Showing posts with label probondho. Show all posts
Showing posts with label probondho. Show all posts

Sunday, September 08, 2024

বাঙালি মধ্যবিত্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া | The Funeral of Bengali Middle Class

কয়েক মাস আগে পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী একটি অসম্ভব ভালো KCC Baithakkhana-র বক্তৃতায় বাঙালি মধ্যবিত্তের একটা আধুনিক শ্রেণীবিন্যাস করেছেন। তাঁর বক্তব্যের বিষয়কে আরেকটু বিস্তার করলে পশ্চিমবঙ্গের এখনকার দুরবস্থা ও ভয়াবহ ভবিষ্যৎকে খানিকটা দেখা যায়। শ্রেণীচরিত্র অনুযায়ী বাঙালি মধ্যবিত্ত বেশ ছোট একটি সমষ্টি হলেও, বাংলার শিল্প, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তাঁদের প্রভাব এবং দখলদারি অনস্বীকার্য। অথচ এখন যে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীটি পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করে, তাঁরা যে সবদিক থেকে বেশ কোণঠাসা সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।


একদিকে, গত ১০-১২ বছর ধরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা বড় অংশ চাকরির তেমন কোনো সুযোগ পশ্চিমবঙ্গে পায় না। প্রাইভেট সেক্টরের অনুপস্থিতি এবং সরকারি চাকরিতে ঘুষ-সর্বস্ব পরিস্থিতি মধ্যবিত্তের জন্য কিছু রাখেনি। তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে তাঁরা জীবন-জীবিকার জন্য পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে ক্রমাগত বাইরে পাঠিয়েছে। অন্যদিকে, বাংলা মৌলিক গানের যে পরিসর এমনকি আগের দশকের প্রথমার্ধেও ছিল, তা বিলুপ্তপ্রায়। শুধুমাত্র বাংলা ছায়াছবির গানেই বাংলা সঙ্গীত ও বাণিজ্য সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এছাড়া বাংলা সিনেমার কথা যত না বলা যায়, ততই ভালো। কয়েকটি ভালো সিনেমা ছাড়া বাণিজ্যিকভাবে সফল অথবা বুদ্ধিদীপ্ত সিনেমা বাংলায় দেখা যায়না। 

মধ্যবিত্ত বাঙালির অন্যতম ইন্টারেস্টের জায়গা ছিল পলিটিক্স। মধ্যবিত্তের একটা বিশ্বাস অন্তত ছিল যে, তাঁদের মানসিকতা দিয়ে বাংলার রাজনীতির বিন্যাস হয়। সিপিএম-এর আপাত মধ্যবিত্তপ্রীতি, ভদ্রতার আভরণ, জ্যোতি বসু ও বুদ্ধদেববাবুর পরিশিলীত ভাষ্য - এসব কিছুই বাঙালি মধ্যবিত্তকে মনে করাতো যে রাজনীতির জল যতই ঘোলা হোক, তাঁদের একটা নিয়ন্ত্রণ এবং বক্তব্য আছে এই রাজনীতিতে। তৃণমূলের জামানায় সেই মধ্যবিত্তই আস্তে আস্তে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ হারাতে দেখেছে, দেখেছে কিভাবে গুন্ডামি ও দুর্নীতিই হয়ে উঠেছে রাজনীতির প্রধান উদ্দেশ্য। আজকের রাজনীতি ও মুখ্যমন্ত্রীর সাথে তাঁদের যে কোনো যোগাযোগই নেই, তাঁরা তা বিলক্ষণ জানে। সবসময় হয়তো মুখ ফুটে বলে উঠতে পারেনা রাজনীতিরই বাধ্যবাধকতায়, কিন্তু তাঁদের নিরুপায় হাত-পা-বাঁধা অবস্থা তাঁদের নিত্যদিনের সঙ্গী।


এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, পশ্চিমবঙ্গের, এবং বিশেষত বাঙালি মধ্যবিত্তের, এই অবস্থার দায় কার। অবশ্যই তাঁদের নিজেদেরই, কিন্তু চিত্রটা আর একটু জটিল। তৃণমূলের সরকার নির্বাচিত হওয়ার পর বাঙালি মধ্যবিত্তর দায়িত্ব ছিল পরের নির্বাচনেই তাঁদের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার যে, সরকার এবং প্রশাসন কেমন চলছে, তাঁর দুর্নীতি এবং নীতির সমস্যা নিয়ে। অথচ সে তখন এতটাই ট্রমাটাইজড এবং আলসেমির ঘুম দিতে ব্যস্ত যে, সারদা-নারদার মতো কেলেঙ্কারির দিকে তাকাতে চায়নি। পরবর্তীকালে সিন্ডিকেট, সরকারি চাকরির বিক্রিবাটা, স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, পরের পর ছাত্রমৃত্যু - এসব কিছুই সে শুধুই বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির খাতিরে উপেক্ষা করে গেছে। এদিকে তৃণমূল তার নীতির ভিতকে, মানে দুর্নীতিকে, মজবুত করে গেছে। বাঙালি মধ্যবিত্তের এই রাজনৈতিক উদাসীনতা কিন্তু একটি সামান্য ভুল ভাবলে ভুল হবে, এটা তাঁর সচেতন সিদ্ধান্ত। 


তৃণমূল সরকারের প্রথম দিকেই পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ কি হতে চলেছে তার আভাস পাওয়া শুরু হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে প্রান্তিক এবং সংখ্যালঘু মানুষ তৃণমূলের দলদাসে পরিণত। মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে তখন বাংলার এই সঙ্কট অপরিষ্কার হলেও কিছুটা অনুমেয়, কিন্তু সে এই সঙ্কট নিজের মনে করে গায়ে মাখেনি। কারণ মধ্যবিত্তের একটা বড় অংশ কখনোই পশ্চিমবঙ্গের ওপর বিশেষ কোনো "বাজি" রাখেনি। ইন্দ্রনীল তাঁর বক্তৃতায় একটি অসাধারণ ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেছেন, "বাঙালির গর্ব ছিল, স্টেক ছিল না", বিশেষত মধ্যবিত্তের। আমরা একটু গভীরভাবে বাঙালির মধ্যবিত্তের দিকে দেখলে বুঝতে পারবো, তাঁদের একটা বড় অংশ কলকাতার নিজের লোক নয়, তাঁরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন। তাঁরা কলকাতাকে নিজের করে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম তাঁদের বাবা-মা-ঠাকুরদা-ঠাকুমার কাছে শুনেছেন সব কিছু ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে আসার কাহিনী। ফলে তাঁদের কাছে আরো একটি জায়গায় রিলোকেট করে যাওয়ার চিত্র অপরিচিত নয়। তাই অশনি সঙ্কেত দেখে, এই দলের মধ্যবিত্ত বাঙালির (যাদের বাঙাল বলা হয়) কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে যেতে নস্টালজিয়া আর দুঃখ হয় ঠিকই, কিন্তু সময়ের দাবিতে তারা সেটা করতে প্রস্তুত। এই মধ্যবিত্তের কিছু অংশ পশ্চিমবঙ্গে থাকে ঠিকই, কিন্তু তাঁরা সুযোগ পেলেই পশ্চিমবঙ্গ ছাড়বেন। কোনো বাধ্যবাধকতা আছে বলেই পশ্চিমবঙ্গে আছেন। প্রকৃতপক্ষে হাতে গোনা কিছু মধ্যবিত্ত ছাড়া প্রায় কেউ তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মকে পশ্চিমবঙ্গে কল্পনা করতে পারেন বলে মনে হয়না। 

পড়ে রইলো কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকার বাইরের মধ্যবিত্ত - এই শ্রেণী বহুকাল আগে থেকেই হয় কলকাতায় ও মধ্যপ্রাচ্যে অথবা দিল্লি ও কেরলে কাজের সূত্রে যেতে অভ্যস্ত। চাষের কাজে লভ্যাংশ কমার সময় থেকেই, মানে ভূমি সংস্কার সফলতা পাওয়ার পর পরই, এরাও যাযাবর। তাই এদেরও পশ্চিমবঙ্গের প্রতি বাজি যৎসামান্যই। আর বাঙালি শিল্পীকুলের কথা না বললেও চলে, কারণ বাঙালি শিল্পীরা মুম্বইতে বহুকাল আগে থেকেই স্বচ্ছন্দ, তাই সময় আসলে তারাও পাততাড়ি গুটোতে প্রস্তুত।


এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিও যে মধ্যবিত্ত দ্বারা নির্ধারিত নয়, সেটাই স্বাভাবিক। আর প্রান্তিক মানুষেরা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে তৃণমূল নিয়ে তিতিবিরক্ত হলেও, আর কোনো সুযোগ দেখেন না। তাঁদের বেঁচে থাকার সম্বলও তৃণমূলের লোকাল দাদাদিদিরা। যদিও পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক জীবনের প্রত্যেকটা ক্ষেত্র যে দুর্নীতির গভীর বাসা - তা সকলের জানা। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে তার বিপক্ষে বাঙালি মধ্যবিত্তের রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া বারণ - কারণ আগেই বলেছি, তাঁদের পশ্চিমবঙ্গে কোনো স্টেক নেই। তাঁরা বহুদিনই পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করেছেন, এবং যারা সশরীরেও ওখানে আছেন, তাঁদের সেটা নিজস্ব কোনো সিদ্ধান্ত নয়, তাঁরা সেটা নিজেদের অসহায় পরিণতি বলেই মনে করেন। এমতাবস্থায় কতিপয় মধ্যবিত্তের এক শেষ আর্তনাদ এই জুনিয়র ডাক্তার মৃত্যু ও "তিলোত্তমা"র আন্দোলন। এটা ঠিকই যে এই আন্দোলন সর্বাত্মক এবং বিশাল আকার ধারণ করেছে, কিন্তু এর রাজনৈতিক দিশাহীনতা বাঙালির ভীত, সন্ত্রস্ত ও বাজি-না-রাখা মনোভাবেরই বাহ্যিক রূপ। তাছাড়া প্রান্তিক মানুষ ইতিমধ্যে তৃণমূলের যে অত্যাচার দৈনন্দিন জীবনে সহ্য করেছে এবং করে চলেছে, তার তুলনায় এই মৃত্যু ও দুর্নীতি কিছুই নয়। আজকে ডাক্তারদের মতো উচ্চ শ্রেণীতে বাঘ পড়েছে বলে উপর থেকে আন্দোলনের চাপ এসেছে ঠিকই - কিন্তু সেই আন্দোলনের রাজনৈতিক কোনো ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে না। এরপর এই আন্দোলন মধ্যবিত্তের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আর শবদেহ যাত্রায় পরিণত হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। এরকম পরিণতিতে যদি মনখারাপ করে, তাহলে উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা বা বিহারের মতো মূলত গান-গল্প-হীন দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার আখড়ার দিকে তাকালে খানিকটা ধাতস্থ হওয়া যাবে।

Wednesday, August 09, 2023

ওপেনহাইমার নিয়ে কিছু কথা (নো স্পয়লার)

চারিদিকে খুব একটা বেশি আর কোনো কথাবার্তা নেই, "ওপেনহাইমার" রিলিজ করার পর। অভিনয়ের প্রশংসা, চিত্রায়নের মুগ্ধতা, বিশাল স্ক্রিনের চমক - ছবির মূলত এই বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বেশ অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া চোখে পড়েছে। কিন্তু চলচিত্রের বিষয়বস্তু নিয়ে তেমন সাড়াশব্দ নেই। আসলে নোলানের মতো এতটা মেইনস্ট্রিম, পপুলার, "অরাজনৈতিক" একজন পরিচালক এমন একটা ছবি বানিয়ে ফেলেছেন, যা দেখে অনেকেই একটু হতভম্ভ হয়ে গিয়েছেন। তার ওপর ছবিটা মূলত ওপেনহাইমার এবং অ্যাটম বম্ব নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আদপে ছবিটায় ম্যাকার্থি যুগের কলঙ্কের ঝলকই বারবার বেরিয়ে এসেছে। সেই কারণেও বোধ হয় এই আপাত নিস্তব্ধতা।

ম্যাকার্থি যুগ আমেরিকার একটা ওপেন সিক্রেট বলা যায়। অনেকেই বিষয়টা সম্পর্কে জানে, কিন্তু সেই নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায়না। আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যে লিবারাল ডেমোক্রেসি বা উদার গণতন্ত্রের পরাকাষ্ঠা হয়ে আমেরিকা নিজেকে দেখতে চেয়েছিল, তার ঠিক বিপরীতটাই ভিতরে ভিতরে ঘটেছিল। ১৯৪০ এর দশকের শেষের দিক থেকে প্রথম ১০ বছর প্রবলভাবে ম্যাকার্থি যুগের কর্মকাণ্ড চলেছিল এবং প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে এর জের ছিল, কিছুটা হালকা চালে। এই যুগের প্রধান যে বক্তব্য ছিল, তা হল যে কোনো বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষকে হেনস্থা করা। সরকারের বিভিন্ন শাখা থেকে এই স্ট্যান্ড নেওয়া হয়েছিল। এমনকি বিভিন্ন আইন পাশ করে সোশ্যালিস্ট এবং কম্যুনিস্টদের কার্যত ব্যান করা হয়েছিল, সরকারি এবং বেসরকারি সংস্থায়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেনেটর জোসেফ ম্যাকার্থির সময় থেকে এই পলিসি দ্রুতগতিতে সরকারের বিভিন্ন শাখায় ও অফিসে ছড়িয়ে পড়ে। উইকিপিডিয়াতে এই সম্পর্কে আরও খুঁটিনাটি পাবেন।

এবার এই সময়ের বড় একটা মুস্কিল ছিল এই যে, বড় বড় বিজ্ঞানী, অভিনেতা এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা সেই সময় বেশিরভাগই সমাজবাদী ভাবনাচিন্তায় প্রভাবিত ছিলেন, সে আইনস্টাইনই হোক, বা চার্লি চ্যাপলিন, বা ওপেনহাইমার। মনে রাখা দরকার, নাৎসী জার্মানি প্রথম যাদের ওপর আক্রমণ করে তারা কম্যুনিস্ট ছিলেন, ফলে ইউরোপের বড় বড় বিজ্ঞানী এবং পন্ডিতরা, যারা সমাজবাদী চিন্তাধারা নিয়ে চলতেন, তারা অনেকেই আমেরিকায় পালিয়ে আসেন। আমেরিকাও ১৯৪০ এর আগে তাঁদের সাদরে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেই আমেরিকাই পরে এই বামপন্থী মনোভাবাপন্ন মানুষদের হেনস্থা শুরু করে।

এই পুরো কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন ছিল সেই সময়। কারণ সেই সময়ে আমেরিকাতেও সমাজবাদী চিন্তাভাবনার বেশ ভালো প্রসার ছিল। ইউজিন ডেবস সোশ্যালিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে আমেরিকার রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হয়েছিলেন বেশ কয়েকবার, যদিও জিততে পারেননি একবারও, কিন্তু ওনার জনপ্রিয়তা ভালোই ছিল। ইউনিয়ন বা কর্মী সংগঠনগুলোও তখন বেশ শক্তিশালী ছিল। এমনকি আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্র্যাংকলিন রোসভেল্ট যখন নিউ ডিল প্রণয়ন করে প্রচুর সরকারি সুযোগসুবিধার ব্যবস্থা করেন, তাও সম্ভব হয়েছিল কারণ সাধারণের মধ্যে একটা প্রবল বামপন্থী ও ইউনিয়ন ধর্মী হাওয়া ছিল। তাছাড়া আমেরিকার বড় বড় কলেজগুলোতে অধ্যাপক ও ছাত্ররা মূলত বামপন্থীদের পক্ষে ছিলেন এবং বেশ খোলামেলাভাবেই তাঁদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রকাশ করতেন। ফলত এই পুরো ব্যাপারটাকে বন্ধ করার জন্য এক বড়সর কর্মকাণ্ডের দরকার ছিল, এবং সেটাই সেনেটর ম্যাকার্থি এবং পরে FBI প্রধান হুভার তদারকি করেছিলেন।

আমরা নোলানের "ওপেনহাইমার" সিনেমায় দেখতে পাচ্ছি, যে এত বড় একজন বিজ্ঞানী, যাঁকে father of atomic bomb বলা হচ্ছে, যার খ্যাতি বিশ্বজোড়া, তাঁকেও কি ধরনের হেনস্থা সহ্য করতে হচ্ছে। তাহলে এটা কল্পনা করতে কষ্ট হয় না, যে সাধারণ মানুষের মধ্যে যারা সামান্য বামপন্থী ধারণাতেও বিশ্বাস করতেন, তাঁদের সাথে কি করা হয়েছিল। প্রায় ২০-২৫ বছর ধরে চলা এই ক্রমাগত অত্যাচার, হত্যা, টর্চারের পরে এই ধরনের চিন্তা সাধারণ আমেরিকানদের মধ্যে থেকে প্রায় নির্বাসিত হয়। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্কুলগুলো থেকেও এই ধরনের পড়াশোনা সিলেবাস ও ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। আমেরিকার পপ কালচার ও সাম্প্রতিক ইতিহাসে শ্রমিকদের যে বিশাল পরিমান প্রভাব ছিল, তার কিছুই প্রায় অবশিষ্ট ছিল না এই সময়ের পরে। আমাদের অনেকেই এ বিষয়ে কিছু জানিনা, কারণ সযত্নে এই বিষয়টাকে আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে দেওয়া হয়েছে, ফুকুয়ামার ভাষায় বললে end of history ।

সবথেকে বড় পরিহাস বোধ হয় এটাই, নাৎসী জার্মানির হাত থেকে বাঁচতে যে উদার আমেরিকায় দেশবিদেশের বিজ্ঞানীরা তাদের স্বাধীন চিন্তাভাবনা করার পরিসর পাবেন ভেবেছিলেন, সেই আমেরিকাই তাঁদের ওপর গোপন আক্রমণ শানিয়েছিল। আজ বার্নি স্যান্ডার্স এর হাত ধরে গত এক দশকে যে এখানে আবার কিছুটা হলেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে সোশ্যালিজম, ম্যাকার্থি যুগের ৫০ বছর পরেও, সেটা একটা বিস্ময়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে নোলানের এই সিনেমা সত্যিই বেশ সময়োপযোগী। নোলানকে বিশেষ ধন্যবাদ যে উনি এরকম একটা বিষয় নিয়ে ছবি করেছেন, এবং উনি করেছেন বলেই কাতারে কাতারে মানুষ দেখছে। বেশ অনেকদিন টিকিট না পাওয়ার পরে শেষ অব্দি বড় স্ক্রিনে সিনেমাটা দেখে ভালো লেগেছে। কিছু কিছু অভিযোগ থাকলেও, এখন সেসবের সময় নয়। এখন সময় বুঝে নেওয়ার যে, এই মতাদর্শকে মুছে ফেলার চেষ্টা বারবার করা হলেও তাকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়, ম্যাকার্থি, হুভার বা অন্য কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়।

Sunday, February 19, 2023

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৫ (AI in the Wild)

