Saturday, May 26, 2018

অন্তরখনন

ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছি, কানে হেডফোন। একটু সামনে একটি মেয়ে হেঁটে চলেছে। আমার মনে হল, সে যেন আমার হেডফোনে হয়ে চলা গানের তালে তালে হাঁটছে। লক্ষ্য করে দেখলাম, তার কানেও হেডফোন। এর মানে, সে হয়তো সম্পূর্ণ অন্য কোনো গানের ছন্দেই হেঁটে চলেছে, অথবা তার হাঁটার হয়তো কোনো ছন্দই নেই। কিন্তু আমার কানে, আমার মনে যে গান, যে ছন্দ বয়ে যাচ্ছে, তারই প্রতিচ্ছবি আমি দেখতে পাচ্ছি মেয়েটির হাঁটার মধ্যে।

একইরকম ভাবে, আমরা তো সত্যিই জানিনা, অন্য লোকটা ঠিক কি ভাবছে, কিভাবে ভাবছে, কোন পরিপ্রেক্ষিতে ভাবছে। কিন্তু নিজেদের সুবিধেমতো একটা প্রতিচ্ছবি ভাসিয়ে দিই, অন্য মানুষের জীবনের ক্যানভাসে। অথচ সেই জীবনটা সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণাই থাকে না। আর সেই মানুষটাকে যদি সামনাসামনি, চাক্ষুষ না দেখে থাকি, তখন আমাদের কল্পনাশ্রিত চারিত্রিক গড়নটার আরো সহজ প্রক্ষেপন করতে পারি। বিভিন্ন ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ার নেটওয়ার্কের দৌলতে, যেটা এখন প্রায়শই হয়ে থাকে।

এর ফলস্বরূপ, ঠিক কোন "আমি"-টা যে আসল "আমি", ক্রমশই সেটা ধোঁয়াশায় চলে যাচ্ছে। আমার চারপাশের সমাজ একটা নির্দিষ্ট "আমি"-কে ডিমান্ড করছে। আমার সোশ্যাল মিডিয়ায় অচেনা-স্বল্পচেনা-(আগে-চেনা-এখন-অচেনা) বন্ধুরা একটা "আমি"-কে চাইছে। এছাড়াও ব্যাক্তিগত স্তরে আরো নানা কাছের মানুষ, দূরের মানুষেরা বিভিন্ন "আমি"-কে চেয়ে থাকছেন। 

কিন্তু তার মধ্যে থেকেও একটা আমার "আমি" তো আছে। যে "আমি"-টা একান্ত আমার। যে "আমি"-টাকে আমি নিজে চেয়েছি। যে "আমি"-টার মতে, সৃষ্টিশীল শিল্প আর রাজনীতি একসাথে পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে। যে "আমি"-টার মতে আধ্যাত্মিক এবং ধর্মীয় ব্যাপারকেও খুব যুক্তিযুক্তভাবেই তর্কের বিষয়ে আনা যায়। তাকে স্রেফ "গাঁজাখুরি" হিসেবে উড়িয়ে না দিয়েও, দেখানো যায় যে ধর্ম পালনের জায়গাটা খুবই ব্যক্তিগত। আবার সেই "আমি"-টা তো এটাও মানে, যে সমাজবাদ কোনো ধর্ম নয়। 

মানুষের সমাজে থাকার দরুন, তার স্বাভাবিক প্রবৃত্তিই তো একসাথে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা। সেই সমাজে একে অপরের সাহায্যই তো খুব প্রত্যাশিত। সেখানে কি করে একটা ভার্চুয়ালি তৈরী করা জিনিস, যার পোশাকি নাম "টাকা", তাকে আমরা সমাজ এগোনোর প্রধান চালিকাশক্তি করে তুলতে পারি? কিন্তু তা বলে সমাজবাদ তো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মতো কোনো "গোঁড়ামো" নয়। কি করে তা হবে? কারণ সমাজ তো সদা-পরিবর্তনশীল, সে এক জায়গায় থামবে কেন! কিন্তু সেই সমাজবাদকেই কিছু মানুষ কুক্ষিগত ধর্মের মতো করে তুলছে। মাঝে মাঝে "মহামতি মার্ক্স্"-এর কোটেশন টেনে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু তা কেন হবে, আমি তো সমাজে থাকতে থাকতে স্বততই উপলব্ধি করছি সমাজবাদের গুরুত্ব। তার জন্য তো আমার মার্ক্স্-এর উদ্ধৃতি লাগছে না। হ্যাঁ, কিছু ক্ষেত্রে পড়তে হয় বৈকি, তবে যেমন কম্পিউটার আর্কিটেকচার বুঝতে না পারলে বই পড়তে হয়, ঠিক তেমনি; স্রেফ আগের কাজটাকে বুঝে নেওয়ার জন্য। কিন্তু তারপর উপলব্ধি তো ব্যক্তিগত, প্রাতিষ্ঠানিক তো নয়।

