Showing posts with label art_notes. Show all posts
Showing posts with label art_notes. Show all posts

Friday, May 08, 2020

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৫

জানালা দিয়ে তাকালে এখন নীল আকাশে পেঁজা তুলো দেখা যাচ্ছে, রোদ ঝকঝকে চারপাশে বাংলার শরতের ছায়া। তবে বাইরে বেরোনো গেলে কম তাপমাত্রা আর আরামদায়ক ঠান্ডা বাতাস পেতাম। কিন্তু বাইরে বেরোনোর উপায় না থাকায়, বড় জানলাটা দিয়ে মেঘগুলোর দিকে তাকিয়ে সময় কাটানো যায়, তখন রোদ্দুর আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে গায়ে। মানুষের ছোঁয়া বহুদিন পাওয়া হয়ে ওঠে না। অন্য কারোর সরাসরি দৃষ্টিও আমার ওপর পড়েনি বহুদিন, তাই ভাবি, মেঘগুলোই বিভিন্ন রূপ নিয়ে আমাকে দেখে উধাও হয়ে যায়। ওরা কি বলতে চাইছে বুঝতে পারিনা, ভীষণ রকম নীরব। ওদের গতিও ভীষণ মন্থর। আমিও নীরব চোখে চেয়ে থাকি, নীরবতার ভাষায় আমরা কথা বলি। এটা হয়তো কোনো ক্রিয়েটিভ প্রসেস নয়, কিন্তু আমাদের এই যোগাযোগে সৃজন আছে, বহুদূরের বন্ধন তৈরী করা আছে। এই মেঘটাই তো উড়ে উড়ে অন্য কোনো মানুষকেও আমার সাথে বেঁধে ফেলছে। এই সৃষ্টিতে, এই বন্ধনে, এই কথোপকথনে কোনো ব্যাকরণ নেই, কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। 

অথচ চারিদিকের শিল্পে শুধুই যেন প্রাতিষ্ঠানিকতা, মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত লাগে। শিল্প বিষয়টার মধ্যে যে স্বতঃস্ফূর্ততা, কোথায় যেন তা ভীষণরকম ভাবে হাঁসফাঁস করতে থাকে। কিছুদিন আগের সত্যজিৎ-এর জন্মদিন উদযাপনে আর তারপরের রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপনে বারবার সেই প্রাতিষ্ঠানিকতার আড়ম্বর। প্রাতিষ্ঠানিকতা শব্দতে স্বততঃই একটা নেতিবাচক ধারণা আছে। কিন্তু একটা প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু সংখ্যক সমমনস্ক মানুষকে কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দেয়। সেটা শুধু যে সেই মানুষদের মধ্যে অন্তরঙ্গতা তৈরী করে তা নয়, সেটা একটা শিল্পচর্চার প্ল্যাটফর্ম তৈরী করে, একটা ফ্রেমওয়ার্ক তৈরী হয়। কিন্তু সমস্যার শুরুও হয় ঠিক সেখান থেকেই। 

সেই ফ্রেমওয়ার্ক এবং প্ল্যাটফর্মের অনুরাগীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রতি বেশি যত্নবান হতে গিয়ে রক্ষণশীল হয়ে পড়েন। তার থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আত্মম্ভরিতা, এলিটিসম এবং কোথাও গিয়ে এনটাইটেলমেন্ট। শিল্প তার বিবর্তনের স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে, বিবর্তনের শিল্পীদের একঘরে করে দেওয়া হয়, জর্জ বিশ্বাসের "ব্রাত্যজনের রুদ্ধসঙ্গীত" লিখতে হয়। যে কোন প্রতিষ্ঠানের যে প্রকৃত ভালো দিকগুলো, যার কারণে কোনো প্রতিষ্ঠান "প্রতিষ্ঠান" হয়ে ওঠে, তা কোথায় যেন হারিয়ে যেতে থাকে। আমরা ভুলে যেতে থাকি, আসলে এসব প্রতিষ্ঠান তো স্রেফ একেকটা "tag", এর থেকে বেশি তো কিছু নয়। কোনো "জাতে" ওঠার একটা রাস্তা মাত্র। আসল বিষয়টা হল তো সৃষ্টিটা, তার ভালো-খারাপ দুইই থাকে। প্রাতিষ্ঠানিকতা তার বিশালত্বের নেশায় খারাপ দিকগুলো ছুঁড়ে ফেলতে থাকে বিস্মৃতিতে, পড়ে থাকে শুধু একটা ঝাঁ-চকচকে bubble। 

শুধু শিল্পে তো নয়, এই প্রতিষ্ঠানের আমদানি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, স্কুল-কলেজ-অফিস। অথচ আমরা যদি পারতাম নিজেদের গর্বটাকে একটু সরিয়ে রাখতে, তাহলে প্রতিষ্ঠান শুধুই অন্তরঙ্গতার জায়গা থাকতে পারতো। কোনো প্রতিষ্ঠানই নিজের চারিধারে অহং-এর বেড়াজাল তৈরী করতে পারতো না। শিল্পের ক্ষেত্রে বিশেষ করে তা তৈরী করতো স্বচ্ছ নদীর মতো বহমানতা। সেই নদীতে সাদা মেঘের ছায়া পড়তো, যে মেঘেরা নতুন রূপে উড়ে যেত নতুন নতুন মানুষের কাছে, অদৃশ্য বন্ধনে আমরা নিজেদের বেঁধে নিতাম।

Monday, April 20, 2020

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৪ | Notes on Arts - 4

শিল্পের উৎস নিয়ে ভাবনার কথা হয়েছিল। সেই উৎস বা অনুপ্রেরণায়, শিল্পকে প্রাথমিকভাবে মানুষের অনুভূতির প্রকাশ হিসেবেই দেখা যায়। এই ফর্মে শিল্প বাস্তবতা, সমাজ, সময় কোনোকিছুকেই তোয়াক্কা না করতে পারে। অথচ এই সমাজ ও সময়েই তো শিল্পের অবস্থান, তাই তাদের প্রভাব শিল্পের ওপর পড়েই। এবং বিপরীতে সমাজ ও সময়কে শিল্পের পরোক্ষে কিছু ফিরিয়ে দেওয়া থাকে, কিছুটা প্রভাবিত করা থাকে। এই ধরনের এক দেওয়া-নেওয়ার মধ্যে দিয়ে শিল্প, সমাজ ও সময়ের একটা সিম্বায়োটিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

খুব ইন্টারেস্টিংলি, সমাজের ঐতিহাসিক যাত্রা যখন প্রগতির দিকে, শিল্পের একটা বড় অংশ সমাজ এবং সময়ের অন্ধকার দিকগুলোর ওপর ফোকাস করে। এটা হয়তো causation, correlation নয়। হয়তো সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশগুলোর বেদনাদায়ক বিবরণী আমাদের সেই খারাপ দিকগুলো সম্পর্কে বেশি করে অবহিত করে রাখতে চায়। আমাদের মনে সচেতনতা, সতর্কতা যোগায়, সাবধানবাণী দিয়ে যায়। শিল্প যেন প্রানবন্তভাবে বুঝিয়ে দিতে চায় সমাজের সেই দুরুহ অবস্থার তীব্রতা ঠিক কতটা। যাতে সমাজ সেই অন্ধকার সময়গুলোতে ফিরে না গিয়ে উজ্জ্বলতার দিকে যাত্রা করে, প্রগতিশীল হয়।

কিন্তু দুঃখ দুর্দশা তো আমাদের মনে হতাশা, সংশয়, ভয় ডেকে এনে। এরকম কঠিন সময়ে, শিল্প কি বিলাসিতা নয়! এখানে মূলত দুটো যুক্তি পাচ্ছি। প্রথমত, শিল্পীর অর্থনৈতিক অবস্থান বা শ্রেণী। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দুর্দশার প্রাথমিক আঁচ থেকে শিল্পীরা একটা দূরত্বে থেকে শুধুমাত্র পর্যবেক্ষণ করে তাঁদের শিল্পরচনা করে থাকেন। এখানে আমরা সত্যজিৎ থেকে সলিল চৌধুরী, অনেককেই পাবো, যারা প্রধানত মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ। দ্বিতীয়ত, শিল্পীর দুরবস্থাই কখনো কখনো শিল্প হয়ে কথা বলে। সেখানে দুর্দশাটার সরাসরি প্রকাশ হয় শিল্পে। এবং অনেক সময় তা শিল্পের সাধারণ পরিশীলন, আঙ্গিককে ভেঙে দেয়। যেমন আমরা ঋত্বিক ঘটকের ভারতভাগ নিয়ে সিনেমাগুলোতে ধারাবাহিক ভাবে দেখি।

এই দুটো যুক্তি ছাড়াও একটি তৃতীয় বক্তব্য রাখা যায়। যে কোন কঠিন সময়েরই একটা প্রাথমিক অভিঘাত থাকে। অযাচিত বা অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা ঘটে যাওয়ার দরুন, মানুষের বিচলিত হয়ে পড়াটাই স্বাভাবিক। যেমন কাছের কোন মানুষের মৃত্যু বা এমনকি এই অকস্মাৎ করোনাভাইরাস নামক মহামারী নেমে আসা। ঘটনার প্রাথমিক চমক কেটে যাওয়ার পরই হয়ত আমরা মানসিকভাবে এমন এক জায়গায় আসতে পারি, যেখানে নতুন শিল্প তৈরী হতে পারে।
(চলবে)

Thursday, August 22, 2019

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ৩ | Notes on Arts - 3

ক্লাসিকাল ইকোনোমিক্স তত্ত্বে শিল্প একটি কমোডিটি ছাড়া আর কিছু নয়। কিন্তু আদপে শিল্প তো শুধু তাই হতে পারেনা, শিল্পের একটা দ্রব্য ধর্ম ছাড়া তাতে পুঞ্জীভূত থাকছে আমাদের অনুভূতি, অভিজ্ঞতা জাতীয় আপাতভাবে বায়বীয় কিছু বস্তু। আবার আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা শিল্পকে আহরণ করতে পারারও উপযোগী করে তুলছে। তাই শিল্প শুধু সৃষ্টিকর্তার হয়ে থাকছে না, তা দর্শক, শ্রোতা বা পাঠকের হয়ে উঠছে। মানে শিল্প সৃষ্টির বিপরীত প্রান্তে যারা শিল্পকে ভোগ করছে, শিল্প তাদের মাধ্যমে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সেদিক থেকে দেখলে ক্লাসিকাল ইকোনমিক্সের তত্ত্ব ভুল কিছু নয় - শিল্পের একটা উৎপাদন (production) এবং ব্যবহার (consumption) আছে। এই অর্থনীতিকে ভিত্তি করে ভাবতে শুরু করলে আমরা শিল্পের সামাজিক বাস্তবতার আলোচনায় ঢুকে পড়তে পারি - যেটা আপাতত করতে চাইছি না। আমরা শিল্পের বিমূর্ত দিকটার গভীরে ঢুকবো।

শিল্পের এই যে দ্বিমাত্রিক ক্ষমতা - উৎপাদন এবং আহরণ - মানবপ্রজাতির এক স্বতন্ত্র উদ্ভাবন। দুটো কাজেই মানুষ কিছু আনন্দ, দুঃখ বা অন্য অনুভূতি পেয়ে থাকে। সুতরাং, শিল্পের দু' প্রান্তেই মানুষের কিছু পাওয়ার আছে। অবশ্য সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে শিল্পীর তার শিল্পের ব্যবহার সম্পর্কে ভাবিত থাকার কোনো কারণ নেই। কিন্তু শিল্পের এই যে বহুমাত্রিক ভূমিকা, তা মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণী বিকশিত করতে পেরেছে কি না, সে আমার জানা নেই। মানুষের চিন্তা এবং বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা শিল্পকে মানুষের জীবনে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। সাথে বিজ্ঞানের অগ্রগতি নতুন ধরণের শিল্পমাধ্যম তৈরী করছে - যেমন সিনেমা, ফটোগ্রাফি, ইত্যাদি। 

আবার বিজ্ঞানের এই প্রগতির মাধ্যমেই এখন আমরা আমাদের এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা অনু-পরমাণুর মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছি। যেখানে বহু ইলেকট্রন দৌড়াদৌড়ি করে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে বিশ্লেষণের ক্ষমতা পাচ্ছে। যদিও এই প্রযুক্তি এখনও শিশুসুলভ, কিন্তু আমরা সহজেই মেশিনপ্রদত্ত গভীর বিশ্লেষণের অনুমান করতে পারছি। এই ধরনের সন্ধিক্ষণে আমি মানবসৃষ্ট শিল্পের আরো গোড়ায়, আরো ফান্ডামেন্টাল-এ ঢুকতে চাইছি। আমি খুঁজে পেতে চাইছি সেই শিল্পমাধ্যমকে যার জন্য মানুষ শুধু নিজেই মাধ্যম, তার আর অন্য কোন মাধ্যম লাগছে না। মানে ধরা যাক, আঁকতে গেলে লাগছে কাগজ, পাথর, রং, তুলি বা পেন্সিল; সাহিত্যে কালি ও কাগজ। সিনেমা বানাতে ক্যামেরা। কিন্তু এমন কোন শিল্প তো আছে, যেখানে মানুষ আর প্রকৃতিপ্রদত্ত শক্তিই শিল্প তৈরী করছে। 

এখানে আমরা একাধারে পাচ্ছি গানকে। এখানে সংগীতের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে শব্দ নামক শক্তি, যা রূপান্তরিত হচ্ছে অন্য কোনো শক্তি থেকে। এই শব্দশক্তিই অন্য মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে শিল্প হয়ে এবং মানুষ তা আহরণ করছে। সংগীতের বিমূর্ততা গানের মাধ্যমে এভাবেই মানুষের কাছে  ভীষণ বাস্তব হয়ে উঠছে, খুব গভীরে থেকে। 

অন্যপাশে আমরা পাচ্ছি নাচকে - যার মাধ্যম মূলত মানুষের পার্থিব অবস্থান ও রূপ এবং আলোকশক্তি। আলোর মাধ্যমে নাচ পৌঁছে যাচ্ছে অন্য মানুষের উপলব্ধিতে। সুতরাং গান এবং নাচকে আমরা শিল্পের একদম ফান্ডামেন্টালে পেয়ে যাচ্ছি। এছাড়া অন্য কিছু আছে কিনা, আপাতত মনে পড়ছে না। তবে গানের সাথে মানুষের এই যে আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক যোগ - এটা নিজে যেমন অনুভব করেছি, তেমনি এটাও বুঝতে পারছি যে গান এভাবেই ভীষণ বিমূর্ত হয়েও মানবসত্ত্বার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। নাচ ছাড়া, গান শিল্পমাধ্যমগুলোর মধ্যে একটা স্বকীয় জায়গা করে নিচ্ছে - এভাবে আমি আমার সংগীতপ্রীতির একটা ব্যাখ্যা তৈরী করছি।

Thursday, August 30, 2018

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ২ | Notes on Arts - 2

আগের নোটে শিল্পের ক্লাসিকাল এবং মর্ডান ধারার মধ্যে একটা মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে, শিল্পের বিষয়বস্তু বোধগম্য না হওয়ার একটা কথা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। সেটা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

শিল্পকে বুঝতে পারার জন্য যেমন নমনীয়, অনুভূতিপ্রবণ একটা মনন দরকার হয়, তেমনি একটা বিশ্লেষণী ক্ষমতাও লাগে। তবে সেই বিশ্লেষণী ক্ষমতার কথা বেশি করে ভাবলে শিল্প আর শুধু অরগ্যানিক একটা বস্তু থাকে না, যার সৃষ্টি নাকি কোনো এক অদৃশ্য শক্তি, ক্ষমতা বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা শিল্পকে কিছুটা যান্ত্রিক বা মেকানিকাল করে ফেলে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

কোনো "ভালো" গানের কথা ধরা যাক, যেমন অঞ্জন দত্তের "বেলা বোস" বা ক্যাকটাসের "হলুদ পাখি"। আমরা যদি ভেবে নিই, এই গানগুলোর সুর তৈরি হয়েছে শুধুমাত্রই অনুভূতি দিয়ে, মানে অঞ্জনবাবু কোন মনখারাপের বিকেলে "বেলা বোস"-এর কথার সাথে সুর তৈরি করেছেন, তাহলে হয়ত শিল্পের একটা আলাদা বায়বীয়তা, মাধুর্য, স্বর্গীয় ভাব তৈরি হয়। কিন্তু আমরা একটু গভীরে গিয়ে দেখবো যে, এই দুটো গানেই শুধুমাত্র ডি মেজর key-এর বিভিন্ন কর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। হয়তো অঞ্জনবাবু বা ক্যাকটাসের মনে মনে হৃদয় থেকেই ডি মেজরের কর্ড গুলোই এসেছে। কিন্তু আমাদের এটাও দেখতে হবে যে, এরকম একটি স্কেলের মেজর কর্ড গুলো মানুষের কানেও শ্রুতিমধুর হিসেবে শোনায়। সেই সূত্র ধরেই এনারা পুরো গানের সুরটাকে বেঁধে ফেলেছেন।

এভাবে শিল্পের বিশ্লেষণ করতে বসলে দেখা যায়, প্রত্যেক শিল্পেরই কিছু ব্যাকরণ আছে। গানের যেমন major বা minor key-এর কর্ডস। এই ব্যাকরণ দিয়েই প্রত্যেক শিল্পের আলাদা কিছু ভাষা তৈরি হয়। যখন কোনো শিল্পী সেই ভাষায় কথা বলে কোনো শিল্প সৃষ্টি করছেন, তখন আমাদের কাছে তা ভীষণ ভালোলাগার এনে দিচ্ছে, যদি আমরা সেই ভাষা বুঝতে পারি। কিন্তু যখন আমরা সে ভাষা বুঝতে পারছিনা, তখন সেই শিল্পকে আমাদের গ্রহণ করতে সমস্যা হচ্ছে। সে জন্য পন্ডিত আমীর খাঁ-এর "সাহানা" রাগ আমাদের কারো কারো কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ওই রাগের যে ভাষা, তার স্বাদ বুঝতে পেরে তার শিল্পরসে ভেসে যাচ্ছেন।

শিল্পের এই ভাষা শেখানোর জন্যই আজকাল বিভিন্ন আর্ট স্কুলগুলো তৈরি হয়েছে। এই স্কুলগুলিতে প্রচলিত শিল্প-ভাষাগুলি শেখানো হয়ে থাকে। তাই কেউ যদি কোনো শিল্পের সম্পূর্ণ মাদকতা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে সে এই আর্ট স্কুলগুলোর শরণাপন্ন হতে পারে, অথবা নিজে থেকে সেইসব ভাষাকে রপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে প্রচলিত ভাষা যেমন আছে, তেমনি সেই ভাষাকে ভেঙে দেওয়াও আছে।

আমরা যদি সত্যজিত কে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো, সিনেমার ভাষা মেনে নিয়ে তিনি অকল্পনীয় কিছু সিনেমা তৈরি করে গেছেন। তার সিনেমাগুলো তখনকার ওয়েস্টার্ন ফিল্মের যে ভাষা, তার সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ। সত্যজিৎ নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে তার এই ওয়েস্টার্ন ফিল্মের অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন। বিপরীত দিকে আছেন ঋত্বিক। তিনি সিনেমার সব প্রচলিত নমনীয় ভাষা, ন্যারেটিভ ভেঙে দিচ্ছেন। ফলত প্রথমে মানুষ সেই ভাষাকে নিতে পারছেনা। কারণ একটা নতুন ভাষা বুঝতে পারা তো বেশিরভাগ জনগণের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা ঋত্বিক-এর বেশিরভাগ ফিল্মকে পছন্দ করেছেন না। কিন্তু "যুক্তি তক্ক গপ্প" একটা ল্যান্ডমার্ক ফিল্ম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, আর এ জন্যই ঋত্বিক এর ছবিগুলোকে এখন বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়ে থাকে। যাতে শিক্ষার্থীরা এই ভাষা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।

এর পরে প্রশ্ন আসতে পারে, শিল্পীরা তাদের শিল্পের উৎস ঠিক কোথা থেকে পেয়ে থাকেন। যে কোনো শিল্পের উৎকর্ষতা তো সেই শিল্পের সততা আর তার ভাষার উপর নির্ভর করলো। কিন্তু সেই উৎকর্ষ শিল্পের অনুপ্রেরণা কোথায়? এ নিয়ে পরের নোটে ভাবার চেষ্টা করবো।
(চলবে)

Sunday, August 19, 2018

শিল্পের আধুনিকতা নিয়ে নোটস - ১ | Notes on Modernity of Arts - 1

ভাবনাগুলোকে অক্ষরে চালান করতে করতে বুঝতে পারছি এগুলো মূলত নোটস। সেরকমই শিল্প আর তার আধুনিকতা নিয়ে বহুদিন ধরেই মনের মধ্যে ভাবনার অযাচিত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। তা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে বেশ ক্লান্ত। এ নিয়ে বেশ কয়েকজনের সাথে অনেক বার আলোচনাও হয়েছে। এবার বোধ হোয় এই ভার নামিয়ে রাখার সময় হয়েছে, সুতরাং লিখন।

শিল্পকে এক হাজার ফুট উঁচু থেকে মূলত দুই ধারায় ভাগ করে নেওয়া যায় - ক্লাসিকাল আর মডার্ন। ক্লাসিকাল এর কথায় পরে আসছি। আধুনিক এর কথা দিয়ে শুরু করি, খুব সাবজেক্টিভ একটা ব্যাপার। বাংলা গানের আধুনিকতা নিয়ে লেখাটায় বলেছিলাম যে, সমসাময়িকতা আমার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা বয়ে আনে। তাই সলিল চৌধুরী যখন কৃষকদের জমির অধিকারে স্বাধীনতার পরেই "হেই সামালো ধান" লিখছেন, আমার কাছে উনি ভীষণ আধুনিক হওয়ে উঠছেন। বব ডিলান যখন বিশ্বের নাগরিক অধিকারের জন্য, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লিখছেন, "টাইমস দে আর চেঞ্জিং", তিনি আমার কাছে ভীষণ পরিমাণে "আধুনিক"। আমি প্রধানত আধুনিক শিল্পকেই ভালোবাসি। ক্লাসিকাল এর প্রতি আমার তেমন আসক্তি নেই।

ক্লাসিকালকে এ হেন বুড়ো আঙুল যখন দেখাচ্ছি, তখন তার পিছনে অনেকগুলো কারণও আছে। নিখিল ব্যানার্জী যখন "মেঘ" রাগে পরিবেশমন্ডলীতে গভীর নিম্নচাপ তৈরি করেছেন, আমি আধঘন্টার জন্য সেই আবহাওয়াতে মিশে যাচ্ছি বটে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না, কি হচ্ছে! উনি যে কোথা দিয়ে আমাকে নিয়ে চলেছেন, সেই রাস্তাই চিনতে পারছি না। এই যে বিমূর্ততা, এটাই তো ক্লাসিকাল শিল্পের প্রাণ ভোমরা। এই বিমূর্ততা কে আমি ধরতেই পারছিনা, আমার অপারগতা। তাই ক্লাসিকাল শিল্পকে আমি আমার শিল্প বলে ভাবছিনা। ঠিক পছন্দ করতে পারছিনা।

এসব বলার পরে, জর্জ বিশ্বাস যখন "আকাশভরা" শুরু করছেন তখন তো আমি মহাবিশ্বের সাথে নিজেকে আর আলাদা করতে পারছিনা। তখন আমি, রবীন্দ্রনাথ, জর্জদা - একসাথে বসে আছি আমরা। সকলে মিলে পথের পাঁচালী দেখছি। যা কিনা আদ্যন্ত একটি ক্লাসিকাল ছবি, অন্তত আগে বলা আধুনিকতার সংজ্ঞা অনুযায়ী। তাহলে আধুনিকতার একটা নতুন সংজ্ঞা বানাতে হয়, কারণ শুধু সমসাময়িকতা দিয়ে আধুনিকতাকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। এই নতুন সংজ্ঞায় নিয়ে আসতে হচ্ছে "খোঁজ"।

চন্দ্রিলবাবুর বক্তব্যকে একটু বিস্তৃত করে বলা যায়, যে শিল্পের মধ্যে এক নিরন্তর সন্ধান চলেছে, সেই শিল্পই আধুনিক। সে খোঁজ নিজেকে চিনতে পারার হতে পারে, বা শিল্পকে উত্তরণের হতে পারে অথবা কোনো এক বিমূর্ত খোঁজ, যা কিনা আসলে সন্ধান পাবার পরও বিমূর্ত থাকবে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্লাসিকাল শিল্পভাবনা এক চূড়ান্ত আধুনিকতায় পরিবর্তিত।

পন্ডিত আমীর খান "বসন্ত" রাগে যখন বিস্তার করছেন, তখন তো মনে হচ্ছে উনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই সর্বশেষ অনুভূতিকে যা বসন্তকে বয়ে আনবে। যে বসন্তের ছায়াছবি তাঁর মনে, হৃদয়ে, মস্তিষ্কে খেলা করছে, সেটাকেই সুরের মধ্যে প্রকাশের এক সর্বোত্তম চেষ্টা। সেই আল্টিমেট অনুভূতিকে নিরন্তর রূপ দেওয়ার চেষ্টাই সার্থক করে তুলছে ক্লাসিক্যাল শিল্পকে। কিন্তু কোনো শিল্পই তো সার্থক নয় এই সন্ধানটুকু ছাড়া। সত্যজিৎ- এর অন্যতম "আধুনিক" কীর্তি, প্রতিদ্বন্দ্বীর শেষ দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। সেই ছোটবেলার নাম-না-জানা পাখির ডাকটা। সেটারই তো খোঁজ সারা ছবিটা জুড়ে। ওই মিষ্টি ডাকটা, ওই সরল ডাকটা, যেটার মধ্যে লুকিয়ে আছে সব অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান। সেটার সন্ধানেই তো কি ভীষণ আধুনিকতা সত্যজিৎ-এ।

এই পর্যন্ত এসে ক্লাসিকাল আর আধুনিক সম্পূর্ণ মিলিয়ে মিশিয়ে ফেলেছি। নবারুণ এর ছোট গল্প কিস্যু বুঝতে পারছিনা। অথচ মানুষটি কি ভীষণ "আধুনিক"। ওনার কবিতা দিয়েই তো আশা নিয়ে বাঁচছি, চেষ্টা করছি, যেন "একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে" পড়ে, হোক সারা সহর উথাল পাথাল। আধুনিকতা তছনছ করে দিক চারপাশের এই মেকী পরিপাট্য। এবং তার পরেই হয়ত একটা নতুন সূর্য উঠবে, "লাল সূর্য" পূর্ব দিকে। সব কিছু তখন কোমলতায় ভরে গেছে। পন্ডিত আলী আকবর খাঁ তখন ভৈরবী বাজাচ্ছেন। রাগেদের সাথে নাকি অনেকটা সময় কাটাতে হয়, তবেই নাকি তাদের বোঝা যায়। আমিও হয়ত একটু একটু করে বেশি সময় কাটিয়ে, রাগসহ অন্যান্য ক্লাসিকাল শিল্পের বিমূর্ততা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করবো। যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্বের সাথেই সহাবস্থান করবে পরিতৃপ্তি বা রেসোলিউশন।
(চলবে)