ChatGPT সম্বন্ধে এতদিনে অনেকেই জানেন। যদিও এই সফ্টওয়্যারের পিছনে যে প্রযুক্তি রয়েছে, তার অন্দরের খবর তেমন পরিষ্কার নয়। গত কয়েক বছরের মধ্যে নিঃসন্দেহে এটি একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য technological product। ChatGPT একটি conversational robot (অথবা bot), যাকে একটি ওয়েবসাইটের (chat.openai.com) মাধ্যমে ব্যবহার করা যাচ্ছে। এই ওয়েবসাইটে একটি চ্যাটবক্সের মাধ্যমে আপনি এই bot-এর সাথে যে কোনো বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন ও একে প্রশ্ন করতে পারেন। এই bot-টির পিছনে কাজ করছে একটি Artificial Intelligence (AI) ইঞ্জিন, যা ইন্টারনেটের বিভিন্ন অন্দরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্যকে বিশ্লেষণ করে তৈরী করেছে একটি সফ্টওয়্যার মডেল। সেই মডেলটিকে ব্যবহার করে ChatGPT কথোপকথনের মতো করে উত্তর দিতে পারে আপনার যে কোনো প্রশ্নের।

ChatGPT-র সঙ্গে Google-এর মতো সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের বিস্তর পার্থক্য আছে। Google শুধুমাত্র আমাদের দেওয়া কিছু শব্দের ভিত্তিতে ইন্টারনেট থেকে কিছু প্রাসঙ্গিক ওয়েবসাইটের খোঁজ দিতে পারে। কিন্তু ChatGPT-কে আমরা কোনো প্রশ্ন করলে, সে তার সঞ্চিত তথ্যকে বিশ্লেষণ করে একটি সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতে সক্ষম। সবথেকে চমকপ্রদ বিষয় হলো, ChatGPT-র বিশ্লেষণী ও সৃষ্টিশীল ক্ষমতার সংমিশ্রণ। মানে এটি তথ্যকে বিশ্লেষণ করে এমন অভিনব আঙ্গিকে উত্তর দিতে পারে, যে উত্তর হয়তো আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি। ফলতঃ খানিকটা একজন প্রতিক্রিয়াশীল মানুষের মতোই, ChatGPT তার সফ্টওয়্যার মডেলকে সম্বল করে নতুন বিশ্লেষণ তুলে আনতে পারে, এবং সেটা প্রায় যে কোনো বিষয়েই। Google-এর মতো সার্চ ইঞ্জিনগুলোর এই ক্ষমতা এখনো নেই। 

তবে ChatGPT-এর উত্তরকে সব বিষয়ে যে সর্বক্ষণ ভরসা করা যায়, এমন নয়। যেমন কোনো গাণিতিক প্রশ্নে এর উত্তর অনেক সময়ই ভুল হতে পারে। আবার ChatGPT-র সাথে বেশিক্ষন ধরে কথাবার্তা চালিয়ে গেলে, কিছু সময় পর থেকে সে প্রাসঙ্গিক উত্তর হয়তো নাও দিতে পারে। এতদসত্ত্বেও ChatGPT-এর মূল কার্যকারিতা একটি Knowledge Synthesis Assistant-এর মতো। মানে কোনো বিষয়ে আপনি যদি সংক্ষেপে কিছু জানতে চান, সেক্ষেত্রে ChatGPT খুবই উপকারী। যেমন ধরুন, সত্যজিৎ রায় এবং মৃনাল সেনের মধ্যে সম্পর্ক কেমন ছিল, সেই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত একটা ধারণা আপনাকে দিয়ে দিতে পারে। কিংবা মোদী সরকারের আমলে ভারতের অর্থনৈতিক হাল কেমন, সে বিষয়ে ছোট্ট একটি ধারণা দিতে পারে। এছাড়া, ChatGPT computer programming বা coding-এর জন্য ভীষণরকমভাবে উপকারী। ইন্টারনেটের বিভিন্ন কোণ ঘেঁটে, বিশ্লেষণ করে coding-এর বিষয়ে খুব প্রাসঙ্গিক উত্তর দিতে এটি সক্ষম। ChatGPT-এর মতো উন্নত একটি সফ্টওয়্যার-এর উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সাম্প্রতিক ইতিহাসের দিকে একটু চোখ ফেরানো যাক। 

গত এক দশকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স আমাদের জীবনের বিভিন্ন দিকেই ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে এক বিশেষ ধরণের অ্যালগরিদম ব্যবহার করা হয়, যাদের মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম বলা হয়ে থাকে। গুগল ফোটোস যে আমাদের পরিবার পরিজন এবং বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে সকলকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করে রাখতে পারে, তা কিন্তু হয় মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যেই। ইউটিউব খুললেই আজকাল আমরা আমাদের পছন্দমতো ভিডিও রেকমেন্ডেশন পেতে থাকি। এর পিছনেও আছে মেশিন লার্নিং। তবে মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স নিয়ে গবেষণা কিন্তু চলছে প্রায় ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তবে এক্ষেত্রে টার্নিং পয়েন্ট ২০১২ সাল।

২০১২ সালের আগে মেশিন লার্নিং নিয়ে বহু রিসার্চ ল্যাবে ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হতো ঠিকই, কিন্তু বেশিরভাগ গবেষণা শুধুই গাণিতিক কিছু তত্ত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তাদের ব্যবহারিক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যেত না। এর মূলত দুটো কারণ ছিল: data এবং computing power। আমাদের কাছে ডিজিটাল ফর্মে যথেষ্ট data ছিল না, যা মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলি কার্যকরী হওয়ার জন্য অপরিহার্য। মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদমগুলি ডেটা বা তথ্য থেকেই কোনো প্রশ্নের সমাধান অনুমান করার চেষ্টা করে, data-ই তাদের মূল চালিকাশক্তি। ২০০০ সালের কাছাকাছি সময় থেকেই digitally data ধরে রাখার কাজটা মোটামুটি জোরকদমে এগোচ্ছিল, এবং ২০১০-এর মধ্যে মেশিন লার্নিং প্রয়োগ করার জন্য বেশ ভালোরকম datasets তৈরী হয়ে গেছিল। 

কিন্তু যেদিকটায় তখনো খামতি ছিল, তা হল কম্পিউটিং পাওয়ার। মানে মেশিন লার্নিং প্রয়োগ করার জন্য যে কম্পিউটার দরকার হতো, তা সাধারণভাবে পাওয়া যেত না। এই পুরো চিত্রটা বদলে গেল ২০১২-এর সেপ্টেম্বরে। ইউনিভার্সিটি অফ টরোন্টোর তিনজন বিজ্ঞানী দেখালেন যে, মেশিন লার্নিং-এর ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত যে CPU (Central Procesing Unit) ব্যবহার করি, তা কার্যকরী নয়।। বরং যদি Graphics Processing Unit বা GPU ব্যবহার করা যায়, তাহলে মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম খুব দ্রুত কাজ করতে পারে। ইতিমধ্যে ভিডিও গেম, ভিডিও প্রসেসিং এবং সিনেমার কাজে GPU-র ব্যবহার খুবই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এরপর থেকে মেশিন লার্নিং-এও ব্যাপক হারে GPU-র ব্যবহার শুরু হয়। গবেষণাও তীব্র গতিতে এগোতে থাকে, সাথে সাথে AI-বিষয়ক পরীক্ষা-নিরিক্ষাও। গত এক দশকের ব্যাপক এবং বিবিধ AI গবেষণার অন্যতম সফল সফটওয়্যার হল ChatGPT । 

ChatGPT নিয়ে এতো উত্তেজনার কারণ হল যে, এটি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের জন্য তৈরী নয়। যেমন এটি শুধুমাত্র একটি computer programming assistant নয়, বা এটি শুধুমাত্র একটি ছবির ভিতর কি কি বস্তু আছে তা চিহ্নিত করছে না। এর আগে বিভিন্ন মেশিন লার্নিং সফ্টওয়্যার কোনো একটি নির্দিষ্ট ধরণের কাজের বিষয়ে বেশ কার্যকরী হয়েছে। কিন্তু এই আগের সফ্টওয়্যারের তুলনায় ChatGPT অনেক বেশি সাধারণ কাজ করতে পারে, কতকটা মানুষের মতোই। কোনো বিশ্লেষণ থেকে আমরা যেমন কোনো উপলব্ধিতে পৌঁছোই, সেরকম বিশ্লেষণ ও উপলব্ধির ক্ষমতাও ChatGPT-র আছে, বরং মানুষের থেকে কিছুটা বেশিই আছে। এর একটা মূল কারণ হল, বিশ্লেষণের জন্য সে আর এখন আমাদের উপর বা আমাদের দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভরশীল নয়। মনে রাখতে হবে, নতুন বিশ্লেষণের উদ্ভাবনী ক্ষমতাও আছে ChatGPT-র কাছে। সে নিজেই নতুন নতুন বিশ্লেষণ তৈরী করে সেখান থেকে নতুন উপলব্ধি করতে পারে। সেটা স্বভাবতই মানুষের উপলব্ধির গতিবেগের থেকে কয়েক গুন্ বেশি। ChatGPT-এর এই বিশ্লেষণ এবং সেখান থেকে উপলব্ধিতে উত্তরণের যে শেষ কোথায়, তা হয়তো মানুষ হিসেবে আমাদের উপলব্ধির বাইরে।

নোট: লেখক এই লেখার সময় GPU-র সর্ববৃহৎ কোম্পানি Nvidia-তে চাকরিরত

Saturday, December 31, 2022

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৪ (Mass Tech Layoff)

ভালো-মন্দ মিশিয়ে ২০২২ শেষ হল। প্রযুক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে, এবছর যেমন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রে বহু উল্লেখযোগ্য ভালো ঘটনা ঘটেছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলিতে ব্যাপক হারে কর্মী ছাঁটাইও আমরা দেখেছি। সারা বিশ্বে প্রায় ১.৫ লক্ষ লোক Tech Sector-এ চাকরি হারিয়েছেন এই বছর। এর মধ্যে প্রচুর startup দেউলিয়া হয়েছে বা বন্ধ হয়ে গেছে। এই ধরণের ব্যাপক হারে ছাঁটাই-এর পিছনের কাহিনী নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার, তাহলে প্রযুক্তির ব্যবসা ও তার কার্যপ্রক্রিয়াটা একটু হলেও পরিষ্কার হবে।

সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু করতে গেলে, COVID-19 Pandemic- কে সময়ের axis-এ রাখতেই হবে। তাই এক্ষেত্রেও ঘটনার সূত্রপাত সেই ২০২০-এর মার্চ মাসে। সেই সময় আমরা যে শুধু দীর্ঘদিনের জন্য ঘরবন্দী হয়ে পড়লাম তাই-ই নয়, প্রযুক্তির প্রতি নির্ভরতাও এক ধাক্কায় বেশ অনেকটা বেড়ে গেল। তার আগেই যদিও জীবনের প্রায় সবক'টা দিকেই সফ্টওয়্যারের প্রবেশ ঘটে গেছে। বড় শিল্পে বিদ্যুৎ যেমন অপরিহার্য, বিভিন্ন কাজের জায়গাতেও সফ্টওয়্যারের ভূমিকা ঠিক তেমনই হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কোভিডের প্রকোপের ফলে, সফ্টওয়্যারের ব্যবহার কয়েক গুন্ বেড়ে গেল। এমনকি যে কাজগুলি সফ্টওয়্যার দিয়ে করা খানিকটা কষ্টকর অথবা কিছুটা অস্বাচ্ছন্দ্যের ছিল, সেগুলিও আমরা সফ্টওয়্যার দিয়ে করতেই বাধ্য হলাম। অনলাইন মিটিং, বাড়িতে বসে অফিসের কাজ, দীর্ঘক্ষণের ভিডিও কল, এমনকি জিনিসপত্র চোখের সামনে পরখ না করেই অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার করা - এসব কিছুই আগের থেকে অনেক বেশি মানুষ দৈনন্দিনভাবে করতে শুরু করলো। কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি এতো দ্রুত সফ্টওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি কি করে এতো বিপুল পরিমান কাজের চাপ মেটাতে পারলো? সেই বিষয় নিয়ে সবার প্রথমে ভাবা যাক।

আমরা জানি যে, কোনো গাড়ি কারখানায় একদিনে কতগুলো গাড়ি তৈরী হবে, তার একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা এবং পরিমাপ থাকে। কোনো জরুরী অবস্থা তৈরী হলে, সেই সংখ্যা কিছুটা বাড়ানো যেতে পারে ঠিকই, কিন্তু রাতারাতি তাকে কয়েক গুন্ বাড়িয়ে ফেলা কষ্টকর। তেমনি যে কোনো সফ্টওয়্যারেরই সুষ্ঠুভাবে কাজ করার একটা সীমা থাকে। উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। Zoom নামটার সঙ্গে আমরা এখন সকলেই পরিচিত। সেই Zoom অ্যাপ্লিকেশনটি প্রতি মিনিটে একটি সীমিত সংখ্যক ভিডিও কল একসাথে চালিয়ে যেতে পারে। ধরা যাক, সেটা ২০ লক্ষ। এবার যদি দিনের কোনো এক সময়ে প্রতি মিনিটে ২০ লক্ষের বেশি Zoom ভিডিও কলের চেষ্টা করা হয়, তাহলে Zoom-এর সার্ভারে সমস্যা হতে পারে, এমনকি সেই সার্ভার বন্ধও হয়ে যেতে পারে। 

কোভিড-এর সময়ে বেশিরভাগ সফ্টওয়্যার কোম্পানিকেই অচকিতে আসা বিপুল কাজের চাপ সামলাতে হয়েছিল। কিছু ক্ষেত্রে তারা সফ্টওয়্যার উন্নত করেছেন, অনেক ক্ষেত্রেই নতুন ইঞ্জিনিয়ার নিয়োগ করে সফ্টওয়্যার আপগ্রেডও করেছেন। এবং এই কাজটা করতে হয়েছে খুব দ্রুত, যাতে আমাদের কোনো সমস্যা না হয়। কোভিডের সময় আমরা কিছু কিছু সফ্টওয়্যার নিয়ে সমস্যায় ভুগেছি ঠিকই, কিন্তু মোটের উপর আমাদের অসুবিধা হয়নি। অথচ ভাববার বিষয় এই যে, সফ্টওয়্যার কোম্পানিগুলি নতুন পরিকাঠামো তৈরির জন্য নতুন ইঞ্জিনিয়ার বা রিসার্চার নিয়োগ করার মূলধন পেলো কোথা থেকে, বা শুধুমাত্র পরিকাঠামো উন্নতি করার জন্যও যে মূলধন দরকার হয়, তার সংস্থানই বা হলো কোথা থেকে? এটা বুঝতে গেলে সফ্টওয়্যারের ব্যবসার দিকটা একটু বোঝা দরকার। 

আমরা হয়তো অনেকেই জানিনা, বেশিরভাগ সফ্টওয়্যার কোম্পানি কিন্তু কোনোরকম লাভের মুখ না দেখেই এগিয়ে চলে বছরের পর বছর। বরং অধিকাংশই বিপুল পরিমান ব্যবসায়িক ক্ষতি বহন করে, যাকে আমরা বলি loss-এ run করা। যেমন ধরুন, উবার (Uber)। আমরা সকলেই এদের কথা জানি, ব্যবহারও করি হরবখত, প্রত্যেকদিন। কিন্তু গত ১৩ বছর ধরে ব্যবসা চালানোর পরেও, এখনো অব্দি তারা মাত্র ১ বছরই (২০১৮) কোনো প্রফিট বা মুনাফা করতে পেরেছে। অন্যান্য বছরে তারা Billions of dollars শুধু loss করেছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে এসব কোম্পানিগুলো টিকে আছে কি করে?

এরা মূলতঃ টিকে আছে ঋণ বা ডেট (debt) নিয়ে এবং এই আশায় যে ভবিষ্যতে হয়তো কখনো তারা লাভজনক হবে। এই ধরণের কোম্পানিদের কিছু আয় থাকে ঠিকই, কিন্তু এদের খরচের পরিমান এতটাই বেশি, যে ঋণ ছাড়া এদের পক্ষে চলা অসম্ভব। কিন্তু ঋণ তো কিছু নতুন নয় - আধুনিক অর্থনীতি দাঁড়িয়েই আছে ঋণের উপর - তবে অসুবিধাটা অন্য জায়গায়। সাধারণত ঋণ বা ধার নিলে, তা সুদসমেত ফেরত দেওয়ার ব্যাপার থাকে। তবে সফ্টওয়্যার-জামানায় ব্যাপারটা বেশ অন্যরকম।

সফ্টওয়্যার-সম্পর্কিত কোম্পানিগুলি বিশ্বের প্রথমসারির এবং সবথেকে বড় কোম্পানিগুলির তালিকায় ঢুকতে শুরু করে মূলতঃ ২০১০ এর পর থেকে। তার আগে Microsoft, Intel, IBM জাতীয় কিছু প্রযুক্তি কোম্পানি থাকলেও, সফ্টওয়্যার দিয়ে বড় স্কেলে ব্যবসা শুরু হয়নি। অথচ সেই ২০১০-এর আগেই সারা বিশ্বে ঘটে গেছে ২০০৮-এর Global Financial Crisis (বা Great Recession), যা আমেরিকা-সহ সমস্ত উন্নত দেশকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দিয়েছিলো। এতো বড় মন্দা গত ৭৫ বছরে সারা বিশ্ব দেখেনি। এই ঘটনার ফলে বিশ্বের GDP এতটাই ধাক্কা খেয়েছিল, যে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিমান ব্যাপক হারে কমে যায়। Economic activity নূন্যতম স্তরে চলে যায়। যার জন্য পৃথিবীর সবক'টা উন্নত দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি তাদের সুদের হার (interest rate) শূন্য (০%) শতাংশ বা তার কাছাকাছি করে দিয়েছিল। যাতে সকলে অন্তত টাকা ধার করে ব্যবসাবৃত্তি করতে পারে এবং দেশে দেশে টাকার লেনদেন বাড়ে। 

সেই সময়ই, সফ্টওয়্যারও বিশাল আকার ধারণ করতে শুরু করে, কারণ প্রযুক্তি ততদিনে তৈরী ছিল। আর যেহেতু সুদের হার ছিল শূন্য শতাংশ, তাই ঋণ নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা ফেরত দেওয়ার কোনো ব্যাপার ছিল না। সফ্টওয়্যার ব্যবসা একেই মূলধন করে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায় বা scale করে। এছাড়া সফ্টওয়্যার ব্যবসার এক বিশেষ সুবিধা হল, সেটা একবার তৈরী হয়ে গেলে খুব দ্রুত অনেক জায়গায় বিপুল সংখ্যক ক্রেতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এবং কিছু ক্ষেত্রে তাই-ই হলো। আমেরিকার সবথেকে বড় কোম্পানিগুলোর মধ্যে তেল, ব্যাঙ্ক, বীমা - এসব সেক্টরকে পিছনে ফেলে প্রথমে চলে এলো Apple, Google, Microsoft, Amazon, Facebook-এর মতো নতুন কিছু নাম। 