অথচ, যে এই "আমি"-টাকে দেখেনি বা বোঝার চেষ্টা করেনি, সে তো ওই প্রাতিষ্ঠানিক "আমি"-কেই দেখার চেষ্টা করছে। আমিও আর আলাদা থাকছি না, অনেক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরূপের মধ্যে স্রেফ আর একটা প্রতিবিম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ছি আমি। এর জেরে, সেই অন্যের চোখের "আমি"-র সাথেও আর নিজেকে মেলাতে পারছি না। খুব খুব দূরে সরে পড়ছি। একটা দেওয়াল তৈরী হচ্ছে। আমি বোঝাতে পারছি না, যে কোথাও গিয়ে আমার অন্য কিছু মনে হচ্ছে, লেনিনিষ্ট-স্টালিনিস্ট পার্টি স্ট্রাকচারে ঠিক বিশ্বাস থাকছে না আমার। আবার কোথাও হয়তো আমার মনে হচ্ছে, ট্রটস্কি যখন আন্তর্জাতিকতাবাদের কাছে গিয়ে সমাজবাদকে স্থান দিতে চাইছেন, সেটাই হয়তো আসল পথ। কখনো মনে হচ্ছে, নিচ-থেকে-উপরে আসার রাস্তাটাই সঠিক, নিচের স্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা-আন্দোলন-রাজনৈতিক-শিক্ষা না হলে উপরের নেতাদের শত শত কুরবানী, আন্দোলন বৃথা। সবকিছুকে আমি যখন অবজেক্টিভলি বুঝতেও চাইছি, আমার গায়ে লেগে থাকা "ট্যাগ", আমাকে তা বুঝতেই দিচ্ছে না, চারপাশের মানুষেরা সেই সুযোগটাই দিচ্ছে না। আমার মতপ্রকাশ স্রেফ আমার গায়ের "ট্যাগ"-কেই আরো জোরে সেঁটে দিচ্ছে। 

একেকবার খুব খুব, যাকে বলে, একেবারে ভীষণ রেগে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করছে, এভাবে আর চলা সম্ভব নয়। আমাকে খুঁজে দিতেই হবে আফ্রিকা থেকে আহমেদাবাদ - সকল জায়গার শ্রমিকের সমানাধিকার। কিন্তু আবার তার পরেই তো আমার খুব ভালো লাগছে এই পৃথিবীটাকে। আমি নদীর ধারে যখন হাঁটছি, তখন দেখতে পাচ্ছি, সলিল সুর করছেন দূরে গাছের তলায় বসে, "আহা ওই আঁকা-বাঁকা যে পথ"। আমি তো শ্যামল মিত্রের স্রোতে ভেসে গেয়ে উঠছি, "আপন নীড়ে ফিরে গেছে পাখি, নীড় হারায়ে আমি পথে থাকি"। এগুলো তো মিথ্যে নয়, বরং ভীষণ ভীষণ করে সত্যি বলে মনে হচ্ছে আমার। আমি যখন অনেক ভেবে ভেবে, একটা থিওরি খাড়া করে, মডেল বানিয়ে, তার ওপর একটা সিস্টেম তৈরী করছি, কোড লিখে - আমার যে ভীষণরকমভাবে সেটাকে রিয়েল, আদ্যোপান্ত সত্যি মনে হচ্ছে। অথচ ফেসবুকের মধ্যে যে কোনোরকম রিয়েলিজম পাচ্ছি না। কেউ যে সেখানে সত্যি কথাটা বলছে না। সক্কলে একটা ডিমান্ড-সাপ্লাইয়ের চেইনে, শৃঙ্খলে ঢুকে গেছে মনে হচ্ছে। এই কঠিন কৃত্তিম সত্যিটাকে যে একদম অস্বীকার করতে পারছি না।

তখনই দূরে দেখতে পাচ্ছি একটা কালো রঙের কাঠের চেয়ার, তার ওপর ধবধবে সাদা আলো ফেলা হয়েছে কোথা থেকে যেন, চারপাশে তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে। কালো চেয়ারটায় একটা মূর্তি বসে আছে। কাছে গিয়ে বুঝতে পারছি, বোধ হয় তিনি বাদল সরকার। ওনাকে সহ্য করতে পারছি না, উনি আমাকে বারবার বলে যাচ্ছেন, "এক-দুই-তিন, তিন-দুই-এক", আমি দৌড়ে পালাচ্ছি। এসে পড়ছি একটা টিভির সামনে। সেই টিভিতে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসি খেলছে, কিংবা খেলতে পারছে না, কারণ বল পাস্ করার মতো কেউ নেই। সেখান থেকেই দূরে শুনতে পাচ্ছি, যেন রেডিও বাজছে, যেমন মামাবাড়িতে সকালবেলায় বাজতো, এখনো বাজে বোধ হয়। কি গান হচ্ছে ওখানে? ছুটে গিয়ে দেখছি এক সুপুরুষ বসে বসে গান বাঁধছেন, পাশে গিটার নিয়ে আমি বসে পড়ছি। বুঝতে পারছি উনি জসিমুদ্দিন, সুর দিচ্ছেন, "জ্বালায়ে চান্দের বাতি, আমি জেগে রব সারা রাতি গো; কব কথা শিশিরের সনে"। দেখছি আকাশে চাঁদ উঠছে, তার রুপোলি আলো পড়ছে নদীর বুকে, গাছের মাথায়। কি ভীষণ নরম হাওয়া আমার মুখে এসে লাগছে ! দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, অনেকে হেঁটে আসছেন আমাদের সুরমূর্ছনায় সঙ্গী হতে, কারা ওরা - চিনতে পারছি না, তবু অবয়বে মনে হচ্ছে, ওদের নামই তো সলিল, সুমন, মার্ক্স্, সত্যজিৎ, নোয়াম, ঋত্ত্বিক, গৌতম, শচীনদেব, পল সাইমন, এবং আরো কত চেনা-শোনা মানুষ। হ্যাঁ, এদেরই তো আমি চিনি। কিন্তু আমার জীবনের চারপাশের কাউকেই যে আর চিনতে পারছি না ! তার থেকেও বড়, তারা যে আমায় চিনতে পারছেন না।

Sunday, May 13, 2018

পশ্চিমবঙ্গ - এবিপি গ্রুপ - পরিবর্তন

কিছু বলছিনা, স্রেফ কিছু ঘটনা তুলে দিচ্ছি। ভাবনাটা পাঠকের দায়িত্ব।

২০০৫ সালে জুন মাসে "ষ্টার আনন্দ" বলে একটি বাংলা খবরের চ্যানেল শুরু হয়। সেই চ্যানেলটির একটি ভাগ থাকে এবিপি গ্রুপের হাতে, বাকিটা থাকে ষ্টার গ্রুপের হাতে। ষ্টার গ্রুপ হল Fox News-এর একটি সাবসিডিয়ারি সংস্থা, যার মালিক হলেন রুপার্ট মার্ডক নামক আমেরিকান businessman. ২০১২ সালে "ষ্টার আনন্দ" নাম বদলে নতুন নাম হয় "এবিপি আনন্দ", কারণ রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ওই চ্যানেলটি চালাতে আর রাজি হয় না; যদিও ভারতে এখনো অব্দি সবথেকে বেশি লাভবান নিউজগ্রূপ ষ্টার নেটওয়ার্কের। ২০১২-এর পরে, এবিপি গ্রুপ সম্পূর্ণরূপে এবিপি আনন্দকে নিজের আয়ত্তে নেয়। 

এই ঘটনা মাথায় রেখে, আরো কিছু ঘটনা দেখে নেওয়া যাক ২০০৫-২০১২-এর মধ্যে।

২০০৫ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ ও এবিপি গোষ্ঠী "ষ্টার আনন্দ" নামক বাংলা ২৪-ঘন্টার নিউজ চ্যানেল তৈরী করে। 
২০০৫ - রিপাবলিকান পার্টির আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করেন। 
২০০৬ - বামপন্থী দলগুলো UPA সরকারকে বলে যে, এই চুক্তি হওয়ার আগে পার্লামেন্টে গভীর আলোচনা করার প্রয়োজন আছে, কারণ এটা ভারতের স্বায়ত্ত্ব শাসন, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার উপর প্রশ্ন তোলে। 
২০০৭ - মনমোহন সিং নিউক্লিয়ার চুক্তি করার জন্য নিজে থেকেই অনেকটা এগিয়ে যান, পার্লামেন্টকে ধোঁয়াশায় রেখে। 
২০০৭-০৮ - পশ্চিমবঙ্গে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম হয়। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজারের আনন্দ-প্রকাশনীর বিশিষ্ঠ লেখকগোষ্ঠী এবং অন্য বুদ্ধিজীবীরা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জন্য পথে নামেন। 
২০০৭-০৮ - আনন্দবাজার, এবিপি আনন্দ-সহ এবিপি গ্রুপের সমস্ত প্রিন্ট ও নিউজ মিডিয়া পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি বলতে থাকে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আনন্দবাজার-গোষ্ঠীর বিশিষ্ঠ লোকেরা সরকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত কথা বলেন। এবিপি আনন্দতে মমতা ব্যানার্জি নিজেও কয়েকবার একান্ত সাক্ষাৎকার দেন। 
২০০৮ - বামফ্রন্ট কেন্দ্রের UPA-সরকার থেকে সমর্থন তুলে নেয়, কারণ কংগ্রেস নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করতে বদ্ধপরিকর ছিল। বামফ্রন্ট এই চুক্তিকে কখনোই স্বীকৃতি দিতে চায় না। 
২০০৮ - UPA তাও পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখে, অন্য দলগুলির সাহায্যে। 
২০০৮ - UPA-সরকার আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করে। 
২০০৯ - বামফ্রন্ট লোকসভা নির্বাচনে মাত্র ১৫টি আসন পায় পশ্চিমবঙ্গে (আগে ছিল ৩৫টি)। 
২০১১ - বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারায়। 
২০১২ - হিলারি ক্লিনটন তার ৩-দিনের ভারত সফরে, পশ্চিমবঙ্গে এসে নতুন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির সাথে দেখা করেন। হিলারি ক্লিনটন ছিলেন তখনকার আমেরিকার সেক্রেটারি অফ স্টেট্। তাঁর আগের সেক্রেটারি অফ স্টেট্ ছিলেন কন্ডোলিজা রাইস, যিনি ভারত এবং আমেরিকার নিউক্লিয়ার চুক্তি সাইন করেছিলেন ২০০৮ সালে।
২০১২ - রুপার্ট মার্ডকের ষ্টার গ্রূপ এবিপির সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার শেষ করে দেয়, ষ্টার আনন্দ বন্ধ হয়ে গিয়ে এবিপি আনন্দ শুরু হয়।

আবারো বলি, কিছু বলছিনা, এগুলো শুধুই ঘটনা, হয়তো শুধুই সমাপতন। কিন্তু ভাবতে পারেন, বা ভাবা প্র্যাকটিস করতে পারেন। 
লাস্ট নোট:  পৃথিবীর মধ্যে এখনো একটি মাত্র দেশই সবথেকে বেশি মাত্রায় অন্য দেশের সরকার বদলেছে, বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়, সেটা কখনো সামরিকভাবে, কখনো যুদ্ধের মাধ্যমে, বা কখনো অন্য কিছু উপায়ে। তবে শাসন বদলানোর পরে প্রায় সবকটা দেশেরই অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেছে, আর সে ব্যাপারে তারা একদমই care করেনি। 

Saturday, April 14, 2018

বাংলা গানের আধুনিকতা । Modernism in Bengali Songs (~১৩ মিনিট)

বাংলা গানের আধুনিকতা (~ ১৩ মিনিট)
---
ঋত্বিক ঘটক, সলিল চৌধুরী, উৎপল দত্ত। সংস্কৃতির তিনটে ধারায় এই তিন বাঙালি ঠিক কি বিপজ্জনক কাজটা করেছিলেন, তা ৭০-এর দশক থেকেই মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে যায়। ওনাদের সৃষ্টির মূলে যে অসন্তোষ, সে ধরণের কাজই আধুনিকতার সংজ্ঞা তৈরী করে, বারবার করেছে, সে আমরা যে যুগেই থাকি না কেন। পৃথিবীর যে কোনো জায়গার যে কোনো আধুনিক শিল্প বেছে নিলেই, এই সাহসী চিন্তাভাবনার ছোঁয়া দেখতে পাবেন। কিন্তু বাঙালির ক্ষেত্রে গত ৭০-৮০ বছর ধরে, সংস্কৃতির আধুনিকতার একটি সমান্তরাল উৎস, অনুপ্রেরণা লক্ষ্য করা যায়। অন্তরে বয়ে যাওয়া সেই আধুনিক সৃষ্টির ফল্গুধারাতেই কি খানিকটা চরা পড়েছে সাম্প্রতিক ইতিহাসে? এখনকার বাংলায় যে শিল্প সৃষ্টি হচ্ছে তা কি "আধুনিক" শিল্পের স্তরে উঠতে পারছে? বা এই শিল্প সমকালীন সমাজ বা অসন্তোষকে কি ধরতে পারছে? নেতিবাচক উত্তরের দিকেই কিন্তু পাল্লা ভারী রাখতে হচ্ছে। আরো বড় প্রশ্ন, যদি সত্যিই সেই আধুনিকতার জোয়ারে চড়া পড়ে থাকে, তার কারণটাই বা কি? এই লেখাতে সেটা খোঁজারই চেষ্টা করবো, তবে শুধুমাত্র সঙ্গীতশিল্প তথা গানের দৃষ্টিভঙ্গিতে। লেখাটা পড়া শুরু করবার আগেই বলে দেওয়া ভালো, আমি এখানে শিল্পকে আমার আধুনিকতার স্তর থেকে দেখছি, যা চারপাশের সমাজের কথা বলে, আবার মানবিকতার কথাও বলে। আধুনিকতার সামান্য অন্য সংজ্ঞাও আছে, তবে আমার সংজ্ঞার পরিপ্রেক্ষিতে আধুনিক গানের কথাই বলতে চাইছি ; সেটা মাথায় রেখেই লেখাটা পড়া কাম্য।

একটু ইতিহাসের খোঁজে যেতে হবে আমাদের। বিংশ শতাব্দীতে বাংলা গানকে মার্গসংগীতের আড়াল থেকে বের করে এনে, রবীন্দ্রনাথ সকলের ঘরে পৌঁছে দিলেন, একান্ত ব্যক্তিগত করে। সেই সুরে রাগাশ্রয়ী সঙ্গীতের আড়ম্বর নেই। ফলে বাংলা গানের সুরের ক্ষেত্রে, রবীন্দ্রনাথকে এক বিপ্লব বলতেই হয়। তবে গানের কথার ক্ষেত্রে আমরা পেলাম, আধুনিকতার থেকেও বেশি অন্তরঙ্গতাকে। সেই গানগুলোর চিরন্তন প্রাসঙ্গিকতা, আনুগত্য হয়তো রবীন্দ্রনাথকে চিরআধুনিক করেছে শিল্পের কোনো এক আঙ্গিকে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানে সমসাময়িক সমাজকে ধরার চেষ্টা মূলত নেই; এটা অনেকাংশে মেনে নেওয়াই বাঞ্চনীয় বলে মনে হয়। তার থেকে অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত, এবং সর্বোপরি কাজী নজরুল ইসলাম - তৎকালীন ভারতবর্ষের দৈন্য অবস্থা, গানের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও ধারাবাহিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আমরা তাঁদের গানে শুনতে পাচ্ছি সদ্য জন্ম নেওয়া দেশাত্মবোধের ধ্বনি, অনেক বেশি করে। নজরুল "ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম" হয়ে বলছেন "কারার ওই লৌহ কপাট" ভেঙে ফেলার কথা। তখনকার সংগ্রামের বক্তব্যের পরিপূরক হয়ে উঠেছিল নজরুলের সুরের বৈচিত্র্য, জটিলতা আর ধার। বিপ্লবের সমার্থক হয়ে উঠছেন নজরুল।

নজরুলের পরে একই ধরণের রাজনৈতিক মানসিকতার আবহে, সঙ্গীতের জগতে আমরা পাচ্ছি সলিল চৌধুরীকে। শুধু সলিলবাবুকে নিয়েও একাধিক প্রবন্ধ লেখা যায়। কিন্তু আমাদের বিষয়ের পরিসরে বললে, উনি বাংলা সংগীতের আধুনিকতাকে যেন নতুন মাত্রা দিলেন। আমার মতে, এখনো অব্দি কোনো বাংলা সুরকার-গীতিকার সলিল চৌধুরীর মতো বাস্তব-সচেতন কাজ করে যেতে পারেননি। সলিল চৌধুরী গান লিখছেন স্বাধীনতার ঠিক প্রাক্কালে, গণনাট্য সংঘ (IPTA)-এর সাথে কাজ করবার সূত্রে। তিনি তার বাংলা গানের সুরের মধ্যে এনে ফেলছেন বেঠোভেন, মোৎজার্টকে। সেটা যেমন নতুনত্ব, তেমনি তার কথায় উঠে আসছে চারপাশের বিপ্লবী আবহ। সলিল চৌধুরীর সুর আর কথা একসঙ্গে মিলে যে অভূতপূর্ব দ্যোতনা তৈরী করছে, তা মিটিং-মিছিলের উত্তেজক মেজাজ তৈরী করে দিচ্ছে। তার গানের কথায় আমরা সরাসরি অনুপ্রেরণা পাচ্ছি, "আহ্বান, শোনো আহ্বান"-এর মধ্য দিয়ে। তিনি আমাদের "আলোর পথযাত্রী" করছেন, ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের শত হতাশার মধ্যেও। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের একত্রিত হতে ডাক দিচ্ছেন, "পথে এবার নামো সাথী।"

কিন্তু ১৯৪০-এ সলিলবাবু তো পরিচিত কোনো মুখ নন। তাহলে তিনি উঠে আসছেন কি ভাবে? আগেই বলেছি গণনাট্য সংঘের সঙ্গীতের ধারা তাকে তুলে আনছে। কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন আন্দোলনের মঞ্চে উনি গান গাইছেন, কখনো কখনো হয়তো শুধুমাত্র একটা হারমোনিয়াম নিয়েই। হাজার হাজার মানুষ উদাত্ত কণ্ঠে একসাথে ওনার গান গাইছে। ওনার গান কিন্তু তখনও রেকর্ড হয়নি, শুধুমাত্র মানুষের কন্ঠ্যে সে গান জীবিত থাকছে। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আধুনিক শিল্পের এই পৃষ্ঠপোষকতা, শুধু গানে নয়, ছায়াছবি, নাটক, সবেতেই ছিল। ঋত্বিক ঘটক, উৎপল দত্ত এমনকি মানিক বন্দোপাধ্যায় - সকলেই একসময় সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করেছেন। বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব বাইরের রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে, মহারাষ্ট্রে তখন IPTA-এর হিন্দি নাটক হচ্ছে। বলরাজ সাহানি, পৃথ্বিরাজ কাপুর তার সাথে জড়িয়ে পড়ছেন। যাই হোক, গানে ফিরে আসা যাক। 

সলিলবাবুর গান ১৯৫০-৬০-এর দশকে রেকর্ড হলো, তার পরেও মানুষকে তৎকালীন সমাজ সম্পর্কে চেতনা যোগাচ্ছে, অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। এর মাঝে যে অন্য ভালো গান হচ্ছে না, তা কিন্ত নয়। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, নচিকেতা ঘোষ - দারুন সব সুর সৃষ্টি করছেন বাংলা ফিল্মে, কিন্তু তাঁরা গানের আধুনিকতাকে ছুঁতে পারছেন না, কথার বন্ধ্যাত্বে। এরপর ১৯৭০-এর টালমাটাল দশক পেরিয়ে আমরা পৌঁছচ্ছি ১৯৮০-এর দশকে। এই সময় একটি আমেরিকা-ফেরত যুবক চেষ্টা করছেন, আবারো বাংলা সংগীতে আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা যোগান দেওয়ার। ১৯৮৬ সালে "তোমাকে চাই"-এর মতো কিছু গান লেখার চেষ্টা করে অসফল হয়ে, আবারো ফিরে আসছেন ৯০-এর দশকে বাংলা সংগীতের খোলনলচে বদলে দিতে।

সুমনের মতো প্রিয়তমকে অভিবাদন জানানোর আগে মনে রাখতে হবে, ৯০-এর দশকের আগেই কিন্তু সুমনের সমাজতন্ত্র সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা হয়েছে, ