Friday, August 31, 2018

"অরাজনৈতিক" আন্দোলন ও কলকাতা-কেন্দ্রিক নাগরিক সমাজ (~৫ মিনিট) । Apolitical Movements and Kolkata-based Civil Society

একবিংশ শতকের বয়েস বাড়ার সাথে সাথেই বাঙালির একটা প্রবণতা বেশি বেশি করে চোখে পড়ছে, "অরাজনৈতিক" হতে চাওয়ার প্রবল চেষ্টা। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অনাস্থাই হয়তো এর মূল কারণ। কিন্তু এই "অরাজনীতি" তাঁদের সাময়িক আরাম ছাড়া আর কিছু দিচ্ছে বলে মনে হয় না। উপরন্তু এই "অরাজনীতির" সুযোগ যখন কোনো রাজনৈতিক দল নিতে পারছে, তখন তারা লাভবান হচ্ছে। আর যখন তা হচ্ছে না, তখন কিছু গোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু সমস্যা ক্ষণিকের জন্য সমাধান হচ্ছে। অথচ "রাজনীতি" যদি সত্যিই দক্ষ এবং দায়িত্বপূর্ণভাবে করা যেত, তাতে কিছু ক্ষতি ছিল না, বরং একটা বৃহত্তর সমাজের ভালো হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল।

২০১৮ সালের জুলাই মাসে মেডিকেল কলেজের ঘটনা নিয়েও এই "অরাজনৈতিক" আকাঙ্খা আবারো দেখা গেল। মেডিকেল কলেজের হোস্টেল নিয়ে ছাত্ররা একটি আন্দোলন করছিলেন। তাঁদের দাবি না মানায় তারা একটি পলিটিকাল টুল হিসেবে "অনশন"-কে ব্যবহার করেন। দিন বাড়ার সাথে সাথে, কলকাতা এবং তার আশেপাশের অঞ্চলগুলো থেকে অনেক মানুষ এই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে আসেন। তাঁরা মেডিকেলে কলেজে উপস্থিত থেকে ছাত্রদের সমর্থন জানান। শেষ পর্যন্ত কতৃপক্ষ ছাত্রদের দাবি মেনে নেয়। তবে এই আন্দোলনের পিছনের রাজনৈতিক চরিত্রটা কলকাতার মানুষ বুঝতে চাইলো না। আন্দোলনটাকে একটি "অরাজনৈতিক" চরিত্র দিয়ে তার পাশে দাঁড়ানো হল। 

এই আন্দোলনকে একটু গভীর ভাবে দেখলে অন্য চরিত্র বেরিয়ে আসে। মেডিকেল কলেজের যে ছাত্র সংগঠন এই আন্দোলনটা পরিচালনা করছিলো, ডিএসএফ, তাঁদের দাবিতে এও ছিল যে, তৃণমূলের প্রাক্তন ছাত্রকে যে সুপার করা হয়েছে, তাঁকে রাখা যাবে না। বদলে ছাত্র-শিক্ষকের কাউকে রাখতে হবে। অন্তত ন্যায়সঙ্গত দাবি, এবং রাজনৈতিকও। দাবিটাকে একটু বড় করে দেখলে বোঝা যায়, সব জায়গায় তৃণমূলের পোষ্য লোক বসিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে এই দাবি। অনেক জায়গাতেই এখন এই সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন মানুষ। কিন্তু সব আন্দোলনকে "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া যায় না, সব আন্দোলনের এলিটিজম থাকে না, যা মেডিকেল কলেজের আছে। ফলে সেইসব আন্দোলন কোনো স্বীকৃতি বা বৃহৎ আকৃতি পায়না। অথচ মানুষের এখনই দরকার ছিল, এই ধরণের আন্দোলনগুলোকে একত্রিত করার। কিন্তু তা না হয়ে, এটা স্রেফ মেডিকেলের ছাত্রদের সাময়িক উপশম ঘটালো।

এখনকার এই ঘটনা যেমন দেখায় যে অরাজনৈতিক আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা, তেমনি উল্টো পিঠও আছে। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন হয়, তাকেও প্রথমদিকে এক "অরাজনৈতিক" রূপ দেওয়া হয়েছিল। কলকাতার সাধারণ মানুষ এবং "বুদ্ধিজীবী", শিল্পী সমাজ সেই আন্দোলনের সমর্থনে নেমে এসেছিলেন। যদিও এটা অরাজনৈতিক আন্দোলন একেবারেই ছিল না, পিছনে খুব ক্ষুরধার রাজনৈতিক মাথারা কাজ করছিলেন। মমতা ব্যানার্জি এই আন্দোলন থেকে নিজের পলিটিকাল মাইলেজ উদ্ধার করেন। আবার মাওবাদীরা - যাদেরকে দেশের সব থেকে বড় ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী - এই আন্দোলনের পিছনে তাঁদের অক্সিজেন খুঁজে পেয়েছিলেন। বাংলার সাধারণ মানুষ অজান্তে দেশের "বৃহত্তম ইন্টারনাল সিকিউরিটি থ্রেট"-কে সমর্থন করেছিল। এরপরে মমতা ব্যানার্জির শাসক চরিত্র উদ্ঘাটিত হওয়ার পরে, সেই বাংলাবাসীই হাত কামড়েছে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী করার জন্য। 

মূলত যেটা দেখা যাচ্ছে, বাঙালী "অরাজনৈতিক" হওয়ার চক্করে কখনো সুযোগ হারায়, কখনো ব্যবহৃত হয়। সম্ভবত ৭০-এর দশকে ছাত্রদের চরম রাজনৈতিক চরিত্রের ফলে যে করুন পরিণতি হয়, এবং হাজার হাজার ছাত্র-যুবরা মারা যান, তার কারণেই বাঙালী এখন রাজনৈতিক হতে ভীষণ ভয় পায়। বাড়ির বড়রাও বলেন ছাত্রদের রাজনীতির দিকে না এগোতে। যদিও এই ঘটনা খুব নতুন নয়, কিন্তু এর ফলগুলো নতুন নতুন করে বাঙালীকে সমস্যার মধ্যে রেখে দিচ্ছে। আমাদের শিবপুরে আমরা দেখেছি, কিভাবে কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের অরাজনৈতিক করার মাধ্যমে সমস্ত ধরণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিলেন। আমরা না বুঝেই "অরাজনৈতিক" হয়েছিলাম, তবে পরে উপলব্ধি করেছিলাম যে আমাদের বক্তব্য বলার মতো প্ল্যাটফর্মটা আমাদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হল। সে কারণেই মনে হয়, "অরাজনীতির রাজনীতি"-এর এই ধোঁকাটা বন্ধ হওয়া দরকার। "অরাজনীতি" বলে যে কিছু হয়না - সেটা বোঝা দরকার।বাঙালী যদি রাজনীতিটাকে অস্পৃশ্য করে না রেখে, সুস্থ এবং দায়িত্বশীল একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারতো, তাতে তাঁদের নিজেদেরই মঙ্গল হত। আশা রাখবো, ভবিষ্যতের আন্দোলনগুলো গঠনমূলক রাজনৈতিক পরিচিতি পাবে, এবং সেখান থেকে এক বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণের পরিসর গড়ে উঠবে।

Thursday, August 30, 2018

শিল্পকলা নিয়ে নোটস - ২ | Notes on Arts - 2

আগের নোটে শিল্পের ক্লাসিকাল এবং মর্ডান ধারার মধ্যে একটা মেলবন্ধনের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে, শিল্পের বিষয়বস্তু বোধগম্য না হওয়ার একটা কথা বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। সেটা নিয়ে একটু বিশ্লেষণ করা যাক।

শিল্পকে বুঝতে পারার জন্য যেমন নমনীয়, অনুভূতিপ্রবণ একটা মনন দরকার হয়, তেমনি একটা বিশ্লেষণী ক্ষমতাও লাগে। তবে সেই বিশ্লেষণী ক্ষমতার কথা বেশি করে ভাবলে শিল্প আর শুধু অরগ্যানিক একটা বস্তু থাকে না, যার সৃষ্টি নাকি কোনো এক অদৃশ্য শক্তি, ক্ষমতা বা অনুভূতির ওপর নির্ভর করে। এই বিশ্লেষণী ক্ষমতা শিল্পকে কিছুটা যান্ত্রিক বা মেকানিকাল করে ফেলে। একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

কোনো "ভালো" গানের কথা ধরা যাক, যেমন অঞ্জন দত্তের "বেলা বোস" বা ক্যাকটাসের "হলুদ পাখি"। আমরা যদি ভেবে নিই, এই গানগুলোর সুর তৈরি হয়েছে শুধুমাত্রই অনুভূতি দিয়ে, মানে অঞ্জনবাবু কোন মনখারাপের বিকেলে "বেলা বোস"-এর কথার সাথে সুর তৈরি করেছেন, তাহলে হয়ত শিল্পের একটা আলাদা বায়বীয়তা, মাধুর্য, স্বর্গীয় ভাব তৈরি হয়। কিন্তু আমরা একটু গভীরে গিয়ে দেখবো যে, এই দুটো গানেই শুধুমাত্র ডি মেজর key-এর বিভিন্ন কর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। হয়তো অঞ্জনবাবু বা ক্যাকটাসের মনে মনে হৃদয় থেকেই ডি মেজরের কর্ড গুলোই এসেছে। কিন্তু আমাদের এটাও দেখতে হবে যে, এরকম একটি স্কেলের মেজর কর্ড গুলো মানুষের কানেও শ্রুতিমধুর হিসেবে শোনায়। সেই সূত্র ধরেই এনারা পুরো গানের সুরটাকে বেঁধে ফেলেছেন।

এভাবে শিল্পের বিশ্লেষণ করতে বসলে দেখা যায়, প্রত্যেক শিল্পেরই কিছু ব্যাকরণ আছে। গানের যেমন major বা minor key-এর কর্ডস। এই ব্যাকরণ দিয়েই প্রত্যেক শিল্পের আলাদা কিছু ভাষা তৈরি হয়। যখন কোনো শিল্পী সেই ভাষায় কথা বলে কোনো শিল্প সৃষ্টি করছেন, তখন আমাদের কাছে তা ভীষণ ভালোলাগার এনে দিচ্ছে, যদি আমরা সেই ভাষা বুঝতে পারি। কিন্তু যখন আমরা সে ভাষা বুঝতে পারছিনা, তখন সেই শিল্পকে আমাদের গ্রহণ করতে সমস্যা হচ্ছে। সে জন্য পন্ডিত আমীর খাঁ-এর "সাহানা" রাগ আমাদের কারো কারো কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ কেউ ওই রাগের যে ভাষা, তার স্বাদ বুঝতে পেরে তার শিল্পরসে ভেসে যাচ্ছেন।

শিল্পের এই ভাষা শেখানোর জন্যই আজকাল বিভিন্ন আর্ট স্কুলগুলো তৈরি হয়েছে। এই স্কুলগুলিতে প্রচলিত শিল্প-ভাষাগুলি শেখানো হয়ে থাকে। তাই কেউ যদি কোনো শিল্পের সম্পূর্ণ মাদকতা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক হয়, তাহলে সে এই আর্ট স্কুলগুলোর শরণাপন্ন হতে পারে, অথবা নিজে থেকে সেইসব ভাষাকে রপ্ত করার চেষ্টা করতে পারে। তবে প্রচলিত ভাষা যেমন আছে, তেমনি সেই ভাষাকে ভেঙে দেওয়াও আছে।

আমরা যদি সত্যজিত কে দেখি, তাহলে দেখতে পাবো, সিনেমার ভাষা মেনে নিয়ে তিনি অকল্পনীয় কিছু সিনেমা তৈরি করে গেছেন। তার সিনেমাগুলো তখনকার ওয়েস্টার্ন ফিল্মের যে ভাষা, তার সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ। সত্যজিৎ নিজেও একাধিক সাক্ষাৎকারে তার এই ওয়েস্টার্ন ফিল্মের অনুপ্রেরণার কথা বলেছেন। বিপরীত দিকে আছেন ঋত্বিক। তিনি সিনেমার সব প্রচলিত নমনীয় ভাষা, ন্যারেটিভ ভেঙে দিচ্ছেন। ফলত প্রথমে মানুষ সেই ভাষাকে নিতে পারছেনা। কারণ একটা নতুন ভাষা বুঝতে পারা তো বেশিরভাগ জনগণের পক্ষে সম্ভব নয়। তারা ঋত্বিক-এর বেশিরভাগ ফিল্মকে পছন্দ করেছেন না। কিন্তু "যুক্তি তক্ক গপ্প" একটা ল্যান্ডমার্ক ফিল্ম হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে, আর এ জন্যই ঋত্বিক এর ছবিগুলোকে এখন বিভিন্ন ফিল্ম স্কুলে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়ে থাকে। যাতে শিক্ষার্থীরা এই ভাষা সম্পর্কে অবগত হতে পারেন।

এর পরে প্রশ্ন আসতে পারে, শিল্পীরা তাদের শিল্পের উৎস ঠিক কোথা থেকে পেয়ে থাকেন। যে কোনো শিল্পের উৎকর্ষতা তো সেই শিল্পের সততা আর তার ভাষার উপর নির্ভর করলো। কিন্তু সেই উৎকর্ষ শিল্পের অনুপ্রেরণা কোথায়? এ নিয়ে পরের নোটে ভাবার চেষ্টা করবো।
(চলবে)

Wednesday, August 22, 2018

কাউকেই চিনি না - Don't know anyone!

Boston, 22-Aug-2018, 10:00 PM

আমার কোনো মুসলিম বন্ধু নেই,
আমার কিছু বন্ধু আছে যারা মুসলিম,
আমার কিছু বন্ধু আছে যারা ঈদের দিন নতুন জামাকাপড় পরে,
কখনো আমাকে সুস্বাদু বিফ খাওয়ায়।
আমার কোনো হিন্দু আত্মীয় নেই,
আমার কিছু আত্মীয় আছে যারা পুজো-আচ্চা করে,
ভালো সিন্নি বানায়।
আমার কোনো বিহারী সহপাঠী ছিল না,
আমার কিছু বন্ধু আছে যারা আমায় প্রথম লিট্টি খাইয়েছিল।
আমার কোনো চেনা মাড়োয়ারি দোকানদার নেই,
পাড়ার মিষ্টির দোকানের মালিক জাগেতিয়া বাবু
আমার প্রিয় মিষ্টির খোঁজ রাখেন,
ওনার কাছে ওদের জয়পুরের বাড়ির গল্প শুনেছি।
আমি কোনো তামিল ছেলেকে চিনিনা,
তবে আমার রুমমেট আমাকে নিখুঁত ধোসা বানানো শিখিয়েছে।
আমি কোনো পাকিস্তানী মেয়েকে চিনিনা,
আমেরিকায় আমার ল্যাবমেট আমার সাথে হিন্দিতে লাহোরের গল্প করে।
আমার কোনো মেক্সিকান কলিগ নেই,
পাশের কিউবিকলের ছেলেটার জানে কোথায় ভালো টাকো পাওয়া যায়,
আমরা মাঝে মাঝে একসাথে খেতে যাই।

আমি আজকাল কাউকেই চিনিনা,
আমি শুধু কিছু মানুষ চিনি, মান-হুঁশ।

Sunday, August 19, 2018

শিল্পের আধুনিকতা নিয়ে নোটস - ১ | Notes on Modernity of Arts - 1

ভাবনাগুলোকে অক্ষরে চালান করতে করতে বুঝতে পারছি এগুলো মূলত নোটস। সেরকমই শিল্প আর তার আধুনিকতা নিয়ে বহুদিন ধরেই মনের মধ্যে ভাবনার অযাচিত দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। তা বয়ে বেড়াতে বেড়াতে বেশ ক্লান্ত। এ নিয়ে বেশ কয়েকজনের সাথে অনেক বার আলোচনাও হয়েছে। এবার বোধ হোয় এই ভার নামিয়ে রাখার সময় হয়েছে, সুতরাং লিখন।

শিল্পকে এক হাজার ফুট উঁচু থেকে মূলত দুই ধারায় ভাগ করে নেওয়া যায় - ক্লাসিকাল আর মডার্ন। ক্লাসিকাল এর কথায় পরে আসছি। আধুনিক এর কথা দিয়ে শুরু করি, খুব সাবজেক্টিভ একটা ব্যাপার। বাংলা গানের আধুনিকতা নিয়ে লেখাটায় বলেছিলাম যে, সমসাময়িকতা আমার কাছে আধুনিকতার সংজ্ঞা বয়ে আনে। তাই সলিল চৌধুরী যখন কৃষকদের জমির অধিকারে স্বাধীনতার পরেই "হেই সামালো ধান" লিখছেন, আমার কাছে উনি ভীষণ আধুনিক হওয়ে উঠছেন। বব ডিলান যখন বিশ্বের নাগরিক অধিকারের জন্য, সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লিখছেন, "টাইমস দে আর চেঞ্জিং", তিনি আমার কাছে ভীষণ পরিমাণে "আধুনিক"। আমি প্রধানত আধুনিক শিল্পকেই ভালোবাসি। ক্লাসিকাল এর প্রতি আমার তেমন আসক্তি নেই।

ক্লাসিকালকে এ হেন বুড়ো আঙুল যখন দেখাচ্ছি, তখন তার পিছনে অনেকগুলো কারণও আছে। নিখিল ব্যানার্জী যখন "মেঘ" রাগে পরিবেশমন্ডলীতে গভীর নিম্নচাপ তৈরি করেছেন, আমি আধঘন্টার জন্য সেই আবহাওয়াতে মিশে যাচ্ছি বটে। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না, কি হচ্ছে! উনি যে কোথা দিয়ে আমাকে নিয়ে চলেছেন, সেই রাস্তাই চিনতে পারছি না। এই যে বিমূর্ততা, এটাই তো ক্লাসিকাল শিল্পের প্রাণ ভোমরা। এই বিমূর্ততা কে আমি ধরতেই পারছিনা, আমার অপারগতা। তাই ক্লাসিকাল শিল্পকে আমি আমার শিল্প বলে ভাবছিনা। ঠিক পছন্দ করতে পারছিনা।

এসব বলার পরে, জর্জ বিশ্বাস যখন "আকাশভরা" শুরু করছেন তখন তো আমি মহাবিশ্বের সাথে নিজেকে আর আলাদা করতে পারছিনা। তখন আমি, রবীন্দ্রনাথ, জর্জদা - একসাথে বসে আছি আমরা। সকলে মিলে পথের পাঁচালী দেখছি। যা কিনা আদ্যন্ত একটি ক্লাসিকাল ছবি, অন্তত আগে বলা আধুনিকতার সংজ্ঞা অনুযায়ী। তাহলে আধুনিকতার একটা নতুন সংজ্ঞা বানাতে হয়, কারণ শুধু সমসাময়িকতা দিয়ে আধুনিকতাকে আর বেঁধে রাখা যাচ্ছে না। এই নতুন সংজ্ঞায় নিয়ে আসতে হচ্ছে "খোঁজ"।

চন্দ্রিলবাবুর বক্তব্যকে একটু বিস্তৃত করে বলা যায়, যে শিল্পের মধ্যে এক নিরন্তর সন্ধান চলেছে, সেই শিল্পই আধুনিক। সে খোঁজ নিজেকে চিনতে পারার হতে পারে, বা শিল্পকে উত্তরণের হতে পারে অথবা কোনো এক বিমূর্ত খোঁজ, যা কিনা আসলে সন্ধান পাবার পরও বিমূর্ত থাকবে। সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী ক্লাসিকাল শিল্পভাবনা এক চূড়ান্ত আধুনিকতায় পরিবর্তিত।

পন্ডিত আমীর খান "বসন্ত" রাগে যখন বিস্তার করছেন, তখন তো মনে হচ্ছে উনি খুঁজে বেড়াচ্ছেন সেই সর্বশেষ অনুভূতিকে যা বসন্তকে বয়ে আনবে। যে বসন্তের ছায়াছবি তাঁর মনে, হৃদয়ে, মস্তিষ্কে খেলা করছে, সেটাকেই সুরের মধ্যে প্রকাশের এক সর্বোত্তম চেষ্টা। সেই আল্টিমেট অনুভূতিকে নিরন্তর রূপ দেওয়ার চেষ্টাই সার্থক করে তুলছে ক্লাসিক্যাল শিল্পকে। কিন্তু কোনো শিল্পই তো সার্থক নয় এই সন্ধানটুকু ছাড়া। সত্যজিৎ- এর অন্যতম "আধুনিক" কীর্তি, প্রতিদ্বন্দ্বীর শেষ দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। সেই ছোটবেলার নাম-না-জানা পাখির ডাকটা। সেটারই তো খোঁজ সারা ছবিটা জুড়ে। ওই মিষ্টি ডাকটা, ওই সরল ডাকটা, যেটার মধ্যে লুকিয়ে আছে সব অন্তর্দ্বন্দ্বের অবসান। সেটার সন্ধানেই তো কি ভীষণ আধুনিকতা সত্যজিৎ-এ।

এই পর্যন্ত এসে ক্লাসিকাল আর আধুনিক সম্পূর্ণ মিলিয়ে মিশিয়ে ফেলেছি। নবারুণ এর ছোট গল্প কিস্যু বুঝতে পারছিনা। অথচ মানুষটি কি ভীষণ "আধুনিক"। ওনার কবিতা দিয়েই তো আশা নিয়ে বাঁচছি, চেষ্টা করছি, যেন "একটা কথার ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে" পড়ে, হোক সারা সহর উথাল পাথাল। আধুনিকতা তছনছ করে দিক চারপাশের এই মেকী পরিপাট্য। এবং তার পরেই হয়ত একটা নতুন সূর্য উঠবে, "লাল সূর্য" পূর্ব দিকে। সব কিছু তখন কোমলতায় ভরে গেছে। পন্ডিত আলী আকবর খাঁ তখন ভৈরবী বাজাচ্ছেন। রাগেদের সাথে নাকি অনেকটা সময় কাটাতে হয়, তবেই নাকি তাদের বোঝা যায়। আমিও হয়ত একটু একটু করে বেশি সময় কাটিয়ে, রাগসহ অন্যান্য ক্লাসিকাল শিল্পের বিমূর্ততা একটু একটু করে বুঝতে শুরু করবো। যেখানে অন্তর্দ্বন্দ্বের সাথেই সহাবস্থান করবে পরিতৃপ্তি বা রেসোলিউশন।
(চলবে)

Sunday, June 17, 2018

পর্দার ওপারে - On the other side of the curtain

Austin, Texas, 18-Jun-2018, 2:17 AM

দুঃখ তখন বৃষ্টি ফোঁটায়, খুব ক'রে মেঘ ঈশান কোণে,
বাদল ঘনায় মনের কনায়, তবুও যেন কেউ না জানে। 

সবাই কেমন বহিরাগত, ভিতরপানে চায় না কেউ,
মনেই গড়া মস্ত দেওয়াল, আটকে দিচ্ছে সুজনকেও।

বয়স হওয়ার অধীর ভারে চুঁইয়ে পড়ছে বিষন্নতা,
কাছের মানুষ, দূরের মানুষ - ভীষণরকম একাত্মতা।

মনের সাথে একলা থাকার এই আদুরে গল্পখানি,
মেঘলা হাওয়ার স্পর্শ লেগে একটুমতো অভিমানী।

Wednesday, June 06, 2018

সাম্যবাদী গণতন্ত্র - Communist Democracy

টুকাইয়ের বাড়িতে মাটির ওপর আসন পেতে বসে স্টিলের থালায় মাংস-ভাত খাচ্ছিলাম। ওর মা সামনে বসেছিলেন। সবশেষে টমেটোর চাটনিও ছিল, কাকিমা বেশ সুন্দর বানিয়েছিলেন। সেবারে টুকাইয়ের জন্মদিনে বেশ মজা হয়েছিল, সাজ্জানলালও এসেছিল। আমি একটা পেন্সিলবক্স উপহার দিয়েছিলাম টুকাইকে, তাতে কয়েকটা খুব সুন্দর পেন্সিল ছিল। তার আগের দিনই ওকে অঙ্কের মাষ্টারমশাই আলম স্যার ক্লাসের বাইরে নীল ডাউন করিয়ে দেন, ক্লাসে লেখার সময় ওর নিজের পেন্সিল না থাকায়। সেজন্যই বোধ হয় ওর খুব পছন্দও হয়েছিল পেন্সিলবক্সটা। ও খুব খুশি ছিল সেবার। আমাদের দুপুরের খাবারের একটু আগেই কেক কাটা হয়েছিল; এই পাশেই, ওদের শোয়ার ঘরে। অবশ্য যা ওদের শোয়ার ঘর, সেটাই ওদের বসার ঘর, সেটাই আমাদের ট্রাম্প কার্ড খেলার ঘর - সবই ওই এক ঘর। কারণ ওদের একটাই ঘর ছিল তখন, এবং সেটাই ওদের পুরো বাড়ি। বাইরে যে ছোট্ট মত জায়গাটায় আমরা খাচ্ছিলাম, সেই ছোট্ট মতো জায়গাটাতেই ওর মা, মানে কাকিমা রান্না করতেন। খেয়ে নিয়ে একটু গল্প করেই আমরা সেদিন স্কুলের মাঠে খেলতে চলে গেছিলাম, দৌড়ে দৌড়ে।

দৌড়োতে দৌড়োতে আমি ২৩বি নম্বর গেট-এ পৌঁছলাম, কিন্তু গিয়ে দেখলাম প্লেন ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। অবশ্য টুকাই দৌড়ে ৩৪ বি বাসটা ধরে ফেলেছিল ধর্মতলার মোড়ে, কে.সি.দাশ-এর অপোজিট-এ। এভাবে কিছু ট্রেন আমরা মাঝে মিস করেছি, কিছু প্লেন ধরে ফেলেছি। ঠিক মতো জানি না, টুকাই ঠিক কোন কোন ট্রেন বা বাসগুলো ধরতে পেরেছিল বা পারেনি। তবে এটুকু বুঝেছিলাম, আমার জন্য যে ট্রেনগুলো ছিল, সেগুলোর নাগাল পায়নি টুকাই। ওর আর্থিক অবস্থা থেকে পাওয়ার কথা ছিল না। হয়তো আমার ছোটবেলার বন্ধু সাজ্জানলালও কিছু একটা কাজ জুটিয়ে নিয়েছে এতদিনে, যদিও ওর একটা পা-এ সামান্য সমস্যা ছিল, খুঁড়িয়ে হাঁটতো। ওর আর কোনো খোঁজ পাইনি স্কুলের পরে, যেমন সামিউল-এরও পাইনি। টুকটাক কিছু খবর ছাড়া অন্য খবর পাওয়ার কথাও ছিল না। কারণ আমি ধীরে ধীরে আলোর দিকে চলে এসেছি। আর আমরা যখন আলোয় থাকি, অন্যদের স্রেফ কিছু সংখ্যায় পরিণত করি। তাই পেপারে আলাউল, টুকাই, সাজ্জানলালদের সম্পর্কে combined কিছু তথ্য পেয়েছি। বুঝতে পেরেছি ওদের জন্য কিছু উন্নতি হচ্ছিলো, আর অনেক কিছু বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।

আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম আমাদের কাছাকাছি ও ব্যক্তিগত উন্নতিটা। একটা সময় মা উনুনে রান্না করতো, তারপর একদিন গ্যাসে এসে গেল। অন্যের বাড়ি থেকে আমাদের নিজেদের বাড়ি হচ্ছিল। টুকাইরা মাটি আর বাঁশের ঘর ছেড়ে পাকা ভাড়া-বাড়িতে উঠে আসছিল। কিন্তু এসবের পিছনের কাহিনীটা আরো পরে ধরতে আরম্ভ করি। সরকার থেকে চাকরি হচ্ছিল অনেকের, আমার বাবা-মা-আত্মীয়রা এই পরিবর্তনটার সাক্ষী ছিল। কিছু বেসরকারি চাকরিও দেখছিলাম। কিন্তু চাকরি তো এমনি এমনি হতে পারে না। এর পিছনে চলছিল লাগাতার আন্দোলন, শ্রমের অধিকার এবং মূল্যের জন্য। অনেক মানুষ মাঠে-ঘাটে নেমে এই আন্দোলনটা করছিলেন। তারা সত্যিকারের শ্রমের মূল্যের তত্ত্ব কতটা বুঝেছিলেন, জানিনা। কিন্তু তাঁরা নিজেদের জীবন দিয়ে শ্রমের প্রকারভেদ এবং নিজেদের সামাজিক অবস্থানটা যথার্থই উপলব্ধি করেছিলেন। তাই তাঁদের আন্দোলনের দিশাও ছিল, প্রাপ্তিও ছিল। একই জিনিস হচ্ছিল একটু গ্রামের দিকে, চাষিদের বাড়িতেও। মুশকিল হল - তাঁরা সকলেই বাস করছিলেন একটা গণতান্ত্রিক দেশে এবং আন্দোলন করছিলেন সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে।

আন্দোলনকারীরা তাঁদের যথার্থ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে যে স্বচ্ছলতাটা আনলেন তাঁদের জীবনে, সেটা সকলের জীবনেই আনা সম্ভব ছিল না। কাজ কখনো একেবারে, একটা প্রজন্মের আন্দোলনে শেষ হতে পারে না, তার জন্য অনেকটা সময়, অনেকগুলো যুগ লাগে। ফলে অনেক মানুষ, এর পরেও, পিছনেই পড়ে রইলেন। কিন্তু একটা প্রজন্মের আন্দোলনের বয়ে আনা স্বচ্ছলতা একটা বৃহৎ গোষ্ঠীকে মূলত পঙ্গু করে দিল। এই খুব বড় জনগোষ্ঠীই হল আমাদের সোনার মিডল ক্লাস, মানে আমরা যারা মধ্যবিত্ত। আমরা একটা আপাত সুখের মাঝে বড় হলাম; বাবা-মা তাঁদের স্বভাববশত, তাঁদের কষ্টটা আমাদের কাছে যথাসম্ভব চেপে রাখলেন। আমরা বড় হয়ে কেউ প্লেন ধরলাম, কেউ ছুটে গিয়ে বাস ধরলাম। এইভাবে আমরা নিজেদের আরো উপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করলাম বটে, কিন্তু অনেকেই এই দৌড়টায় পিছিয়ে পড়লো।

যারা পিছিয়ে পড়লো, তারা মনে করলো, তাঁদের পিছিয়ে পড়ার কারণ তাঁদের নিজেদের অক্ষমতা। অথচ আমরা যে সেই একই সমাজব্যবস্থায় বাস করছি, সেটা অনেকেই খেয়াল করলাম না। নাহ্, একটু ভুল বললাম, ঠিক একই সমাজব্যবস্থায় আমরা আর বাস করছিলাম না। একটা বৃহৎ গোষ্ঠী, যারা আমাদের আগের প্রজন্মে সক্রিয় ছিল, তারা এখন নিজেদের অক্ষম বলে ভাবতে শুরু করেছে। তাই ব্যবস্থাটাকে আর একই বলা যাচ্ছে না। এই এখনকার অক্ষম গোষ্ঠীটাতেই আগে ছিল আমাদেরই বাবা-মা-আত্মীয়রা, তাঁদের যুবক-সত্ত্বায়, যারা তখন মাঠে-ঘাটে নেমে আন্দোলনটা করছিল, শ্রমের অধিকারের জন্য, সঠিক চাকরির জন্য। কিন্তু আমরা বড় হয়ে সেই চাকরিটাকে হয় নিজেদের অধিকার অথবা চাকরি না-পাওয়াটাকে নিজেদের অক্ষমতা বলতে শুরু করলাম। ফলে যে গোষ্ঠীটা খুব সক্রিয় ছিল নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে আনায় বা প্রতিষ্ঠিত করায়, সেই গোষ্ঠীটা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেল।

পুরোপুরি বিলুপ্তও বলা যায় না, বলতে হয়, সেই গোষ্ঠীটা ছন্নছাড়া হয়ে গেল। সেই গোষ্ঠীর কিছু লোক এখন ব্যাঙ্গালোরে হুইস্কি সহযোগে হাহুতাশ করে মমতা ব্যানার্জির শাসন নিয়ে, অথবা নন্দনে বিকেলবেলা হাওয়া খেতে খেতে সিপিএম-এর করুন দশা নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, অথবা আমেরিকায় বসে এরকম একটা লেখা লেখে। এরা কিছুটা সচেতন সমাজের এই (অধঃ)গতিটা সম্পর্কে এবং সেখানে নিজেদের কিছু করতে না-পারার ব্যর্থতা সম্পর্কে। কিন্তু যেহেতু এদের আগের প্রজন্ম এদের একটা স্বচ্ছলতা দিয়েছে, একটা পরিসর দিয়েছে নিজেদের ব্যক্তিগত স্বপ্ন-চাহিদাগুলো পূরণ করার, তাই তারা মূলত উদাস এবং প্রমাণসাপেক্ষে অপারগ, এই সমস্যা নিয়ে কিছু করার উদ্দ্যশ্যে।

এর পরও পড়ে থাকছে এই বৃহৎ গোষ্ঠীর আর একটা মূল উপগোষ্ঠী। যাদের এখনো সেই চাকরিগুলো দরকার, যেগুলো সক্রিয় আন্দোলন এবং সঠিক উন্নয়ন থেকে উঠে আসতে পারে। এই হল সেই গোষ্ঠীটা যারা গণতন্ত্রের এবং সর্বোপরি সাম্যবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে উঠে আসা স্বচ্ছলতার শিকার। এরা এখন হয় শাসক দলের তাবেদারী করতে বাধ্য বা সিভিক পুলিশে নাম লেখাতে। এদের কাছে সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তেমন কোনো উপায় নেই। কারণ এরা জানেনা, আন্দোলন করার মানে, এদের বড় হওয়ায় হয় মিশে আছে সামান্য শৌখিনতা, অথবা স্বচ্ছলতার মেদুর স্বপ্ন যা ২০০৩-০৪-এর "Shining India"-এর মতোই সত্যি। সেই স্বপ্নে কোনো আক্রোশ নেই, বাসনা নেই, শুধু আছে চাতকের চাহুনি। আর সেই চাহুনি চেয়ে আছে সমাজবাদী, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে, যা খানিকটা "সুখী" আন্দোলনে পর্যবসিত। তবে প্যারাডক্সটা এখানেই যে, সফল আন্দোলনের মূল জ্বালানি যে অনুভূতিটা, সেই আক্রোশ বা ক্রোধ নামক আবেগটা এখন প্রায় অনুপস্থিত এই গোষ্ঠীর ভিতর। ফলে আমরা কোথাও আটকে গেছি একটা ডেডলকের মধ্যে। কেউ কোনোদিকে চলতে পারছি না, কেউ দৌড়োতে পারছি না, কেউ মাটির কাছাকাছি যেতে পারছি না। আমরা শুধুই মাটির ওপরে সুন্দর হাতের কাজ-করা আসনটুকু দেখতে পাচ্ছি, পেতে চাইছি; ওর উপর বসে মাংস-ভাত খাওয়ার স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু আসনটা যে মাটিতেই বিছিয়ে দিতে হবে, এবং তার জন্য আসনটাকে যে মাটি ছোঁওয়াতেই হবে - সেটা মেনে নিতে রাজি হচ্ছি না। বর্তমান শাসকেরাও চান না আমরা রাজি হই, কারণ তারা এই পঙ্গু গোষ্ঠীটাকে ভোট জেতার মেশিনারি হিসেবেই কাজে লাগাতে ব্যস্ত। সাম্যবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন আমাদের যে দৌড়টা দিতে শিখিয়েছিল, আমরা খুব সহজে ভেবে নিয়েছি যে, তার বোধ হয় কোনো ফিনিশিং লাইন আছে। কিন্তু সেটা তো ছিল না, সেটার একটা চিরন্তন বহমানতা থাকার কথা ছিল। অথচ আমরা সেই কাল্পনিক ফিনিশিং লাইনে এসে অপেক্ষা করছি, আশা করছি, একটা উন্নততর পৃথিবীর, যেটাকে মরীচিকা ছাড়া আর কোনো ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও সাম্যবাদী আন্দোলনের এটাই বোধ হয় সব থেকে বড় পরিহাস।
---

আলোচনা ও ভাবনা সহায়তা: শুভাশিস পাত্র

শুভাশিসের মন্তব্য: তোর এই লেখাটা পড়ে আমার মনে যে টা সব থেকে বেশি টাচ করেছে সেটা হল 'গোষ্ঠী'। শ্রেণী নয়। একদম ঠিক। যতদুর মনে পড়ে প্রথম বামফ্রন্ট সরকার এর পর থেকেই শ্রেণী চেতনা হারিয়ে গেছে এসেছে গোষ্ঠীবাজি। তুই সেটাই দেখেছিস।
তোর দেখাটা সত্য। বামফ্রন্ট সরকার যখন থেকে কাজের সুযোগ তৈরী করতে সক্ষম হল, তখন আন্দোলনটা গোষ্ঠীগত আন্দোলন হয়ে গেছে, শ্রেণীগত চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা কায়েম করার তাগিদে ভুলে গেল তুলনামূলক ভাবে অগ্রসর শ্রেণী এর সিংহ ভাগ সুযোগ আত্মসাৎ করবে। হলও তাই। সেই ব্রাহ্মণ্যবাদ থেকে মুক্তি পেতে ultimately মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর উদয় হলো। কিন্তু সেটাও মরিচীকা।

Sunday, June 03, 2018

সংরক্ষণ বন্ধ করার আগে - Before abolishing caste-based Reservation

দীপক মন্ডল ক্লাসের মাঝারি মাপের ছাত্র। প্রথমবার সরকারি চাকরির পরীক্ষায় বসে ভালো ফল করতে পারেনি। যদিও সংরক্ষণের সুবিধা অনুসারে তার চাকরি হয়ে যায়, কিন্তু সে কখনোই ওই সুবিধে নেয়নি। তাই অনেক খেটে, পড়াশোনা করে দ্বিতীয়বার আবার চাকরির পরীক্ষা দেয় এবং ভালো ফল করে। তারপর সরকারি দপ্তরে জেনারেল কোটাতেই তার চাকরি হয়। সরকারি চাকরি পাবার পর খুব খুশি ছিল দীপক। ভেবেছিল এবার সে সুলগ্নাকে বিয়ে করতে পারবে। সুলগ্না তার কলেজের প্রেম, সুলগ্না চক্রবর্তী। কিন্তু সুলগ্নার বাড়ি থেকে এই বিয়েতে রাজি হয় না। কারণ দীপক SC, আর সুলগ্নারা ব্রাহ্মণ। সুলগ্নার বিয়ে ঠিক হয় সপ্তর্ষি ভট্টাচার্যের সাথে। সুলগ্না দীপককে ভালোবাসলেও বাবা-মা-র ইচ্ছের বিরুদ্ধে যেতে পারেনি, সপ্তর্ষিকেই বিয়ে করে ও। সুলগ্না এখন ভালই আছে।

সুলগ্নার স্বামী সপ্তর্ষি একটা প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে। সেই ফার্মেরই রাইভাল ফার্মে দীপকের বন্ধু আলাউল কিছুদিন আগে অ্যাপ্লাই করেছিল। আলাউল অ্যাপ্লাই করার পরেও কল পায়নি ফার্মটা থেকে। দীপক জানত আলাউল-এর যা প্রোফাইল, অন্তত ইন্টারভিউর জন্য ওকে ডাকা উচিৎ। দীপকের অন্য কিছু বন্ধুও ওই একই ফার্মেই কাজ করতো। দীপক তাদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, আলাউল-এর শুধুমাত্র নামটা দেখেই নাকি ওকে বাছাই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছ।

আগে আপনারা দীপক মন্ডল আর সুলগ্না চক্রবর্তীর ভালোবাসার বিয়ে সুরক্ষিত করুন। আগে আলাউল ইসলামকে সমাজে প্রাপ্য সম্মান আর মর্যাদাটা দিন, তারপর না হয়, আমরা সরকারি ক্ষেত্রে ওদের সংরক্ষণ তোলার ব্যাপারে ভাববো।

আগে আমাদের রাজ্যের পার্টি, সরকার এবং অন্যান্য প্রভাবশালী জায়গায় দীপক মন্ডল আর আলাউল ইসলামদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ুক, আগে বুদ্ধদেব "ভট্টাচার্য", মমতা "ব্যানার্জী"-এর ব্রাহ্মণ্য এলিটিজম বন্ধ হোক, তারপর নয় সংরক্ষণে ঠিক কি কি সুবিধে SC/ST-রা বেশি পাচ্ছে, সেটা ভাবা যাবে।

Saturday, May 26, 2018

অন্তরখনন

ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, কানে হেডফোন। একটু সামনে একটি মেয়ে হেঁটে চলেছে। আমার মনে হল, সে যেন আমার হেডফোনে হয়ে চলা গানের তালে তালে হাঁটছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, তার কানেও হেডফোন। এর মানে, সে হয়তো সম্পূর্ণ অন্য কোনো গানের ছন্দেই হেঁটে চলেছে, অথবা তার হাঁটার হয়তো কোনো ছন্দই নেই। কিন্তু আমার কানে, আমার মনে যে গান, যে ছন্দ বয়ে যাচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পাচ্ছি মেয়েটির হাঁটার মধ্যে।

একইরকম ভাবে, আমরা তো সত্যিই জানিনা, অন্য লোকটা ঠিক কি ভাবছে, কিভাবে ভাবছে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে ভাবছে। কিন্তু নিজেদের সুবিধেমতো একটা প্রতিচ্ছবি ভাসিয়ে দিই, অন্য মানুষের জীবনের ক্যানভাসে। অথচ সেই জীবনটা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই থাকে না। আর সেই মানুষটাকে যদি সামনাসামনি, চাক্ষুষ না দেখে থাকি, তখন আমাদের কল্পনাশ্রিত চারিত্রিক গড়নটার আরো সহজ প্রক্ষেপন করতে পারি। বিভিন্ন ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার নেটওয়ার্কের দৌলতে, যেটা এখন প্রায়শই হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ, ঠিক কোন "আমি"-টা যে আসল "আমি", ক্রমশই সেটা ধোঁয়াশায় চলে যাচ্ছে। আমার চারপাশের সমাজ একটা নির্দিষ্ট "আমি"-কে ডিমান্ড করছে। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় অচেনা-স্বল্পচেনা-(আগে-চেনা-এখন-অচেনা) বন্ধুরা একটা "আমি"-কে চাইছে। এছাড়াও ব্যাক্তিগত স্তরে আরো নানা কাছের মানুষ, দূরের মানুষেরা বিভিন্ন "আমি"-কে চেয়ে থাকছেন। 

কিন্তু তার মধ্যে থেকেও একটা আমার "আমি" তো আছে। যে "আমি"-টা একান্ত আমার। যে "আমি"-টাকে আমি নিজে চেয়েছি। যে "আমি"-টার মতে, সৃষ্টিশীল শিল্প আর রাজনীতি একসাথে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। যে "আমি"-টার মতে আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় ব্যাপারকেও খুব যুক্তিযুক্তভাবেই তর্কের বিষয়ে আনা যায়। তাকে স্রেফ "গাঁজাখুরি" হিসেবে উড়িয়ে না দিয়েও, দেখানো যায় যে ধর্ম পালনের জায়গাটা খুবই ব্যক্তিগত। আবার সেই "আমি"-টা তো এটাও মানে, যে সমাজবাদ কোনো ধর্ম নয়। 

মানুষের সমাজে থাকার দরুন, তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই তো একসাথে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা। সেই সমাজে একে অপরের সাহায্যই তো খুব প্রত্যাশিত। সেখানে কি করে একটা ভার্চুয়ালি তৈরী করা জিনিস, যার পোশাকি নাম "টাকা", তাকে আমরা সমাজ এগোনোর প্রধান চালিকাশক্তি করে তুলতে পারি? কিন্তু তা বলে সমাজবাদ তো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতো কোনো "গোঁড়ামো" নয়। কি করে তা হবে? কারণ সমাজ তো সদা-পরিবর্তনশীল, সে এক জায়গায় থামবে কেন! কিন্তু সেই সমাজবাদকেই কিছু মানুষ কুক্ষিগত ধর্মের মতো করে তুলছে। মাঝে মাঝে "মহামতি মার্ক্স্"-এর কোটেশন টেনে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তা কেন হবে, আমি তো সমাজে থাকতে থাকতে স্বততই উপলব্ধি করছি সমাজবাদের গুরুত্ব। তার জন্য তো আমার মার্ক্স্-এর উদ্ধৃতি লাগছে না। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে পড়তে হয় বৈকি, তবে যেমন কম্পিউটার আর্কিটেকচার বুঝতে না পারলে বই পড়তে হয়, ঠিক তেমনি; স্রেফ আগের কাজটাকে বুঝে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারপর উপলব্ধি তো ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক তো নয়।

অথচ, যে এই "আমি"-টাকে দেখেনি বা বোঝার চেষ্টা করেনি, সে তো ওই প্রাতিষ্ঠানিক "আমি"-কেই দেখার চেষ্টা করছে। আমিও আর আলাদা থাকছি না, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরূপের মধ্যে স্রেফ আর একটা প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছি আমি। এর জেরে, সেই অন্যের চোখের "আমি"-র সাথেও আর নিজেকে মেলাতে পারছি না। খুব খুব দূরে সরে পড়ছি। একটা দেওয়াল তৈরী হচ্ছে। আমি বোঝাতে পারছি না, যে কোথাও গিয়ে আমার অন্য কিছু মনে হচ্ছে, লেনিনিষ্ট-স্টালিনিস্ট পার্টি স্ট্রাকচারে ঠিক বিশ্বাস থাকছে না আমার। আবার কোথাও হয়তো আমার মনে হচ্ছে, ট্রটস্কি যখন আন্তর্জাতিকতাবাদের কাছে গিয়ে সমাজবাদকে স্থান দিতে চাইছেন, সেটাই হয়তো আসল পথ। কখনো মনে হচ্ছে, নিচ-থেকে-উপরে আসার রাস্তাটাই সঠিক, নিচের স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা-আন্দোলন-রাজনৈতিক-শিক্ষা না হলে উপরের নেতাদের শত শত কুরবানী, আন্দোলন বৃথা। সবকিছুকে আমি যখন অবজেক্টিভলি বুঝতেও চাইছি, আমার গায়ে লেগে থাকা "ট্যাগ", আমাকে তা বুঝতেই দিচ্ছে না, চারপাশের মানুষেরা সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। আমার মতপ্রকাশ স্রেফ আমার গায়ের "ট্যাগ"-কেই আরো জোরে সেঁটে দিচ্ছে। 

একেকবার খুব খুব, যাকে বলে, একেবারে ভীষণ রেগে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, এভাবে আর চলা সম্ভব নয়। আমাকে খুঁজে দিতেই হবে আফ্রিকা থেকে আহমেদাবাদ - সকল জায়গার শ্রমিকের সমানাধিকার। কিন্তু আবার তার পরেই তো আমার খুব ভালো লাগছে এই পৃথিবীটাকে। আমি নদীর ধারে যখন হাঁটছি, তখন দেখতে পাচ্ছি, সলিল সুর করছেন দূরে গাছের তলায় বসে, "আহা ওই আঁকা-বাঁকা যে পথ"। আমি তো শ্যামল মিত্রের স্রোতে ভেসে গেয়ে উঠছি, "আপন নীড়ে ফিরে গেছে পাখি, নীড় হারায়ে আমি পথে থাকি"। এগুলো তো মিথ্যে নয়, বরং ভীষণ ভীষণ করে সত্যি বলে মনে হচ্ছে আমার। আমি যখন অনেক ভেবে ভেবে, একটা থিওরি খাড়া করে, মডেল বানিয়ে, তার ওপর একটা সিস্টেম তৈরী করছি, কোড লিখে - আমার যে ভীষণরকমভাবে সেটাকে রিয়েল, আদ্যোপান্ত সত্যি মনে হচ্ছে। অথচ ফেসবুকের মধ্যে যে কোনোরকম রিয়েলিজম পাচ্ছি না। কেউ যে সেখানে সত্যি কথাটা বলছে না। সক্কলে একটা ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের চেইনে, শৃঙ্খলে ঢুকে গেছে মনে হচ্ছে। এই কঠিন কৃত্তিম সত্যিটাকে যে একদম অস্বীকার করতে পারছি না।

তখনই দূরে দেখতে পাচ্ছি একটা কালো রঙের কাঠের চেয়ার, তার ওপর ধবধবে সাদা আলো ফেলা হয়েছে কোথা থেকে যেন, চারপাশে তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। কালো চেয়ারটায় একটা মূর্তি বসে আছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারছি, বোধ হয় তিনি বাদল সরকার। ওনাকে সহ্য করতে পারছি না, উনি আমাকে বারবার বলে যাচ্ছেন, "এক-দুই-তিন, তিন-দুই-এক", আমি দৌড়ে পালাচ্ছি। এসে পড়ছি একটা টিভির সামনে। সেই টিভিতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি খেলছে, কিংবা খেলতে পারছে না, কারণ বল পাস্ করার মতো কেউ নেই। সেখান থেকেই দূরে শুনতে পাচ্ছি, যেন রেডিও বাজছে, যেমন মামাবাড়িতে সকালবেলায় বাজতো, এখনো বাজে বোধ হয়। কি গান হচ্ছে ওখানে? ছুটে গিয়ে দেখছি এক সুপুরুষ বসে বসে গান বাঁধছেন, পাশে গিটার নিয়ে আমি বসে পড়ছি। বুঝতে পারছি উনি জসিমুদ্দিন, সুর দিচ্ছেন, "জ্বালায়ে চান্দের বাতি, আমি জেগে রব সারা রাতি গো; কব কথা শিশিরের সনে"। দেখছি আকাশে চাঁদ উঠছে, তার রুপোলি আলো পড়ছে নদীর বুকে, গাছের মাথায়। কি ভীষণ নরম হাওয়া আমার মুখে এসে লাগছে ! দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, অনেকে হেঁটে আসছেন আমাদের সুরমূর্ছনায় সঙ্গী হতে, কারা ওরা - চিনতে পারছি না, তবু অবয়বে মনে হচ্ছে, ওদের নামই তো সলিল, সুমন, মার্ক্স্, সত্যজিৎ, নোয়াম, ঋত্ত্বিক, গৌতম, শচীনদেব, পল সাইমন, এবং আরো কত চেনা-শোনা মানুষ। হ্যাঁ, এদেরই তো আমি চিনি। কিন্তু আমার জীবনের চারপাশের কাউকেই যে আর চিনতে পারছি না ! তার থেকেও বড়, তারা যে আমায় চিনতে পারছেন না।

Sunday, May 13, 2018

পশ্চিমবঙ্গ - এবিপি গ্রুপ - পরিবর্তন

কিছু বলছিনা, স্রেফ কিছু ঘটনা তুলে দিচ্ছি। ভাবনাটা পাঠকের দায়িত্ব।

২০০৫ সালে জুন মাসে "ষ্টার আনন্দ" বলে একটি বাংলা খবরের চ্যানেল শুরু হয়। সেই চ্যানেলটির একটি ভাগ থাকে এবিপি গ্রুপের হাতে, বাকিটা থাকে ষ্টার গ্রুপের হাতে। ষ্টার গ্রুপ হল Fox News-এর একটি সাবসিডিয়ারি সংস্থা, যার মালিক হলেন রুপার্ট মার্ডক নামক আমেরিকান businessman. ২০১২ সালে "ষ্টার আনন্দ" নাম বদলে নতুন নাম হয় "এবিপি আনন্দ", কারণ রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ওই চ্যানেলটি চালাতে আর রাজি হয় না; যদিও ভারতে এখনো অব্দি সবথেকে বেশি লাভবান নিউজগ্রূপ ষ্টার নেটওয়ার্কের। ২০১২-এর পরে, এবিপি গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে এবিপি আনন্দকে নিজের আয়ত্তে নেয়। 

এই ঘটনা মাথায় রেখে, আরো কিছু ঘটনা দেখে নেওয়া যাক ২০০৫-২০১২-এর মধ্যে।

২০০৫ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ও এবিপি গোষ্ঠী "ষ্টার আনন্দ" নামক বাংলা ২৪-ঘন্টার নিউজ চ্যানেল তৈরী করে। 
২০০৫ - রিপাবলিকান পার্টির আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। 
২০০৬ - বামপন্থী দলগুলো UPA সরকারকে বলে যে, এই চুক্তি হওয়ার আগে পার্লামেন্টে গভীর আলোচনা করার প্রয়োজন আছে, কারণ এটা ভারতের স্বায়ত্ত্ব শাসন, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার উপর প্রশ্ন তোলে। 
২০০৭ - মনমোহন সিং নিউক্লিয়ার চুক্তি করার জন্য নিজে থেকেই অনেকটা এগিয়ে যান, পার্লামেন্টকে ধোঁয়াশায় রেখে। 
২০০৭-০৮ - পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হয়। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজারের আনন্দ-প্রকাশনীর বিশিষ্ঠ লেখকগোষ্ঠী এবং অন্য বুদ্ধিজীবীরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জন্য পথে নামেন। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজার, এবিপি আনন্দ-সহ এবিপি গ্রুপের সমস্ত প্রিন্ট ও নিউজ মিডিয়া পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আনন্দবাজার-গোষ্ঠীর বিশিষ্ঠ লোকেরা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত কথা বলেন। এবিপি আনন্দতে মমতা ব্যানার্জি নিজেও কয়েকবার একান্ত সাক্ষাৎকার দেন। 
২০০৮ - বামফ্রন্ট কেন্দ্রের UPA-সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেয়, কারণ কংগ্রেস নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করতে বদ্ধপরিকর ছিল। বামফ্রন্ট এই চুক্তিকে কখনোই স্বীকৃতি দিতে চায় না। 
২০০৮ - UPA তাও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখে, অন্য দলগুলির সাহায্যে। 
২০০৮ - UPA-সরকার আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করে। 
২০০৯ - বামফ্রন্ট লোকসভা নির্বাচনে মাত্র ১৫টি আসন পায় পশ্চিমবঙ্গে (আগে ছিল ৩৫টি)। 
২০১১ - বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারায়। 
২০১২ - হিলারি ক্লিনটন তার ৩-দিনের ভারত সফরে, পশ্চিমবঙ্গে এসে নতুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে দেখা করেন। হিলারি ক্লিনটন ছিলেন তখনকার আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট্। তাঁর আগের সেক্রেটারি অফ স্টেট্ ছিলেন কন্ডোলিজা রাইস, যিনি ভারত এবং আমেরিকার নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করেছিলেন ২০০৮ সালে।
২০১২ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ এবিপির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার শেষ করে দেয়, ষ্টার আনন্দ বন্ধ হয়ে গিয়ে এবিপি আনন্দ শুরু হয়।

আবারো বলি, কিছু বলছিনা, এগুলো শুধুই ঘটনা, হয়তো শুধুই সমাপতন। কিন্তু ভাবতে পারেন, বা ভাবা প্র্যাকটিস করতে পারেন। 
লাস্ট নোট:  পৃথিবীর মধ্যে এখনো একটি মাত্র দেশই সবথেকে বেশি মাত্রায় অন্য দেশের সরকার বদলেছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, সেটা কখনো সামরিকভাবে, কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে, বা কখনো অন্য কিছু উপায়ে। তবে শাসন বদলানোর পরে প্রায় সবকটা দেশেরই অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে, আর সে ব্যাপারে তারা একদমই care করেনি। 

Saturday, April 14, 2018

বাংলা গানের আধুনিকতা । Modernism in Bengali Songs (~১৩ মিনিট)

বাংলা গানের আধুনিকতা (~ ১৩ মিনিট)
---
ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, উৎপল দত্ত। সংস্কৃতির তিনটে ধারায় এই তিন বাঙালি ঠিক কি বিপজ্জনক কাজটা করেছিলেন, তা ৭০-এর দশক থেকেই মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়। ওনাদের সৃষ্টির মূলে যে অসন্তোষ, সে ধরণের কাজই আধুনিকতার সংজ্ঞা তৈরী করে, বারবার করেছে, সে আমরা যে যুগেই থাকি না কেন। পৃথিবীর যে কোনো জায়গার যে কোনো আধুনিক শিল্প বেছে নিলেই, এই সাহসী চিন্তাভাবনার ছোঁয়া দেখতে পাবেন। কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, সংস্কৃতির আধুনিকতার একটি সমান্তরাল উৎস, অনুপ্রেরণা লক্ষ্য করা যায়। অন্তরে বয়ে যাওয়া সেই আধুনিক সৃষ্টির ফল্গুধারাতেই কি খানিকটা চরা পড়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাসে? এখনকার বাংলায় যে শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে তা কি "আধুনিক" শিল্পের স্তরে উঠতে পারছে? বা এই শিল্প সমকালীন সমাজ বা অসন্তোষকে কি ধরতে পারছে? নেতিবাচক উত্তরের দিকেই কিন্তু পাল্লা ভারী রাখতে হচ্ছে। আরো বড় প্রশ্ন, যদি সত্যিই সেই আধুনিকতার জোয়ারে চড়া পড়ে থাকে, তার কারণটাই বা কি? এই লেখাতে সেটা খোঁজারই চেষ্টা করবো, তবে শুধুমাত্র সঙ্গীতশিল্প তথা গানের দৃষ্টিভঙ্গিতে। লেখাটা পড়া শুরু করবার আগেই বলে দেওয়া ভালো, আমি এখানে শিল্পকে আমার আধুনিকতার স্তর থেকে দেখছি, যা চারপাশের সমাজের কথা বলে, আবার মানবিকতার কথাও বলে। আধুনিকতার সামান্য অন্য সংজ্ঞাও আছে, তবে আমার সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক গানের কথাই বলতে চাইছি ; সেটা মাথায় রেখেই লেখাটা পড়া কাম্য।

একটু ইতিহাসের খোঁজে যেতে হবে আমাদের। বিংশ শতাব্দীতে বাংলা গানকে মার্গসংগীতের আড়াল থেকে বের করে এনে, রবীন্দ্রনাথ সকলের ঘরে পৌঁছে দিলেন, একান্ত ব্যক্তিগত করে। সেই সুরে রাগাশ্রয়ী সঙ্গীতের আড়ম্বর নেই। ফলে বাংলা গানের সুরের ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথকে এক বিপ্লব বলতেই হয়। তবে গানের কথার ক্ষেত্রে আমরা পেলাম, আধুনিকতার থেকেও বেশি অন্তরঙ্গতাকে। সেই গানগুলোর চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা, আনুগত্য হয়তো রবীন্দ্রনাথকে চিরআধুনিক করেছে শিল্পের কোনো এক আঙ্গিকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে সমসাময়িক সমাজকে ধরার চেষ্টা মূলত নেই; এটা অনেকাংশে মেনে নেওয়াই বাঞ্চনীয় বলে মনে হয়। তার থেকে অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, এবং সর্বোপরি কাজী নজরুল ইসলাম - তৎকালীন ভারতবর্ষের দৈন্য অবস্থা, গানের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা তাঁদের গানে শুনতে পাচ্ছি সদ্য জন্ম নেওয়া দেশাত্মবোধের ধ্বনি, অনেক বেশি করে। নজরুল "ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম" হয়ে বলছেন "কারার ওই লৌহ কপাট" ভেঙে ফেলার কথা। তখনকার সংগ্রামের বক্তব্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল নজরুলের সুরের বৈচিত্র্য, জটিলতা আর ধার। বিপ্লবের সমার্থক হয়ে উঠছেন নজরুল।

নজরুলের পরে একই ধরণের রাজনৈতিক মানসিকতার আবহে, সঙ্গীতের জগতে আমরা পাচ্ছি সলিল চৌধুরীকে। শুধু সলিলবাবুকে নিয়েও একাধিক প্রবন্ধ লেখা যায়। কিন্তু আমাদের বিষয়ের পরিসরে বললে, উনি বাংলা সংগীতের আধুনিকতাকে যেন নতুন মাত্রা দিলেন। আমার মতে, এখনো অব্দি কোনো বাংলা সুরকার-গীতিকার সলিল চৌধুরীর মতো বাস্তব-সচেতন কাজ করে যেতে পারেননি। সলিল চৌধুরী গান লিখছেন স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে, গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর সাথে কাজ করবার সূত্রে। তিনি তার বাংলা গানের সুরের মধ্যে এনে ফেলছেন বেঠোভেন, মোৎজার্টকে। সেটা যেমন নতুনত্ব, তেমনি তার কথায় উঠে আসছে চারপাশের বিপ্লবী আবহ। সলিল চৌধুরীর সুর আর কথা একসঙ্গে মিলে যে অভূতপূর্ব দ্যোতনা তৈরী করছে, তা মিটিং-মিছিলের উত্তেজক মেজাজ তৈরী করে দিচ্ছে। তার গানের কথায় আমরা সরাসরি অনুপ্রেরণা পাচ্ছি, "আহ্বান, শোনো আহ্বান"-এর মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের "আলোর পথযাত্রী" করছেন, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের শত হতাশার মধ্যেও। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের একত্রিত হতে ডাক দিচ্ছেন, "পথে এবার নামো সাথী।"

কিন্তু ১৯৪০-এ সলিলবাবু তো পরিচিত কোনো মুখ নন। তাহলে তিনি উঠে আসছেন কি ভাবে? আগেই বলেছি গণনাট্য সংঘের সঙ্গীতের ধারা তাকে তুলে আনছে। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন আন্দোলনের মঞ্চে উনি গান গাইছেন, কখনো কখনো হয়তো শুধুমাত্র একটা হারমোনিয়াম নিয়েই। হাজার হাজার মানুষ উদাত্ত কণ্ঠে একসাথে ওনার গান গাইছে। ওনার গান কিন্তু তখনও রেকর্ড হয়নি, শুধুমাত্র মানুষের কন্ঠ্যে সে গান জীবিত থাকছে। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আধুনিক শিল্পের এই পৃষ্ঠপোষকতা, শুধু গানে নয়, ছায়াছবি, নাটক, সবেতেই ছিল। ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত এমনকি মানিক বন্দোপাধ্যায় - সকলেই একসময় সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করেছেন। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাইরের রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, মহারাষ্ট্রে তখন IPTA-এর হিন্দি নাটক হচ্ছে। বলরাজ সাহানি, পৃথ্বিরাজ কাপুর তার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। যাই হোক, গানে ফিরে আসা যাক। 

সলিলবাবুর গান ১৯৫০-৬০-এর দশকে রেকর্ড হলো, তার পরেও মানুষকে তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে চেতনা যোগাচ্ছে, অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। এর মাঝে যে অন্য ভালো গান হচ্ছে না, তা কিন্ত নয়। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, নচিকেতা ঘোষ - দারুন সব সুর সৃষ্টি করছেন বাংলা ফিল্মে, কিন্তু তাঁরা গানের আধুনিকতাকে ছুঁতে পারছেন না, কথার বন্ধ্যাত্বে। এরপর ১৯৭০-এর টালমাটাল দশক পেরিয়ে আমরা পৌঁছচ্ছি ১৯৮০-এর দশকে। এই সময় একটি আমেরিকা-ফেরত যুবক চেষ্টা করছেন, আবারো বাংলা সংগীতে আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা যোগান দেওয়ার। ১৯৮৬ সালে "তোমাকে চাই"-এর মতো কিছু গান লেখার চেষ্টা করে অসফল হয়ে, আবারো ফিরে আসছেন ৯০-এর দশকে বাংলা সংগীতের খোলনলচে বদলে দিতে।

সুমনের মতো প্রিয়তমকে অভিবাদন জানানোর আগে মনে রাখতে হবে, ৯০-এর দশকের আগেই কিন্তু সুমনের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা হয়েছে, ৬০-৭০-দশকের নকশাল আন্দোলনে উনি প্রভাবিত হয়েছেন, লাশ বয়ে যেতে দেখেছেন কলকাতার মাঝে খাল দিয়ে। উনি আবারো শিল্প সৃষ্টি করছেন, বাস্তবের মধ্যে থেকেই, কিন্তু তার সাথে এক জীবনদর্শনও তার গানে ধরা পড়ছে। যে দর্শন একসাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বলে, শিহরিত হয় "লাল নিশান" দেখে, আবার এই স্বপ্নও দেখে যে "সেনাবাহিনী বন্দুক নয়, গোলাপের তোড়া হাতে কুচকাওয়াজ" করবে। আর এই গানকে প্রথম তুলে ধরছে সিপিএমের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল। শুভেন্দু মাইতির মতো কমিউনিস্ট আদর্শের মানুষ সুমনকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন, গান গাইবার মঞ্চ তৈরী করে দিচ্ছেন। এরপর ধীরে ধীরে সারা বাংলায় একটু একটু করে, সমস্ত ৯০-এর দশক জুড়ে ঘরে ঘরে আলোচনার বিষয় হয়ে যাচ্ছে, "মরবো দেখে বিশ্ব জুড়ে যৌথ খামার।" মনে রাখতে হবে, তখন সোভিয়েত ভেঙে গেছে, নকশাল আন্দোলন শেষ, কিন্তু তবুও বাঙালি সমাজ-বদলানোর গানকে স্বাদরে গ্রহণ করছে।

২০০০ সালের কিছু আগে, সুমনের পরে বাংলা ব্যান্ডের উত্থান হচ্ছে। সেখানে আমরা নতুন করে পাচ্ছি ৭০-৮০-এর দশকে তৈরী হওয়া কিছু গান, মহীনের ঘোড়াগুলির পৃষ্ঠপোষকতায়। বাংলার সমস্ত বিখ্যাত ব্যান্ডই স্বীকার করে যে, তাদের উত্থানের পিছনে মহীনের ঘোড়াগুলির প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ই অনুপ্রেরণা। সেই গৌতমবাবু আবার ৭০-এর দশকে কংগ্রেস সরকারের তাড়া খেয়েছেন নকশাল আন্দোলনের জন্য। তাঁর এবং রঞ্জন ঘোষালের গানেও যে "ওরা কাজ করে, গ্রামে বন্দরে, শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে-প্রান্তরে"- এসবের কথা উঠে আসবে, তা খুব স্বাভাবিক। বাংলা ব্যান্ডের উঠে আসার পিছনেও আমরা একই ধরণের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের ছোঁয়া পাচ্ছি। 

এছাড়া সিপিএম পার্টি থেকেও কিছু ক্ষেত্রে (পার্টির স্বার্থেই) আমরা আধুনিক শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা দেখতে পাচ্ছি, আরো বিশেষভাবে নচিকেতার উঠে আসার মাধ্যমে। সুভাষ চক্রবর্তী নচিকেতার গানকে সামনে আনতে সাহায্য করছেন; যদিও সুমনকে রোখার জন্যই নাকি নচিকেতাকে তুলে আনে সিপিএম - এমনটা শোনা যায়। কিন্তু পরে আবার নচিকেতার গান "আমি সরকারি কর্মচারী" - ব্যানও করছে সিপিএমের সরকার। একই কাজ হয়েছে সলিল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও। তাঁকেও পার্টির পক্ষ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে। কিন্তু এই যে বিকল্প শৈল্পিক ভাবনা গঠন করা এবং তাকে তুলে ধরা - এটা অসংগঠিতভাবে কমিউনিস্ট-ভাবধারার মধ্যে থেকে বাঙালি আত্মস্থ করেছিল। সংগঠিত এবং "রাষ্ট্রীয়" কমিউনিস্ট পার্টি পরে বারবার এই শৈল্পিক ভাবধারার বিরুদ্ধে গেলেও, বাঙালি তাঁর দর্শনটা হারায়নি। কোথাও যেন খুব অন্তরে, বাঙালি সামাজিকতার দর্শনকে লালন করেছে, যে দর্শন সমষ্টির কথা ভাবতে বলে, নিজের স্বার্থের থেকেও বড় উদ্দেশ্যের জন্য। তাই বারবার আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা আমরা পেয়েছি, কখনো তার নাম সুমন, কখনো সলিল, কখনো গৌতম। কোনো একটা উৎস ছিল এই সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের বিকাশ ঘটার। 

এবার এখনকার যুগে চলে আসুন। আমাদের সামনে এখন কেন্দ্রীয় সরকারে শুধু নয়, রাজ্যেও খুব বড় ক্রাইসিস। অথচ তার বিপক্ষে সংগীতের তেমন কোনো চলন নেই। ভালো গান হচ্ছে না, তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়টাকে ধরার বাসনাটা নেই। অথচ এখন YouTube-জাতীয় মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে গানের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আরো বেশি। কিন্তু সেই ধরণের শিল্পীকে আমরা যেন পাচ্ছি না। দীপাংশু প্যারোডি লিখছেন, বহু মানুষ শুনছেন। এর মানে, মানুষ কিন্তু সরকারের সমালোচনাটা শুনতে চাইছে। কিন্তু সেই শিল্পিত প্রকাশের পরিসরটা যেন কমে গেছে।

আমার মতে, এর একটা বড় দায় সিপিএমেরও। অনেকে ব্যঙ্গ করতে পারেন এই বলে যে, পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুর দায়ই তো সিপিএমকেই নিতে হয়। কিন্তু আগে যেভাবে গণসংগীত বা অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে দিয়ে সিপিএম সংস্কৃতিগত আধুনিকতার ধারক ছিল, সেই জায়গাটা সিপিএমের গণসংঠনগুলো হারিয়ে ফেলেছে। ৩৪ বছরের শাসনের জন্য সিপিএমের এই চলমান গতিতেও, মনে হয়, কোথাও যেন জং ধরে গেছিল। তাই একটা খুব বড় শূন্যস্থান তৈরী হচ্ছে, সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের।

সেটার আর একটা কারণ হতে পারে বিশ্বায়ন এবং individualism. সমগ্র পৃথিবীতে, এখন সকলেই খুব বেশি করে নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা এবং আশাপূরণের কথা ভাবছে। সেখানে সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা বড়ই দুর্লভ। বাংলাও এই বিশ্বজুড়ে চলা ট্রেন্ডের বাইরে নয় আর। তাই মানুষের মনে অসন্তোষ থাকলেও তা দানা বাঁধছে না, তা জমে কালো মেঘের গর্জনে পরিণত হচ্ছে না, যে মেঘ চিৎকার করে আহ্বান করতে পারে। যা সলিল করেছিলেন, যা শুনে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। তবে সময় এখনো যে চলে গেছে তা নয়, এই লেখাটার পরেও হয়তো আশার সূর্য আছে। সুমনের গান সকলের সামনে আসতে প্রায় কয়েক বছর সময় লেগে গেছিলো। কে বলতে পারে? হয়তো কোনো নতুন "সুমন", অন্য কোনো নামে, নিজের ঘরে গিটার বাজিয়ে দুঃসাহসী কোনো কথাকে সুরের জ্বালে বাঁধছেন না? অপেক্ষা করছি, আশা করছি, কেউ আবারো জেগে উঠবে, গেয়ে উঠবে:

"যখন প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ কি শান্তি,
আমাদের বেছে নিতে হয় নাকো ভ্রান্তি,
আমরা জবাব দিই শান্তি শান্তি শান্তি।
আর রক্ত নয় নয়!"