Friday, April 21, 2017

মনের ম্যানিপুলেশন - Manipulating yourself

বরফ পড়ে যেসব দেশে, সেখানে সূর্য ডুবে যাওয়ার বেশ পরেও একটা সফেদ উজ্জ্বলতা থেকে যায়। আকাশে যদি চাঁদের মায়াটা কখনো নাও থাকে, রয়ে যায় চাঁদের গরিমার মোহটা। এই সাদাটে ভাবটার রেশ থেকে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে দূরে সরিয়ে, একটু মন দিয়ে চারপাশটাকে অনুভব করলে, মনের মধ্যে একটা বেয়াড়া ইচ্ছের জন্ম হয়। মনে হয় জীবনানন্দকে এখানে এনে ফেলি। সাথে নির্মলেন্দু গুনকেও। প্রথমজন প্রকৃতির এই নিস্তব্ধ রঙ্গকে ভালোবাসবেন আর অক্ষর জুড়ে তৈরি করবেন আবেগ। আর দ্বিতীয়জন ওনার ভালোবাসাকে ভালোবাসবেন, তাতে তৈরি হবে কিছু "বরফমাখা জল"।

বরফের দেশে তো ওই হিমশীতল জলই আছে। বাকি সবকিছুতেই উষ্ণতার অভাব। তাই বোধ হয় পাখিরাও এখানে গান গায় না, ঠোঁট বেঁকায় না, গাছে বসে না। অন্য কোনো পাখি নয়, তবে একটা পাখির কথা বেশ মনে পড়ে। সকালে উঠে ডাকতো। মামাবাড়িতে কিংবা গ্রামের বাড়িতে বেশি শুনতে পেতাম। তবে আমাদের বাড়িতেও যে শোনা একদম যেতো না, তা নয়। সেদিন সকালে বাবা যখন ফোনে প্রাত্যহিক জীবনের চর্যা শোনাচ্ছে, পিছনে সেই পাখির ডাকটা শুনতে পেলাম। ডাকটা আমাকে বোধ হয় স্বস্তি দিলো, যে সব কিছু নিজের গতিময়তায় ঠিকঠাক আছে। কিন্তু মনটা তাতেও কেন জানিনা খারাপ করে এলো।

মনের কোনো দোষ অবশ্য নেই। যখন খুশি তার অসুখ হয়। কারণ মনকে তো আমরা খুব একটা আলাদা করে যত্ন করি না, বা অসুখ থেকে সরিয়ে তুলি না। শরীরকে যাও বা দায়ে পড়ে যত্ন করতে হয়, মনের বেলায় সে রকম কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অতএব অবহেলাই ওর প্রাপ্য হয়। কিন্তু আমাদের যত বয়স বাড়ে, এই দক্ষতাটাই বোধ হয় সব থেকে প্রয়োজনীয় হয়। কিভাবে মনকে শরীরের মতোই বুঝে নেওয়া যায় এবং তাকে পরিপূর্ণ পুষ্টি দেওয়া যায়, যত্ন করা যায়। মানে মনের ম্যানিপুলেশন।

যদি প্রেম করার অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে সেই ভীতকে সম্বল করে এই নিজেকে ম্যানিপুলেশনের গেমে একটা advantage নিয়ে শুরু করা যায়। এই খেলাটা নিজের সাথেই খেলতে হয়, নিজের স্বার্থেই। আর এই খেলায় শরীর পালন করে আপনার পক্ষে থাকা এক বন্ধুর ভূমিকা। ঠিক কোন হরমোনগুলো মনের ঠিক কোন জিনিসটা হরণ করে, শরীর তার খোঁজ রাখে। যেমন ধরুন চকোলেট, এটা খেলে এমন এক হরমোন ক্ষরণ হয়, যা আপনার মনকে খুশি করবে। সুতরাং, মনের কোনো অকারণে খারাপকরা সময়ে এই ওষুধ কাজ করে যেতে পারে। আবার খুব অবসাদ বা আলস্যের সময়, একবার ঈষদুষ্ণ জলের তলায় যদি শরীরটাকে ভিজিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে কিছুটা স্বস্তি মেলে। একটা জমাট ঘুমও মনকে বেশ খানিকটা সতেজ করে তোলে, আর ঘুমের ভিতরে মন নিজের মতো করে অনেক কিছু সাজিয়ে-ঘুছিয়েও নেয়। আবার কনফিডেন্স বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য নিজে যে কাজটায় বেশ পারদর্শী বা যে কাজটা করতে বেশ পছন্দ, সেরকম কিছু করে নেওয়া যেতে পারে। নিজের যে কোনো নতুন সৃষ্টিই মনের মধ্যে একটা আলাদা আরাম বয়ে আনে। এসব ছাড়াও খুব খারাপ লাগলে, স্রেফ প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলেও, নিজের অস্তিত্বের একটা নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। এই বিশ্ব-সংসারে সবকিছুর সাথে একাত্ব হওয়ার অনুভূতিটা কিন্তু কম কিছু নয়।

তবে যখন মন কোনো কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, তখন তার রোগ নির্ণয় করে তাকে সঠিক ওষুধ বাতলানোটাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ। আর সবার জন্য তো ওষুধ এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু যদি নিজেদের মধ্যেই একটা দ্বৈত স্বত্ত্বা তৈরি করে মনকে নজর রাখা যায়, তাহলে কিন্তু মনের আলাদা করে খেয়াল রাখা যায়। অন্তত মনের ভিতরে কি চলছে, তার হালহকিকতের একটা আভাস মেলে। সেটুকুই যথেষ্ট মনের যত্ন নেওয়ার শুরু করার জন্য। শুরুটাই হোক, সু-মনে থাকার। বরফের দেশের রাতে সূর্যের অনুপস্থিতিতে সবকিছুই খুব হতাশাজনক লাগতে পারে, কিন্তু তখনও তো থেকে যায় সূর্যের ফেলে যাওয়া আলোর রেশ। তা দিয়ে তো জীবনানন্দের মতো কেউ রোমাঞ্চও তৈরি করতে পারেন। তাই এই আশাটুকুই থাকুক না!

Saturday, April 15, 2017

বাংলা সঙ্গীতের নয়া হাইপ - New hype in Bengali Music

ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথ ১৮৬১-তে জন্মেছিলেন, তাই ২০১১-এর আশপাশ থেকে শুরু হয়েছিল ওনার জন্মের সার্ধশতবর্ষ পালনের হিড়িক। আর বাংলা সঙ্গীত সেই সুযোগে আরো কিছুদিন ওনার কাঁধে ভর করে বেঁচে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন প্রায় ৫ বছরের ওপর কেটে গিয়েছে সেই হাইপের। এখন বাজারের নতুন হাইপ লোকসঙ্গীত। পল্লীগীতিগুলোকে নতুন প্যাকেজে বাজারে আনা। বেশ অনেকদিন থেকে চলছিল এই ব্যাপারটা, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের জন্মের ১৫০ বছর পালনের সময়টা কেটে যাওয়ার পর অতীতে-বেঁচে-থাকতে-চাওয়া বাঙালির "নতুন" অতীতচারণের দরকার পড়লো। সুতরাং বাজারে নতুন মোড়কে ছাড়া হল ফোক গানকে।

ফকিরার ইতরপনা অ্যালবাম দিয়ে শুরুর দিকটা বেশ সুন্দর হয়েছিল। এখনো সে গান নেশার মতো কানে লেগে আছে। কিন্তু কোনো ফর্মুলা যদি মার্কেটে খেটে যায়, সেটাই বারবার ব্যবহার করে মুনাফা করার নিয়ম। সুতরাং সব্বাই সেটা করতে লাগলেন। আর বাঙালি কে পায় কে? পাওয়া গেছে "আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম", ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে সেটাই শোনা চালু হল। স্বাধীন সঙ্গীত যে কত বছর থেকে শোনা হচ্ছেই না, সেটার কোনো খেয়ালই আর কেউ করলো না। অথচ এর মধ্যে যে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক হয়নি, তা নয়। কিন্তু সেগুলো কোনো জায়গাই পায়নি। এর মধ্যেই অনুপম রায় পুরো ব্যাপারটাই বুঝলেন।

অনুপম দেখলেন এমনি নিজের গানগুলো আলাদা অ্যালবাম করে বার করা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গেছে। সুতরাং, নিজের গানগুলো চালান করে দিলেন সিনেমার গানে। সাথে ফি-বছর একটা করে নিজের অ্যালবাম করার কনট্র্যাক্ট আদায় করে নিলেন। কিন্তু সেটা অনুপমের স্ট্র্যাটেজি আর সাফল্য অনুযায়ী খেটে গেলো। বাকিরা সেটা করতে পারলেন না। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিউজিক পিছিয়েই পড়লো।

ইতিমধ্যে ফোক সঙ্গীতের জনপ্রিয়তা এখনো বিদ্যমান। আর যাহা কিছু মার্কেটে খাটে, তাহাকে আরোই মার্কেটে লাগাও। এই ফর্মুলাই ব্যবসায়ীরা বোঝেন। তাই ফোক সঙ্গীত ঢুকে পড়লো ছায়াছবির গানেও। অনেকদিন ধরে একটু একটু করে প্রবেশ করার চেষ্টা করছিলো। প্রাক্তনে "ভ্রমর" ব্যবহার করা হল। কিন্তু "দূর্গা সহায়" বললো অতো রিস্ক নিয়ে লাভ নেই,যা আছে যত পারো ঢুকিয়ে দাও। তাই ফোক গানের মেডলি তৈরী করে ফেললো (https://www.youtube.com/watch?v=8PaCWoL31Yg)। কপিরাইট যখন নেই, আর মানুষ যখন খাচ্ছে, তখন চালিয়ে দিতে তো অসুবিধে নেই।

পুরোনো জিনিসের নতুন মোড়ক - ব্যাপারটা খুব একটা খারাপ না। এতে পুরোনো জিনিসেরই কদর নতুন প্রজন্মের কাছে বাড়ে। কিন্তু মুশকিলটা হচ্ছে, সেই নতুন মোড়কটাই যখন পুরোটা বাণিজ্যের স্বার্থে চলতে থাকে। যেটা রবীন্দ্রনাথের গান নিয়ে হয়ে গেলো। একটা সময় এত্ত ভীষণ পরিমান রবীন্দ্রসঙ্গীত বেরোতে শুরু করেছিল, যে মান পড়তে লাগলো। এই পল্লীগীতির নতুন মোড়ক নিয়েও একই শুরু হয়েছে। তাই পুরোনোকে নতুন করে আনার সহাবস্থান থাকুক, শুধু সেটা যেন বাণিজ্যের খাতিরেই না হয়। তার মধ্যে শিল্পটাকে দূরে ছুঁড়ে ফেলবেন না। ফোক সঙ্গীত তো শিল্পের অকৃত্তিম চরিত্রের কথাই তুলে ধরে, সেটাই থাকুক না!

Thursday, April 06, 2017

প্রযুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ ২ - Technology and its future 2

জীবনবিজ্ঞান পড়তে কোনোকালেই ভালো লাগতো না। বরাবরই বায়োলজিকে সাবজেক্ট হিসেবে এড়িয়ে এসেছি। কিন্তু কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরে দেখলাম, শেষে কিনা প্রযুক্তির এই দুর্নিবার গতি আসলে বায়োলোজিকেই অনুসরণ করছে! আমরা যেভাবে ভাবি, কাজ করি, সিদ্ধান্ত নিই, সেগুলোকেই একটা যন্ত্রকে দিয়ে করাতে চাইছি আমরা। আর তার উদ্দেশ্যেই হয়ে চলেছে কম্পিউটার সায়েন্সের বেশিরভাগ গবেষণা। এই গবেষণা এগোচ্ছে বেশ দারুন গতিতে সফলভাবেই। তবে এই সফলতা যে মানবজাতির ভালো কাজেই আসছে, তা নয়। সফলতার পরিণাম হিসেবে আমরা পাচ্ছি বিপুল সংখ্যক মানুষের বেকারিত্ত্ব এবং "termination of employment"। এই লেখার মূল উদ্দেশ্য, কম্পিউটার সায়েন্সের যে বিভাগটা এই আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে, সেই বিজ্ঞানটা কিভাবে আমাদের চারপাশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে, তার খোঁজ করা। 

যেসব আবিষ্কারগুলো এ যাবৎকাল ধরে মানুষের সভ্যতার গতি-প্রকৃতি আমূল পাল্টে দিয়েছে, তাদের কয়েকটা হল - আগুনের আবিষ্কার, বিদ্যুৎ, পারমাণবিক বোমা। আর আগামী কয়েকবছরে যে আবিষ্কারটা সভ্যতার বেশ খানিকটা পরিবর্তন ঘটাতে চলেছে, তা হল: Machine Learning (মেশিন লার্নিং বা ML) এবং Artificial Intelligence (আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স বা AI).

প্রথমে বলা যাক, মেশিন লার্নিং ঠিক কি? খুব ছোট্ট কথায়, কম্পিউটারের কাছে সাধারণত যে বিপুল পরিমাণ তথ্য থাকে, তা থেকে কিছু আকর্ষণীয় বা গুরুত্ত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অথবা ফলাফলে আসার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নাম মেশিন লার্নিং। যদিও আমি এখানে চূড়ান্ত অ-বৈজ্ঞানিক একটা সংজ্ঞা দিলাম। যারা এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তারা জানেন, এই মেশিন লার্নিং-এর পিছনে লুকিয়ে আছে খুব নিগূঢ় কিছু গাণিতিক থিওরি। কিন্তু যেহেতু এই লেখাটা বিজ্ঞান আর অর্থনীতির সম্পর্ককে ধরতে চাইছে, তাই এরকম একটাই সংজ্ঞাই আপাতত সঙ্গত মনে হল।

যাই হোক, এখন যে প্রশ্নটা মাথায় আসতে পারে, তা হল - কম্পিউটার তাহলে তার সঞ্চিত তথ্য থেকে কিভাবে কিছু দুর্দান্ত সিদ্ধান্ত বা কিছুটা অজানা তথ্যের সন্ধান দেওয়ার চেষ্টা করছে? প্রায় সেভাবেই, যেভাবে আপনি আপনার মস্তিষ্কে করে থাকেন। আপনার মাথায় যেমন আছে একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক, যেটা বোঝার চেষ্টা করে, লাল সিগনাল জ্বলছে মানে আমাকে ট্রাফিকে দাঁড়াতে হবে, অথবা সেই জাতীয় কিছু সেরিব্রাল কাজ; ঠিক সেরকমই কম্পিউটার তৈরি করছে তার ভিতরে একটা নিউরাল নেটওয়ার্ক। আমরা যা যা জানি, যে যে বিষয়ে আমাদের কাছে তথ্য আছে - তা দিয়ে এরকম নিউরাল নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন নিউরাল নেটওয়ার্কের উদ্দেশ্য আলাদা হতে পারে। যেমন, কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক শুধুই চালক-বিহীন গাড়ি চালানোর কাজে লাগানো যেতে পারে। আবার কোনো নিউরাল নেটওয়ার্ক শুধুই দুর্দান্ত দাবা খেলার কাজে আসতে পারে। দাবার কথা বললাম, কারণ দাবা সবথেকে কঠিন খেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সেই কঠিন খেলাতেও মানুষের থেকে বেশি পারদর্শী হয়ে একটি কম্পিউটার মানুষকে হারিয়ে দিচ্ছে। এখানে এটা বোঝা খুব জরুরি যে, এই নিউরাল নেটওয়ার্ক এইসব কিছু নির্দিষ্ট কাজ করার জন্য মানুষের থেকেও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। কারণ মানুষের যে সব সীমাবদ্ধতা, যেমন খুব বেশি তথ্য মনে রাখতে না পারা বা ক্লান্ত হয়ে যাওয়া, এই সমস্যা কিন্তু কম্পিউটারের প্রায় নেই। ইতিমধ্যেই দাবার থেকে কঠিন প্রেডিকশানের খেলাগুলোতেও, যেমন পোকার বা চীনের গো নামক খেলাগুলোতে, বিশ্বের চ্যাম্পিয়নদের হারিয়ে দিয়েছে কম্পিউটারে বসে থাকা মেশিন লার্নিং সিস্টেম। এবার এই সিস্টেমকে জীবনের অন্য ক্ষেত্রের সমস্যা সমাধানে প্রয়োগের পালা।

কিন্তু তার আগে আর একটা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। এই যে মেশিন লার্নিং-এর সাহায্যে নতুন প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে আরো সহজ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে, সেটা কি খুব নতুন কিছু? মেশিন লার্নিং আর তাকে কাজে লাগিয়ে আমরা যে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা গড়ে তুলছি যন্ত্রের ভিতরেই - তার সাহায্যে আমরা ঠিক কোন ধরণের কাজগুলোকে আরো সহজে করে ফেলতে পারবো? সেই কাজগুলো, যেগুলোতে আমাদের বিশ্লেষণী ক্ষমতা লাগতো। মানে ধরুন, আমাদের কাছে আছে - প্রচুর রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য ও তাদের যে রোগ হয়েছিল, তার প্রাথমিক symptom কিরকম ছিল, তার একটা ইতিহাস। সেই তথ্য শুধু দিয়ে দিতে হবে কোনো মেশিন লার্নিং সিস্টেমকে। এর পরে ওই সিস্টেম তার পারদর্শিতা দেখাতে শুরু করবে।  সিস্টেমকে এর পরে শুধু বলতে হবে কোনো নতুন এক রোগীর প্রাথমিক symptom-গুলো।  তাহলে সেই সিস্টেম বলে দিতে পারে, খুব সহজেই, কোনো নতুন রোগীর ঠিক কোন রোগটা হয়ে থাকতে পারে। এই কাজটা কোনো ডাক্তারও হয়তো বিশ্লেষণ করে করতে পারেন, কিন্তু একটা মেশিনেরও সেই ক্ষমতা জন্মাচ্ছে। এর মানে এই নয় যে, কাল থেকে আর ডাক্তারদের দরকার হবে না। ডাক্তাররা চিরকালই আমাদের সমাজে মূল্যবান, কিন্তু তাদের একটা অল্টারনেটিভ থাকছে। আরো বড় আকারে বললে, আমরা বিশ্লেষণী ক্ষমতার কাজগুলোকে হয়তো মেশিনের সাহায্যেই করতে শুরু করছি।

এতদিন যাবৎ আমরা মূলত কায়িক শ্রমের কাজগুলোকে মেশিনের মাধ্যমে করানোর চেষ্টা করছিলাম। ফোর্ডের গাড়ি কারখানাতে, গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ একটা কনভেয়ার বেল্টে পরের পর জুড়ে যাচ্ছে। একটা গাড়ি তৈরি করার জন্য, মানুষের সাহায্যের দরকার প্রায় হচ্ছেই না। এই দৃশ্য আমরা এতদিন দেখে আসছি। কিন্তু এবার, যে সব কাজে analytical ability লাগতো, সেগুলোতেও মানুষের থেকে দক্ষ বিকল্প আসা শুরু হয়েছে। এই পরিবর্তন এখনো খুবই শুরুর দিকে, কিন্তু একে বলা হচ্ছে Industrial Revolution 4.0। যেহেতু কম্পিউটার এখন নিজেই মানুষের থেকেও বেশি বুদ্ধিমান হয়ে যেতে চলেছে, তাই প্রযুক্তির উন্নতিতে এর পরের প্রগতিটা হয়তো খুব দ্রুত হবে। কিন্তু আমরা কি তৈরি এই পরিবর্তনটার জন্য? অর্থনৈতিক ভাবে?

এই পরিবর্তনটার অর্থনৈতিক দিকটা নিয়ে একটু গভীরে ভাবা যাক। যখন কায়িক আর বিশ্লেষণী ক্ষমতা দরকার, এমন কাজগুলো একটা কম্পিউটারই করতে পারবে, তাহলে মানুষের জন্য ঠিক কোন ধরনের কাজ পড়ে থাকবে? মূলত, তিন ধরণের। প্রথমত, কোনো শিল্পীর শৈল্পিক এবং স্বতন্ত্র কাজগুলো। যদিও কম্পিউটার এখনই নতুন ধরণের গান-বাজনা নিজেই তৈরী করতে পারছে, তবুও আমার মনে হয় শিল্পের জায়গাটা মানুষের সভ্যতার ইতিহাসে যেমন ছিল, তেমনি ভবিষ্যতেও থেকে যাবে। কারণ শিল্পটা শুধুমাত্র তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হয়না। তার জন্য সৃজনশীলতা লাগে, যেটা কোনো কৃত্তিম নিউরাল নেটওয়ার্ক আপাতত দিতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, একজন রিসার্চারের নতুন উদ্ভাবনী কাজগুলো। মূলত আগের বলা কারণেই কম্পিউটার এখনো স্বতন্ত্রভাবে নতুন উদ্ভাবন করার ক্ষমতা ধরে না। এবং আগামী ৫০ বছরে সেরকম নতুন idea নিজে গড়ে তোলার ক্ষমতা অর্জন করা সম্ভব নয় বলেই মনে হয়। আর তৃতীয়ত এবং শেষ, কোনো সিদ্ধান্তকে সঠিক বলে অন্য মানুষকে convince করার কাজটা। মূলত MBA যারা করেন, যারা কোনো সংস্থার leader বা মানুষের psychology বা মনস্তত্ব নিয়ে যারা কারবার করেন, তাদের কাজটা আপাতত বেশ কয়েকবছর কম্পিউটারের পক্ষে করা অসম্ভব। কারণ কোনো রোবট বা মেশিন লার্নিং সিস্টেম মানুষের সাথে তর্কে জিততে পারেনা।

এই যে কতিপয় কাজ পড়ে থাকবে, তাতে অনেক মানুষ তো কাজ হারাবেন। তাহলে কি আমাদের সমাজ ভেঙে পড়বে? এতটা সহজে নয়, কারণ এই প্রযুক্তির আশীর্বাদেই আমরা পৌঁছবো আমাদের উৎপাদন ক্ষমতার শিখরে। মেশিনরা এখনই এত সুদক্ষ যে আমাদের সারা পৃথিবীতে যা খাবার উৎপাদন হয়, তা দিয়ে পৃথিবীর সকলের অন্ন-সংস্থানে কোনো অসুবিধাই হওয়া উচিত নয়। অনেকেই হয়তো জানেন, যে অন্ন-সংস্থানের থেকেও মূল সমস্যাটা অন্ন-ভাগ করে দেওয়ার। আর মেশিন লার্নিং আমাদের এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শুধু বর্তমান নয়, আমরা ভবিষ্যতের খাদ্য এবং অন্য সামগ্রী সংকুলানের নিশ্চয়তা দিতে শুরু করেছি। কিন্তু মুশকিল হয়ে যাচ্ছে, সেই একটাই জায়গায়। এই সমস্ত সিস্টেমের দখল থাকছে খুব কম কিছু মানুষের হাতে। ফলে বর্তমান বা ভবিষ্যতের যে নিশ্চয়তা আমাদের আয়ত্ত্বে আছে, তা আমরা সকলের কাছে পৌঁছে দিতে পারছিনা। সুতরাং, প্রযুক্তির এই কুক্ষিগত হওয়ার প্রবণতাকে বন্ধ না করতে পারলে, আমরা কখনোই এর সুফলগুলো উপলব্ধি করতে পারবো না। মানুষ এখন যেমন বেশি সংখ্যক হারে কাজ হারাচ্ছেন, সেটাই বাড়তে থাকবে। অর্থ জমা হতে থাকবে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের কাছেই, যেমনটা এখন হচ্ছে। 

এবার চোখ ফেরানো যাক, আমাদের চারপাশের হালহকিকত নিয়ে। ভারতের ইনফরমেশান টেকনোলজির সেক্টরে গত প্রায় ১৫-২০ বছরে যে বিপুল জোয়ার এসেছিলো, তা হঠাৎই ধাক্কা খেয়েছে, আপনারা দেখতে পাচ্ছেন। Cognizant, Wipro, Infosys থেকে শুরু করে প্রায় সব বড় Services সেক্টরের কোম্পানিগুলো তাদের কর্মীদের ছেঁটে ফেলছেন। এবার ওপরে যে নতুন সিস্টেমের আবির্ভাবের কথা বললাম, সেটার কথা চিন্তা করুন। গত কয়েক বছরে ওই সিস্টেমের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কারণ এতো বিশাল পরিমান তথ্য রাখার এবং তাকে দ্রুত প্রসেস করবার মতো computing power আমাদের কাছে ছিল না। কিন্তু এখন যখন এসব সম্ভব হচ্ছে, তখন এই বিশাল সংখ্যক IT employee-দের কোম্পানিগুলোর দরকার হচ্ছে না। তারা নতুন সিস্টেমের সাহায্যে আরো সস্তায় নিজেদের কাজগুলো করে ফেলতে পারছেন। মানুষের সাহায্যের দরকার পড়ছে না, যেমন একসময় ফোর্ডের দরকার পড়েনি, তাদের গাড়ি তৈরী জন্য নতুন শ্রমিকের। সুতরাং, এটা বুঝতে হবে যে, এই মুছে-যাওয়া কাজগুলো কিন্তু আদৌ আর ফিরে আসা সম্ভব নয়। বরং আরো আরো বেশি হারে, এই IT-Services সেক্টরে কর্মীসংখ্যা কমতে চলেছে। কম্পিউটার নিজেই নিজেকে খুব দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। আশা করবো ফোর্ডের দরুন যে করুন দুর্দশা ডেট্রয়েটের হয়েছিল, তা ভারতে হবে না। ডেট্রয়েট যদিও এখন ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে, কিন্তু ধুলোয় মিশে যাওয়া সেই ডেট্রয়েটের স্বাদ, ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে খুবই তিক্তভাবে ধরা দিতে পারে।

তবে আমরা কি অন্ধকার কোনো ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে চলেছি? এতো সম্ভাবনা সত্ত্বেও? সত্যিই, এই মুহূর্তে মেশিন লার্নিং এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টালিজেন্সকে মোকাবিলা করে', নতুন ধরণের কাজ তৈরী করার মতো কোনো সমাধান আমাদের সিস্টেমের কাছে কিন্তু নেই। সারা পৃথিবী জুড়ে সকলেই চাইছেন, নতুন কাজ সৃষ্টি করতে। কারণ নতুন কাজ ছাড়া মানুষ টাকা উপার্জন করতে পারবেন না। ফলে যে সব সামগ্রী উৎপাদন হচ্ছে, সেগুলো কেনবার লোকও পাওয়া যাবে না। এই অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেরই সম্মুখীন আমরা, আবারো। এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়, ১৯৩০, ১৯৭০, ২০০০, ২০০৮ - বারবারই এই দ্বন্দ্বের জন্যই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দুর্দশাগ্রস্থ হয়েছেন। কিন্তু প্রত্যেকবারই জোড়াতালি দিয়ে আমরা বেরিয়ে আসতে পেরেছি, কিন্তু সমস্যাটাকে সমূলে আঘাত করা হয়নি। এবারের সমস্যাটা আরো আলাদা কারণ এর আগে কোনোবারই মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে কোনো চ্যালেঞ্জের সামনে পড়তে হয়নি। এই কারণেই এবারের এই সমস্যা এতো প্রলম্বিত, ২০০৮ সাল থেকে আমরা এখনো বেরিয়ে আসতে পারিনি। 

আমরা যদি সামগ্রিকভাবে নতুন করে না ভাবতে পারি, যদি সমষ্টির কথা না ভাবতে পারি, তাহলে দুর্গতি আরো বাড়তে বাধ্য। সমষ্টিগতভাবে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে রাখতে পারলে, তবেই প্রযুক্তির সুষম বন্টন সম্ভব হবে, নচেৎ নয়। তাই যদি পারেন, এই সার্ভিসেস সেক্টরের কবল থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরোনোর চেষ্টা করুন, নাহলে পরবর্তী পিঙ্ক স্লিপটি আপনার নামে আসতে চলেছে। 

Friday, March 24, 2017

ইন্টেলেকচুয়াল - Intellectual (খুচরো দর্শন)

Boston, 24-Mar-2017, 10:38 PM

দিন গেলে ভাই তোমার জীবন
ছাপোষা চার দেওয়াল।
আমার ভোরে দুধ-চা-ও নাকি,
ইন্টেলেকচুয়াল।

তোমার সমাজ, আমরা বাদ,
সমাজবাদী তত্ত্ব।
দাস ক্যাপিটাল আমার ঘরে -
দেখনদারি মস্ত।

তোমার কোনো বারণ নেই,
পৈতে-আংটি পড়ায়।
আমিই খালি কনভিকটেড,
বিমানযাত্রা করায়।

কিওরোস্তামী মানুষ-ঘেঁষা,
চেরির মতো স্বাদ।
আমি শুধু মজিদ দেখলে -
আভিজাত্যবাদ।

তোমার ফোনে ইংরেজি গান -
ট্রেন্ডি নাকি খুব।
আমার কোহেন গাইতে এলে -
বুদ্ধিজীবী ভূত।

তোমার কবি ছন্দ ছাড়া -
রিয়েলিটির পাতা।
আমার খাতা, দু'কলমেই
এলিট এবং সস্তা।

তোমার হয়তো সাউথ পয়েন্ট
কিংবা কোনো সেন্ট।
বাংলা মিডিয়াম নিয়ে,
বক্র বাক্যভেদ।

এসব করে তুমি যখন,
নিজের কাছেই গোলাম,
আমি তখন দৃষ্টিভঙ্গি
পাল্টে নিচ্ছিলাম।

Thursday, March 09, 2017

ফেসবুক আর তার পারফর্মাররা - Facebook and its performers

ফেসবুক কিছুদিন আগেই নিজেকে মিডিয়া কোম্পানির মতো গড়ে তোলার কথা বলেছে। অনেক সংবাদমাধ্যমে এটাও দেখা যাচ্ছে, যে internally ফেসবুক নিজেকে একটি মিডিয়া কোম্পানিই ভাবে। কিন্তু ঠিক কি রকমের মিডিয়া কোম্পানি ফেসবুক?

এতদিন আমরা মিডিয়া বলতে জানতাম শুধুই খবরের কাগজ, টিভি। সেখানে আমরা রাজনীতি, অর্থনীতি, দেশ-বিদেশ, গান, খেলাধুলা, সিনেমা – এসবের খবরাখবর পেতাম। কিন্তু ফেসবুক সেইসব খবরকে ছাপিয়ে গেলো। ফেসবুক বললো, খবর প্রত্যেক মানুষের ঘরে তৈরী হচ্ছে। তারা সেসব ঘরোয়া খবরকে তাদের মিডিয়ার বিষয় বানাবে। ফলে আমরা এক নতুন মিডিয়া, এক অভিনব বোকাবাক্সের সন্ধান পেলাম। যা কিনা আমাদের চারপাশের জগতের হালহকিকত সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখায়। মানে আমার বন্ধুর নতুন Himalayan Trip, বা পাশের পাড়ার সঞ্চিতার নতুন বিড়াল পোষার ছবি আর ওবামার কিউবা সফর – সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ফেসবুক এসব করার জন্য যথেষ্ট সময় নিয়ে ভেবেছে এবং user-সংখ্যা বাড়িয়েছে। কারণ ফেসবুকের প্রধান আয়ের উৎস বিজ্ঞাপন। আর সেই বিজ্ঞাপন খুব টার্গেটেড বিজ্ঞাপন। মানে আমরা টিভি বা খবরের কাগজে সবাই মিলে যে একই বিজ্ঞাপন দেখি তা নয়। আপনার পাশের বাড়ির সুলেখা কাকিমা, আর আপনার মা একই বিজ্ঞাপন কিন্তু দেখবেন না ফেসবুকে, যদিও তারা খবরের কাগজ বা টিভিতে একই বিজ্ঞাপন দেখেন। আপনি যা পছন্দ করেন, সেই অনুযায়ী আপনাকে বিজ্ঞাপন দেখানো হবে। মানে সুলেখা কাকিমা যদি পি.সি.চন্দ্র-র গয়না পছন্দ করেন, আর আপনার মা সেনকো গোল্ড – তবে ওদের দুজনকে দুজনের পছন্দসই বিজ্ঞাপনই দেখানো হবে। আর আপনার পছন্দকে জানার জন্য শুধু সময় ব্যয় করলেই চলবে না, আপনার চারপাশের লোকজন, আপনার আশা-আকাঙ্খা জানাটাও খুব প্রয়োজন। আপনি কোন রাজনৈতিক মতবাদে বিশ্বাসী, তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল আপনি আপনার বন্ধুর কোন্ ব্র্যান্ডের জামাকাপড় পছন্দ করছেন, বা আপনার বন্ধু কোন্ রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে আপনি সেটায় আগ্রহী হচ্ছেন।

কিন্তু এসব করার মাঝেই, ফেসবুক যেটা করলো, সেটা একদিক থেকে খুব অভাবনীয়। ফেসবুক সবার জীবনকে সবার চোখের সামনে ঠেলে নিয়ে এলো। শুধু তাই নয়, সেই জীবন কতটা আকর্ষক তার মাপকাঠির একটা জায়গাও তৈরী করলো, “লাইক”-ব্যাপারটার মাধ্যমে। এভাবে ফেসবুক আমাদের চারপাশের সকলকে পারফর্মার বানিয়ে দিলো। যখনই আমরা কিছু post করছি ফেসবুকে, তখনই আমাদের অবচেতনে আমরা যেন কিছু একটা perform করার মানসিকতা নিয়ে করছি। আর সেই performance শুধু একলা নয়, তাতে আবার প্রতিযোগীও আছে। প্রতিযোগীরা হচ্ছেন আমাদের অবচেতনেই আমাদের চারপাশের স্বল্প-চেনা, বেশি-চেনা, অচেনা লোকজনেরা। প্রতিযোগিতার মাপকাঠি কিছু virtual number, যার পোশাকি নাম, লাইক, কমেন্ট, রিয়্যাকশন বা শেয়ার। এই performance-এর জগতে সর্বশেষ সংযোজন – Facebook Live. আপনি শুধু এমনি পারফর্মার নয়, প্রায় সরাসরি লাইভ পারফর্মার। যার আবার প্রতিক্রিয়াও real-time-এ পাওয়া যাচ্ছে।

যে কোনো পারফর্মারকে যদি জিজ্ঞেস করেন, তাহলেই দেখবেন, তারা বলবে যে তাদের performance anxiety বলে একটা ব্যাপার হয়। প্রত্যক্ষ্য অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, আপনি যাই করুন না কেন, আপনি যতই দক্ষ হন না কেন, আপনি যতই practice করুন না কেন, একটা উদ্বেগ আপনার থেকেই যাবে, perform করার জন্য। আর এই উদ্বেগ সরাসরি performance-গুলোতে আরো বেশি হয়। এবার ভেবে দেখুন, আমরা সকলেই এই ফেসবুক platform-এ যখন performer হয়ে যাচ্ছি, তখন এই উদ্বেগ আমাদের সকলের ভিতরে কাজ করছে। এই উদ্বেগ আরো অনেক বিষয়ের সাথে মিলে একটা হতাশা সৃষ্টি করে। দেখবেন অনেক performer অনেক সময় লম্বা ছুটিতে চলে যান, এই উদ্বেগ, এই সবসময়ের প্রত্যাশা থেকে পার পাওয়ার জন্য।

এই হতাশার আরো একটা কারণ অবশ্য আছে। আপনি যখন ফেসবুকে আপনার মতামত জানাচ্ছেন, তখন ততক্ষণ সবই ঠিক চলছে, যতক্ষণ বেশিরভাগ মানুষ আপনার পক্ষে। কিন্তু সময়বিশেষে সেটা থাকে না। এই ক্রমশ-বৃত্ত-ছোট-হয়ে-আসা-র যুগে, আমরা চাই, virtual দুনিয়া হলেও, মানুষ আমাদের কাছে থাকুন। কিন্তু ফেসবুকের এতো মানুষের এতো মতামতের ভিড়ে মাঝে মাঝেই আমরা সেই কাঙ্খিত সাহচর্যটা পাচ্ছি না। আমরা সেই কোনোখানে একলা হয়ে পড়ছি। হতাশার একটা উৎস সেটাও বটে। ফেসবুক কিন্তু এই হতাশার কথা আগাম আঁচই করেছিল।
তাই ফেসবুক চালু করেছে deactivation system. ফেসবুক বুঝেছে যে শুধু log out করেও মানুষ এই উদ্বেগ, একাকীত্ত্ব, হতাশা এবং এই চিরন্তন ভালো performance করে চলার প্রত্যাশা থেকে বের হতে পারছে না। তাদের দরকার হচ্ছে, আর একটা level of protection. সেই জন্যই এই deactivation-এর অবতারণা। আমার নিজের ফেসবুক বন্ধুতালিকার মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ এখন তাদের profile deactivate করে বসে আছেন। তবে অনেকে deactivation না করে, প্রায় passive user হয়ে যান ফেসবুকে। মানে তারা অন্যের performance-এ খুশি হন, মন্তব্য করেন। কিন্তু নিজের মধ্যে কোথাও একটা সুপ্ত ভয় জন্ম নেয়। তাই নিজে থেকে আর ফেসবুকে কিছু বলতে এগিয়ে আসেন না। তাদের অবচেতনে কোনো একটা কণ্ঠ্যস্বর সাবধানবাণী শোনায়, “যদি আমি সবার মতো perform না করতে পারি ! তার থেকে চুপ থাকাই শ্রেয়।” এই passive user-এর সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান, তাই নিয়ে ফেসবুক চিন্তিতও বটে

বেশিরভাগ মানুষ যে ভুলটা করেন এই virtual দুনিয়াতে পা রেখে, সেটা হল, এটাকে এক অন্য দুনিয়া মনে করা। তারা মনে করেন, আমার চারপাশ আর ফেসবুক – দুটো আলাদা জগৎ। বাস্তব পৃথিবীর একটা separate, কিন্তু extension যে এই virtual medium-টা, সেটা অনেকেই ভাবেন না। আপনার পক্ষে কি সম্ভব, নিজের চারপাশের বাস্তবকে deactivate করে থাকা? তা যখন সম্ভব নয়, তখন আপনি এই virtual দুনিয়াকে কিভাবে “না” বলতে পারেন, খানিক সময়ের জন্য। কিন্তু মানুষ এটাই করছেন। আমাদের চারপাশের পারফর্মাররা এটাই করতে বাধ্য করাচ্ছেন আমাদের। কিন্তু এটা বোঝা খুব দরকার – বাস্তব জীবনেও যেমন আপনি পারফর্মার নন, তেমনি virtual-এও নন। আপনার পোস্টের লাইক, কমেন্টের সংখ্যা দিয়ে আপনার পারফর্মেন্স মাপার জায়গা তৈরী করলে – সেটা খুব বড় ভুল হয়ে যাবে। কারণ এই সংখ্যাগুলো একটা ব্যক্তি-মানুষকে মুছে ফেলে’ তাকে সংখ্যা দিয়ে ভাবতে চায়। আমরা যখন আলোয় থাকি, তখন অন্ধকারের মানুষগুলোকে আমরা স্রেফ সংখ্যায় বা স্ট্যাটিস্টিক্স-এ পরিণত করি। আশা রাখবো, আপনার “পারফর্মেন্স” মানুষকে তার ব্যক্তি-সত্ত্বাটুকুর মূল্য দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।

[ফেসবুক নিয়ে একটা সিরিজ অফ লেখার এটা প্রথম কিস্তি - পরেরটা আসবে মে মাসে]

Monday, March 06, 2017

নিউ ইয়র্ক ভ্রমণ - প্রথম পর্ব

বেশ একটা আবেশ করার মতো ঠান্ডা আবহাওয়া। আমরা দুজন পাশাপাশি ফুটপাথ দিয়ে হাঁটছি। এভাবে আমরা কলেজের শীত-গ্রীষ্মতেও হোস্টেল থেকে ক্যাম্পাসের গেট অব্দি হেঁটে যেতাম, ঝালমুড়ি-তেলেভাজা খেতে। তবে এবারে আমরা বেড়িয়েছি স্রেফ চারপাশটা একটু দেখতে, আর কিছু ভালো পানীয়ের সন্ধান পেতে। আমরা হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, কলেজ থেকে আজকের এই মার্কিন মুলুকের পাশাপাশি হাঁটা - বেশ অনেকটা পথ হয়ে এলো। আমরা দুজনেই এরকমটা হতে পারে, ভাবিনি কোনোদিন। আমাদের ব্র্যাকগ্রাউন্ড যেরকম, তাতে ভাবাও সম্ভব না। আমি সরকারি চাকুরের ছেলে, মধ্যমেধার ছাত্র। আর আমার বন্ধুটি চাষির ছেলে, পরীক্ষার নম্বরের দিক থেকে আমারই মতন। কিন্তু তারাই আজ, কিছুটা ভাগ্য, আর কিছুটা চেষ্টার জোরে, বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহরে ঘুরতে বেড়িয়েছি।


লন্ডন-প্যারিস-নিউ ইয়র্ক - বিশ্বের এই তিনটে জায়গার নাম একসাথে উচ্চারিত হয়, এই শহর তিনটের আলাদা আকর্ষণের জন্য। এদের মধ্যে নিউ ইয়র্ককে বিশ্বের বাণিজ্যিক রাজধানী বলেন অনেকেই। বাণিজ্য, ব্যবসা - এই   শব্দগুলোর মধ্যে কোথাও যেন একটা কাঠিন্য লুকিয়ে আছে। মনে হয়, শব্দগুলোর বুঝি হৃদয় নেই, আবেগ নেই। কিন্তু তাও কোনো একটা আবেগের তাড়না থেকেই আমরা ২০১৭ সালের শুরুটা নিউ ইয়র্কেই করতে গেলাম ।


আমি বস্টনে থাকি। সেখান থেকে চার ঘন্টায় বাসে করে, নিউ ইয়র্কে আমরা পৌঁছলাম বিকেল নাগাদ। এক হোমস্টেতে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলাম আমরা। এই ধরণের থাকায় দুটো সুবিধে: এক, একটু কম খরচায় থাকা যায়, হোটেলের থেকে। দুই, জায়গাটার খুঁটিনাটি সম্পর্কে, যার বাড়িতে থাকছি, তার থেকে অনেক কিছু ব্যক্তিগতভাবে জানা যায়। এছাড়াও নতুন মানুষের সাথে পরিচয়ের সুযোগ থাকে, তাতে নিজের মানসিক দৃষ্টিভঙ্গির দিগন্তটা আর একটু বিস্তৃত হয়। জীবনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটা বড় উদ্দেশ্য তো নিজের যে কোনো ধরণের দিগন্তের বিস্তার ঘটানো। এই ধরণের থাকার ব্যবস্থায় সেটা সাবলীলভাবেই হয়। আমরা নিউ ইয়র্কে ছিলাম বালুচিস্তানের (পাকিস্তান) এক মধ্যবয়স্কা মহিলার বাড়িতে। তিনি যথেষ্ট আপ্যায়নের সাথেই আমাদের থাকার বন্দোবস্ত করেছিলেন।


নিউ ইয়র্ক শহরের মধ্যে যদি হৃদয় বলে কিছু থাকে, তাহলে টাইমস স্ক্যোয়ারের কথাই বলতে হয়। আমরা প্রথম দিন পৌঁছেই সন্ধ্যেবেলা সেখানে চলে গেলাম। পৌঁছেই অবাক হয়ে গেলাম। প্রচুর লোক সেখানে আনন্দে মাতোয়ারা। রাস্তার ধারে স্ট্রিট ফুড তৈরী হচ্ছে। সকলে ফটো তুলছেন। রাস্তা পেরোতে কেউ লাল-সবুজের তোয়াক্কা করছেন না। এ যেন এশিয়ার কোনো বড় শহরের ছবি। এমনিতে মার্কিন মুলুকের বেশিরভাগ শহরে এ ছবি দেখাই যায় না। আমরা এসব দেখে, খেয়ে ফেললাম বীফ স্যান্ডউইচ, রাস্তার ধার থেকেই। মোটামুটি কম দামের মধ্যে বেশ মুখরোচক খাবার। আর খিদে পেলে, যে কোনো খাবারের মধ্যেই একটা আলাদা স্বাদের আবির্ভাব হয়। তাই স্যান্ডুইচটা একটু বেশিই ভালো লেগে গেলো খেতে।


এর পরে আমরা দেখতে থাকলাম চারদিক, আর অবাক হলাম। বিশাল বড় বড় নিয়ন আলো দিয়ে তৈরী ডিসপ্লে বোর্ড। সেখানে বিশ্বের নামিদামি মডেল, অভিনেতারা বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন বিভিন্ন ব্যান্ডের। সেই বিজ্ঞাপনের নীল আর লাল আলো সাধারণ মানুষের উপর পড়ছে, আর তারাও যেন খানিকটা রঙিন হয়ে উঠছেন, তাদের সাদা-কালো জীবনকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখে।


নিউ ইয়র্কের সারা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রচুর মিউজিয়াম। কোনোটায হয়তো আছে ভ্যান গগের পুরোনো পেন্টিং। কোনোটায় দারুন সব স্থাপত্য, আবার কোনোটায় মহাজাগতিক বিশ্ব থেকে ধার করে আনা ছবি। আমাদের পক্ষে সব কিছু দেখা সম্ভব ছিল না। কারণ আমাদের হাতে সময় কম, আর অর্থ তো চিরকালই সীমিত। তাই আমরা ঘুরে দেখেছিলাম ৩-৪টি জায়গা - ম্যাডাম ট্যুসো মিউজিয়াম, আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্টোরি, আর মিউজিয়াম অফ সেক্স। এছাড়া নিউ ইয়র্ক শহর আরো একটা যে কারণে বিখ্যাত - তা হল এখানের লম্বা লম্বা হাইরাইস গুলো। আকাশকে ভেদ করে চলে যাওয়া এই বিল্ডিংগুলো যেন মানুষের কীর্তিকে সদম্ভে প্রকাশ করে। আমরা এর মধ্যে অন্যতম প্রধান দুটো বিল্ডিং-এর শীর্ষে উঠেছিলাম (যেগুলোতে উঠতেও প্রবেশমূল্য দিতে হয়) - এম্প্যায়ার স্টেট্ বিল্ডিং, রকাফেলার সেন্টার।

এই সমস্ত জায়গা ঘুরতে ঘুরতে প্রচুর মানুষ দেখেছি, তাবড় তাবড় শিল্পীর দুর্দান্ত সব সৃষ্টি সেখানে। এতকালের সভ্যতার ইতিহাসের টুকরো টুকরো সাজানো আছে অনেক জায়গায়। ম্যাডাম ট্যুসো মিউজিয়ামে বিশ্বের বিখ্যাত মানুষদের মোমের মূর্তিগুলো দেখছিলাম। মানুষের বাইরেটাকে কিভাবে সহজে আবদ্ধ করে নেওয়া যায় - তা বোধ হয় এখানে আসলেই বোঝা যায়। মানুষের ভিতরের নীতি, বোধ, জীবনচর্চাই যে তার প্রকৃত স্বাক্ষর, সেটা এই বাহ্যিক মোড়কগুলো যেন আমাদের সামনে খুলে দেয়। আবার অন্য এক মিউজিয়ামে মানুষের আদি-অনন্তকাল থেকে যে আদিম চাহিদা, যে যৌন আকাঙ্খা - যার সাহায্যে আমরা পৃথিবীকে এক সূত্রে গেঁথে ফেলতে পারি - তার বিবরণ। রকাফেলার সেন্টারের চূড়ায় উঠে মনে হচ্ছিলো - এদের এই এতো উঁচু বিল্ডিং যারা তৈরী করলো, তারা কি আর এখানে উঠে দেখতে পারে! তাদের নিজেদের সৃষ্টির স্বাদ কি তারা উপভোগ করতে পারে? আবার এই রকাফেলাররা পৃথিবীর ইতিহাসে প্রায় গত একশো বছর ধরে তেলের সাহায্যে নিজেদের বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। তাই ওই বিল্ডিং-এর উপরে উঠে, নিচে তাকিয়ে আমার বন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলাম, নিজে কি দেখছিস? ও বলেছিলো, ছোট ছোট অনেক আরো বিল্ডিং দেখতে পাচ্ছি। আমি বলেছিলাম, আমি কি দেখছি জানিস, শত শত মানুষের ঘাম।

Tuesday, February 14, 2017

সব কি সাজানো? - Is everything artificial?

এখানে একটা Park Street আছে, একটা Esplanade আছে। গঙ্গা নেই, তবে চার্লস নদী আছে। কলকাতার যেমন হাওড়া আছে, বস্টনের তেমনি কেমব্রিজ আছে। তারা চার্লস নদীর দু'পাড়ে দুটো শহর, যমজ নয় কিন্তু খুব কাছের দুটো ভাইয়ের মতো, যেমন হাওড়া-কলকাতা। বঙ্গোপসাগর যেমন কলকাতা থেকে দূরে, সেরকম নয়, তবে শহরের একটা পাশেই অতলান্তিকে ভেসে যাওয়া আছে। কলকাতায় যেমন প্রচুর কলেজ, বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আছে, তেমনি বিশ্বের সেরা কিছু পড়াশোনা আর গবেষণার জায়গা এখানে; Harvard, MIT-এর নাম তো অনেকেরই শোনা।

এই এতগুলো মিল ঠিক কেন ঘটলো, কেন ঘটে যায় এই co-incidence গুলো? যখনই এরকম ঘটে যায়, তখনই দুটো জিনিসের কথা মনে পড়ে: ১) টেলিপ্যাথির কথা, যার ব্যাপারে সোনার কেল্লায় প্রথম শোনা। ২) The Truman Show-এর কথা, যেই ফিল্মটি এক প্রিয় শিক্ষকের পরামর্শে দেখেছিলাম। Truman Show-এর কথাই বেশি মনে পড়ে। সেখানে ছোট্ট থেকে একটা বাচ্চাকে বড় করা হচ্ছে। অথচ সেই বাচ্চাটির চারপাশে কেউই আসল নন। সকলে অভিনয় করে চলেছেন। আর বাচ্চাটিকে যে জায়গায় বড় করা হচ্ছে সেটা একটা TV Show-এর সেট। পুরোটাই বানানো। এবং সেই সেটে লুকোনো ক্যামেরা রাখা আছে, যার সাহায্যে ২৪x৭ বাচ্চাটির জীবন সম্প্রচার করা হচ্ছে টিভিতে। বাচ্চাটি ছোট থেকে যুবক হয়ে উঠছে, কিন্তু তাও সে বুঝে উঠতে পারেনি, যে তার চারপাশে এতবড়ো একটা ভাঁওতা চলছে।

চারপাশের সবই কি তাহলে এরকমই কোনো অদৃশ্য কৃত্তিমতা দিয়ে বানানো ! আজো ঘটে গেলো, এরকমই একটা সন্দেহজনক ঘটনা। আজ ভ্যালেন্টাইন্স ডে, পৃথিবীর জন্য অফিসিয়ালি প্রেমের দিবস। ঘরে ফিরে আজ একটা গল্প দেখছিলাম, download করে। সেই গল্পে সকলে একটা অদ্ভুত দুনিয়ায় বাস করে, যেখানে তাদের জীবনধারণ খুব সোজা - হাত আর মুখের অঙ্গভঙ্গিতে সব কিছু হাতের কাছে পাওয়া যায়। বাথরুমে গিয়ে ব্রাশ করার মতো ভঙ্গি করলে ব্রাশ আর মাজন হাতের কাছে এসে যায়। একটা button ক্লিক করে খাবার পাওয়া যায়। মানে আদ্যন্ত যান্ত্রিক দুনিয়া।

তবে ওই যান্ত্রিক দুনিয়াতে একটাই জিনিসের বড় অভাব। অনুভূতির। সমব্যাথী হওয়া, ভালো লাগা, ভালোবাসা - এই ধরণের কোনো অনুভূতিই নেই সে দুনিয়ায়। একটা ছেলে সেই অনুভূতিগুলো পাওয়ার চেষ্টা করেও, সে তার ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে যন্ত্রের কাছে। এমনকি যন্ত্রের আধিপত্য এমনই যে, সে নিজের মধ্যে অনুভূতি জিইয়ে রাখার যে প্রবল ইচ্ছে, সেটাকেও বিসর্জন দিতে বাধ্য হয়। সে সবার সামনে এই যান্ত্রিক সিস্টেমের বিরোধিতা করতে, একসময়, গেছিলো। কিন্তু সকলের চাপে, জনগণের মত্ততায় সে সবার মতোই একজন হয়ে যায়।

ওই গল্পের ছেলেটার মতোই আমরা কি এভাবেই আমাদের হারিয়ে ফেলবো? যন্ত্রের শাসনে, জনগণের অনুশাসনে, আমাদের স্বাধীন মূল্যবোধ, ছোটোখাটো চাহিদা, স্বকীয়তা, এগুলো কি শেষ হয়ে যাবে! ভালোবাসা কি শুধু পরিণত হবে সংখ্যাগরিষ্ঠ তাকে যেভাবে প্রকাশ করে, সেই ধরণের কোনো স্থূল অভিব্যক্তিতে? নাকি এসব ভবিষ্যৎ আশঙ্কা নয়, ঘোর বাস্তব! সত্যিই হয়তো এখন পৃথিবীটা কতকটা ওই গল্পের মতোই। আর ওই download-করা গল্পটা আমাকে ওই ছেলেটির প্রতিরূপের মাধ্যমে কোনো ইঙ্গিতে বোঝাতে চাইলো সেই সত্যিটাকে।

Sunday, February 05, 2017

পরিবেশের পরিণতি - Fate of Environment

এই লেখাটা বেশ পরে লিখবো ভেবেছিলাম, কিন্তু এখনই লিখে ফেলতে হচ্ছে। কিছু এমন ঘটনা ঘটে যাচ্ছে যে, এ লেখা আর পরে লেখার সুযোগই হয়তো পাবো না।

পেট্রল-ডিজেলের দাম গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকবার কমেছে। বিশ্বের তেলের বাজার আর দেশের তেলের বাজারেও। এরকমটা আগে খুব একটা দেখা যায়নি। কিন্তু কেন এরকম হল? পৃথিবীর সীমিত তেলের ভান্ডারে তেল তো কমে আসছে, তাহলে দাম কমবে কি করে? অনেকগুলো geo-political কারণ আছে। কিন্তু তার মধ্যেও একটা অন্য রকমের কারণ লুকিয়ে আছে, যেটা বেশ আলাদা। কারণটা একটা নতুন আবিষ্কার। আমরা এতদিন যেভাবে তেল তুলতাম মাটির বা সমুদ্রের নিচে থেকে, তার থেকে একটা অন্য পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে। যদিও আসলে এই পদ্ধতি বেশ অনেকদিনই জানা ছিল। কিন্তু এই পদ্ধতিটার খরচ খুব বেশি। তাই এই ধরণের পন্থা অবলম্বন করে তেল তোলা হতো না। কিন্তু তেলের দাম ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে এখন সেই আলাদা ধরণের পদ্ধতিও আমরা afford করতে পারবো।

যে নতুন পদ্ধতির কথা বলছি, তাকে বলা হয় ফ্র্যাকিং (fracking). খুব বিস্তারিতভাবে বলার মতো জ্ঞান বা পরিসর নেই। সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি। কোনো কোনো জায়গায়, মাটির নিচে পাথরের মধ্যে খুব ছোট্ট ছোট্ট কুণ্ডলীতে তেল জমা হয়ে থাকে। এই সব ছোট্ট কুণ্ডলীর তেল খুব সহজে বের করে আনা যায় না। এই তেল বের করে আনার জন্য মাটির নিচে পাইপে করে কিছু তরল পাঠাতে হয়। সেই তরলে থাকে জল আর কিছু রাসায়নিক পদার্থ। এর পরে সেই তেল কুণ্ডলীগুলো থেকে বেরিয়ে আসে। বেশ চাপ দেওয়ার ফলেও এই কাজটি সহজ হয়। মোটের ওপর এটাই পদ্ধতি, YouTube-এ এর থেকে ভালো বিবরণ পেয়ে যাবেন।

ফ্র্যাকিং-এ প্রথমেই যে বিশাল ক্ষতিটা প্রকৃতি সহ্য করে, সেটা জল-সম্পর্কিত। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, ফ্র্যাকিং জলকে ভীষণভাবে দূষিত করে তোলে, রাসায়নিক পদার্থগুলোর জন্যে। এ ছাড়াও এই পদ্ধতিতে যেহেতু প্রচুর পরিমান জলের দরকার হয়, তাই আমাদের পানীয় এবং ব্যবহারযোগ্য জলেরও প্রচুর অপচয় হয়।

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণে বিজ্ঞানীরা ফ্র্যাকিং-কে ভালো চোখে দেখেন না। ফ্র্যাকিং মাটির নিচের পাথরের মাঝের অংশগুলি খালি করে দেয়। ফলে আমাদের থাকার জায়গার নীচটাও অনেকটা ফাঁপা হয়ে পড়ে। আর ফ্র্যাকিং যেহেতু জনবসতিপূর্ণ এলাকাতেও করা যায়, তাই বসবাসযোগ্য এলাকা ধীরে ধীরে ভূমিকম্পপ্রবণ হয়ে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। একটা গবেষণায় বলা হচ্ছে যে, ফ্র্যাকিংয়ের কারণেই আমেরিকার দক্ষিণের অনেক অঞ্চলে গত কয়েক বছরে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়েছে।

এই ফ্র্যাকিং মূলত শুরু হয়েছে আমেরিকায়। আর সে জন্যই গত কয়েক বছরে তেলের দামের এই পতন। কারণ আমেরিকা এখন নিজেই প্রচুর পরিমানে তেল উৎপাদন করতে পারছে। ফ্র্যাকিং সাধারণত করে থাকে Shell-এর মতো বড় বড় তেলের কোম্পনিগুলি। সম্প্রতি তারা একটি নতুন জায়গায় ফ্র্যাকিং শুরু করেছে। যার পাইপলাইন যাবে আমেরিকার নর্থ ডাকোটা বলে একটি রাজ্যের ওপর দিয়ে। কিন্তু সেই অঞ্চলটি আবার নেটিভ আমেরিকানদের বাসভূমি। মানে সেইসব মানুষরা এখানে থাকেন, যারা ব্রিটিশদের আমেরিকা আবিষ্কার করার পূর্ববর্তী সময় থেকেই, এখানে কয়েক বংশ ধরে আছেন। সেসব আদিবাসী মানুষেরা নর্থ ডাকোটায় পাইপলাইনের-এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। অনেক স্বনামধন্য মানুষ, যেমন পিঙ্ক ফ্লয়েডের রজার ওয়াটার্স, তাদের প্রতিবাদকে সমর্থন করেছিলেন। ফলে এর পর ওবামা-সরকার নর্থ ডাকোটায় পাইপলাইন পাতার অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে।

কিন্তু ট্রাম্প-এর সরকার ক্ষমতায় এসে সেই অনুমতি দেওয়ার ব্যবস্থা করা শুরু করেছেন। প্রাথমিক ছাড়পত্র পাওয়া হয়ে গিয়েছে। বলা যাচ্ছে না, শেষ পর্যন্ত কি হবে ! কিন্তু এই ছাড়পত্র যদি পাওয়া যায়, আমরা ধ্বংসের পথে আরো এক ধাপ এগোবো। এর মূলত দুটো কারণ, এক এই fossil fuel-এর ব্যবহার আমাদের ধ্বংসকে ত্বরান্বিত করবে। আর সারা পৃথিবীর কাছে বার্তা যাবে, যে আমেরিকা ফ্র্যাকিং করছে, মানে অন্যান্য দেশও এটা করতে পারে। আর দুই, পৃথিবীর আবহাওয়াকে সুরক্ষিত রাখার জন্য যে কাজগুলো করা হচ্ছিলো, তা ভীষণভাবে আহত হবে। টাকা বোঝে না কে মানুষ, আর কে পৃথিবী। সে শুধু বোঝে যে, তার কাজ বেড়ে চলা। তাতে পৃথিবী ক্ষতিগ্রস্থ হোক আর না হোক, তার কিছু যায় আসে না।

আমরা ঠিক কতটা পিছিয়ে পড়ছি তা সম্প্রতি একটি তথ্যচিত্রে লিওনার্ডো ডি ক্যাপ্রিও তুলে ধরেছিলেন। নাম, Before the Flood. দেখে না থাকলে যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব দেখার চেষ্টা করুন। প্রথম ক'দিন তথ্যচিত্রটি YouTube-এ বিনামূল্যে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু এখন আর পাওয়া যাচ্ছে না, তবে তাও YouTube-এ খুঁজলে পাওয়া যাবে। আসলে Before the Flood-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল National Geographic. সেই National Geographic হল Fox Studio-এর একটি অংশ। আর Fox Studio এবং তার মালিক Rupert Murdoch হলেন অন্যতম বড় Climate Change Deniers. মানে এরা মানেন না যে, তেলের যথেচ্ছ ব্যবহার আর মানুষের কার্যকলাপের জন্যই প্রকৃতির বড় ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে। তাই এই পুরো ব্যাপারটাতেই থেকে যাচ্ছে অনেক ধোঁয়াশা। কে, কোন কাজ, কেন করছে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার। আশা করবো এ ব্যাপারে আমরা সকলে আরো বেশি করে সচেতন থাকতে পারবো। সচেতন থাকতে হবে - কি পড়ছি, কাদের থেকে পড়ছি, এবং আরো কিছু প্রশ্ন মনে নিয়ে। তবে আপাতত ভবিষ্যৎ খুব একটা উজ্জ্বল নয়।

Friday, January 27, 2017

নির্বাসন - Exile

Boston, 28-Jan-2017, 1:50 AM

ধূসর আলোয় ফ্লোরের উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে ব্যস্ততা,
একটা কোণে বাক্সে রাখা ভুলতে বসা তিক্ততা।
এমন করে যাবে জানি, ক্যালেন্ডারে দিন গুনি,
উজান মেঘে বৃষ্টি হয়ে, কেটে যাবে শূন্যতা।

কিন্তু এখন রাত কাটে না মন খারাপের সঙ্গতে,
পেনের কালি আমার সাথে আসর বসায় শেষটাতে,
একটি মেয়ের প্রতিচ্ছবি, রুকসানা বা জাহ্নবী,
আদর দিয়ে ফুটিয়ে তুলি আমার লেখা গল্পতে।

চোখ ভেঙে যে নিদ্রা আসে, গল্প থামে ঠিক তখন,
বিজলি বাতি কাঁদতে থাকে একলা আরো কিছুক্ষন।
চারিদিকে স্তব্ধতা, হারিয়ে যাওয়া মুগ্ধতা।
আরামদায়ক এই সময়ের আরেকটা নাম নির্বাসন।

Wednesday, January 18, 2017

প্রযুক্তি ও তার ভবিষ্যৎ - Technology and its future

Technology যেন সমুদ্রের মতোই যতটা নেয়, ততটাই ফিরিয়ে দেয়। কথা-টা হয়তো সম্পূর্ণ ঠিক নয়; প্রযুক্তিকে ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। কিন্তু কিছুটা তো ঠিক অবশ্যই। তাকানো যাক আজ থেকে মোটামুটি ১০ বছর আগের দিনগুলোয় বাংলার সংগীতজগৎ-এর দিকে। খুব সঙ্গীন অবস্থা। এখন যে খুব ভালো অবস্থায় আছে, তা নয়। তবে এখনকার থেকে তখন অবস্থা আরো খারাপ ছিল। MP3-এর ব্যবহার ততদিনে আমরা সকলে জেনে গেছি। ফলে Music CD আর প্রায় বিক্রিই হচ্ছে না। বাংলা ব্যান্ড যদিও ভীষণ পপুলার। private radio channel গুলো কিছুটা চেষ্টা করছে বাংলা গান বাঁচিয়ে রাখার জন্য। কিন্তু রেডিওগুলো বিভিন্ন অভিনব প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করলেও, CD-এর কাটতি বাড়াতে পারছেন না।

Cut-to আজকের যুগ। CD ব্যাপারটাই প্রায় উঠে গেছে। পার্ক স্ট্রিটের Music World বন্ধ হয়ে গেল। YouTube, Spotify, Saavn, Gaana, Google Play Music – এসব চলে এলো। MP3 যে এখনো নেই তা নয়, এখনো যে পাইরেসি হচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু একটা অল্টারনেটিভ রাস্তা খুঁজে পাওয়া গেছে। আজকালকার গানগুলো সব থাকছে কোনো এক সার্ভারে। সেখান থেকে সবাই download করে শুনছেন। শিল্পীও তার পয়সা পাচ্ছে, আর কিছু advertisement-এর নূন্যতম বিরক্তি সহ্য করে, আমরাও বিনামূল্যে গান শুনতে পারছি। বা কিছু টাকার বিনিময়ে সেই বিজ্ঞাপনের বিরক্তিও দূর করা সম্ভবপর হচ্ছে।

কিন্তু এতে আবার একটা নতুন সমস্যা তৈরী করেছে – এই যে শিল্পী আর শ্রোতার মধ্যিখানের কোম্পানিগুলি – এগুলো নাকি শিল্পীদের ন্যায্য দাম দিচ্ছেন না। এক উঠতি ব্যান্ডের গিটারিস্টের সাথে কথা হচ্ছিলো প্রযুক্তির পীঠস্থানে, মানে এই খোদ আমেরিকায়। তাদের বক্তব্য Spotify-এর মতো বড় বড় কোম্পানি যে পরিমান income-এর স্বপ্ন দেখে বা already যা income করছে, তার খুব সামান্যই musician-রা পান। Google-এর বিরুদ্ধেও এই অভিযোগ উঠেছে YouTube-কে নিয়ে। যাই হোক, আপাতত এটা মনে রাখা যাক, এই মধ্যিখানের কোম্পানিগুলোর ভূমিকা সামান্য ঝাপসা…

এবার একটু অন্য দিকে চোখ রাখা যাক। কিছু বছর আগের কথা, তখন আমি প্রাইভেট সার্ভিসেস কোম্পানির ঘানি টানছি কলকাতায়। মাস গেলে মাইনে পাচ্ছি, যদিও সন্তুষ্টি অধরা। এই সময় অনেক ধরণের নতুন চিন্তা মাথায় আসতো। সেই idea-গুলোই আমার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করে নিতাম, যাদের সাথে আবার ফ্ল্যাটও শেয়ার করতাম।

এর মধ্যে একটা সমস্যা যেটা মনে হয়েছিল – সেটা হল, এই যে এতো ট্যাক্সি আমাদের শহরে ঘোরাফেরা করে, অনেক সময়ই ফাঁকায়, বিনা যাত্রীতে এদিক-ওদিক যায়। সেই ট্যাক্সিগুলোতে যদি একটি GPS device বসিয়ে centrally control করা যেত, তাহলে অনেক তেল আর সময় বাঁচানো যেত। জানি কি ভাবছেন। এটাই তো এখন Uber, Ola বা Lyft করে। আর আমার দাবি এই যে, Uber-এর আগেই আমি এই ভাবনাটা ভেবে ফেলেছিলাম? না আদৌ, তা নয়। এটা আমার মতো হয়তো অনেকেই ভেবেছিলো। Uber সেটা করে দেখিয়েছে। Information Technology-তে ভাবনার খুব একটা কোনো মূল্য নেই (আমার যে বন্ধুটিকে বলেছিলাম সে তো বলেছিলো যে এসব ট্যাক্সিওলাদের সাথে কোনোরকম deal করাটাই চাপের)

যাই হোক, আমার idea-টার আরও একটা part ছিল। আমি ভেবেছিলাম যখন একটা Software বানানো হয়ে যাবে এই idea-টা দিয়ে, তখন সেটাকে Government-এর কাছে বেচে দেব। কারণ খুব স্বাভাবিকভাবেই, Software তৈরী হয়ে যাওয়ার পর ওটায় আমার আর কোনো ভূমিকা দেখিনি। এবং এখানেই লুকিয়ে আছে পরের ব্যাপারটা।

Uber ঠিক করছেটা কি? কেউ তার নিজের গাড়ি চালাচ্ছে। আমরা সেইসব গাড়িতে চড়ছি। যে গাড়ি চালাচ্ছে, সে তার প্রতিদানে কিছু পাবে, সেটাই স্বাভাবিক। আমি গাড়ি চড়ছি, তাই আমি গাড়ির চালক ও মালিককে কিছু টাকা দেব, সেটাও স্বাভাবিক। কিন্তু Uber? সে কি করছে? সে Software-এর মাধ্যমে গাড়ি আর তার সওয়ারীকে connect করছে। কিন্তু Software যখন তৈরী হয়ে গেলো, তারপর সেটা maintain করার *প্রকৃত* খরচ তো খুবই সামান্য। এই maintenance cost-এর ব্যাপারটা সমস্ত Software Engineer-দেরই জানা। এবং আজকাল প্রযুক্তি এতটাই উন্নতির জায়গায় চলে যাচ্ছে, যে একটা computer নিজেই তার fault বুঝতে পেরে, তাকে সারিয়ে নেবার প্রাথমিক পদ্দক্ষেপগুলো নিয়ে নিতে পারছে। মানুষের সহযোগীতা খুব কমই দরকার হচ্ছে। এই automated fault resolution নিয়ে এখন অনেক গবেষণাও হচ্ছে। সুতরাং, maintenance cost আরো কমবে ভবিষ্যতে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।

তাহলে এবার প্রশ্ন: Uber-কে আমি কি জন্য টাকা দেব? বা Uber-এর এই গাড়ির মধ্যস্থতা করার জন্য আলাদা করে আদৌ অস্তিত্বের কি প্রয়োজন আছে? কোনো Government-ই তো এটা operate করতে পারে। বরং Government-এর আরো সুবিধে আছে। গাড়ি চালকের বৈধতা, কোনো দুর্ঘটনা-জনিত সমস্যা – এ জাতীয় যাবতীয় জটিলতা (আজকাল পেপারেও দেখা যায়) মেটানোর ব্যাপারে Uber-এর মতো প্রাইভেট কোম্পানিগুলোর থেকে আমাদের সরকার অনেক বেশি সক্ষম এবং উপযুক্ত।

এবার একটা প্যাটার্ন ধরার চেষ্টা করা যাক। গানের জগতের Spotify, গাড়ির জগতের Uber, অথবা এরোপ্লেন বুক করার Yatra.com বা ঘুরতে গিয়ে বাড়িঘর বুক করার AirBnB – এই সমস্ত সংস্থাগুলো শুধুমাত্র একটা ব্রিজের ভূমিকা নিচ্ছে – পরিষেবা যে দেবে আর যে পাবে – তাদের মধ্যে। কিন্তু ক্রেতা এবং বিক্রেতা দুজনেই এই সংস্থাগুলোকে আলাদা করে টাকা দিচ্ছে। Uber যখন আপনি চড়েন, তখন Uber একটা charge কেটে নেয় আপনার থেকে, তার নিজের জন্য। আবার Uber-চালক আপনাকে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য যে টাকা পান, তার একটা অংশ Uber-কে দেন (আসলে procedure-টা আরো জটিল, কিন্তু মোটের উপর এটাই)। তাহলে আপনি বা গাড়ির চালক Uber-কে টাকাটা দিচ্ছেন কেন? শুধুমাত্র কোনোকালে তারা একটি Software তৈরি করেছিল বলে, মূলত তাই তো?

প্রযুক্তির বিষয়ে মূল প্রশ্নটা এখন এখানেই। প্রযুক্তি তো আমাদের নিরন্তর দিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির মালিকানাটা ঠিক কার হাতে? Uber, Spotify-এর Software-গুলো তৈরী করেছে আপনার-আমাদের মতোই হাজার হাজার Software Engineer-রা। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই Uber-এর আর দরকার হবে না এইসব Software Engineer-দের। কারণ তারা তো already Software-টা তৈরি করেই ফেলেছে। কিন্তু তাদের তৈরী করা এই Uber কিন্তু থেকে যাবে, আর তার মুনাফা পকেটস্থ করবে Uber-এর মালিকানা যাদের আছে, সেই গুটিকতক মানুষ।

এই নিয়ে খুব সচেতনভাবে ভাবা দরকার – প্রযুক্তির যে অসম্ভব প্রগতি আর তার যে দানগুলো আমরা সমাজে প্রকটভাবে দেখতে পাচ্ছি – সেটা আমরা কাদের হাতে ছেড়ে দেব! ভীষণ অদ্ভুত ব্যাপারটা হলো – এ নিয়ে যাদের সব থেকে বেশি কথা বলা দরকার – সেই বামপন্থী সংগঠনগুলো এই পরিবর্তনটা ধরতেই পারেননি ঠিক করে। পরবর্তী জামানাটা যে শুধুমাত্র এক তথ্যভিত্তিক জামানা হতে চলেছে – যে ব্যাপারে তারা পুরোপুরি উদাসীন। তথ্যের মালিকানা যার, আগামী সময়টাও তারই – এই নিয়ে বেশিরভাগ বামপন্থী সংগঠনগুলো কিছু বলে না। শুধুমাত্র সামান্য কিছু প্রগতিশীল, বামপন্থী নিউজপেপার এই নিয়ে একটু লেখালিখি করে।

এই বিষয়টা গুরুত্ত্বপূর্ণ হওয়ার আর একটা বড় কারণ আছে। আমরা ভীষণ দ্রুতভাবে সেই যুগটায় যেতে চলেছি – যখন আমাদের বেশিরভাগ কাজ automated হয়ে যাবে। মনে হতে পারে এটা কোনো science fiction – কিন্তু একটু প্রযুক্তির খোঁজখবর নিলেই বুঝতে পারবেন – আর কিছুদিন পর থেকেই আমাদের নিজেদের দৈনন্দিন কাজগুলো করার জন্য মানুষের সহযোগিতার আর প্রয়োজন হবেনা। কোনো artificially intelligent agent আমাদের সাহায্য করে দেবে।

ধরুন, একটা সারা দিনের কিছু কাজের কথা। সকালে উঠে আপনি ব্রেকফাস্ট করলেন, toaster-এ তৈরী করা ব্রেড আর জ্যাম দিয়ে। এর পর আপনি স্নানে যাওয়ার সময় Alexa (Amazon-এর voice assistant)-কে বলে দিলেন ১৫ মিনিট পরে একটা Uber ডেকে দিতে। Uber একটা driverless car পাঠিয়ে দিল (যা এখন ক্যালিফোর্নিয়া আর পিটসবার্গে already রাস্তায় commercially চলছে). আপনি অফিসে এসে দেখলেন computer আপনার সব কাজ এগিয়ে রেখেছে, আপনি শুধু একটু approve করে দিলেন কাজগুলো। তারপর আপনি ভাবতে শুরু করলেন যে নতুন, innovative আর কি করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে বাড়ি ফেরার সময় এলো। আপনি অফিসে রাখা Alexa-কে বললেন বাড়ি ফেরার রাস্তায় Amazon Store-এ আপনার জন্য ১ কেজি চিকেন রেডি রাখতে। Amazon তার Robot দিয়ে সেটা রেডি রাখলো। আপনি চালকবিহীন Uber-করে বাড়ি ফেরার সময় Amazon Store থেকে টুক করে চিকেন তুলে আনলেন। বাড়ি এসে আপনার জামাকাপড় ধোওয়া এবং শুকোনোর জন্য Washing Machine-এ দিয়ে দিলেন। তারপর মুরগির মাংস দিয়ে জমিয়ে ডিনার সারলেন। এরপর ঘুমোতে যাওয়ার সময় Google Assistant-কে বললেন আপনার মোবাইলে সকাল ৭টার আল্যার্ম দিতে। খুব অকল্পনীয় ঘটনা কিন্তু নয়, কারণ প্রায় প্রত্যেকটা product মার্কেটে already পাওয়া যাচ্ছে।

এই artificial intelligence-কে যদি আমরা মুষ্টিমেয় কিছু লোকের হাতে ছেড়ে দিই, তাহলে মুনাফাটাও ক্রমশ জড়ো হবে সেই লোকগুলোর সিন্দুকেই। গরিব আর ধনীর মধ্যে তফাৎ যেভাবে এখন অশ্লীলভাবে বেড়ে চলেছে – এটা থামানো সম্ভব হবে না।তাই সমাজের শিক্ষিত অংশ – মানে যারা এই প্রযুক্তির সুফলটা প্রথমেই পাচ্ছে আর যাদের আমার এই লেখাটা পড়ার সম্ভাবনা আছে – তাদের ভাবা দরকার প্রযুক্তিটা কাদের দখলে থাকা উচিত? যারা Software-গুলো তৈরী করছেন, সেই সকল মানুষ এবং জনগণের? নাকি কিছুসংখ্যক ভাগ্যবান লোকের দখলে? যারা প্রযুক্তিটাকে টাকা ছাপাবার মেশিন হিসেবে ব্যবহার করবে? ভাবনার দায়িত্ব আমাদের সকলের।