২০২০-এর কোভিড লকডাউনের সময়, এসব প্রযুক্তি কোম্পানির ব্যবসা স্বাভাবিকভাবেই আরো বেড়ে গেলো। মুশকিল শুরু হল দুই বছর বাদে, ২০২২-এ। ইউক্রেনে যুদ্ধ, কোভিডজনিত supply chain-এর সমস্যা এবং চিনের লকডাউনের জন্য দ্রব্যমূল্য বাড়তে শুরু করলো। এছাড়াও গত দু'বছর ঘরবন্দি থাকায়, মানুষের খরচ করার সুযোগ ছিল কম। ফলে ২০২২-এ মানুষ বেশি হারে তাদের জমানো মূলধন খরচ করছিল। এই ধরণের বিবিধ কারণে বিশ্বের বেশিরভাগ জায়গাতেই শুরু হল মুদ্রাস্ফীতি (inflation)। দ্রব্যমূল্য যখন প্রায় ৮-৯ শতাংশ হারে বাড়তে শুরু করলো, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলো বাধ্য হল, সুদের হার শূন্য থেকে বাড়িয়ে তুলতে। বেশ অনেক বছর বাদে এই প্রথম বার সুদের হার অনেকটা বেশি বাড়তে শুরু করলো। এবং এখন ২০২২-এর ডিসেম্বরে সেই হার প্রায় ৪.৫%। 

সফ্টওয়্যার কোম্পানিগুলি তাদের জন্মলগ্ন থেকে কখনোই এইরকম বেশি সুদের হারের সময়ে ব্যবসা করেনি। তারা শুধুই ভেবেছে কি করে নতুন ব্যবহারকারীদের (user) কাছে পৌঁছনো যায়, তা সে ব্যবসায় লাভ হোক বা না হোক। তারা ভেবেছে বিশাল সংখ্যক কাস্টমারের ভিত্তি তৈরী করতে পারলে, কোনো না কোনোদিন লাভ ঠিক হবে। সেই জন্য তারা বিশাল আকার ধারণ করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ধারণা নেই, এই রকম অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলাতে কিভাবে হয়, কি রকম পরিকল্পনা করতে হয়। উপরন্তু কোভিডের জন্য অতিরিক্ত কাজ সামাল দিতে, তারা অনেক অনেক বেশি কর্মী নিয়োগ ও পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ করেছে, যা এ লেখার শুরুতেই বলা হয়েছে। এই সমস্ত কারণে, তাদের বেশিরভাগের পক্ষেই এই অতিরিক্ত খরচ চালিয়ে যাওয়া এই সময়ে আর সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে তাদের খরচ কমানোর প্রথম পদক্ষেপই হল কর্মী ছাঁটাই। 

Tech কোম্পানিগুলোর এই দিশেহারা দশার জন্য প্রথমে ভুগতে হচ্ছে সেই কর্মীদেরই। কারণ এই কোম্পানিগুলোর পাওয়ার স্ট্রাকচার সামান্য আলাদা হলেও, ম্যানেজমেন্ট স্ট্রাকচার মোটামুটি অন্য সেক্টরের কোম্পানিগুলোর মতোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। কিন্তু এখানে এ কথা উল্লেখযোগ্য যে, এর মধ্যে অনেক কোম্পানিই কর্মীদের পিঙ্ক স্লিপ দেখানোর সময়, তাদের প্রায় ৩ থেকে ৬ মাসের স্যালারি এবং অন্যান্য আরো কিছু সুযোগ-সুবিধা দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পথ বাতলেছে - এটা একটুখানি সিলভার লাইনিং। ২০২৩ হয়তো দেখাবে, সফ্টওয়্যার ব্যবসা কিভাবে বিবর্তিত হয় এই অনবরত বদলে চলা প্রযুক্তির দুনিয়ায়।

Saturday, June 26, 2021

The Lost Decade

একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকের শুরুতেই আমরা মহামারী, বেকারত্ব, বড় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো সমস্যার সম্মুখীন। আবার এর সাথে সাথেই আমরা পেয়ে যাচ্ছি মহামারীর প্রতিষেধক ভ্যাকসিন, যা বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলেই এতো দ্রুত সম্ভব হচ্ছে। সাথে ট্রাম্পের পরাজয় এই নতুন দশকের শুভ সূচনা। ভালো-খারাপের এরকম আলো-আঁধারিতে আমাদের নতুন দশকে এগিয়ে চলা। আমেরিকার রাজনীতিতে আগামী দশক, বোধ হয়, আধুনিক ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই একই কথা ভেবেছিলেন সেই মানুষগুলো, যারা ২০১০-এ ওবামাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখেছিলেন। এই নতুন দশকের শুরুতে পিছনে ফিরে দেখা দরকার, সেই ফেলে আসা দশকটার যে বড় বড় স্বপ্নগুলো ছিল, তাদের হাল কি হল?

এই লেখাটার শিরোনামটা একটু গোলমেলে ঠেকতে পারে, যদি আমরা কিছু cherrypick করা তথ্যের দিকে তাকাই। আমেরিকার সব থেকে ধনী ১ শতাংশ মানুষ তাঁদের অর্থের পরিমান দ্বিগুন (১৭ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে ৩৪ ট্রিলিয়ন ডলার) করেছেন ২০১০-১৯-এর দশকটিতে [1]। তাঁদের কাছে এই দশক নিশ্চয়ই কোনো "lost decade" নয়। এই মাত্র এক শতাংশ সবথেকে ধনী মানুষ ২০১০ সালে আমেরিকার total wealth-এর ২৮ শতাংশের মালিক ছিল, ২০২০-তে তাঁরা ৩০-এরও বেশি শতাংশের মালিক। এই কতিপয় কিছু মানুষকে ওবামা হোক বা ট্রাম্প - দুজনেই বেশ "দক্ষ রাষ্ট্রপতি"র মতোই সেবা করেছেন।

এবার একটু পিছিয়ে পড়া জনগণের দিকে তাকাই। ধনসম্পদের দিক থেকে আমেরিকার সবথেকে নীচের ৫০ শতাংশ লোক ২০১০-এর শুরুতে মাত্র ০.৫% সম্পত্তির মালিক ছিলেন। হ্যাঁ, ঠিকই পড়ছেন, এতটাই কম। কপর্দকশূন্য বললেও অত্যুক্তি হয়না। ২০০৮-এর ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিসের পরে এই নিচে থাকা লোকগুলোর অবস্থা পথে বসার থেকেও খারাপ হয়েছিল। তারপর থেকে ধীরে ধীরে উঠে এসে এই নিচের ৫০% লোক এখন আমেরিকার মাত্র ২% সম্পত্তির অধিকারী হতে পেরেছেন। তবুও মধ্যবিত্ত আমেরিকান আর সবথেকে ধনী ১% আমেরিকানদের মধ্যে সম্পত্তির পার্থক্য ১০০০%। জানিনা এই বৈষম্যকে কোন বিশেষণ দিয়ে জাস্টিফাই করা যায়। যে দশকে ওবামার মতো তথাকথিত "ভালো রাষ্ট্রপতি" ৬ বছর দেশ শাসন করলেন আর ডেমোক্র্যাটের মতো লিবারালরা কিছু বছর ধরে আপার ও লোয়ার হাউস নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত করলো, সে দেশেও এই অবস্থায় রয়ে গেছে।

এর কারণ নিয়ে বলতে গেলে হয়তো ওবামার নতুন বই "A Promised Land"-এর মতোই বড় একটা বই লিখতে হয়। কিন্তু তার থেকে ছোট করে সংক্ষেপেও কিছু বিষয় দেখে নেওয়া যেতেই পারে। এটা থেকে আমরা ঠাওর করতে পারবো যে, রাজনীতির অভিমুখ ঠিক কিরকম হলে এই ধরণের অর্থনৈতিক ব্যর্থতা আসতে পারে।

ওবামা আমেরিকার প্রথম কৃষাঙ্গ রাষ্ট্রপতি। ওবামাকে ঘিরে আমেরিকায় উচ্ছাস তৈরী হয়েছিল ২০০৮ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার প্রথম থেকেই। কিন্তু ওবামা ক্ষমতায় আসার পরই বড় বড় ব্যাঙ্ক এবং ফিনান্সিয়াল সংস্থাগুলোকে প্রচুর পরিমান সরকারি অর্থসাহায্য দিলেন। এদের তখন বেশিরভাগেরই দেউলিয়া অবস্থা। তাঁদেরকে বলা হল "too big to fail", মানে এরা না থাকলে আমেরিকা দেশটাই টিকবে না। সাধারণ মানুষের জীবন এসব ব্যাঙ্কগুলোর সঙ্গে এমনভাবেই জড়িয়ে যে এই ব্যাঙ্কগুলিকে বাদ দিয়ে আমেরিকা, এমনকি আধুনিক বিশ্বকেও ভাবা যায়না। কিন্তু তবুও এদের রাষ্ট্রীয় সংস্থা হিসেবে ঘোষণা করার কথা ভাবা তো হলই না, উপরন্তু রাষ্ট্রীয় ট্যাক্স ডলারে এদের "বেইল আউট" করানো হল, যাতে এই ব্যাঙ্কগুলো বসে না যায় [2]। কিন্তু কার্যত দেখা গেলো, এই প্রচুর পরিমান অর্থসাহায্য পৌঁছালো ব্যাংকের CEO, CFO-জাতীয় উচ্চপদে বসে থাকা বিশাল সম্পত্তির মালিকদের হাতে [3]। এছাড়াও ওবামা রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় বুশ জামানার ট্যাক্স ছাঁটও বহাল রেখে দিলেন। আর ট্রিকল ডাউন অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী মোট সম্পদের খুব সামান্যই পৌঁছালো পিছিয়ে পড়া, "ওয়ার্কিং ক্লাস" মানুষদের কাছে। ওবামা প্রথমেই যে বিশাল সুযোগ পেয়েছিলেন - আমেরিকার বিসদৃশ সম্পত্তির বৈষম্যকে মুছে দেওয়ার - উনি ওনার রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রথম মেয়াদে তার সামান্যও করতে পারেননি।

এর পরবর্তীকালে ওবামা কিছু মানুষের জন্য, যাঁদের বেশিরভাগ বৃদ্ধ ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মী, প্রায় নিখরচায় স্বাস্থ্য পরিষেবা চালু করলেন, যাকে আমেরিকান মিডিয়া বিপ্লবী বলে আখ্যা দিতেও পিছপা হয়নি [4]। কিন্তু তারপরেও আমেরিকার প্রায় ১০% বা ৩ কোটি মানুষের কোন স্বাস্থ্যবীমাই ছিল না, এখনো নেই। তাছাড়াও স্বাস্থ্যবীমার বিষয়টি মানুষের চাকরির সঙ্গে যুক্ত হয়েই থেকে গেলো - মানে যতদিন ভালো চাকরী আছে, ততদিন বীমা আছে, নচেৎ নয়। অথচ এটা এখন প্রায় সবার জানা কথা, এবং বিভিন্ন গবেষণা বলেছে যে, বেশিরভাগ মানুষ গরীব থেকে আরো গরীব হয়ে যায় মূলত স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খরচ সামলাতে না পেরে। আর এটা একটা রিকার্সিভ ফাংশনের মতো, যেখানে টাকা-পয়সার সমস্যার কারণে অনেকেই ঠিক করে নিজের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখতে পারেন না, খাওয়া দাওয়া ঠিকঠাক করতে পারেন না, ওষুধ কিনতে পারেন না। ফলে তাঁরা আরো বেশি করে রোগে ভুগতে থাকেন। যার ফলে তাঁরা বেশি বেশি করে দেনার কবলে চলে যেতে থেকে থাকেন।

এরপর আর একটি পয়েন্ট বলে আপাতত শেষ করবো। ওবামা এবং ওনার ডেমোক্র্যাটিক পার্টি যা তথাকথিত লিবারাল পার্টি হিসেবে পরিচিত, তাঁরা নিজেদের cultural বামপন্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এতো সচেষ্ট ছিলেন, যে অর্থনৈতিক দিকে তাঁদের প্রায় কোনো নজরই ছিল না। cultural leftist issue গুলো মূলত freedom of abortion বা "pro-choice", gay marriage, কৃষাঙ্গদের অধিকার - এসবকে কেন্দ্র করে তৈরী করা হয়েছিল। এগুলো একটা উন্নত সমাজে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন একটা রাজনৈতিক মঞ্চ শুধুমাত্র এই ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করেই তৈরী হয়, তখন সেই রাজনীতি থেকে বৃহত্তর জনগণের পাওনা বলে কিছু থাকেনা। ফলত আমরা শেষ দশকের শেষার্ধে দেখতে পেতে থাকি, "me too" মুভমেন্ট। যা আদতে মেয়েদের বহু বহু বছর ধরে নিপীড়ত থাকার দরুন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। আমরা ট্রাম্পকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাই আমেরিকায়। আমরা দেখতে পাই ব্রিয়োনা টেলর বা জর্জ ফ্লয়েডকে মারা যেতে হয় পুলিশের হাতে, হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টদের হাতে। এতো সবের পরেও ট্রাম্প সাড়ে সাত কোটি ভোট পান ২০২০ সালে। তাই অর্থনীতি ব্যতিরেকে যে সাংস্কৃতিক উদারবাদ বা বামপন্থা হতে পারেনা - আধুনিক ইতিহাসে এই দশকই তার সেরা উদাহরণ এবং আমাদের কাছে শিক্ষনীয়। 

ভীষণ আশা জাগিয়েও এই দশকের শেষে যে করুণ হাল আমরা দেখতে পাচ্ছি, তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দিতে গেলে বলা যায়, আগের দশকের রাজনীতি সাংস্কৃতিক উদারবাদের সাথে অর্থনৈতিক উদারবাদের ছায়াযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল। অর্থনৈতিক উদারবাদ সমাজে যে ভীষণ মেরুকরণ তৈরি করছে, তাকে মেনে নিতে পারছে না প্রগতিশীল সমাজ। অথচ অর্থনৈতিকভাবে প্রগতিশীল নীতিগুলো - সবার জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবা, শিক্ষা, বাসস্থান, সমবায়ের মাধ্যমে কোম্পানি পরিচালনা, গ্রিন এনার্জিতে বিনিয়োগ - সেগুলোকেই আমরা শুরু করতে পারছিনা বা রাজনৈতিক ইস্যু করে তুলতে পারছিনা। এসব নীতির ওপর ভিত্তি করেই যে আমরা অন্য প্রগতিশীল ইস্যুগুলোকে ছুঁতে পারবো, সেটা আশা করি পরবর্তী দশক আমাদের বোঝাবে, আর আমাদের রাজনীতিও সাংস্কৃতিক উদারবাদের ঊর্ধ্বে উঠতে পারবে।


[1] https://www.federalreserve.gov/releases/z1/dataviz/dfa/distribute/chart/#range:2009.4,2019.4

[2] https://money.cnn.com/2009/01/06/news/economy/where_stimulus_fits_in/

[3] https://abcnews.go.com/Business/story?id=8214818&page=1

[4] https://www.foxnews.com/transcript/bill-oreilly-obamacare-and-socialism

Sunday, March 01, 2020

প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ ৩ (মেশিন লার্নিং ও অর্থনীতি)

গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রয়িকার কথা আমরা অনেকেই মোটামুটি জানি - সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার প্রধান দুটি কারন বলা হয় থাকে এ দু'টিকে। বাংলায় এদের নিয়ে অনেক ঠাট্টা, মস্করা, এমনকি গান পর্যন্ত লেখা হয়েছে - "...এমনকি পেরেস্ত্রয়িকাও থাকেনা" - চন্দ্রবিন্দুর "মঙ্গল গ্রহে" গানে। কিন্তু সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পিছনে অর্থনৈতিক কারণগুলো স্রেফ এই দুটি বিষয় ঘিরেই নয়। কয়েকটি মূল কারণ স্বরূপ বলা হয় - মিলিটারিতে অতিরিক্ত খরচ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েতের নিজের অত্যন্ত খারাপ অবস্থায় অক্ষত এবং শক্তিশালী আমেরিকার বিনিয়োগের সাথে অসম লড়াই, ইত্যাদি। আর একটি কারণও ভীষণ জরুরি, গুরুত্বপূর্ণ এবং অনেকাংশে মুখ্য - যেটা কিনা "সেন্ট্রাল প্ল্যানিং"-এর ব্যর্থতা।

সেন্ট্রাল প্ল্যানিং - যার অর্থ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। সোভিয়েতের "ঘোষিত কম্যুনিস্ট" বা "স্টেট্ ক্যাপিটালিজম"-এর মডেলে সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এর মস্ত বড় ভূমিকা ছিল। রাষ্ট্র ঠিক করতো কোথায় কত পরিমান খাদ্য এবং দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন হবে ও সরবরাহ হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারেনি, এর কারণ যেসব আধিকারিকরা ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ের এই তথ্য রাষ্ট্রর কাছে পাঠাতেন - তাতে গলদ থাকতো। তাঁরা নিজেদের গা বাঁচাবার জন্য অনেকসময় ভুল তথ্য নথিভুক্ত করতেন। এছাড়া মূল অভিযোগ করা হয় যে, রাষ্ট্রের পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয় - কোন্ কোন্ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন কাঁচামাল কোথায় পাঠানো উচিত, বা কোনো সামগ্রী কতটা উৎপাদন করা উচিত। রাষ্ট্র এতসব তথ্য জোগাড় করতে এবং অনুমান করতে অক্ষম। তাই রাষ্ট্রের পক্ষে এরকম কেন্দ্রীয়ভাবে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা করাটা অবাস্তব। মার্কেট বা বাজারের হাতেই অর্থনীতির এই কাজটাকে ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে দাবী করা হয়। 

এবার আমরা চলে আসি আজকের যুগে, এখনকার বাস্তবে। এখন আমাদের কাছে ডিজিটাল মিডিয়ামের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা এবং সেই data analyze করা খুবই সহজ থেকে সহজতর হতে শুরু করেছে। মূলত কম্পিউটারের বিশাল উন্নতির কারণে এই কাজ খুব সহজেই করে ফেলা যাচ্ছে। ফলে প্রত্যন্ত গ্রামে কতটা ধান উৎপাদন বা আলু চাষ করলে, বড় বড় শহরের খাবারের চাহিদা মেটানো যাবে, সে সম্পর্কে অনেক বেশি সঠিকভাবে অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মানুষ ঠিক কোন ধরণের খাবার, সামগ্রী বেশি কিনছেন, চাইছেন, সে সম্পর্কেও আমরা খুব সহজে তথ্য পেয়ে যাচ্ছি আজকের ডিজিটাল যুগের কারণে। আপনি বিগ বাজার থেকে যখন মাসে ১ কেজি ডাল বা ৫ কেজি চাল কিনছেন, তখন তা একটি সার্ভারে ক্রমাগত নথিভুক্ত হয়ে যাচ্ছে। সেই তথ্য এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় পৌঁছানোও যাচ্ছে খুব দ্রুত। তবে এর পরেও অনেক কিছুই শুধুমাত্র মানুষের খাতা-পেনের ক্যালকুলেশনে বলে দেওয়া সম্ভব নয়। তাই এখানেই সহায়তা করতে পারে মেশিন লার্নিং। মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে মানুষের কেনাকাটার তথ্য থেকে অনুমান করা যেতে পারে জনগণের চাহিদার প্রকৃতি কিরকম, তাদের জিনিসপত্র কেনার প্যাটার্ন কিরকম। তারপর আমরা সেরকম দ্রব্যসামগ্রী তৈরী করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারি। 

এটা যে আমি কোনো বায়বীয় তত্ত্ব বলছি, তা নয়। ওপরে বলা আমার বক্তব্যের বাস্তব প্রয়োগ করে চলেছে, আমার-আপনার চেনা একটি জনপ্রিয় কোম্পানি। Amazon। Amazon-এর একটি বিজনেস মডেলের ব্যাপারে সে জন্য জানা দরকার। Amazon-এ বিভিন্ন বিক্রেতা তাঁদের জিনিস বিক্রি করে থাকেন। ধরুন একটা ফ্রিজ। বিভিন্ন বিক্রেতা বিভিন্ন ধরণের ফ্রিজ বিক্রি করে থাকেন Amazon.com-এ। মানুষ তাঁদের চাহিদা মতো বিভিন্ন ধরণের ফ্রিজ কিনে থাকেন। কোনোটায় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের উপায় থাকে, কোনোটায় ফ্রিজারটা বড় হয় - এরকম হাজারো প্যারামিটার থাকে। কোন্ ক্রেতারা কোন্ ফ্রিজ কিনছেন, কোন্ ধরণের বৈশিষ্ট্যের ফ্রিজ তাঁদের ভালো লাগছে, তাঁরা ফ্রিজটিকে কেনার আগে কতক্ষন ধরে পরীক্ষা করছেন - Amazon এইসব তথ্যই জোগাড় করতে থাকে। এরপরে মোটামুটি সর্বাধিক ক্রেতাদের চাহিদা মতো একটি ফ্রিজ Amazon নিজেই বানানো শুরু করে। এই নতুন ফ্রিজটিকে তারা নিজেদের একটি ব্র্যান্ড দেয় - AmazonBasics. এরপর Amazon এই নতুন ফ্রিজটিকে অন্য সব বিক্রেতাদের থেকে একটু কম দামে বেচতে শুরু করে। সাথে সাথেই Amazon সম্ভাব্য ক্রেতাদের AmazonBasics-এর তৈরী করা সামগ্রীই কেনার জন্য রেকমেন্ড করতে শুরু করে তাদের প্ল্যাটফর্মে। আর যেহেতু Amazon-এর কাছে তাঁদের ক্রেতাদের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে ডেটা আগে থেকেই আছে, তাই তারা খুব সহজে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছেও যেতে পারে, মেশিন লার্নিং-কে কাজে লাগিয়ে। ফলত অন্য সব বিক্রেতা বাজার থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়, কারণ তাঁরা Amazon-এর সাথে প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না। Amazon খুব সহজেই ক্রেতাদের মনের মতো সামগ্রী, তাঁদের সূক্ষ বিশ্লেষণের মাধ্যমে, ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা পায়। এভাবে বাজারে তারা একরকম মনোপলি তৈরি করে।

এই একই মডেল যদি আমরা এনে ফেলি সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এ, তাহলে দেখবো তা Amazon-এর strategy-এর থেকে খুব একটা আলাদা তা নয়। Amazon তার সফল মডেলের জেরে বিশ্বের ট্রিলিয়ন ডলার কোম্পানি। কিন্তু আমাজন একটি প্রাইভেট কোম্পানি, ফলে তার লভ্যাংশ শুধু কোম্পানির মালিকেরাই পেয়ে থাকেন - প্রধানত জেফ বেজোস। অথচ সেন্ট্রাল প্ল্যানিং-এ যদি আমরা মেশিন লার্নিং-এর মডেল আনতে পারি, তাহলে সেটা একটা বৃহত্তর সমাজের স্বার্থের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। তখন আমাদের খাদ্য, ব্যবহারযোগ্য সামগ্রীর অহেতুক অপচয় বন্ধ হতে পারে। আমাদের খুব দক্ষ প্রোডাকশন সিস্টেম মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে যতটা দরকার ঠিক ততটাই দ্রব্য উৎপাদনের উপযুক্ত হতে পারে। শুধু তাই নয়, আমরা যদি আবহাওয়ার কথাও এখানে চিন্তা করি, তাহলে কিভাবে প্রকৃতিকে নষ্ট না করে দ্রব্য উৎপাদন করা যেতে পারে, সেদিকেও মেশিন লার্নিং যথেষ্ট সাহায্য করতে পারে। যেমন করে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মেশিন লার্নিং এবং অন্যান্য উন্নত প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে Bill and Melinda Gates Foundation পোলিও এবং অন্য রোগ দূরীকরণের কাজ সাফল্যের সাথে করেছেন। তাই আমাদের কাছে জনসাধারণের উন্নতির উদাহরণও যে নেই তা নয়। 

বর্তমানে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলি বিভিন্ন ইকোনোমিক ডেটা সংগ্রহ করে' দেশীয় ব্যাঙ্কগুলির বেস ইন্টারেস্ট রেট নির্ধারণ করে। চীন একধাপ এগিয়ে তাদের দারিদ্র্য দূর করার জন্য মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার করা শুরু করেছে, খাদ্য সরবরাহ এবং উৎপাদনের জন্য। আমাদের লক্ষ্য থাকা উচিত যে, গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যেসব দেশগুলি চলছে, সেগুলির সরকারও ক্রমশ যাতে জনগণের জন্য টেকনোলজির ব্যবহার করা শুরু করে। যে প্রযুক্তির ব্যবহার আমরা প্রতিরক্ষা এবং মিলিটারি ক্ষেত্রে খুব সহজেই করে থাকি, সেই প্রযুক্তিই দ্রুত সাধারণ জনগণের অর্থনৈতিক এবং দৈনন্দিন স্বার্থে ব্যবহার করা দরকার। চিলির প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্দের আমলে Project Cybersyn নামক এক পরিকল্পনায় অনেকটা এই কাজটাই করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু তখন প্রযুক্তি এবং ডেটা সংগ্রহ আজকের স্তরে না পৌঁছানোয়, সেই কাজ পুরোপুরি সফল হয়নি। আজ আমাদের প্রযুক্তি এবং সমাজ এই পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য মূলত প্রস্তুত। বামপন্থী দলগুলোর এই ধারণাগুলোকে আবার একবার তাই ফিরে দেখা দরকার। যেভাবে প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ মেশিন লার্নিংকে কাজে লাগাচ্ছে, সেভাবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও যদি মেশিন লার্নিং-এর সাহায্য নিয়ে ইকোনোমিক প্ল্যানিং-এর দিকে এগোতে পারে, তবে বাস্তব জীবনে টেকনোলজির এক বিরাট প্রয়োগ ও ফলস্বরূপে সাধারণের উন্নতির প্রভূত সম্ভাবনা আছে।

Friday, April 05, 2019

বাংলার সামাজিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি

আমরা বাঙালি, আমরা দেশের মধ্যে সব থেকে উদার এবং ধর্মনিরপেক্ষ বলে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালোবাসি। আমাদের গর্ব - পশ্চিমবঙ্গের মাটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আখড়া নয়। সারা ভারতের কাছে আমরা হিন্দু-মুসলিম একসাথে মিলে মিশে থাকার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বাইরের রাজ্য আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুখ্যাতি করলে আমাদের ভালো লাগে, অহংকার হয়। কিন্তু আমরা অনেকসময় ভুলে যাই, আমরা "ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে", "গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস"-এর বাংলা। ১৯৪৬-এর সেই সময়ে প্রায় চার হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছিলেন ও আরো কয়েক হাজার মানুষ আহত হয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায়। সেই একই সময়ের নোয়াখালী দাঙ্গারও উত্তরসূরি আমাদের আজকের বাংলা, যে দাঙ্গা স্বয়ং মহাত্মা গান্ধীও সম্পূর্ণ শান্ত করতে পারেননি। কয়েক হাজার মানুষ মারা যান।

আমরা একত্রিত বাঙালিরা উদারবাদী হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিলেও, আজকের মুসলিম অধুষ্যিত বাংলাদেশ চরমপন্থী ইসলামের আশ্রয় নিয়েছে। আবার এটাও মনে রাখা দরকার আমাদের বাংলাই তৈরী করেছে আজকের ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপিকে। বিজেপির পূর্বসূরি ভারতীয় জনসঙ্ঘকে জন্ম দিয়েছিলেন আমাদের বাংলার শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি। শ্যামাপ্রসাদবাবু হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, এবং মনে করেছিলেন RSS, হিন্দু মহাসভা-জাতীয় সামাজিক সংগঠনগুলোর একটা রাজনৈতিক শাখা থাকা উচিত। সেই দার্শনিক চিন্তাভাবনা থেকেই আজকের বিজেপির উত্থান। আমাদের এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলায় হিন্দুদের ব্রাহ্মণ্যবাদী চিন্তাধারাই রাজনীতিতে আধিপত্য করেছে। তাই আমাদের সামাজিক উদারতা এসব তথ্যের দেয়ালে খানিক ধাক্কাই খায়। 

ফলত ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায়, বাঙালির আপাত উদারবাদী মনোভাব ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আড়ালে সবসময়ই উগ্রতার ও গোঁড়ামির এক চোরাস্রোত বয়ে গেছে। ব্যক্তিগত পরিসরে আমরা অনেকেই ধর্মীয়ভাবে এখনও ভীষণরকমভাবে রক্ষণশীল। হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি সামাজিকভাবে আজ গ্রহণযোগ্য হলেও, ব্যক্তিগত ক্ষেত্রগুলো - যেমন বিয়ে, বাড়িভাড়া - এসবদিকে গোঁড়ামি বাঙালির মধ্যেও মজ্জাগত। বাঙালি হিন্দুদের কাস্ট নিয়েও যথেষ্ট শুচিবাই আছে। সেটা শুধু গ্রামবাংলা নয়, কলকাতাতেও বেশি বই কম নেই। কিন্তু আমার নিজের বড় হয়ে ওঠায় আমি এই সাম্প্রদায়িকতা দেখতে পাইনি। হাওড়ায় আমাদের বাড়ির কাছে, মুসলিম জনসংখ্যা ভালোই, তবে সেখানেও পরিবেশ তেমন উত্তপ্ত দেখিনি কখনো। এমনকি আমার বড় হওয়ার সময়ের পশ্চিমবঙ্গে, ধর্মকে ঘিরে তেমন কোনো বাকবিতন্ডা দেখিনি। এ নিয়ে প্রথম বাড়াবাড়ি শুনি, যখন তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বের করে দেওয়া হল, ২০০৭ সালের শেষের দিকে। কলকাতায় বড়সড় দাঙ্গার মতোই হল সেবার, নেতৃত্বে ছিলেন ইদ্রিশ আলী, যিনি পরবর্তীকালে তৃণমূলের পক্ষ থেকে বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে সাংসদ হন। এর পরে পশ্চিমবঙ্গে আরো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হতে থাকে, ২০১৩-তে ক্যানিং, ২০১৬-তে মালদা, ধুলাগড়, ২০১৭-তে বাদুড়িয়া - কোনটা একটু ছোট, কোনটা একটু বড়।

মাঝের প্রায় আধা শতক পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইস্যুগুলোতে দাঙ্গা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি না থাকলেও, এবারের নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে সেটাও একটা ইস্যু। এমনকি ১৯৯০-এর দশকে, যখন বিজেপি প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী হিসেবে উঠে আসছে লোকসভায়, সারা ভারত যখন মুম্বাই দাঙ্গায় আক্রান্ত, অযোধ্যা, বাবরি মসজিদ নিয়ে চিন্তিত, তখন পশ্চিমবঙ্গ নাকি মোটামুটি শান্ত ছিল। বাবা-মা-দাদুদের মুখে তাই শুনেছি। আমাদের বি.ই.কলেজের এক সিনিয়রের লেখায় পড়েছি, সেই সময় বাইরে বেরোনো নিয়ে চিন্তা থাকলেও, পুলিশ এবং প্রশাসন মোটামুটি একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখেছিল, "ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে"-র বাংলাতেও। কিন্তু যখন সারা দেশে বিজেপি উঠে আসছে, রাজনৈতিকভাবে এই শান্তি কি করে সম্ভব? বিজেপির উত্থানের পিছনে যে অনুকূল পরিস্থিতি - চরমপন্থা - তা তো সারা দেশের মতো পশ্চিমবঙ্গেও তখন ছিল। ভোটের ফলের দিকে তাকালে এর পিছনের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যায়। 

ভোটের ফলাফল বলছে, বিগত বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গে প্রধান বিরোধী দল, কংগ্রেস (এবং পরে তৃণমূল কংগ্রেস), একটা সম্মানীয় ভোট পেয়ে এসেছে সব সময়ই। এমনকি কংগ্রেস ১৯৯৬ সালে ৪০% ভোট পায়, যা কিনা সিপিএমের প্রাপ্ত ভোটের থেকেও বেশি, যদিও তাদের আসনসংখ্যা ৯-এই সীমাবদ্ধ ছিল। বিজেপি সেক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গে কখনো ১৫%-এর বেশি ভোট পায়নি, তাদের ভোট ১০-১১%-এর কাছাকাছিই সীমাবদ্ধ থাকতো। এমনকি সারা ভারতে যখন বিজেপি ১৯৮৯ আর ১৯৯১-এর নির্বাচনে যথাক্রমে ৮৫ আর ১২০টা সিট্ পেয়ে প্রথম একটা সঙ্ঘবদ্ধ শক্তিশালী বিরোধী হিসেবে কংগ্রেসের সামনে দাঁড়াতে শুরু করছে, তখনও পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দৈন্য দশাই ছিল। এর মূল কারণ পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের শক্তিশালী বিরোধী অবস্থান এবং এই অবস্থানকে সিপিএম-এর মান্যতা দেওয়া। এখন আমরা মূলত এটা জানি যে, সিপিএম-এর যে ধরণের সাংগঠনিক বাহুবল সেইসময় ছিল, তখন বিরোধীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া খুব কঠিন হত না। কিন্তু কংগ্রেসকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার অর্থ - রাজনৈতিক মানচিত্রে বিপরীত প্রতিক্রিয়ার উঠে আসা - যা এক্ষেত্রে বিজেপির উত্থানের নামান্তর হত। অন্তত ১৯৯৯ পর্যন্ত এ কাজটা অতি সতর্কভাবেই পশ্চিমবঙ্গে এড়ানো গেছিল। প্রশাসনিক, পুলিশি ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সমীকরণ - দুদিক থেকেই এই কৌশল কাজে লেগেছিল। ১৯৯৮-৯৯-এ তৃণমূলের উত্থানের পরে সমীকরণ সামান্য বদলাতে আরম্ভ করে। 

কংগ্রেসের বেশিরভাগ শক্তিবল নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস তৈরী হয়। কিন্তু তৃণমূল এরপরে বিজেপির সাথে জোটের রাস্তায় যায়। বিজেপির মূল উদ্দেশ্য খুবই আদর্শগত এবং তা হল হিন্দুত্ববাদের প্রচার। তাই তারা তৃণমূলের মতো কোনো ভাবাদর্শহীন দলকেই পছন্দ করে নিজের বিস্তার করার জন্য। তৃণমূলের সাথে জোট করে বিজেপি দৃঢ়ভাবে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করতে চেয়েছিল। যদিও সেই ১৯৯৯-এ অটল বিহারি বাজপেয়ির সময়ও, বিজেপি ১১%-এর বেশি ভোট পশ্চিমবঙ্গে পেতে পারেনি, তৃণমূলের সাহায্য নেওয়ার পরেও। এরপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০১১-এ ক্ষমতায় আসেন এবং সিপিএম-সহ বামফ্রন্টকে মূলত নিশ্চিহ্ন করার পণ করেন। ওনার মূল লক্ষ্য ছিল সিপিএম। কংগ্রেস থেকে শক্তিবল ক্রমশ তৃণমূলের দিকে স্বততই আসতে থাকে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সরকার ছোটখাট কাজ করলেও, মূলত ভোটে জেতার রাজনীতির ওপর জোর দেয়। তাই সেখানে চাকরি, অর্থনীতি এসব মূল ইস্যু না হয়ে, প্রধান কাজ হয়ে ওঠে ক্লাবের মাধ্যমে ভোটব্যাংককে মজবুত করে রাখা। এছাড়া সংখ্যালঘু ভোটের শক্তিশালী কনসেন্ট্রেশন করতে তৃণমূল সক্ষম হয়। ইদ্রিশ আলী-রা বিধায়ক হন। সারদার টাকা বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে পাচার হয়, জঙ্গি কার্যকলাপে। সিমি-নামক মুসলিম জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে পরোক্ষে জড়িয়ে থাকা আহমেদ হাসান ইমরান এখনো তৃণমূলের পক্ষ থেকে রাজ্যসভার সংসদ। এসবেরই প্রতিক্রিয়া-স্বরূপ ফর্মুলামাফিক বিজেপির উত্থান। ২০১৪-তে বিজেপি প্রথম ১৫%-এর গন্ডি (১৭%) পার করে পশ্চিমবঙ্গে, তাও একা লড়ে।

সেই ১৭%-এ মোদী হাওয়া যেমন ছিল, তেমনি সেখানে অন্যান্য বিরোধীদের কোনঠাসা হয়ে যাওয়াও ছিল। এর পরে, কেন্দ্রের বিজেপি রাজ্যে তৃণমূলকে বিভিন্ন তদন্তের ভয় দেখিয়ে নিজেদের পশ্চিমবঙ্গে বিস্তারের চেষ্টা করতে থাকে এবং করে। গত কয়েক বছরে RSS প্রচুর শাখা খুলেছে পশ্চিমবঙ্গে।রাজনৈতিক বিস্তারের পাশাপাশি হিন্দুত্ববাদের আদর্শগত বিস্তার - RSS এবং বিজেপির অন্যতম উদ্দেশ্য। মমতা ব্যানার্জির সৌজন্যে সেটা সম্ভব হচ্ছে। এটা একদিক থেকে বিজেপির আঁতুড়ঘরে ফেরা।

পশ্চিমবঙ্গই বিজেপির আঁতুরঘর। ১৯৫১-এর সাধারণ নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদবাবুর জনসঙ্ঘ (যা বিজেপির পূর্বসূরি) সারা ভারতে যে তিনটি সিট্ জিতেছিল, তার দুটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু তার পরেও, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কিছুদিন আগে পর্যন্ত মাথা তুলতে না পারার কারণ, শাসক এবং বিরোধী - এই দুই গোষ্ঠীই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিল। এছাড়াও শাসক দল কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধীদের সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দিতে চায়নি। ফলে সুস্থ বিরোধিতার পরিবেশ ছিল, যেখানে বিজেপির উঠে আসার সুযোগ তৈরী করতে দেওয়া হয়নি। সেটা শাসক দল খুব সচেতনভাবেই করে থাকে। শাসক দল তার প্রতিপক্ষ তৈরী করে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিক মাটিতে। পশ্চিমবঙ্গে এতদিন যাবৎ এভাবেই শাসক এবং বিরোধী দুপক্ষেই সুষ্ঠ ধর্মনিরপেক্ষতার আবহ টিকিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু মমতা ব্যানার্জির আমলে এসে এই চিত্র আপাতত প্রশ্নচিহ্নের মুখে। মমতা ব্যানার্জির হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির দৃঢ় পদার্পন। এখন ওনার আমলেই বিজেপির দৌরাত্ম্য ক্রমশ বাড়ছে পশ্চিমবঙ্গে। 

বাংলার সাম্প্রদায়িক পরিবেশ নির্ভর করছে তার প্রধান রাজনৈতিক ও বিরোধী দল কি কথা বলবে। আর বাংলার প্রধান রাজনৈতিক বিরোধী দল কে হবে, এটা নির্ভর করছে শাসক দল কোন বিরোধী দলকে তাঁদের সাংগঠনিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে দেবে। তৃণমূল কংগ্রেস বামপন্থীদের কোনঠাসা করে দিয়েছে, তাদের কোনোরকম সাংগঠনিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে না দিয়ে। আর কংগ্রেসকে মমতা ব্যানার্জি নিজের দলে পরিণত করেছেন। এই সুযোগেই বিজেপির একটা উত্থানের সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে এবং হচ্ছে। মমতা ব্যানার্জি নিজেও সম্ভবত বুঝছেন, যে তিনি ঠিক কোন ধরণের আগুন নিয়ে খেলছেন। 

বিজেপি কোনো একটি সাধারণ দল নয়। এটি একটি চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী পার্টি। এই দলের আপাতত চাই লোকবল, যাতে তাঁরা তাঁদের আদর্শগত গোঁড়ামিকে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। আর অদূর ভবিষ্যতে বিজেপির উদ্দেশ্য পুরো তৃণমূল দলটাকেই বিজেপিতে পরিণত করা। যেহেতু তৃণমূলের নিজস্ব কোনো আদর্শ নেই, তাই এই কাজটা তুলনামূলকভাবে সহজ। বিজেপি আপাতত সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে। বিজেপির প্রথমদিকের লোকবল তৈরী হয়েছে সাধারণ সিপিএম ভোটারদের নিয়ে। সিপিএমের সাংগঠনিক শক্তি তলানিতে পৌঁছনোর পর, এইসব ভোটাররা সিপিএমের থেকে সরে গেছেন - যার বড় কারণ সিপিএম-এর সংগঠনগুলোর ওপর মমতা ব্যানার্জির তীব্র আক্রমণ। এর পরের স্টেজে তৃণমূলকে ভাঙ্গানোর কাজ চলছে বিজেপির। মনে রাখতে হবে, ত্রিপুরায় এভাবেই রাতারাতি সমস্ত কংগ্রেসকে গ্রাস করে ফেলেছিল বিজেপি। তাই, এক্ষেত্রে বাংলার মানুষকে বেছে নিতে হবে, তারা কোন শাসক এবং আরো প্রয়োজনীয়ভাবে কোন বিরোধী দলকে দেখতে চায়। যারা সামাজিক সমস্যাগুলোর কথা বলে, নাকি যারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মতো ইস্যু নিয়ে লড়াই বাঁধায়। প্রশ্নটা ভীষণ সহজ, তবে উত্তরটা কঠিন।

Wednesday, March 13, 2019

Please, do not blame Modi.

This note is not from the angle of social fabric or freedom of expression. I am mainly trying to understand the BJP government's rule from the economical and related philosophical aspects. Just after gaining power in 2014, Modi announced the "Make in India" project. This is, of course, an effort to create more manufacturing jobs in India. So by 2014, a right-wing party is already admitting that opening up Indian economy in 1991 actually did not help much to create "real" jobs in private sectors for our unskilled labors. Therefore, Modi is trying to attract investments both from the Indian and foreign private investors for manufacturing jobs in India.

Well, this same call was given by the Leftists in 1990s. Their main argument was that we needed to create manufacturing jobs before investing in the services sector, so that large part of our labor force and lower class are employed. Thus, we would have a strong base to grow in the services sector later on. Leftists actually tried this approach in West Bengal (WB). There was reduction of trade union power in WB from the 1990s; that meant less strikes in industrial sector, government encouraged manufacturing units, a pro-private-investment government which was first led by Jyoti Basu and then Buddhadeb Bhattacharya. We instantly got Haldia Petrochemicals (1994), the largest petrochemical company in India and others [Jai Balaji Group (1999), Titagarh Wagons (1998), Bisk Farm (2000), Vikram Solar (2006)]. The establishment of these new projects was alleviated by the ending of License Raj (1990) [1] and Freight equalization policy (1993) [2].

So, a right-wing government by BJP wanted to reach the same goal in 2014, as wished by a left-wing government 15-20 years ago. Of course, these two government had different approaches. The left-wing government did seek private investment because the state government did not have much money. Nevertheless, it still created and encouraged government-funded manufacturing units like Thermal Power Plants [Budge Budge (1997), Bakreswar (1999)]. Soon, West Bengal became power surplus state [3] (although this masks the reality that many villages were still not electrified). In addition, WB government was still caring for labor unions, albeit toning it down to pave the way for the private investors. On the opposite side, the right-wing BJP government followed, of course, right-wing economic mentality from 2014.

BJP government dissolved PSUs like Biecco Lawrie. It handled the government undertakings (e.g. - BSNL, Air India) so badly that the companies suffered from mismanagement [4]. On top of that, as a party in democracy, BJP needed to ensure their source of party funding. Thus, enter the Reliance, Adani and co.

Although private investments were independently invited, the government favored only a chosen few like Reliance, Adani group, etc. These companies provide huge sums of money to the BJP party funds. BJP works on behalf of these small set of companies which are just looking for their return on investments. Therefore, for the sake of election and party funding, free market took a dip into the Michigan lake, and cronyism entered. BSNL was sacrificed for Reliance's Jio. "Make in India" was already all set to drown into the Indian Ocean. Then, we got two major blows: Demonetisation and Goods & Services Tax (GST).

Demonetisation had to happen, as the government-owned banks loaned out huge sums of money to the private investors to create companies and jobs. The previous neo-liberal UPA and current BJP both incurred huge debt in public banks to support private investments. So public money was lent to untrustworthy private bodies to create public jobs. Let that sink in first, read the previous sentence again. What could go wrong in this setup, right? A few Nirav Modi, Vijay Malia flew away for their aborad vacations; a few others could not pay their debts. Banks consequently had crunch of money. On top of that, student loans soared [5] because enough jobs were already not created for the services-sector based economy. Students could not get jobs or were not able to pay back their education loans. Demonetisation and GST just put the nail into the coffin.

The situation was already worse because of India's excessive reliance on the services sector. If you ask any IT employee, they can answer about it. The lower level salaries for the IT or the services sector have become virtually stagnated. In the meantime, high- and top-level employees have seen manifold increment in their salaries. Therefore, we can, of course, see the rise in Indian GDP, because the salaries do increase for the already rich. However, the lower level jobs and salaries have become dry. Thus, we enter our jobless growth period [6] exacerbated by the right-wing policies of the BJP government from 2014. When we need government encouragement to create more public sector employment, the government subdued by its private patrons.

Now, what can Modi do here? Modi himself is really not at any fault here. The whole right-wing economy should be questioned. Modi is just following whatever his right-wing economics is dictating. The poster boy of liberal right-wing people, Raghuram Rajan warned us about "Make in India" that India could have become depended on exports because of "Make in India". But, laughably, the project itself never really took off because India has already missed the train of manufacturing jobs to China. In addition, China does not have to depend on democracy to setup factories. India and Indian right-wing parties are too reliant on democratic procedures. Democracy and right-wing economics are a stark mismatch, especially at the stage of India's development phase. So if you want to really pinpoint the economic issue, it's the right-wing economic policies. It's not Modi! So, do not blame Modi, please!

[1] https://en.wikipedia.org/wiki/Licence_Raj
[2] https://en.wikipedia.org/wiki/Freight_equalisation_policy
[3] http://www.calcuttayellowpages.com/index.html
[4] https://www.thehindu.com/business/Industry/over-192-lakh-employees-of-bsnl-and-mtnl-yet-to-get-salaries/article26522223.ece
[5] https://economictimes.indiatimes.com/industry/banking/finance/banking/despite-21-jump-in-npas-in-fy17-lenders-lap-up-education-loans/articleshow/59721203.cms
[6] Mishra, Arti, and Prashant Kumar Pandey. "Growth without Job in India." 14th (2018): 385.

Saturday, October 06, 2018

বাংলা ভাষা বিষয়ক (~৫ মিনিট) | About Bengali Language

কলকাতা - প্রাক্তন ব্রিটিশ রাজধানী। এই শহরের একটা বিশেষ চরিত্র যদি হয় এর নস্টালজিয়া, মিষ্টত্ব - এসব কোমলতায় মোড়া বিশেষণগুলি - তাহলে অন্য চরিত্রটি এর অন্তর্দ্বন্দ্ব। যে কোনো আধুনিকতাতে দ্বন্দ্বের অবতারণা হওয়াটা খুব স্বাভাবিক, আধুনিক শিল্পের একটা বড় মূলধন এই টানাপোড়েনটাই; আর ব্রিটিশ রাজধানী হওয়ার আগে থেকেই, মূলত সম্পদের বৈভবের কারণে কলকাতায় আধুনিকতার পরশ লেগেছিলো। ব্রিটিশরা এসে ঘাঁটি গেঁড়ে বসার পর সেই আধুনিকতা অন্য মাত্রা পায়। ব্রিটিশদের মাতৃভাষার প্রতি বাঙালীদের সেই তখন থেকেই ঈর্ষা। ব্রিটিশদের সম্পদের প্রাচুর্য এবং শাসক-চরিত্র সেই ইংরিজি ভাষা-প্রীতিকে আরো জোরদার করে। আবার বাংলা ভাষার প্রতিও বাঙালীর স্বাভাবিক টান, ফলত জন্ম হয় এক চিরকালীন দ্বন্দ্বের।

কলকাতায় বরাবরই ইংরেজি বলিয়ে লোকেদের বেশি মান্যগন্য করা হয়ে আসছে। স্বাধীনতার আগে ভারতের প্রদেশগুলোতে যখন নির্বাচনে-জেতা নেতারা বিধানসভায় বক্তব্য রাখতেন, তখন বাংলার বেশিরভাগ প্রতিনিধি ইংরেজিতে বক্তব্য পেশ করতেন। এতে করে তাঁদের একটা সম্মানীয় স্থান পেতে সুবিধে হত, অন্যেরা তাঁদের মন্তব্যকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে শুনতেন। এই ইংরিজি কতৃত্বকে কিছুটা আটকে রেখেছিল - ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা। যার জন্য যখন ১৯৩৭-এর নির্বাচনে ইংরেজদের বিভাজনের সুযোগে অনেক সাধারণ, খেটে-খাওয়া মুসলমান বাংলার নির্বাচনে জিতলেন, তখন তাঁরা বাংলায় বক্তব্য পেশ করতে শুরু করলেন বিধানসভায়। সেই সময় যে গুটিকতক হিন্দু বিধানসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, তাঁরা সেই বাংলায়-রাখা বক্তব্যে কিছুটা প্রভাবিত হয়ে বাংলা বলার চেষ্টা করেন, নিজেদের চিরাচরিত ইংরিজি ছেড়ে। সুতরাং বাংলা নিয়ে নাক সিঁটকানো ভাবটা বেশ পুরোনো, এবং এর উৎসটা কলকাতাকেন্দ্রিক হিন্দু সম্প্রদায় থেকে আসা। এনাদের বেশিরভাগই তখনকার জমিদার, ব্যবসায়ী এবং উচ্চবর্ণ ছিলেন। এই ইংরিজি ভালোবাসার সুফল স্বরূপ প্রথম নন-ইউরোপীয়ান নোবেলটাও কলকাতাবাসী এক সাহিত্যিকের ঝুলিতে আসে। তবে সে যুগে ইংরিজি ভালোবাসার সাথে বাংলাকে অবহেলা ব্যাপারটা পুরোপুরি সমার্থক হয়ে ওঠেনি।

আধুনিক ইতিহাসেও কলকাতাকেন্দ্রিক এই উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা ইংরিজির পদলেহন করা বন্ধ করেননি। সেখানেও লুকিয়ে আছে কলকাতার চিরস্থায়ী অন্তর্দ্বন্দ্ব। সেই প্রসঙ্গে ঢোকার আগে বলতে হবে, ২০১৭ সালে একটি বিতর্কে চন্দ্রিল ভট্টাচার্য্যের বক্তব্যের কথা, যা কিনা সম্প্রতি নতুন করে প্রচার পেয়েছে (এবং এই লেখাটার একটা অনুঘটক)। উনি সেখানে বাংলা ভাষার দুরবস্থা প্রসঙ্গে বলছেন যে, "উচ্চকোটির বাঙালী" বাংলা ভাষাকে বর্জন করার জন্যই আজকে বাংলা ভাষার এই করুন পরিস্থিতি। লোকে বাংলা বলতে ভুলে যাচ্ছেন, বাংলায় ভাবতে বন্ধ করছেন। দরকার হলে ভিডিওটা দেখে নেওয়া যেতে পারে, তবে ছোট করে বললে মূল বক্তব্য এটাই। কিন্তু আধুনিক ইতিহাসে বাংলাকে পিছনে ফেলে দেওয়ার ন্যারেটিভটি তৈরী করেছিলেন কারা? - সেই অনুসন্ধানেই দ্বন্দ্ব ধরা পড়ে। 

বামফ্রন্ট সরকার মাঝখানে কিছু বছরের জন্য সরকারি স্কুলে প্রাথমিকে ইংরিজি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ গ্রামাঞ্চলে অনেক প্রথম জেনারেশনের শিক্ষার্থীরা স্কুলে আসছিল না, সঠিক ইংরিজি শিক্ষকেরও অভাব ছিল। কিছু বছর পরেই যদিও আবার ইংরিজি চালু করা হয়, সারা ভারতের আগেই। কিন্তু সেই সময় ইংরিজি তুলে দেওয়া নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ হয়। এই বিক্ষোভের মূল বক্তব্য ছিল, ইংরিজি না শিখলে উচ্চপদে চাকরি, উচ্চশিক্ষা সম্ভব নয়। এই বিক্ষোভ যে গোষ্ঠীগুলো থেকে উঠে আসে - চন্দ্রিলবাবু তার প্রায় প্রত্যেকটারই অন্তগর্ত - কলকাতাকেন্দ্রিক উচ্চবর্ণ (মূলত ব্রাহ্মণ), "বাবু"-সম্প্রদায়, প্রতিষ্ঠিত ধনী মানুষেরা এবং আনন্দবাজার গোষ্ঠী। অথচ পরবর্তীকালে দেখা গেছে যে ইংরিজি তুলে নেওয়ার কোনো প্রভাবই প্রায় পড়েনি। বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসা থেকে যাওয়ার মাঝে পশ্চিমবঙ্গে সাক্ষরতার হারে প্রায় ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছে। দেশের বড় বড় IIT-গুলিতে বাঙালী প্রফেসরের আধিক্য দেখা গেছে। কিন্তু সেই ন্যারেটিভটা থেকে গেছে - ইংরিজি ছাড়া উচ্চশিক্ষিত বা সম্ভ্রান্ত হওয়া যায় না। খুব কম সংখ্যকই বলেছেন, উচ্চপদের পরীক্ষাগুলোতে বা উচ্চশিক্ষায় আরো মাতৃভাষার ব্যবহার প্রয়োজন। 

চন্দ্রিল নিজে হুতোমের গুণগ্রাহী এবং হুতোমের লেখনীর ঘরানার লেখক। হুতোম নিজে কলকাতার বাবু-সম্প্রদায়ের অন্তগর্ত হয়েও সেই গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বগুলিকে তাঁর লেখা নকশায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন। চন্দ্রিল সেই একই কাজ করে থাকেন, আধুনিক মধ্যবিত্ত বাঙালীর ক্ষেত্রে। কিন্তু তাঁর নিজের তর্কের মধ্যেও এই দ্বন্দ্বের পরিসর আছে। তবে যেটা প্রথমে বলেছিলাম, এই দ্বন্দ্ব চন্দ্রিলবাবুর শুধু নয়, কলকাতাকেন্দ্রিক সমাজের একটা অঙ্গাঙ্গী সত্তা হল এই দ্বন্দ্ব। যে কারণে এখনও বলা হয়ে থাকে, ইংরিজি-শিক্ষা শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। অথচ ভারতের প্রায় কোনো প্রদেশ থেকেই এই ধরণের বক্তব্যকে আগে তুলে আনা হয়নি। আগে অনেক রাজ্যেই ইংরিজি তুলে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কেউ অভিযোগ করে থাকেনা, যেভাবে বাঙালী করে থাকে। না ভুল বললাম, এমনকি গ্রামবাংলাও এই অভিযোগ করে না। শুধুমাত্র কলকাতাকেন্দ্রিক এলিট সমাজের এই অভিযোগ থেকে যায়। বিভিন্ন ইউরোপীয়ান দেশগুলি, জাপান - এরা সকলেই নিজেদের মাতৃভাষাকে উদযাপন করেন, ব্যতিক্রম কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালী ভদ্রসমাজ। 

যতদিন না কলকাতা তাঁর এই দ্বন্দ্ব কাটিয়ে উঠতে পারবে, ততদিন কলকাতার উপর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ না ছাড়াই ভালো। বাংলা বরং অনেক বেশি নির্ভরশীল কলকাতার বাইরে তার কতটা সমাদর তার ওপর। কারণ বাংলাকে কলকাতা কোনোদিনই তাঁর সঠিক মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা করেনি, আর অদূর ভবিষ্যতেও করবে বলে আশা করিনা। কলকাতার বাংলার অনিবার্য পরিণতি, "I तो বিরিয়ানি খেতে ভীষণ love করি।"

Friday, August 31, 2018

"অরাজনৈতিক" আন্দোলন ও কলকাতা-কেন্দ্রিক নাগরিক সমাজ (~৫ মিনিট) । Apolitical Movements and Kolkata-based Civil Society

একবিংশ শতকের বয়েস বাড়ার সাথে সাথেই বাঙালির একটা প্রবণতা বেশি বেশি করে চোখে পড়ছে, "অরাজনৈতিক" হতে চাওয়ার প্রবল চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থাই হয়তো এর মূল কারণ। কিন্তু এই "অরাজনীতি" তাঁদের সাময়িক আরাম ছাড়া আর কিছু দিচ্ছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু এই "অরাজনীতির" সুযোগ যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারছে, তখন তারা লাভবান হচ্ছে। আর যখন তা হচ্ছে না, তখন কিছু গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা ক্ষণিকের জন্য সমাধান হচ্ছে। অথচ "রাজনীতি" যদি সত্যিই দক্ষ এবং দায়িত্বপূর্ণভাবে করা যেত, তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না, বরং একটা বৃহত্তর সমাজের ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে মেডিকেল কলেজের ঘটনা নিয়েও এই "অরাজনৈতিক" আকাঙ্খা আবারো দেখা গেল। মেডিকেল কলেজের হোস্টেল নিয়ে ছাত্ররা একটি আন্দোলন করছিলেন। তাঁদের দাবি না মানায় তারা একটি পলিটিকাল টুল হিসেবে "অনশন"-কে ব্যবহার করেন। দিন বাড়ার সাথে সাথে, কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো থেকে অনেক মানুষ এই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে আসেন। তাঁরা মেডিকেলে কলেজে উপস্থিত থেকে ছাত্রদের সমর্থন জানান। শেষ পর্যন্ত কতৃপক্ষ ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়। তবে এই আন্দোলনের পিছনের রাজনৈতিক চরিত্রটা কলকাতার মানুষ বুঝতে চাইলো না। আন্দোলনটাকে একটি "অরাজনৈতিক" চরিত্র দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো হল। 

এই আন্দোলনকে একটু গভীর ভাবে দেখলে অন্য চরিত্র বেরিয়ে আসে। মেডিকেল কলেজের যে ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনটা পরিচালনা করছিলো, ডিএসএফ, তাঁদের দাবিতে এও ছিল যে, তৃণমূলের প্রাক্তন ছাত্রকে যে সুপার করা হয়েছে, তাঁকে রাখা যাবে না। বদলে ছাত্র-শিক্ষকের কাউকে রাখতে হবে। অন্তত ন্যায়সঙ্গত দাবি, এবং রাজনৈতিকও। দাবিটাকে একটু বড় করে দেখলে বোঝা যায়, সব জায়গায় তৃণমূলের পোষ্য লোক বসিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এই দাবি। অনেক জায়গাতেই এখন এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন মানুষ। কিন্তু সব আন্দোলনকে "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া যায় না, সব আন্দোলনের এলিটিজম থাকে না, যা মেডিকেল কলেজের আছে। ফলে সেইসব আন্দোলন কোনো স্বীকৃতি বা বৃহৎ আকৃতি পায়না। অথচ মানুষের এখনই দরকার ছিল, এই ধরণের আন্দোলনগুলোকে একত্রিত করার। কিন্তু তা না হয়ে, এটা স্রেফ মেডিকেলের ছাত্রদের সাময়িক উপশম ঘটালো।

এখনকার এই ঘটনা যেমন দেখায় যে অরাজনৈতিক আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা, তেমনি উল্টো পিঠও আছে। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন হয়, তাকেও প্রথমদিকে এক "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া হয়েছিল। কলকাতার সাধারণ মানুষ এবং "বুদ্ধিজীবী", শিল্পী সমাজ সেই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে এসেছিলেন। যদিও এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন একেবারেই ছিল না, পিছনে খুব ক্ষুরধার রাজনৈতিক মাথারা কাজ করছিলেন। মমতা ব্যানার্জি এই আন্দোলন থেকে নিজের পলিটিকাল মাইলেজ উদ্ধার করেন। আবার মাওবাদীরা - যাদেরকে দেশের সব থেকে বড় ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী - এই আন্দোলনের পিছনে তাঁদের অক্সিজেন খুঁজে পেয়েছিলেন। বাংলার সাধারণ মানুষ অজান্তে দেশের "বৃহত্তম ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট"-কে সমর্থন করেছিল। এরপরে মমতা ব্যানার্জির শাসক চরিত্র উদ্ঘাটিত হওয়ার পরে, সেই বাংলাবাসীই হাত কামড়েছে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য। 

মূলত যেটা দেখা যাচ্ছে, বাঙালী "অরাজনৈতিক" হওয়ার চক্করে কখনো সুযোগ হারায়, কখনো ব্যবহৃত হয়। সম্ভবত ৭০-এর দশকে ছাত্রদের চরম রাজনৈতিক চরিত্রের ফলে যে করুন পরিণতি হয়, এবং হাজার হাজার ছাত্র-যুবরা মারা যান, তার কারণেই বাঙালী এখন রাজনৈতিক হতে ভীষণ ভয় পায়। বাড়ির বড়রাও বলেন ছাত্রদের রাজনীতির দিকে না এগোতে। যদিও এই ঘটনা খুব নতুন নয়, কিন্তু এর ফলগুলো নতুন নতুন করে বাঙালীকে সমস্যার মধ্যে রেখে দিচ্ছে। আমাদের শিবপুরে আমরা দেখেছি, কিভাবে কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের অরাজনৈতিক করার মাধ্যমে সমস্ত ধরণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। আমরা না বুঝেই "অরাজনৈতিক" হয়েছিলাম, তবে পরে উপলব্ধি করেছিলাম যে আমাদের বক্তব্য বলার মতো প্ল্যাটফর্মটা আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হল। সে কারণেই মনে হয়, "অরাজনীতির রাজনীতি"-এর এই ধোঁকাটা বন্ধ হওয়া দরকার। "অরাজনীতি" বলে যে কিছু হয়না - সেটা বোঝা দরকার।বাঙালী যদি রাজনীতিটাকে অস্পৃশ্য করে না রেখে, সুস্থ এবং দায়িত্বশীল একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো, তাতে তাঁদের নিজেদেরই মঙ্গল হত। আশা রাখবো, ভবিষ্যতের আন্দোলনগুলো গঠনমূলক রাজনৈতিক পরিচিতি পাবে, এবং সেখান থেকে এক বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের পরিসর গড়ে উঠবে।

Wednesday, June 06, 2018

সাম্যবাদী গণতন্ত্র - Communist Democracy

টুকাইয়ের বাড়িতে মাটির ওপর আসন পেতে বসে স্টিলের থালায় মাংস-ভাত খাচ্ছিলাম। ওর মা সামনে বসেছিলেন। সবশেষে টমেটোর চাটনিও ছিল, কাকিমা বেশ সুন্দর বানিয়েছিলেন। সেবারে টুকাইয়ের জন্মদিনে বেশ মজা হয়েছিল, সাজ্জানলালও এসেছিল। আমি একটা পেন্সিলবক্স উপহার দিয়েছিলাম টুকাইকে, তাতে কয়েকটা খুব সুন্দর পেন্সিল ছিল। তার আগের দিনই ওকে অঙ্কের মাষ্টারমশাই আলম স্যার ক্লাসের বাইরে নীল ডাউন করিয়ে দেন, ক্লাসে লেখার সময় ওর নিজের পেন্সিল না থাকায়। সেজন্যই বোধ হয় ওর খুব পছন্দও হয়েছিল পেন্সিলবক্সটা। ও খুব খুশি ছিল সেবার। আমাদের দুপুরের খাবারের একটু আগেই কেক কাটা হয়েছিল; এই পাশেই, ওদের শোয়ার ঘরে। অবশ্য যা ওদের শোয়ার ঘর, সেটাই ওদের বসার ঘর, সেটাই আমাদের ট্রাম্প কার্ড খেলার ঘর - সবই ওই এক ঘর। কারণ ওদের একটাই ঘর ছিল তখন, এবং সেটাই ওদের পুরো বাড়ি। বাইরে যে ছোট্ট মত জায়গাটায় আমরা খাচ্ছিলাম, সেই ছোট্ট মতো জায়গাটাতেই ওর মা, মানে কাকিমা রান্না করতেন। খেয়ে নিয়ে একটু গল্প করেই আমরা সেদিন স্কুলের মাঠে খেলতে চলে গেছিলাম, দৌড়ে দৌড়ে।

দৌড়োতে দৌড়োতে আমি ২৩বি নম্বর গেট-এ পৌঁছলাম, কিন্তু গিয়ে দেখলাম প্লেন ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। অবশ্য টুকাই দৌড়ে ৩৪ বি বাসটা ধরে ফেলেছিল ধর্মতলার মোড়ে, কে.সি.দাশ-এর অপোজিট-এ। এভাবে কিছু ট্রেন আমরা মাঝে মিস করেছি, কিছু প্লেন ধরে ফেলেছি। ঠিক মতো জানি না, টুকাই ঠিক কোন কোন ট্রেন বা বাসগুলো ধরতে পেরেছিল বা পারেনি। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, আমার জন্য যে ট্রেনগুলো ছিল, সেগুলোর নাগাল পায়নি টুকাই। ওর আর্থিক অবস্থা থেকে পাওয়ার কথা ছিল না। হয়তো আমার ছোটবেলার বন্ধু সাজ্জানলালও কিছু একটা কাজ জুটিয়ে নিয়েছে এতদিনে, যদিও ওর একটা পা-এ সামান্য সমস্যা ছিল, খুঁড়িয়ে হাঁটতো। ওর আর কোনো খোঁজ পাইনি স্কুলের পরে, যেমন সামিউল-এরও পাইনি। টুকটাক কিছু খবর ছাড়া অন্য খবর পাওয়ার কথাও ছিল না। কারণ আমি ধীরে ধীরে আলোর দিকে চলে এসেছি। আর আমরা যখন আলোয় থাকি, অন্যদের স্রেফ কিছু সংখ্যায় পরিণত করি। তাই পেপারে আলাউল, টুকাই, সাজ্জানলালদের সম্পর্কে combined কিছু তথ্য পেয়েছি। বুঝতে পেরেছি ওদের জন্য কিছু উন্নতি হচ্ছিলো, আর অনেক কিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম আমাদের কাছাকাছি ও ব্যক্তিগত উন্নতিটা। একটা সময় মা উনুনে রান্না করতো, তারপর একদিন গ্যাসে এসে গেল। অন্যের বাড়ি থেকে আমাদের নিজেদের বাড়ি হচ্ছিল। টুকাইরা মাটি আর বাঁশের ঘর ছেড়ে পাকা ভাড়া-বাড়িতে উঠে আসছিল। কিন্তু এসবের পিছনের কাহিনীটা আরো পরে ধরতে আরম্ভ করি। সরকার থেকে চাকরি হচ্ছিল অনেকের, আমার বাবা-মা-আত্মীয়রা এই পরিবর্তনটার সাক্ষী ছিল। কিছু বেসরকারি চাকরিও দেখছিলাম। কিন্তু চাকরি তো এমনি এমনি হতে পারে না। এর পিছনে চলছিল লাগাতার আন্দোলন, শ্রমের অধিকার এবং মূল্যের জন্য। অনেক মানুষ মাঠে-ঘাটে নেমে এই আন্দোলনটা করছিলেন। তারা সত্যিকারের শ্রমের মূল্যের তত্ত্ব কতটা বুঝেছিলেন, জানিনা। কিন্তু তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে শ্রমের প্রকারভেদ এবং নিজেদের সামাজিক অবস্থানটা যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁদের আন্দোলনের দিশাও ছিল, প্রাপ্তিও ছিল। একই জিনিস হচ্ছিল একটু গ্রামের দিকে, চাষিদের বাড়িতেও। মুশকিল হল - তাঁরা সকলেই বাস করছিলেন একটা গণতান্ত্রিক দেশে এবং আন্দোলন করছিলেন সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

আন্দোলনকারীরা তাঁদের যথার্থ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে স্বচ্ছলতাটা আনলেন তাঁদের জীবনে, সেটা সকলের জীবনেই আনা সম্ভব ছিল না। কাজ কখনো একেবারে, একটা প্রজন্মের আন্দোলনে শেষ হতে পারে না, তার জন্য অনেকটা সময়, অনেকগুলো যুগ লাগে। ফলে অনেক মানুষ, এর পরেও, পিছনেই পড়ে রইলেন। কিন্তু একটা প্রজন্মের আন্দোলনের বয়ে আনা স্বচ্ছলতা একটা বৃহৎ গোষ্ঠীকে মূলত পঙ্গু করে দিল। এই খুব বড় জনগোষ্ঠীই হল আমাদের সোনার মিডল ক্লাস, মানে আমরা যারা মধ্যবিত্ত। আমরা একটা আপাত সুখের মাঝে বড় হলাম; বাবা-মা তাঁদের স্বভাববশত, তাঁদের কষ্টটা আমাদের কাছে যথাসম্ভব চেপে রাখলেন। আমরা বড় হয়ে কেউ প্লেন ধরলাম, কেউ ছুটে গিয়ে বাস ধরলাম। এইভাবে আমরা নিজেদের আরো উপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করলাম বটে, কিন্তু অনেকেই এই দৌড়টায় পিছিয়ে পড়লো।

যারা পিছিয়ে পড়লো, তারা মনে করলো, তাঁদের পিছিয়ে পড়ার কারণ তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা। অথচ আমরা যে সেই একই সমাজব্যবস্থায় বাস করছি, সেটা অনেকেই খেয়াল করলাম না। নাহ্, একটু ভুল বললাম, ঠিক একই সমাজব্যবস্থায় আমরা আর বাস করছিলাম না। একটা বৃহৎ গোষ্ঠী, যারা আমাদের আগের প্রজন্মে সক্রিয় ছিল, তারা এখন নিজেদের অক্ষম বলে ভাবতে শুরু করেছে। তাই ব্যবস্থাটাকে আর একই বলা যাচ্ছে না। এই এখনকার অক্ষম গোষ্ঠীটাতেই আগে ছিল আমাদেরই বাবা-মা-আত্মীয়রা, তাঁদের যুবক-সত্ত্বায়, যারা তখন মাঠে-ঘাটে নেমে আন্দোলনটা করছিল, শ্রমের অধিকারের জন্য, সঠিক চাকরির জন্য। কিন্তু আমরা বড় হয়ে সেই চাকরিটাকে হয় নিজেদের অধিকার অথবা চাকরি না-পাওয়াটাকে নিজেদের অক্ষমতা বলতে শুরু করলাম। ফলে যে গোষ্ঠীটা খুব সক্রিয় ছিল নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনায় বা প্রতিষ্ঠিত করায়, সেই গোষ্ঠীটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেল।

পুরোপুরি বিলুপ্তও বলা যায় না, বলতে হয়, সেই গোষ্ঠীটা ছন্নছাড়া হয়ে গেল। সেই গোষ্ঠীর কিছু লোক এখন ব্যাঙ্গালোরে হুইস্কি সহযোগে হাহুতাশ করে মমতা ব্যানার্জির শাসন নিয়ে, অথবা নন্দনে বিকেলবেলা হাওয়া খেতে খেতে সিপিএম-এর করুন দশা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অথবা আমেরিকায় বসে এরকম একটা লেখা লেখে। এরা কিছুটা সচেতন সমাজের এই (অধঃ)গতিটা সম্পর্কে এবং সেখানে নিজেদের কিছু করতে না-পারার ব্যর্থতা সম্পর্কে। কিন্তু যেহেতু এদের আগের প্রজন্ম এদের একটা স্বচ্ছলতা দিয়েছে, একটা পরিসর দিয়েছে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন-চাহিদাগুলো পূরণ করার, তাই তারা মূলত উদাস এবং প্রমাণসাপেক্ষে অপারগ, এই সমস্যা নিয়ে কিছু করার উদ্দ্যশ্যে।

এর পরও পড়ে থাকছে এই বৃহৎ গোষ্ঠীর আর একটা মূল উপগোষ্ঠী। যাদের এখনো সেই চাকরিগুলো দরকার, যেগুলো সক্রিয় আন্দোলন এবং সঠিক উন্নয়ন থেকে উঠে আসতে পারে। এই হল সেই গোষ্ঠীটা যারা গণতন্ত্রের এবং সর্বোপরি সাম্যবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা স্বচ্ছলতার শিকার। এরা এখন হয় শাসক দলের তাবেদারী করতে বাধ্য বা সিভিক পুলিশে নাম লেখাতে। এদের কাছে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই। কারণ এরা জানেনা, আন্দোলন করার মানে, এদের বড় হওয়ায় হয় মিশে আছে সামান্য শৌখিনতা, অথবা স্বচ্ছলতার মেদুর স্বপ্ন যা ২০০৩-০৪-এর "Shining India"-এর মতোই সত্যি। সেই স্বপ্নে কোনো আক্রোশ নেই, বাসনা নেই, শুধু আছে চাতকের চাহুনি। আর সেই চাহুনি চেয়ে আছে সমাজবাদী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে, যা খানিকটা "সুখী" আন্দোলনে পর্যবসিত। তবে প্যারাডক্সটা এখানেই যে, সফল আন্দোলনের মূল জ্বালানি যে অনুভূতিটা, সেই আক্রোশ বা ক্রোধ নামক আবেগটা এখন প্রায় অনুপস্থিত এই গোষ্ঠীর ভিতর। ফলে আমরা কোথাও আটকে গেছি একটা ডেডলকের মধ্যে। কেউ কোনোদিকে চলতে পারছি না, কেউ দৌড়োতে পারছি না, কেউ মাটির কাছাকাছি যেতে পারছি না। আমরা শুধুই মাটির ওপরে সুন্দর হাতের কাজ-করা আসনটুকু দেখতে পাচ্ছি, পেতে চাইছি; ওর উপর বসে মাংস-ভাত খাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আসনটা যে মাটিতেই বিছিয়ে দিতে হবে, এবং তার জন্য আসনটাকে যে মাটি ছোঁওয়াতেই হবে - সেটা মেনে নিতে রাজি হচ্ছি না। বর্তমান শাসকেরাও চান না আমরা রাজি হই, কারণ তারা এই পঙ্গু গোষ্ঠীটাকে ভোট জেতার মেশিনারি হিসেবেই কাজে লাগাতে ব্যস্ত। সাম্যবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন আমাদের যে দৌড়টা দিতে শিখিয়েছিল, আমরা খুব সহজে ভেবে নিয়েছি যে, তার বোধ হয় কোনো ফিনিশিং লাইন আছে। কিন্তু সেটা তো ছিল না, সেটার একটা চিরন্তন বহমানতা থাকার কথা ছিল। অথচ আমরা সেই কাল্পনিক ফিনিশিং লাইনে এসে অপেক্ষা করছি, আশা করছি, একটা উন্নততর পৃথিবীর, যেটাকে মরীচিকা ছাড়া আর কোনো ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাম্যবাদী আন্দোলনের এটাই বোধ হয় সব থেকে বড় পরিহাস।
---

আলোচনা ও ভাবনা সহায়তা: শুভাশিস পাত্র

শুভাশিসের মন্তব্য: তোর এই লেখাটা পড়ে আমার মনে যে টা সব থেকে বেশি টাচ করেছে সেটা হল 'গোষ্ঠী'। শ্রেণী নয়। একদম ঠিক। যতদুর মনে পড়ে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার এর পর থেকেই শ্রেণী চেতনা হারিয়ে গেছে এসেছে গোষ্ঠীবাজি। তুই সেটাই দেখেছিস।
তোর দেখাটা সত্য। বামফ্রন্ট সরকার যখন থেকে কাজের সুযোগ তৈরী করতে সক্ষম হল, তখন আন্দোলনটা গোষ্ঠীগত আন্দোলন হয়ে গেছে, শ্রেণীগত চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার তাগিদে ভুলে গেল তুলনামূলক ভাবে অগ্রসর শ্রেণী এর সিংহ ভাগ সুযোগ আত্মসাৎ করবে। হলও তাই। সেই ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে মুক্তি পেতে ultimately মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর উদয় হলো। কিন্তু সেটাও মরিচীকা।

Saturday, May 26, 2018

অন্তরখনন

ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, কানে হেডফোন। একটু সামনে একটি মেয়ে হেঁটে চলেছে। আমার মনে হল, সে যেন আমার হেডফোনে হয়ে চলা গানের তালে তালে হাঁটছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, তার কানেও হেডফোন। এর মানে, সে হয়তো সম্পূর্ণ অন্য কোনো গানের ছন্দেই হেঁটে চলেছে, অথবা তার হাঁটার হয়তো কোনো ছন্দই নেই। কিন্তু আমার কানে, আমার মনে যে গান, যে ছন্দ বয়ে যাচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পাচ্ছি মেয়েটির হাঁটার মধ্যে।

একইরকম ভাবে, আমরা তো সত্যিই জানিনা, অন্য লোকটা ঠিক কি ভাবছে, কিভাবে ভাবছে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে ভাবছে। কিন্তু নিজেদের সুবিধেমতো একটা প্রতিচ্ছবি ভাসিয়ে দিই, অন্য মানুষের জীবনের ক্যানভাসে। অথচ সেই জীবনটা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই থাকে না। আর সেই মানুষটাকে যদি সামনাসামনি, চাক্ষুষ না দেখে থাকি, তখন আমাদের কল্পনাশ্রিত চারিত্রিক গড়নটার আরো সহজ প্রক্ষেপন করতে পারি। বিভিন্ন ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার নেটওয়ার্কের দৌলতে, যেটা এখন প্রায়শই হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ, ঠিক কোন "আমি"-টা যে আসল "আমি", ক্রমশই সেটা ধোঁয়াশায় চলে যাচ্ছে। আমার চারপাশের সমাজ একটা নির্দিষ্ট "আমি"-কে ডিমান্ড করছে। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় অচেনা-স্বল্পচেনা-(আগে-চেনা-এখন-অচেনা) বন্ধুরা একটা "আমি"-কে চাইছে। এছাড়াও ব্যাক্তিগত স্তরে আরো নানা কাছের মানুষ, দূরের মানুষেরা বিভিন্ন "আমি"-কে চেয়ে থাকছেন। 

কিন্তু তার মধ্যে থেকেও একটা আমার "আমি" তো আছে। যে "আমি"-টা একান্ত আমার। যে "আমি"-টাকে আমি নিজে চেয়েছি। যে "আমি"-টার মতে, সৃষ্টিশীল শিল্প আর রাজনীতি একসাথে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। যে "আমি"-টার মতে আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় ব্যাপারকেও খুব যুক্তিযুক্তভাবেই তর্কের বিষয়ে আনা যায়। তাকে স্রেফ "গাঁজাখুরি" হিসেবে উড়িয়ে না দিয়েও, দেখানো যায় যে ধর্ম পালনের জায়গাটা খুবই ব্যক্তিগত। আবার সেই "আমি"-টা তো এটাও মানে, যে সমাজবাদ কোনো ধর্ম নয়। 

মানুষের সমাজে থাকার দরুন, তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই তো একসাথে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা। সেই সমাজে একে অপরের সাহায্যই তো খুব প্রত্যাশিত। সেখানে কি করে একটা ভার্চুয়ালি তৈরী করা জিনিস, যার পোশাকি নাম "টাকা", তাকে আমরা সমাজ এগোনোর প্রধান চালিকাশক্তি করে তুলতে পারি? কিন্তু তা বলে সমাজবাদ তো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতো কোনো "গোঁড়ামো" নয়। কি করে তা হবে? কারণ সমাজ তো সদা-পরিবর্তনশীল, সে এক জায়গায় থামবে কেন! কিন্তু সেই সমাজবাদকেই কিছু মানুষ কুক্ষিগত ধর্মের মতো করে তুলছে। মাঝে মাঝে "মহামতি মার্ক্স্"-এর কোটেশন টেনে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তা কেন হবে, আমি তো সমাজে থাকতে থাকতে স্বততই উপলব্ধি করছি সমাজবাদের গুরুত্ব। তার জন্য তো আমার মার্ক্স্-এর উদ্ধৃতি লাগছে না। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে পড়তে হয় বৈকি, তবে যেমন কম্পিউটার আর্কিটেকচার বুঝতে না পারলে বই পড়তে হয়, ঠিক তেমনি; স্রেফ আগের কাজটাকে বুঝে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারপর উপলব্ধি তো ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক তো নয়।

অথচ, যে এই "আমি"-টাকে দেখেনি বা বোঝার চেষ্টা করেনি, সে তো ওই প্রাতিষ্ঠানিক "আমি"-কেই দেখার চেষ্টা করছে। আমিও আর আলাদা থাকছি না, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরূপের মধ্যে স্রেফ আর একটা প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছি আমি। এর জেরে, সেই অন্যের চোখের "আমি"-র সাথেও আর নিজেকে মেলাতে পারছি না। খুব খুব দূরে সরে পড়ছি। একটা দেওয়াল তৈরী হচ্ছে। আমি বোঝাতে পারছি না, যে কোথাও গিয়ে আমার অন্য কিছু মনে হচ্ছে, লেনিনিষ্ট-স্টালিনিস্ট পার্টি স্ট্রাকচারে ঠিক বিশ্বাস থাকছে না আমার। আবার কোথাও হয়তো আমার মনে হচ্ছে, ট্রটস্কি যখন আন্তর্জাতিকতাবাদের কাছে গিয়ে সমাজবাদকে স্থান দিতে চাইছেন, সেটাই হয়তো আসল পথ। কখনো মনে হচ্ছে, নিচ-থেকে-উপরে আসার রাস্তাটাই সঠিক, নিচের স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা-আন্দোলন-রাজনৈতিক-শিক্ষা না হলে উপরের নেতাদের শত শত কুরবানী, আন্দোলন বৃথা। সবকিছুকে আমি যখন অবজেক্টিভলি বুঝতেও চাইছি, আমার গায়ে লেগে থাকা "ট্যাগ", আমাকে তা বুঝতেই দিচ্ছে না, চারপাশের মানুষেরা সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। আমার মতপ্রকাশ স্রেফ আমার গায়ের "ট্যাগ"-কেই আরো জোরে সেঁটে দিচ্ছে। 

একেকবার খুব খুব, যাকে বলে, একেবারে ভীষণ রেগে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, এভাবে আর চলা সম্ভব নয়। আমাকে খুঁজে দিতেই হবে আফ্রিকা থেকে আহমেদাবাদ - সকল জায়গার শ্রমিকের সমানাধিকার। কিন্তু আবার তার পরেই তো আমার খুব ভালো লাগছে এই পৃথিবীটাকে। আমি নদীর ধারে যখন হাঁটছি, তখন দেখতে পাচ্ছি, সলিল সুর করছেন দূরে গাছের তলায় বসে, "আহা ওই আঁকা-বাঁকা যে পথ"। আমি তো শ্যামল মিত্রের স্রোতে ভেসে গেয়ে উঠছি, "আপন নীড়ে ফিরে গেছে পাখি, নীড় হারায়ে আমি পথে থাকি"। এগুলো তো মিথ্যে নয়, বরং ভীষণ ভীষণ করে সত্যি বলে মনে হচ্ছে আমার। আমি যখন অনেক ভেবে ভেবে, একটা থিওরি খাড়া করে, মডেল বানিয়ে, তার ওপর একটা সিস্টেম তৈরী করছি, কোড লিখে - আমার যে ভীষণরকমভাবে সেটাকে রিয়েল, আদ্যোপান্ত সত্যি মনে হচ্ছে। অথচ ফেসবুকের মধ্যে যে কোনোরকম রিয়েলিজম পাচ্ছি না। কেউ যে সেখানে সত্যি কথাটা বলছে না। সক্কলে একটা ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের চেইনে, শৃঙ্খলে ঢুকে গেছে মনে হচ্ছে। এই কঠিন কৃত্তিম সত্যিটাকে যে একদম অস্বীকার করতে পারছি না।

তখনই দূরে দেখতে পাচ্ছি একটা কালো রঙের কাঠের চেয়ার, তার ওপর ধবধবে সাদা আলো ফেলা হয়েছে কোথা থেকে যেন, চারপাশে তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। কালো চেয়ারটায় একটা মূর্তি বসে আছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারছি, বোধ হয় তিনি বাদল সরকার। ওনাকে সহ্য করতে পারছি না, উনি আমাকে বারবার বলে যাচ্ছেন, "এক-দুই-তিন, তিন-দুই-এক", আমি দৌড়ে পালাচ্ছি। এসে পড়ছি একটা টিভির সামনে। সেই টিভিতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি খেলছে, কিংবা খেলতে পারছে না, কারণ বল পাস্ করার মতো কেউ নেই। সেখান থেকেই দূরে শুনতে পাচ্ছি, যেন রেডিও বাজছে, যেমন মামাবাড়িতে সকালবেলায় বাজতো, এখনো বাজে বোধ হয়। কি গান হচ্ছে ওখানে? ছুটে গিয়ে দেখছি এক সুপুরুষ বসে বসে গান বাঁধছেন, পাশে গিটার নিয়ে আমি বসে পড়ছি। বুঝতে পারছি উনি জসিমুদ্দিন, সুর দিচ্ছেন, "জ্বালায়ে চান্দের বাতি, আমি জেগে রব সারা রাতি গো; কব কথা শিশিরের সনে"। দেখছি আকাশে চাঁদ উঠছে, তার রুপোলি আলো পড়ছে নদীর বুকে, গাছের মাথায়। কি ভীষণ নরম হাওয়া আমার মুখে এসে লাগছে ! দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, অনেকে হেঁটে আসছেন আমাদের সুরমূর্ছনায় সঙ্গী হতে, কারা ওরা - চিনতে পারছি না, তবু অবয়বে মনে হচ্ছে, ওদের নামই তো সলিল, সুমন, মার্ক্স্, সত্যজিৎ, নোয়াম, ঋত্ত্বিক, গৌতম, শচীনদেব, পল সাইমন, এবং আরো কত চেনা-শোনা মানুষ। হ্যাঁ, এদেরই তো আমি চিনি। কিন্তু আমার জীবনের চারপাশের কাউকেই যে আর চিনতে পারছি না ! তার থেকেও বড়, তারা যে আমায় চিনতে পারছেন না।

Saturday, April 14, 2018

বাংলা গানের আধুনিকতা । Modernism in Bengali Songs (~১৩ মিনিট)

বাংলা গানের আধুনিকতা (~ ১৩ মিনিট)
---
ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, উৎপল দত্ত। সংস্কৃতির তিনটে ধারায় এই তিন বাঙালি ঠিক কি বিপজ্জনক কাজটা করেছিলেন, তা ৭০-এর দশক থেকেই মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়। ওনাদের সৃষ্টির মূলে যে অসন্তোষ, সে ধরণের কাজই আধুনিকতার সংজ্ঞা তৈরী করে, বারবার করেছে, সে আমরা যে যুগেই থাকি না কেন। পৃথিবীর যে কোনো জায়গার যে কোনো আধুনিক শিল্প বেছে নিলেই, এই সাহসী চিন্তাভাবনার ছোঁয়া দেখতে পাবেন। কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, সংস্কৃতির আধুনিকতার একটি সমান্তরাল উৎস, অনুপ্রেরণা লক্ষ্য করা যায়। অন্তরে বয়ে যাওয়া সেই আধুনিক সৃষ্টির ফল্গুধারাতেই কি খানিকটা চরা পড়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাসে? এখনকার বাংলায় যে শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে তা কি "আধুনিক" শিল্পের স্তরে উঠতে পারছে? বা এই শিল্প সমকালীন সমাজ বা অসন্তোষকে কি ধরতে পারছে? নেতিবাচক উত্তরের দিকেই কিন্তু পাল্লা ভারী রাখতে হচ্ছে। আরো বড় প্রশ্ন, যদি সত্যিই সেই আধুনিকতার জোয়ারে চড়া পড়ে থাকে, তার কারণটাই বা কি? এই লেখাতে সেটা খোঁজারই চেষ্টা করবো, তবে শুধুমাত্র সঙ্গীতশিল্প তথা গানের দৃষ্টিভঙ্গিতে। লেখাটা পড়া শুরু করবার আগেই বলে দেওয়া ভালো, আমি এখানে শিল্পকে আমার আধুনিকতার স্তর থেকে দেখছি, যা চারপাশের সমাজের কথা বলে, আবার মানবিকতার কথাও বলে। আধুনিকতার সামান্য অন্য সংজ্ঞাও আছে, তবে আমার সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক গানের কথাই বলতে চাইছি ; সেটা মাথায় রেখেই লেখাটা পড়া কাম্য।

একটু ইতিহাসের খোঁজে যেতে হবে আমাদের। বিংশ শতাব্দীতে বাংলা গানকে মার্গসংগীতের আড়াল থেকে বের করে এনে, রবীন্দ্রনাথ সকলের ঘরে পৌঁছে দিলেন, একান্ত ব্যক্তিগত করে। সেই সুরে রাগাশ্রয়ী সঙ্গীতের আড়ম্বর নেই। ফলে বাংলা গানের সুরের ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথকে এক বিপ্লব বলতেই হয়। তবে গানের কথার ক্ষেত্রে আমরা পেলাম, আধুনিকতার থেকেও বেশি অন্তরঙ্গতাকে। সেই গানগুলোর চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা, আনুগত্য হয়তো রবীন্দ্রনাথকে চিরআধুনিক করেছে শিল্পের কোনো এক আঙ্গিকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে সমসাময়িক সমাজকে ধরার চেষ্টা মূলত নেই; এটা অনেকাংশে মেনে নেওয়াই বাঞ্চনীয় বলে মনে হয়। তার থেকে অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, এবং সর্বোপরি কাজী নজরুল ইসলাম - তৎকালীন ভারতবর্ষের দৈন্য অবস্থা, গানের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা তাঁদের গানে শুনতে পাচ্ছি সদ্য জন্ম নেওয়া দেশাত্মবোধের ধ্বনি, অনেক বেশি করে। নজরুল "ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম" হয়ে বলছেন "কারার ওই লৌহ কপাট" ভেঙে ফেলার কথা। তখনকার সংগ্রামের বক্তব্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল নজরুলের সুরের বৈচিত্র্য, জটিলতা আর ধার। বিপ্লবের সমার্থক হয়ে উঠছেন নজরুল।

নজরুলের পরে একই ধরণের রাজনৈতিক মানসিকতার আবহে, সঙ্গীতের জগতে আমরা পাচ্ছি সলিল চৌধুরীকে। শুধু সলিলবাবুকে নিয়েও একাধিক প্রবন্ধ লেখা যায়। কিন্তু আমাদের বিষয়ের পরিসরে বললে, উনি বাংলা সংগীতের আধুনিকতাকে যেন নতুন মাত্রা দিলেন। আমার মতে, এখনো অব্দি কোনো বাংলা সুরকার-গীতিকার সলিল চৌধুরীর মতো বাস্তব-সচেতন কাজ করে যেতে পারেননি। সলিল চৌধুরী গান লিখছেন স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে, গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর সাথে কাজ করবার সূত্রে। তিনি তার বাংলা গানের সুরের মধ্যে এনে ফেলছেন বেঠোভেন, মোৎজার্টকে। সেটা যেমন নতুনত্ব, তেমনি তার কথায় উঠে আসছে চারপাশের বিপ্লবী আবহ। সলিল চৌধুরীর সুর আর কথা একসঙ্গে মিলে যে অভূতপূর্ব দ্যোতনা তৈরী করছে, তা মিটিং-মিছিলের উত্তেজক মেজাজ তৈরী করে দিচ্ছে। তার গানের কথায় আমরা সরাসরি অনুপ্রেরণা পাচ্ছি, "আহ্বান, শোনো আহ্বান"-এর মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের "আলোর পথযাত্রী" করছেন, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের শত হতাশার মধ্যেও। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের একত্রিত হতে ডাক দিচ্ছেন, "পথে এবার নামো সাথী।"

কিন্তু ১৯৪০-এ সলিলবাবু তো পরিচিত কোনো মুখ নন। তাহলে তিনি উঠে আসছেন কি ভাবে? আগেই বলেছি গণনাট্য সংঘের সঙ্গীতের ধারা তাকে তুলে আনছে। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন আন্দোলনের মঞ্চে উনি গান গাইছেন, কখনো কখনো হয়তো শুধুমাত্র একটা হারমোনিয়াম নিয়েই। হাজার হাজার মানুষ উদাত্ত কণ্ঠে একসাথে ওনার গান গাইছে। ওনার গান কিন্তু তখনও রেকর্ড হয়নি, শুধুমাত্র মানুষের কন্ঠ্যে সে গান জীবিত থাকছে। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আধুনিক শিল্পের এই পৃষ্ঠপোষকতা, শুধু গানে নয়, ছায়াছবি, নাটক, সবেতেই ছিল। ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত এমনকি মানিক বন্দোপাধ্যায় - সকলেই একসময় সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করেছেন। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাইরের রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, মহারাষ্ট্রে তখন IPTA-এর হিন্দি নাটক হচ্ছে। বলরাজ সাহানি, পৃথ্বিরাজ কাপুর তার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। যাই হোক, গানে ফিরে আসা যাক। 

সলিলবাবুর গান ১৯৫০-৬০-এর দশকে রেকর্ড হলো, তার পরেও মানুষকে তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে চেতনা যোগাচ্ছে, অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। এর মাঝে যে অন্য ভালো গান হচ্ছে না, তা কিন্ত নয়। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, নচিকেতা ঘোষ - দারুন সব সুর সৃষ্টি করছেন বাংলা ফিল্মে, কিন্তু তাঁরা গানের আধুনিকতাকে ছুঁতে পারছেন না, কথার বন্ধ্যাত্বে। এরপর ১৯৭০-এর টালমাটাল দশক পেরিয়ে আমরা পৌঁছচ্ছি ১৯৮০-এর দশকে। এই সময় একটি আমেরিকা-ফেরত যুবক চেষ্টা করছেন, আবারো বাংলা সংগীতে আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা যোগান দেওয়ার। ১৯৮৬ সালে "তোমাকে চাই"-এর মতো কিছু গান লেখার চেষ্টা করে অসফল হয়ে, আবারো ফিরে আসছেন ৯০-এর দশকে বাংলা সংগীতের খোলনলচে বদলে দিতে।

সুমনের মতো প্রিয়তমকে অভিবাদন জানানোর আগে মনে রাখতে হবে, ৯০-এর দশকের আগেই কিন্তু সুমনের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা হয়েছে, ৬০-৭০-দশকের নকশাল আন্দোলনে উনি প্রভাবিত হয়েছেন, লাশ বয়ে যেতে দেখেছেন কলকাতার মাঝে খাল দিয়ে। উনি আবারো শিল্প সৃষ্টি করছেন, বাস্তবের মধ্যে থেকেই, কিন্তু তার সাথে এক জীবনদর্শনও তার গানে ধরা পড়ছে। যে দর্শন একসাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বলে, শিহরিত হয় "লাল নিশান" দেখে, আবার এই স্বপ্নও দেখে যে "সেনাবাহিনী বন্দুক নয়, গোলাপের তোড়া হাতে কুচকাওয়াজ" করবে। আর এই গানকে প্রথম তুলে ধরছে সিপিএমের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল। শুভেন্দু মাইতির মতো কমিউনিস্ট আদর্শের মানুষ সুমনকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন, গান গাইবার মঞ্চ তৈরী করে দিচ্ছেন। এরপর ধীরে ধীরে সারা বাংলায় একটু একটু করে, সমস্ত ৯০-এর দশক জুড়ে ঘরে ঘরে আলোচনার বিষয় হয়ে যাচ্ছে, "মরবো দেখে বিশ্ব জুড়ে যৌথ খামার।" মনে রাখতে হবে, তখন সোভিয়েত ভেঙে গেছে, নকশাল আন্দোলন শেষ, কিন্তু তবুও বাঙালি সমাজ-বদলানোর গানকে স্বাদরে গ্রহণ করছে।

২০০০ সালের কিছু আগে, সুমনের পরে বাংলা ব্যান্ডের উত্থান হচ্ছে। সেখানে আমরা নতুন করে পাচ্ছি ৭০-৮০-এর দশকে তৈরী হওয়া কিছু গান, মহীনের ঘোড়াগুলির পৃষ্ঠপোষকতায়। বাংলার সমস্ত বিখ্যাত ব্যান্ডই স্বীকার করে যে, তাদের উত্থানের পিছনে মহীনের ঘোড়াগুলির প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ই অনুপ্রেরণা। সেই গৌতমবাবু আবার ৭০-এর দশকে কংগ্রেস সরকারের তাড়া খেয়েছেন নকশাল আন্দোলনের জন্য। তাঁর এবং রঞ্জন ঘোষালের গানেও যে "ওরা কাজ করে, গ্রামে বন্দরে, শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে-প্রান্তরে"- এসবের কথা উঠে আসবে, তা খুব স্বাভাবিক। বাংলা ব্যান্ডের উঠে আসার পিছনেও আমরা একই ধরণের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের ছোঁয়া পাচ্ছি। 

এছাড়া সিপিএম পার্টি থেকেও কিছু ক্ষেত্রে (পার্টির স্বার্থেই) আমরা আধুনিক শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা দেখতে পাচ্ছি, আরো বিশেষভাবে নচিকেতার উঠে আসার মাধ্যমে। সুভাষ চক্রবর্তী নচিকেতার গানকে সামনে আনতে সাহায্য করছেন; যদিও সুমনকে রোখার জন্যই নাকি নচিকেতাকে তুলে আনে সিপিএম - এমনটা শোনা যায়। কিন্তু পরে আবার নচিকেতার গান "আমি সরকারি কর্মচারী" - ব্যানও করছে সিপিএমের সরকার। একই কাজ হয়েছে সলিল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও। তাঁকেও পার্টির পক্ষ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে। কিন্তু এই যে বিকল্প শৈল্পিক ভাবনা গঠন করা এবং তাকে তুলে ধরা - এটা অসংগঠিতভাবে কমিউনিস্ট-ভাবধারার মধ্যে থেকে বাঙালি আত্মস্থ করেছিল। সংগঠিত এবং "রাষ্ট্রীয়" কমিউনিস্ট পার্টি পরে বারবার এই শৈল্পিক ভাবধারার বিরুদ্ধে গেলেও, বাঙালি তাঁর দর্শনটা হারায়নি। কোথাও যেন খুব অন্তরে, বাঙালি সামাজিকতার দর্শনকে লালন করেছে, যে দর্শন সমষ্টির কথা ভাবতে বলে, নিজের স্বার্থের থেকেও বড় উদ্দেশ্যের জন্য। তাই বারবার আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা আমরা পেয়েছি, কখনো তার নাম সুমন, কখনো সলিল, কখনো গৌতম। কোনো একটা উৎস ছিল এই সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের বিকাশ ঘটার। 

এবার এখনকার যুগে চলে আসুন। আমাদের সামনে এখন কেন্দ্রীয় সরকারে শুধু নয়, রাজ্যেও খুব বড় ক্রাইসিস। অথচ তার বিপক্ষে সংগীতের তেমন কোনো চলন নেই। ভালো গান হচ্ছে না, তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়টাকে ধরার বাসনাটা নেই। অথচ এখন YouTube-জাতীয় মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে গানের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আরো বেশি। কিন্তু সেই ধরণের শিল্পীকে আমরা যেন পাচ্ছি না। দীপাংশু প্যারোডি লিখছেন, বহু মানুষ শুনছেন। এর মানে, মানুষ কিন্তু সরকারের সমালোচনাটা শুনতে চাইছে। কিন্তু সেই শিল্পিত প্রকাশের পরিসরটা যেন কমে গেছে।

আমার মতে, এর একটা বড় দায় সিপিএমেরও। অনেকে ব্যঙ্গ করতে পারেন এই বলে যে, পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুর দায়ই তো সিপিএমকেই নিতে হয়। কিন্তু আগে যেভাবে গণসংগীত বা অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে দিয়ে সিপিএম সংস্কৃতিগত আধুনিকতার ধারক ছিল, সেই জায়গাটা সিপিএমের গণসংঠনগুলো হারিয়ে ফেলেছে। ৩৪ বছরের শাসনের জন্য সিপিএমের এই চলমান গতিতেও, মনে হয়, কোথাও যেন জং ধরে গেছিল। তাই একটা খুব বড় শূন্যস্থান তৈরী হচ্ছে, সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের।

সেটার আর একটা কারণ হতে পারে বিশ্বায়ন এবং individualism. সমগ্র পৃথিবীতে, এখন সকলেই খুব বেশি করে নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা এবং আশাপূরণের কথা ভাবছে। সেখানে সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা বড়ই দুর্লভ। বাংলাও এই বিশ্বজুড়ে চলা ট্রেন্ডের বাইরে নয় আর। তাই মানুষের মনে অসন্তোষ থাকলেও তা দানা বাঁধছে না, তা জমে কালো মেঘের গর্জনে পরিণত হচ্ছে না, যে মেঘ চিৎকার করে আহ্বান করতে পারে। যা সলিল করেছিলেন, যা শুনে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। তবে সময় এখনো যে চলে গেছে তা নয়, এই লেখাটার পরেও হয়তো আশার সূর্য আছে। সুমনের গান সকলের সামনে আসতে প্রায় কয়েক বছর সময় লেগে গেছিলো। কে বলতে পারে? হয়তো কোনো নতুন "সুমন", অন্য কোনো নামে, নিজের ঘরে গিটার বাজিয়ে দুঃসাহসী কোনো কথাকে সুরের জ্বালে বাঁধছেন না? অপেক্ষা করছি, আশা করছি, কেউ আবারো জেগে উঠবে, গেয়ে উঠবে:

"যখন প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ কি শান্তি,
আমাদের বেছে নিতে হয় নাকো ভ্রান্তি,
আমরা জবাব দিই শান্তি শান্তি শান্তি।
আর রক্ত নয় নয়!"

Friday, March 23, 2018

Ticking Time Bomb - Part 2 (~১৫ মিনিট)


মার্ক জাকারবার্গ প্রথমে নিজেও মানতে চাননি যে, ফেসবুককে এভাবে অন্য কোনো দেশ নির্বাচনী কৌশলে কাজে লাগাতে পারে। তবে তিনি আঁচ করতে পারছিলেন ফেসবুকের বিশাল manipulating power-টাকে। এমনকি তাঁর নিজের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা তৈরী হয়েছিল, আর তাই জন্যই ২০১৬-১৭-তে তিনি আমেরিকার ৫০টা রাজ্যের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্য ঘুরে ফেলেন। আসলে যে দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, সেখানে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা সকলের মনেই জন্মায়। আর মার্কের হাতে তো ছিল আমেরিকার প্রায় সকল মানুষ সম্পর্কে খুব বিস্তারিত তথ্যভান্ডার। সিলিকন ভ্যালিতে কানাঘুঁষো শোনা যায়, সেই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেই জাকারবার্গ বুঝেছিলেন যে ট্রাম্পের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তাঁরও যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। কিন্তু রাশিয়ান গ্রূপের খবর চাউর হওয়ার পর পরই জাকারবার্গ বুঝতে পারেন, ফেসবুকের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় নির্বাচনের মতো বিষয়ে অংশ নেওয়াটা অসম্ভব। তাই তিনি তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা মুলতুবি রেখে ফেসবুকে মনোনিবেশ করেন। তবে এই রাশিয়ানদের কথা জানাজানি হওয়ার পরও নাটকের কিছু অংশ বাকি ছিল।

ফেসবুকের কাছে আছে বিশাল তথ্যভান্ডার, তাতে আছে হাজারো মানুষের হাজারো গতিবিধি-সম্পর্কিত data। এবং এই তথ্য ভীষণ সেনসিটিভ। ফেসবুক জানে আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কাকে পছন্দ করছেন। ফেসবুক তার অজান্তেই তৈরী করে ফেলেছে ভয়ানক এবং দুরন্ত একটি মাধ্যম। এই যে বিপুল পরিমাণ তথ্য ফেসবুকের কাছে গচ্ছিত আছে, তা দিয়ে যে ঠিক কি কি করা যেতে পারে, তার আর কোন সীমা নেই। আপনি ফেসবুককে data দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকছেন, কিন্তু আপনার data থেকে আপনার বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন যে প্রভাবিত হতে পারেন, সেটা ভাবেননি হয়তো। বিজ্ঞাপন থেকে নির্বাচন ম্যানিপুলেশন - সমস্ত রকম কাজেই ব্যবহার করা যায় এই data। কিন্তু এই বিপুল তথ্য কি আদৌ সুরক্ষিত?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের চলে আসতে হবে 2018-এর মার্চ মাসে। তবে তার আগে বলুন, আপনি ফার্মভিল খেলেছেন ফেসবুকে বা এমন কোনো কুইজ খেলেছেন যেটা বলে দেবে আপনার প্রিয় বন্ধু কে, বা আপনার প্রোফাইল কোন বন্ধু কত বার চেক করেছে - এই ধরণের কিছু? তাহলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি - এসব আদৌ সুরক্ষিত কিনা সে বিষয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কেন? তার জন্য একটি ছোট্ট গল্প জানা দরকার।

কোগান নামের একজন বিজ্ঞানী মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে কয়েক বছর আগে। যারা গবেষণা করেন, তাদের জন্যে ফেসবুক এক ধরণের স্পেশাল অ্যাপ্লিকেশন (app) তৈরি করার পারমিশন দিত। রিসার্চাররা গবেষণার খাতিরে প্রচুর তথ্য ফেসবুক থেকে ডাউনলোড করতে পারেন সেই app-এর মাধ্যমে। তবে শর্ত একটাই, গবেষণা শেষ হওয়ার পরে সব তথ্য মুছে ফেলতে হবে। কোগান তাঁর রিসার্চের জন্য একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন, ফেসবুকের ভিতরে, অনেকটা ফার্মভিল গেম অ্যাপ্লিকেশন বা ওই কুইজ অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মতো, যেগুলো আপনারা অবসর সময়ে খেলে থাকেন। তিনি একটি নিরীহ প্রশ্নোত্তর app তৈরি করেন। কোগান তাঁর research grant থেকে কিছু টাকাও বরাদ্দ করেন কিছু লোকের জন্য, যারা প্রশ্নগুলোর সম্পূর্ণ উত্তর দেবেন। প্রায় ২,৭০,০০০ জন মানুষ সেই অ্যাপ ব্যবহার করেন।

এই অ্যাপ যখন কেউ ফেসবুকে খেলবে, সে তার নিজের ফেসবুকের data access-এর পারমিশনও দিয়ে থাকে সেই অ্যাপ টিকে। ফলত কোগান শুধু প্রশ্ন আর উত্তর নয়, সব অ্যাপ ব্যবহারকারীর ফেসবুক ডাটা-ও access করতে পারেন। বলা হচ্ছে, কোগান-এর সাথে এই সময়েই যোগাযোগ হয় একটি কোম্পানির, যার নাম Cambridge Analytica. এই কোম্পানিটি বিভিন্ন দেশে ভোটারদের প্রভাবিত করার কাজ করে থাকে, রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে। তারা কোগানের গবেষণার স্বার্থে ডাউনলোড করা ফেসবুক data কিনে নেয়। তবে তারা মাত্র ২৭০, ০০০ জন মানুষেরই data পেয়েছিলেন, তা নয়।

সেই সময়কালে ফেসবুকের সুরক্ষায় আরো গাফিলতি ছিল। কোনো একজন user-এর data-access permission পাওয়া গেলে, তার প্রায় সমস্ত বন্ধুদের অনেক তথ্যই পাওয়া যেত ফেসবুক থেকে। ফলত ২,৭০,০০০ জন মানুষের বন্ধুবান্ধবের নেটওয়ার্ক মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের data কোগান ডাউনলোড করে ফেলেন। Cambridge Analytica এই বিপুল তথ্য পাওয়ার পরে, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে খুব সুক্ষভাবে ভোটারদের প্রোফাইল, তাদের রাজনৈতিক পক্ষ সম্পর্কে ধারণা তৈরী করে। এর জন্য তারা সাইকোলজির আর এক প্রফেসরের গবেষণাকেও কাজে লাগায়, যাতে প্রায় নিপুনভাবে বলে দেওয়া যায়, কোন ভোটার মোটামুটি কি রকম ভাবছে। এর পরে যারা swing voter (নিরপেক্ষ অথবা দ্বিধাগ্রস্থ), তাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া হয় কার্যকরী বিজ্ঞাপন। Cambridge Analytica officially ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইলেকশন ক্যাম্পেইন-এ কাজ করে। আর এর ফল আমাদের সবার প্রাপ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে Cambridge Analytica বলছে, তারা শুধু আমেরিকা নয়, অনেক দেশেই তাঁদের data model-কে কাজে লাগিয়েছে, যেমন ব্রেক্সিটের সময় ব্রেক্সিটের পক্ষে, এমনকি ভারতেও।

নিউজ এজেন্সি চ্যানেল-৪ বলে একটি মিডিয়া এই সব তথ্য ফাঁস করে এই মার্চ মাসে, মাত্র কয়েক দিন আগেই। ফেসবুকের মার্কেট ভ্যালু এর পরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার নিচে নেমে যায় (যদিও শোনা যাচ্ছে, এসব আগে থেকে বুঝে মার্ক জাকারবার্গ তাঁর অংশের শেয়ারগুলি বেচে দিয়েছিলেন কিছুদিন আগে )। এই ঘটনার পরে মার্ক জাকারবার্গ একটি নিরামিষাশী ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। অবশ্য এর থেকে বেশি আর করারও কিছু নেই। কারণ ফেসবুক এই পুরো ঘটনা সম্পর্কে অনেক দিন আগে থেকেই জানতো। তারা নাকি Cambridge Analytica-কে "অনুরোধ"-ও করেছে বারবার data delete করে দেওয়ার জন্য। Cambridge Analytica এখন বলছে যে, তারা সেটা delete করেও দিয়েছেন। এই ছেলেভোলানো কথায় মার্ক ভুলতে পারেন, কিন্তু আপনি ভুলবেন কি? এতো সূক্ষাতিসূক্ষ মানুষের প্রোফাইলিং data কেউ মুছে ফেলবে? ডেমোক্রেসিকে নিয়ন্ত্রণ করার এতো সহজ উপায় হাতছাড়া কেউ করবে?

এই ঘটনায় ফেসবুকের data সুরক্ষা তো প্রশ্নের মুখে পড়েছে বটেই। কিন্তু ফেসবুকের হাতে যে এতো বৃহৎ একটা সম্পদ এসেছে, এর ঠিক ভবিষ্যৎটা কোথায়, আমার মনে হয় সে সম্পর্কেও ভাবার সময় এসেছে। আসলে ফেসবুক নিজেকে ধীরে ধীরে এতটাই বৃহৎ একটি মেশিনারিতে পরিণত করেছে যে, ক্রমশঃ তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। ফেসবুক শুধু এখন যোগাযোগের মাধ্যম তো নয়ই, এখন ফেসবুক দাঁড়িয়ে আছে মানসিক ব্যবহার ও গতিবিধি সম্পর্কে বিপুল তথ্যের সাগরের মাঝে। এই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত? কোন বেসরকারি সংস্থা - ফেসবুকের মত? তাহলে তার অবস্থা তো এরকম হবে, সে তথ্য বেচে দেবে নিজেদের মুনাফার স্বার্থে। তাহলে কি সরকার এই তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে? তাহলে তো সে তার নিজের জনগণকেই ম্যানিপুলেট করতে কাজে লাগাবে এই তথ্যকে? তবে এই তথ্যের সঠিক অধিকারী কার হওয়া উচিত? কোনো নন-প্রফিট, জনগণের একত্রিতভাবে অধিকৃত সমবায় সংস্থার? কিন্তু তার পরিচালন পদ্ধতিই বা কি হবে? এমনকি আরো বড় প্রশ্ন সমাজে ফেসবুকের ভূমিকাটা ঠিক কি হওয়া উচিত?

আমরা কেউই ঠিক জানিনা। ফেসবুক বলেছিলো আমাদেরকে আরো বেশি যুক্ত করবে একে অপরের সাথে। কিন্তু ফেসবুকের filter bubble-এর জেরে, আমরা একে অপরের আরো দূরে সরে গেছি। শুধু পছন্দ করছি যে মতাদর্শগুলো আমাদের মনোপূতঃ। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে তৈরি করেছি আরো বৈরিতা হিংসা ঘৃণা indifference। ফেসবুক যারা তৈরী করেছিলেন, (মার্ক বাদে) তাঁদের অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন ফেসবুক ছেড়ে দেওয়ার। ফেসবুক সামাজিক ও ব্যক্তিগত মানসিক দিকেও তর্কসাপেক্ষে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এখানে আমরা নিজেদের ইগোকে এক অসম উচ্চতায় নিয়ে চলেছি। অতীতকে পিছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে সাধারণ অগ্রগতিকে রোধ করে দিয়েছি। মাঝে মাঝেই ফিরে যাচ্ছি অতীতের প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে, যাদের অনেকদিনই ফেলে আসা উচিত ছিল, তারা এখনো পড়ে থাকছে জীবনে। আর এসবের মাঝে ফেসবুক গুঁজে দিচ্ছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী, রাজনৈতিক সংস্থার প্রোপাগান্ডা। আপনি আপাতভাবে ভাবছেন যে আমার data নিয়ে ফেসবুকের কিছুই করার নেই। অথচ, ফেসবুক তার থেকে ঠিক খুঁজে বের করে নিচ্ছে কোনটা দরকারি। আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতির পথে ফেসবুক ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা কেউ জানিনা। তবে এতো বিপুল তথ্যের মালিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনাটা বোঝা যাচ্ছে।

আর বোঝা যাচ্ছে যে, বোমাটা কিন্তু আমরা তৈরী করে ফেলেছি। ক্রমাগত শান দিয়ে চলেছি সেই বোমায়, যাতে ওটা আরো শক্তিশালী হয়। চীনারা এই বোমাটা এড়াতে পেরেছে, কিন্তু বাকি বিশ্ব এই বোমার মোহতে এগিয়ে চলেছে। আর আমরা সবাই অপেক্ষা করছি এর পরের বিস্ফোরণটা কখন হয়। তবে ম্যাজিকটা এখানেই যে, এই বোমার বিস্ফোরণের তীব্রতা খুব বেশি হয়েও, এটি অতি সুক্ষভাবে মানবসভ্যতাকে আক্রমণ করছে। তাই এই বোমাটা সঠিকভাবে যখন তার ভয়াবহ রূপ দেখিয়ে ফাটবে, তখন আমরা বোধ হয় নিজেদেরকে বোঝার অবস্থাতেও থাকবো না। ঠিক যেমনভাবে আমেরিকানরা পারেননি। স্রেফ অপেক্ষা করে যাবো পরবর্তী বিস্ফোরণটার জন্য।