের বাস্তবের খাড়া-বড়ি-থোড় থেকে কল্পনার থোড়-বড়ি-খাড়ায় ঢুকে পড়বেন। 

প্রথমেই, আমরা ফিরে যাবো ২০০৪-০৫ সালে। এখন ঠিক যেখানে বসে গল্পটা লিখছি, তার খুব কাছাকাছিই এই গল্পের শুরু, খোদ বস্টন শহরে। এই শহরের লক্ষ লক্ষ ছাত্রের মধ্যে থেকে মাত্র ৪-৫ জন ছাত্রের মাথা থেকে বেরোনো এক আইডিয়া, সারা বিশ্বের এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলে দিল, শুধু ব্যক্তিগত স্তরে নয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক স্তরেও। আপাতভাবে খুব নিরীহ একটি আইডিয়া। কলেজে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ছবি ও ব্যক্তিগত কিছু তথ্য-সম্বলিত একটি ওয়েবসাইট তৈরী করা হবে। সেই ওয়েবসাইটে এসে যে কেউ তার সহপাঠী বা সহপাঠিনী সম্পর্কে তথ্য জানতে পারবে।

কলেজ চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে ২০০৬-০৭ সালে ধীরে ধীরে যখন এই ওয়েবসাইটটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, তখনও তা বেশ নিরীহই। ফেসবুকের কথা তখন বিশ্বের মানুষ সবে জানতে শুরু করেছেন। সকলে তাদের ব্যক্তিগত ভালোলাগা, মতাদর্শ এ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া শুরু করেছেন। পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পেতে শুরু করছেন। আবার যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে পুরোনো স্কুলের হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীর সাথে, যার সাথে টিফিনবেলায় ঝগড়া হতো; আর স্কুল ছুটির পরে চুড়ান ও ফুচকা খেয়ে বাড়ি ফেরা হতো। তবে না, নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করা এই লেখার উদ্দ্যেশ্য নয়। তাই বেরিয়ে আসুন, আমরা এবার চলে আসবো ২০১২ সালে। 

সারা দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশে ফেসবুক ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক শুধু আর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ফেসবুক একটা স্টাইল, খবরাখবর পাওয়ার জায়গা, বিজ্ঞাপনের আস্তানা, আবার গ্রূপে আড্ডা মারার জায়গাও বটে। তার কিছু আগে থেকেই, পশ্চিমবঙ্গেও ফেসবুক গ্রূপে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ফেসবুক থেকে শুরু হতে থাকলো সংগঠিত আন্দোলন, যেমন Jasmine Revolution। বিভিন্ন মিডিয়া গোষ্ঠী ফেসবুকে তাদের নিউজ দিতে আরম্ভ করলো। ফেসবুক এগিয়ে যেতে থাকলো নতুন দিগন্তের পথে। সোশ্যাল মিডিয়াই শুধু নয়, এক আদ্যন্ত মিডিয়া হয়ে উঠলো ফেসবুক। 

এর পাশাপাশি যেটা হতে থাকলো, বিজ্ঞাপনের স্বার্থে ফেসবুক সংগ্রহ করতে লাগলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আরও আরও তথ্য। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কি খাচ্ছেন, কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পড়ছেন, কোথা থেকে জামাকাপড় কিনছেন, কি পছন্দ করছেন, কি ভিডিও দেখছেন, কাকে কী বলছেন - সব তথ্য জমানো শুরু করলো। এমনকি আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক কি রকম হতে পারে, তা আপনি ফেসবুককে সরাসরি না বললেও, সে আপনার আচার আচরন দেখে মোটামুটি প্রেডিক্ট করতে শুরু করলো। মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যভান্ডার - বিশ্ব ইতিহাসে আগে কোথাও কোনও দিন তৈরি হয়নি। ফেসবুকের মধ্যে তৈরী হতে থাকলো World's largest social data bank। এই বিপুল তথ্য ফেসবুক ব্যবহার করে সেই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের জন্য। ফেসবুকের পারদর্শিতা এখানেই যে, সে একদম সঠিকভাবে সঠিক লোককে উপযোগী বিজ্ঞাপনটা দেখাতে পারে, কারণ সে খুব সুক্ষভাবে জানে আপনার পছন্দ ঠিক কোন ধরণের প্রোডাক্ট। এর ফলে ফেসবুকে বিভিন্ন কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে লাভবানও হল। আপনি বিজ্ঞাপনে দেখা কোম্পানির জিনিস কিনলেন, বা সেই রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে গেলেন। এতক্ষন পর্যন্ত ব্যাপারটা মোটামুটি ঠিকই ছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপন কি শুধুমাত্র consumer product-এরই হয়?

এই প্রশ্নের খুব সরাসরি উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের এবার চলে আসতে হবে ঠিক 2016 সালে। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। সেই সময়কালে ফেসবুকের একজন প্রাক্তন-head লক্ষ্য করলেন, একটি আপাতভাবে-মনে-হওয়া Bernie Sanders-এর প্রচারের পেজ থেকে কিছু অদ্ভুত ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে ফেসবুকে। মানে যে বিষয়গুলোর বিপক্ষে Bernie Sanders কথা বলেন, ঠিক সেগুলোরই পক্ষে প্রচার করা হচ্ছে, অথচ ওনার স্বপক্ষে প্রচারের পেজ থেকে। পরে বোঝা যায়, কিছু লোকজন মিলে Sanders-এর বিপক্ষে তারই নাম দিয়ে উল্টো প্রচার করছিল। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে ফেক নিউজের জমানা। যে নিউজ সত্যি নয়, তাকেই সত্যের মোড়কে জনগণের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর ফেসবুক হয়ে উঠলো সেই ফেক নিউজের মূল কারখানা।

2017-তে জানা যায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য, Russian কিছু গ্রুপ ফেসবুকে প্রায় লক্ষাধিক ডলার ব্যয় করে আমেরিকান প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারের জন্য।  তারা অন্য প্রার্থীদের বিপক্ষেও প্রচার করেছিল। যে রাষ্ট্রটি এতদিন অন্য দেশের নির্বাচনে নাক গলিয়ে এসেছে, তাদেরই নির্বাচনে তাদেরই দেশের একটি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে মানুষকে যে ম্যানিপুলেট করা যেতে পারে, এটা অনেকেরই ধর্তব্যের বাইরে ছিল। রাশিয়ান গ্রুপগুলি ফেসবুকের বিজ্ঞাপন-মাধ্যমকে ব্যবহার করে। ফেইসবুকের কাছে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম data আছে প্রচুর মানুষের সম্পর্কে, সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে নিপুন দক্ষতায় ভোটার টার্গেট করা হয়। মানে ধরুন আপনি conservative কোনো ideology-তে বিশ্বাস করেন, তখন আপনাকে দেখানো হয় Republican party-র বিজ্ঞাপন বেশি বেশি করে। বা আপনি যদি দ্বিধাগ্রস্থ অথচ সামান্য-হিন্দু-ঘেঁষা ভোটার হন, তাহলে আপনাকে BJP-এর বিজ্ঞাপন দেখানো হবে। ফলাফল আমরা দেখতেই পাই, 2016 সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু এই গল্প শুধু বিজ্ঞাপনেই শেষ হয় না।

- বাকিটা পরের পার্টে

Thursday, December 07, 2017

বিটকয়েন আর অর্থনীতি | Bitcoin and Economics

বিটকয়েন এর নাম হয়তো অনেকেই শোনেননি। যারা শুনেছেন এবং শোনেননি, সকলের জন্যই লেখাটা। শেষ পর্যন্ত লেখাটা সাধারণ অর্থনীতির দিকে নিয়ে গিয়ে শেষ করবো। যারা এ সম্পর্কে শোনেননি, তাদের উৎসাহ যোগানোর জন্য বলি যে, এখন মাত্র একটি বিটকয়েন-এর মূল্য ১৪-১৬ হাজার ডলারে পৌঁছেছে। কি করে এই অবিশ্বাস্য ব্যাপার হল, সেটা কিছু পরেই বোঝা যাবে। তার আগে এর সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া যাক। 

বিটকয়েন একটি ডিজিটাল কারেন্সি। মানে এর কোনোরকম ফিজিকাল অস্তিত্ব নেই। এই কারেন্সি যদি কিনতে চান, তাহলে আপনাকে অনলাইনেই কিনতে হবে। আপনার একটি প্রাইভেট পাসওয়ার্ড দ্বারা সেই কারেন্সি সুরক্ষিত থাকবে। কিভাবে এটা সুরক্ষিত থাকছে, সেটা বলার জন্য আর একটা লেখা লিখতে হবে। এমন দুর্দান্ত কিছু থিওরি নয়, এবং এই সম্পর্কিত একটি লেখা কিছুদিন পরে পাবেন। তবে এখন আপাতত এটুকু জানলেই চলবে যে, কিছু unsolved mathematical problem-এর জেরেই, আপনার পাসওয়ার্ডের দ্বারা ওই ডিজিটাল কারেন্সি, বিটকয়েন, সুরক্ষিত থাকার ব্যবস্থা আছে। যেমন আপনার সাধারণ টাকা ব্যাংকে সুরক্ষিত থাকে, অনেকটা তেমন করেই। কিন্তু বিটকয়েন শুধু এই নিরাপত্তার জন্য এবং ডিজিটাল হওয়ার কারণেই স্পেশ্যাল, তা নয়। এর একটা অন্য কারণ আছে। 

এই বিটকয়েনকে কোনো সেন্ট্রাল অথরিটি নিয়ন্ত্রণ করছে না। এর মানে হলো, কোনো রিজার্ভ ব্যাংক বা সরকার নেই, যে বলে দিচ্ছে কত বিটকয়েন মার্কেটে থাকবে। অথবা কেউ কোনো অর্থনৈতিক নিয়ম তৈরী করে দিচ্ছে না, যাতে বিটকয়েনের যোগান কন্ট্রোল করা যায়। ফলে বিটকয়েনের মূল্য নিয়ন্ত্রণের কোনো উপায় সরকারের কাছে নেই। এ বিষয়েই পরে আর একটু আলোচনা করবো। কিন্তু তার আগে বিটকয়েনের পিছনে আর একটি প্রযুক্তি কাজ করছে, সে ব্যাপারে জানা প্রয়োজন।

যেহেতু কোনো সেন্ট্রাল অথরিটি বিটকয়েনকে কন্ট্রোল করছে না, তাই এটা বোঝা তো খুব শক্ত যে কার কাছে কত বিটকয়েন আছে! অথবা কেউ অন্য কাউকে বিটকয়েন যদি ট্রান্সফার করে, তাহলে আদৌ সেই বিটকয়েনগুলি ভ্যালিড কিনা এটা যাচাই করার উপায় কি? এর পিছনে আছে একটি নতুন টেকনোলজি, blockchain। আরো সোজা ভাষায়, একটি পাবলিক ledger সিস্টেম। দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মেশিনে কপি করে রাখা আছে, একটি public ledger. এই পাবলিক ডেটাবেস বা লেজারে জমা রাখা হচ্ছে সমস্ত transaction বা লেনদেনগুলো। এই public ledger-এ কোনো transaction তখনই ভ্যালিড বলে গণ্য হবে, যখন একটি নূন্যতম সংখ্যক মেশিন (যথাযত সংখ্যাটা বলাটা একটু জটিল) সেটাকে মান্যতা দেবে। এই মান্যতা দেওয়ার পদ্ধতিও বেশ অভিনব। এই মান্যতা দেওয়ার জন্য প্রত্যেক মেশিনকে করতে হবে কিছু সময়সাপেক্ষ জটিল গাণিতিক ক্যালকুলেশন। যখন নূন্যতম সংখ্যক মেশিন ক্যালকুলেশনগুলি করার পরে কোনো transaction-কে মান্যতা দিলো, তখনই সেই transaction পাবলিক লেজারে বৈধ হিসেবে স্থান পাবে। সেই ক্যালকুলেশনগুলো করতে, আপনার বা আমার সাধারণ ল্যাপটপ বা কম্পিউটার অনেক বেশি সময় লাগিয়ে দেবে। কিন্তু দুনিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের বেশ পাওয়ারফুল মেশিনগুলো তুলনামূলকভাবে কম সময়ে এই ক্যালকুলেশন করতে পারে। এই পাওয়ারফুল মেশিনগুলোকে সমষ্টিগতভাবে কিনেছে আমার বা আপনার মতোই সাধারণ মানুষেরা। তারা এই জটিল ক্যালকুলেশনের পুরস্কারস্বরূপ কিছু নতুন বিটকয়েন পাবেন, এবং এভাবেই সৃষ্টি হচ্ছে নতুন বিটকয়েনগুলি।

মূলত এই হচ্ছে বিটকয়েন সিস্টেম। এই সিস্টেমে কাউকে identify করা খুব কষ্টকর এবং প্রায় অসম্ভব বলা যায়। কারণ পুরো লেনদেনটাই হচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয়ে। ফলত কারোর জানার ক্ষমতা নেই, কার কাছে কত বিটকয়েন আছে। এই বিটকয়েনের মূল্য মূলত নির্ধারিত হচ্ছে এর যোগানের অভাব থেকে। এখনো অব্দি মোটামুটি ১৬ মিলিয়ন বিটকয়েন তৈরী করা হয়েছে এবং বাজারে আছে। তবে বিটকয়েন সর্বাধিক তৈরী হতে পারে ২১ মিলিয়ন। গাণিতিক ফর্মুলার জেরেই তার থেকে বেশি বিটকয়েন তৈরী হওয়া আর সম্ভব নয়। ফলে একটা সীমা থেকে যাচ্ছে সর্বমোট বিটকয়েনের। (অনেকটা সোনার সাথে এক্ষেত্রে তুলনা করা যায় বিটকয়েনকে) এখানে যদিও হ্যাকিং বা চুরির সমস্যা আছে। কিন্তু সেই সমস্যা যে কোনো অনলাইন ডিজিটাল মিডিয়ামের থেকে বেশি কিছু নয়, বরং খানিকটা কমই। 

তবে বিটকয়েনের সবথেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যটা হল নিয়ন্ত্রণহীনতা। যেহেতু সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, তাই যারা Free Market Capitalism-এর সমর্থক তারা এ ব্যাপারে ভীষণ উৎসাহী। এই কারেন্সির মূল্য ঠিক করে দিতে পারে শুধুই বাজার এবং সেখানের চাহিদা-যোগানের সমীকরণ। সে কারণে তাদের উচ্ছাসের যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু পুঁজিপতিদের সমস্যাও যদিও সেখানেই, নিয়ন্ত্রণ-না-থাকা নিয়ে। কারণ সরকার শুধুমাত্র একটি যন্ত্র, যা পুঁজিপতিদের লাভ বাড়াতে সাহায্য করে। তাই সেই নিয়ন্ত্রণটুকু চলে গেলে, পুঁজিপতিরা কিভাবে তাদের লভ্যাংশ বাড়িয়ে চলবেন, সেটা বড় চিন্তার কারণ হতে পারে।

যারা anarchy পছন্দ করেন, তাঁদেরও কাছেও যথেষ্ট আকর্ষণীয় এই বেলাগাম মুদ্রা। কারণ যে established currency-গুলি আছে, সেগুলোর বাধা এড়িয়ে এই মুদ্রাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। আর সে কারণে এই মুদ্রা বিকল্প অর্থনীতির একটা দিক খুলে দিতে পারে। অলরেডি আন্ডারগ্রাউন্ড অর্থনীতিতে এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কোনোভাবেই এই মুদ্রা আমাদের সম্পদের চরম অসামঞ্জস্যকে কমাতে পারবে বলে, আমার মনে হয় না। এখনকার অর্থনীতিকে সাময়িক আঘাত দেওয়া ছাড়া, একে পরিবর্তনের জন্য বিটকয়েনের দিকে না তাকানোই ভালো। বরং এখনকার রাজনৈতিক সিস্টেমের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা কমে গেছে, বিশেষত ২০০৮-এর ফিনান্সিয়াল ক্র্যাশ-এর পরে, তার একটা প্রতিফলন পাওয়া যায় বিটকয়েনের মতো সিস্টেমের বিপুল জনপ্রিয়তায়। শেষ পর্যন্ত আমরা তাকিয়ে থাকবো, বিটকয়েন গ্লোবাল কারেন্সি হিসেবে আন্তর্জাতিক বেড়াজাল ভেঙে দিয়ে কতটা সফল হতে পারে, সেই দিকে।  

Thursday, April 06, 2017

প্রযুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ ২ - Technology and its future 2

জীবনবিজ্ঞান পড়তে কোনোকালেই ভালো লাগতো না। বরাবরই বায়োলজিকে সাবজেক্ট হিসেবে এড়িয়ে এসেছি। কিন্তু কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরে দেখলাম, শেষে কিনা প্রযুক্তির এই দুর্নিবার গতি আসলে বায়োলোজিকেই অনুসরণ করছে! আমরা যেভাবে ভাবি, কাজ করি, সিদ্ধান্ত নিই, সেগুলোকেই একটা যন্ত্রকে দিয়ে করাতে চাইছি আমরা। আর তার উদ্দেশ্যেই হয়ে চলেছে কম্পিউটার সায়েন্সের বেশিরভাগ গবেষণা। এই গবেষণা এগোচ্ছে বেশ দারুন গতিতে সফলভাবেই। তবে এই সফলতা যে মানবজাতির ভালো কাজেই আসছে, তা নয়। সফলতার পরিণাম হিসেবে আমরা পাচ্ছি বিপুল সংখ্যক মানুষের বেকারিত্ত্ব এবং "termination of employment"। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য, কম্পিউটার সায়েন্সের যে বিভাগটা এই আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, সেই বিজ্ঞানটা কিভাবে আমাদের চারপাশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, তার খোঁজ করা। 

যেসব আবিষ্কারগুলো এ যাবৎকাল ধরে মানুষের সভ্যতার গতি-প্রকৃতি আমূল পাল্টে দিয়েছে, তাদের কয়েকটা হল - আগুনের আবিষ্কার, বিদ্যুৎ, পারমাণবিক বোমা। আর আগামী কয়েকবছরে যে আবিষ্কারটা সভ্যতার বেশ খানিকটা পরিবর্তন ঘটাতে চলেছে, তা হল: Machine Learning (মেশিন লার্নিং বা ML) এবং Artificial Intelligence (আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বা AI).

প্রথমে বলা যাক, মেশিন লার্নিং ঠিক কি? খুব ছোট্ট কথায়, কম্পিউটারের কাছে সাধারণত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকে, তা থেকে কিছু আকর্ষণীয় বা গুরুত্ত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অথবা ফলাফলে আসার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নাম মেশিন লার্নিং। যদিও আমি এখানে চূড়ান্ত অ-বৈজ্ঞানিক একটা সংজ্ঞা দিলাম। যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তারা জানেন, এই মেশিন লার্নিং-এর পিছনে লুকিয়ে আছে খুব নিগূঢ় কিছু গাণিতিক থিওরি। কিন্তু যেহেতু এই লেখাটা বিজ্ঞান আর অর্থনীতির সম্পর্ককে ধরতে চাইছে, তাই এরকম একটাই সংজ্ঞাই আপাতত সঙ্গত মনে হল।

যাই হোক, এখন যে প্রশ্নটা মাথায় আসতে পারে, তা হল - কম্পিউটার তাহলে তার সঞ্চিত তথ্য থেকে কিভাবে কিছু দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত বা কিছুটা অজানা তথ্যের সন্ধান দেওয়ার চেষ্টা করছে? প্রায় সেভাবেই, যেভাবে আপনি আপনার মস্তিষ্কে করে থাকেন। আপনার মাথায় যেমন আছে একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক, যেটা বোঝার চেষ্টা করে, লাল সিগনাল জ্বলছে মানে আমাকে ট্রাফিকে দাঁড়াতে হবে, অথবা সেই জাতীয় কিছু সেরিব্রাল কাজ; ঠিক সেরকমই কম্পিউটার তৈরি করছে তার ভিতরে একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক। আমরা যা যা জানি, যে যে বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য আছে - তা দিয়ে এরকম নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন নিউরাল নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য আলাদা হতে পারে। যেমন, কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক শুধুই চালক-বিহীন গাড়ি চালানোর কাজে লাগানো যেতে পারে। আবার কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক শুধুই দুর্দান্ত দাবা খেলার কাজে আসতে পারে। দাবার কথা বললাম, কারণ দাবা সবথেকে কঠিন খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই কঠিন খেলাতেও মানুষের থেকে বেশি পারদর্শী হয়ে একটি কম্পিউটার মানুষকে হারিয়ে দিচ্ছে। এখানে এটা বোঝা খুব জরুরি যে, এই নিউরাল নেটওয়ার্ক এইসব কিছু নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য মানুষের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কারণ মানুষের যে সব সীমাবদ্ধতা, যেমন খুব বেশি তথ্য মনে রাখতে না পারা বা ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, এই সমস্যা কিন্তু কম্পিউটারের প্রায় নেই। ইতিমধ্যেই দাবার থেকে কঠিন প্রেডিকশানের খেলাগুলোতেও, যেমন পোকার বা চীনের গো নামক খেলাগুলোতে, বিশ্বের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দিয়েছে কম্পিউটারে বসে থাকা মেশিন লার্নিং সিস্টেম। এবার এই সিস্টেমকে জীবনের অন্য ক্ষেত্রের সমস্যা সমাধানে প্রয়োগের পালা।

কিন্তু তার আগে আর একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এই যে মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে নতুন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আরো সহজ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেটা কি খুব নতুন কিছু? মেশিন লার্নিং আর তাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুলছি যন্ত্রের ভিতরেই - তার সাহায্যে আমরা ঠিক কোন ধরণের কাজগুলোকে আরো সহজে করে ফেলতে পারবো? সেই কাজগুলো, যেগুলোতে আমাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা লাগতো। মানে ধরুন, আমাদের কাছে আছে - প্রচুর রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ও তাদের যে রোগ হয়েছিল, তার প্রাথমিক symptom কিরকম ছিল, তার একটা ইতিহাস। সেই তথ্য শুধু দিয়ে দিতে হবে কোনো মেশিন লার্নিং সিস্টেমকে। এর পরে ওই সিস্টেম তার পারদর্শিতা দেখাতে শুরু করবে।  সিস্টেমকে এর পরে শুধু বলতে হবে কোনো নতুন এক রোগীর প্রাথমিক symptom-গুলো।  তাহলে সেই সিস্টেম বলে দিতে পারে, খুব সহজেই, কোনো নতুন রোগীর ঠিক কোন রোগটা হয়ে থাকতে পারে। এই কাজটা কোনো ডাক্তারও হয়তো বিশ্লেষণ করে করতে পারেন, কিন্তু একটা মেশিনেরও সেই ক্ষমতা জন্মাচ্ছে। এর মানে এই নয় যে, কাল থেকে আর ডাক্তারদের দরকার হবে না। ডাক্তাররা চিরকালই আমাদের সমাজে মূল্যবান, কিন্তু তাদের একটা অল্টারনেটিভ থাকছে। আরো বড় আকারে বললে, আমরা বিশ্লেষণী ক্ষমতার কাজগুলোকে হয়তো মেশিনের সাহায্যেই করতে শুরু করছি।

এতদিন যাবৎ আমরা মূলত কায়িক শ্রমের কাজগুলোকে মেশিনের মাধ্যমে করানোর চেষ্টা করছিলাম। ফোর্ডের গাড়ি কারখানাতে, গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একটা কনভেয়ার বেল্টে পরের পর জুড়ে যাচ্ছে। একটা গাড়ি তৈরি করার জন্য, মানুষের সাহায্যের দরকার প্রায় হচ্ছেই না। এই দৃশ্য আমরা এতদিন দেখে আসছি। কিন্তু এবার, যে সব কাজে analytical ability লাগতো, সেগুলোতেও মানুষের থেকে দক্ষ বিকল্প আসা শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন এখনো খুবই শুরুর দিকে, কিন্তু একে বলা হচ্ছে Industrial Revolution 4.0। যেহেতু কম্পিউটার এখন নিজেই মানুষের থেকেও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যেতে চলেছে, তাই প্রযুক্তির উন্নতিতে এর পরের প্রগতিটা হয়তো খুব দ্রুত হবে। কিন্তু আমরা কি তৈরি এই পরিবর্তনটার জন্য? অর্থনৈতিক ভাবে?

এই পরিবর্তনটার অর্থনৈতিক দিকটা নিয়ে একটু গভীরে ভাবা যাক। যখন কায়িক আর বিশ্লেষণী ক্ষমতা দরকার, এমন কাজগুলো একটা কম্পিউটারই করতে পারবে, তাহলে মানুষের জন্য ঠিক কোন ধরনের কাজ পড়ে থাকবে? মূলত, তিন ধরণের। প্রথমত, কোনো শিল্পীর শৈল্পিক এবং স্বতন্ত্র কাজগুলো। যদিও কম্পিউটার এখনই নতুন ধরণের গান-বাজনা নিজেই তৈরী করতে পারছে, তবুও আমার মনে হয় শিল্পের জায়গাটা মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে যেমন ছিল, তেমনি ভবিষ্যতেও থেকে যাবে। কারণ শিল্পটা শুধুমাত্র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়না। তার জন্য সৃজনশীলতা লাগে, যেটা কোনো কৃত্তিম নিউরাল নেটওয়ার্ক আপাতত দিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, একজন রিসার্চারের নতুন উদ্ভাবনী কাজগুলো। মূলত আগের বলা কারণেই কম্পিউটার এখনো স্বতন্ত্রভাবে নতুন উদ্ভাবন করার ক্ষমতা ধরে না। এবং আগামী ৫০ বছরে সেরকম নতুন idea নিজে গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। আর তৃতীয়ত এবং শেষ, কোনো সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে অন্য মানুষকে convince করার কাজটা। মূলত MBA যারা করেন, যারা কোনো সংস্থার leader বা মানুষের psychology বা মনস্তত্ব নিয়ে যারা কারবার করেন, তাদের কাজটা আপাতত বেশ কয়েকবছর কম্পিউটারের পক্ষে করা অসম্ভব। কারণ কোনো রোবট বা মেশিন লার্নিং সিস্টেম মানুষের সাথে তর্কে জিততে পারেনা।

এই যে কতিপয় কাজ পড়ে থাকবে, তাতে অনেক মানুষ তো কাজ হারাবেন। তাহলে কি আমাদের সমাজ ভেঙে পড়বে? এতটা সহজে নয়, কারণ এই প্রযুক্তির আশীর্বাদেই আমরা পৌঁছবো আমাদের উৎপাদন ক্ষমতার শিখরে। মেশিনরা এখনই এত সুদক্ষ যে আমাদের সারা পৃথিবীতে যা খাবার উৎপাদন হয়, তা দিয়ে পৃথিবীর সকলের অন্ন-সংস্থানে কোনো অসুবিধাই হওয়া উচিত নয়। অনেকেই হয়তো জানেন, যে অন্ন-সংস্থানের থেকেও মূল সমস্যাটা অন্ন-ভাগ করে দেওয়ার। আর মেশিন লার্নিং আমাদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শুধু বর্তমান নয়, আমরা ভবিষ্যতের খাদ্য এবং অন্য সামগ্রী সংকুলানের নিশ্চয়তা দিতে শুরু করেছি। কিন্তু মুশকিল হয়ে যাচ্ছে, সেই একটাই জায়গায়। এই সমস্ত সিস্টেমের দখল থাকছে খুব কম কিছু মানুষের হাতে। ফলে বর্তমান বা ভবিষ্যতের যে নিশ্চয়তা আমাদের আয়ত্ত্বে আছে, তা আমরা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারছিনা। সুতরাং, প্রযুক্তির এই কুক্ষিগত হওয়ার প্রবণতাকে বন্ধ না করতে পারলে, আমরা কখনোই এর সুফলগুলো উপলব্ধি করতে পারবো না। মানুষ এখন যেমন বেশি সংখ্যক হারে কাজ হারাচ্ছেন, সেটাই বাড়তে থাকবে। অর্থ জমা হতে থাকবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছেই, যেমনটা এখন হচ্ছে। 

এবার চোখ ফেরানো যাক, আমাদের চারপাশের হালহকিকত নিয়ে। ভারতের ইনফরমেশান টেকনোলজির সেক্টরে গত প্রায় ১৫-২০ বছরে যে বিপুল জোয়ার এসেছিলো, তা হঠাৎই ধাক্কা খেয়েছে, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। Cognizant, Wipro, Infosys থেকে শুরু করে প্রায় সব বড় Services সেক্টরের কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের ছেঁটে ফেলছেন। এবার ওপরে যে নতুন সিস্টেমের আবির্ভাবের কথা বললাম, সেটার কথা চিন্তা করুন। গত কয়েক বছরে ওই সিস্টেমের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ এতো বিশাল পরিমান তথ্য রাখার এবং তাকে দ্রুত প্রসেস করবার মতো computing power আমাদের কাছে ছিল না। কিন্তু এখন যখন এসব সম্ভব হচ্ছে, তখন এই বিশাল সংখ্যক IT employee-দের কোম্পানিগুলোর দরকার হচ্ছে না। তারা নতুন সিস্টেমের সাহায্যে আরো সস্তায় নিজেদের কাজগুলো করে ফেলতে পারছেন। মানুষের সাহায্যের দরকার পড়ছে না, যেমন একসময় ফোর্ডের দরকার পড়েনি, তাদের গাড়ি তৈরী জন্য নতুন শ্রমিকের। সুতরাং, এটা বুঝতে হবে যে, এই মুছে-যাওয়া কাজগুলো কিন্তু আদৌ আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। বরং আরো আরো বেশি হারে, এই IT-Services সেক্টরে কর্মীসংখ্যা কমতে চলেছে। কম্পিউটার নিজেই নিজেকে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আশা করবো ফোর্ডের দরুন যে করুন দুর্দশা ডেট্রয়েটের হয়েছিল, তা ভারতে হবে না। ডেট্রয়েট যদিও এখন ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে, কিন্তু ধুলোয় মিশে যাওয়া সেই ডেট্রয়েটের স্বাদ, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে খুবই তিক্তভাবে ধরা দিতে পারে।

তবে আমরা কি অন্ধকার কোনো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে চলেছি? এতো সম্ভাবনা সত্ত্বেও? সত্যিই, এই মুহূর্তে মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সকে মোকাবিলা করে', নতুন ধরণের কাজ তৈরী করার মতো কোনো সমাধান আমাদের সিস্টেমের কাছে কিন্তু নেই। সারা পৃথিবী জুড়ে সকলেই চাইছেন, নতুন কাজ সৃষ্টি করতে। কারণ নতুন কাজ ছাড়া মানুষ টাকা উপার্জন করতে পারবেন না। ফলে যে সব সামগ্রী উৎপাদন হচ্ছে, সেগুলো কেনবার লোকও পাওয়া যাবে না। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেরই সম্মুখীন আমরা, আবারো। এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়, ১৯৩০, ১৯৭০, ২০০০, ২০০৮ - বারবারই এই দ্বন্দ্বের জন্যই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দুর্দশাগ্রস্থ হয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেকবারই জোড়াতালি দিয়ে আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি, কিন্তু সমস্যাটাকে সমূলে আঘাত করা হয়নি। এবারের সমস্যাটা আরো আলাদা কারণ এর আগে কোনোবারই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে কোনো চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হয়নি। এই কারণেই এবারের এই সমস্যা এতো প্রলম্বিত, ২০০৮ সাল থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি। 

আমরা যদি সামগ্রিকভাবে নতুন করে না ভাবতে পারি, যদি সমষ্টির কথা না ভাবতে পারি, তাহলে দুর্গতি আরো বাড়তে বাধ্য। সমষ্টিগতভাবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে রাখতে পারলে, তবেই প্রযুক্তির সুষম বন্টন সম্ভব হবে, নচেৎ নয়। তাই যদি পারেন, এই সার্ভিসেস সেক্টরের কবল থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরোনোর চেষ্টা করুন, নাহলে পরবর্তী পিঙ্ক স্লিপটি আপনার নামে আসতে চলেছে। 

Wednesday, January 18, 2017

প্রযুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ - Technology and its future

Technology যেন সমুদ্রের মতোই যতটা নেয়, ততটাই ফিরিয়ে দেয়। কথা-টা হয়তো সম্পূর্ণ ঠিক নয়; প্রযুক্তিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু কিছুটা তো ঠিক অবশ্যই। তাকানো যাক আজ থেকে মোটামুটি ১০ বছর আগের দিনগুলোয় বাংলার সংগীতজগৎ-এর দিকে। খুব সঙ্গীন অবস্থা। এখন যে খুব ভালো অবস্থায় আছে, তা নয়। তবে এখনকার থেকে তখন অবস্থা আরো খারাপ ছিল। MP3-এর ব্যবহার ততদিনে আমরা সকলে জেনে গেছি। ফলে Music CD আর প্রায় বিক্রিই হচ্ছে না। বাংলা ব্যান্ড যদিও ভীষণ পপুলার। private radio channel গুলো কিছুটা চেষ্টা করছে বাংলা গান বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু রেডিওগুলো বিভিন্ন অভিনব প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করলেও, CD-এর কাটতি বাড়াতে পারছেন না।

Cut-to আজকের যুগ। CD ব্যাপারটাই প্রায় উঠে গেছে। পার্ক স্ট্রিটের Music World বন্ধ হয়ে গেল। YouTube, Spotify, Saavn, Gaana, Google Play Music – এসব চলে এলো। MP3 যে এখনো নেই তা নয়, এখনো যে পাইরেসি হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একটা অল্টারনেটিভ রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেছে। আজকালকার গানগুলো সব থাকছে কোনো এক সার্ভারে। সেখান থেকে সবাই download করে শুনছেন। শিল্পীও তার পয়সা পাচ্ছে, আর কিছু advertisement-এর নূন্যতম বিরক্তি সহ্য করে, আমরাও বিনামূল্যে গান শুনতে পারছি। বা কিছু টাকার বিনিময়ে সেই বিজ্ঞাপনের বিরক্তিও দূর করা সম্ভবপর হচ্ছে।

কিন্তু এতে আবার একটা নতুন সমস্যা তৈরী করেছে – এই যে শিল্পী আর শ্রোতার মধ্যিখানের কোম্পানিগুলি – এগুলো নাকি শিল্পীদের ন্যায্য দাম দিচ্ছেন না। এক উঠতি ব্যান্ডের গিটারিস্টের সাথে কথা হচ্ছিলো প্রযুক্তির পীঠস্থানে, মানে এই খোদ আমেরিকায়। তাদের বক্তব্য Spotify-এর মতো বড় বড় কোম্পানি যে পরিমান income-এর স্বপ্ন দেখে বা already যা income করছে, তার খুব সামান্যই musician-রা পান। Google-এর বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ উঠেছে YouTube-কে নিয়ে। যাই হোক, আপাতত এটা মনে রাখা যাক, এই মধ্যিখানের কোম্পানিগুলোর ভূমিকা সামান্য ঝাপসা…

এবার একটু অন্য দিকে চোখ রাখা যাক। কিছু বছর আগের কথা, তখন আমি প্রাইভেট সার্ভিসেস কোম্পানির ঘানি টানছি কলকাতায়। মাস গেলে মাইনে পাচ্ছি, যদিও সন্তুষ্টি অধরা। এই সময় অনেক ধরণের নতুন চিন্তা মাথায় আসতো। সেই idea-গুলোই আমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে নিতাম, যাদের সাথে আবার ফ্ল্যাটও শেয়ার করতাম।

এর মধ্যে একটা সমস্যা যেটা মনে হয়েছিল – সেটা হল, এই যে এতো ট্যাক্সি আমাদের শহরে ঘোরাফেরা করে, অনেক সময়ই ফাঁকায়, বিনা যাত্রীতে এদিক-ওদিক যায়। সেই ট্যাক্সিগুলোতে যদি একটি GPS device বসিয়ে centrally control করা যেত, তাহলে অনেক তেল আর সময় বাঁচানো যেত। জানি কি ভাবছেন। এটাই তো এখন Uber, Ola বা Lyft করে। আর আমার দাবি এই যে, Uber-এর আগেই আমি এই ভাবনাটা ভেবে ফেলেছিলাম? না আদৌ, তা নয়। এটা আমার মতো হয়তো অনেকেই ভেবেছিলো। Uber সেটা করে দেখিয়েছে। Information Technology-তে ভাবনার খুব একটা কোনো মূল্য নেই (আমার যে বন্ধুটিকে বলেছিলাম সে তো বলেছিলো যে এসব ট্যাক্সিওলাদের সাথে কোনোরকম deal করাটাই চাপের)

যাই হোক, আমার idea-টার আরও একটা part ছিল। আমি ভেবেছিলাম যখন একটা Software বানানো হয়ে যাবে এই idea-টা দিয়ে, তখন সেটাকে Government-এর কাছে বেচে দেব। কারণ খুব স্বাভাবিকভাবেই, Software তৈরী হয়ে যাওয়ার পর ওটায় আমার আর কোনো ভূমিকা দেখিনি। এবং এখানেই লুকিয়ে আছে পরের ব্যাপারটা।

Uber ঠিক করছেটা কি? কেউ তার নিজের গাড়ি চালাচ্ছে। আমরা সেইসব গাড়িতে চড়ছি। যে গাড়ি চালাচ্ছে, সে তার প্রতিদানে কিছু পাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমি গাড়ি চড়ছি, তাই আমি গাড়ির চালক ও মালিককে কিছু টাকা দেব, সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু Uber? সে কি করছে? সে Software-এর মাধ্যমে গাড়ি আর তার সওয়ারীকে connect করছে। কিন্তু Software যখন তৈরী হয়ে গেলো, তারপর সেটা maintain করার *প্রকৃত* খরচ তো খুবই সামান্য। এই maintenance cost-এর ব্যাপারটা সমস্ত Software Engineer-দেরই জানা। এবং আজকাল প্রযুক্তি এতটাই উন্নতির জায়গায় চলে যাচ্ছে, যে একটা computer নিজেই তার fault বুঝতে পেরে, তাকে সারিয়ে নেবার প্রাথমিক পদ্দক্ষেপগুলো নিয়ে নিতে পারছে। মানুষের সহযোগীতা খুব কমই দরকার হচ্ছে। এই automated fault resolution নিয়ে এখন অনেক গবেষণাও হচ্ছে। সুতরাং, maintenance cost আরো কমবে ভবিষ্যতে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

তাহলে এবার প্রশ্ন: Uber-কে আমি কি জন্য টাকা দেব? বা Uber-এর এই গাড়ির মধ্যস্থতা করার জন্য আলাদা করে আদৌ অস্তিত্বের কি প্রয়োজন আছে? কোনো Government-ই তো এটা operate করতে পারে। বরং Government-এর আরো সুবিধে আছে। গাড়ি চালকের বৈধতা, কোনো দুর্ঘটনা-জনিত সমস্যা – এ জাতীয় যাবতীয় জটিলতা (আজকাল পেপারেও দেখা যায়) মেটানোর ব্যাপারে Uber-এর মতো প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর থেকে আমাদের সরকার অনেক বেশি সক্ষম এবং উপযুক্ত।

এবার একটা প্যাটার্ন ধরার চেষ্টা করা যাক। গানের জগতের Spotify, গাড়ির জগতের Uber, অথবা এরোপ্লেন বুক করার Yatra.com বা ঘুরতে গিয়ে বাড়িঘর বুক করার AirBnB – এই সমস্ত সংস্থাগুলো শুধুমাত্র একটা ব্রিজের ভূমিকা নিচ্ছে – পরিষেবা যে দেবে আর যে পাবে – তাদের মধ্যে। কিন্তু ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুজনেই এই সংস্থাগুলোকে আলাদা করে টাকা দিচ্ছে। Uber যখন আপনি চড়েন, তখন Uber একটা charge কেটে নেয় আপনার থেকে, তার নিজের জন্য। আবার Uber-চালক আপনাকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে টাকা পান, তার একটা অংশ Uber-কে দেন (আসলে procedure-টা আরো জটিল, কিন্তু মোটের উপর এটাই)। তাহলে আপনি বা গাড়ির চালক Uber-কে টাকাটা দিচ্ছেন কেন? শুধুমাত্র কোনোকালে তারা একটি Software তৈরি করেছিল বলে, মূলত তাই তো?

প্রযুক্তির বিষয়ে মূল প্রশ্নটা এখন এখানেই। প্রযুক্তি তো আমাদের নিরন্তর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির মালিকানাটা ঠিক কার হাতে? Uber, Spotify-এর Software-গুলো তৈরী করেছে আপনার-আমাদের মতোই হাজার হাজার Software Engineer-রা। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই Uber-এর আর দরকার হবে না এইসব Software Engineer-দের। কারণ তারা তো already Software-টা তৈরি করেই ফেলেছে। কিন্তু তাদের তৈরী করা এই Uber কিন্তু থেকে যাবে, আর তার মুনাফা পকেটস্থ করবে Uber-এর মালিকানা যাদের আছে, সেই গুটিকতক মানুষ।

এই নিয়ে খুব সচেতনভাবে ভাবা দরকার – প্রযুক্তির যে অসম্ভব প্রগতি আর তার যে দানগুলো আমরা সমাজে প্রকটভাবে দেখতে পাচ্ছি – সেটা আমরা কাদের হাতে ছেড়ে দেব! ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো – এ নিয়ে যাদের সব থেকে বেশি কথা বলা দরকার – সেই বামপন্থী সংগঠনগুলো এই পরিবর্তনটা ধরতেই পারেননি ঠিক করে। পরবর্তী জামানাটা যে শুধুমাত্র এক তথ্যভিত্তিক জামানা হতে চলেছে – যে ব্যাপারে তারা পুরোপুরি উদাসীন। তথ্যের মালিকানা যার, আগামী সময়টাও তারই – এই নিয়ে বেশিরভাগ বামপন্থী সংগঠনগুলো কিছু বলে না। শুধুমাত্র সামান্য কিছু প্রগতিশীল, বামপন্থী নিউজপেপার এই নিয়ে একটু লেখালিখি করে।

এই বিষয়টা গুরুত্ত্বপূর্ণ হওয়ার আর একটা বড় কারণ আছে। আমরা ভীষণ দ্রুতভাবে সেই যুগটায় যেতে চলেছি – যখন আমাদের বেশিরভাগ কাজ automated হয়ে যাবে। মনে হতে পারে এটা কোনো science fiction – কিন্তু একটু প্রযুক্তির খোঁজখবর নিলেই বুঝতে পারবেন – আর কিছুদিন পর থেকেই আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন কাজগুলো করার জন্য মানুষের সহযোগিতার আর প্রয়োজন হবেনা। কোনো artificially intelligent agent আমাদের সাহায্য করে দেবে।

ধরুন, একটা সারা দিনের কিছু কাজের কথা। সকালে উঠে আপনি ব্রেকফাস্ট করলেন, toaster-এ তৈরী করা ব্রেড আর জ্যাম দিয়ে। এর পর আপনি স্নানে যাওয়ার সময় Alexa (Amazon-এর voice assistant)-কে বলে দিলেন ১৫ মিনিট পরে একটা Uber ডেকে দিতে। Uber একটা driverless car পাঠিয়ে দিল (যা এখন ক্যালিফোর্নিয়া আর পিটসবার্গে already রাস্তায় commercially চলছে). আপনি অফিসে এসে দেখলেন computer আপনার সব কাজ এগিয়ে রেখেছে, আপনি শুধু একটু approve করে দিলেন কাজগুলো। তারপর আপনি ভাবতে শুরু করলেন যে নতুন, innovative আর কি করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে বাড়ি ফেরার সময় এলো। আপনি অফিসে রাখা Alexa-কে বললেন বাড়ি ফেরার রাস্তায় Amazon Store-এ আপনার জন্য ১ কেজি চিকেন রেডি রাখতে। Amazon তার Robot দিয়ে সেটা রেডি রাখলো। আপনি চালকবিহীন Uber-করে বাড়ি ফেরার সময় Amazon Store থেকে টুক করে চিকেন তুলে আনলেন। বাড়ি এসে আপনার জামাকাপড় ধোওয়া এবং শুকোনোর জন্য Washing Machine-এ দিয়ে দিলেন। তারপর মুরগির মাংস দিয়ে জমিয়ে ডিনার সারলেন। এরপর ঘুমোতে যাওয়ার সময় Google Assistant-কে বললেন আপনার মোবাইলে সকাল ৭টার আল্যার্ম দিতে। খুব অকল্পনীয় ঘটনা কিন্তু নয়, কারণ প্রায় প্রত্যেকটা product মার্কেটে already পাওয়া যাচ্ছে।

এই artificial intelligence-কে যদি আমরা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে মুনাফাটাও ক্রমশ জড়ো হবে সেই লোকগুলোর সিন্দুকেই। গরিব আর ধনীর মধ্যে তফাৎ যেভাবে এখন অশ্লীলভাবে বেড়ে চলেছে – এটা থামানো সম্ভব হবে না।তাই সমাজের শিক্ষিত অংশ – মানে যারা এই প্রযুক্তির সুফলটা প্রথমেই পাচ্ছে আর যাদের আমার এই লেখাটা পড়ার সম্ভাবনা আছে – তাদের ভাবা দরকার প্রযুক্তিটা কাদের দখলে থাকা উচিত? যারা Software-গুলো তৈরী করছেন, সেই সকল মানুষ এবং জনগণের? নাকি কিছুসংখ্যক ভাগ্যবান লোকের দখলে? যারা প্রযুক্তিটাকে টাকা ছাপাবার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করবে? ভাবনার দায়িত্ব আমাদের সকলের।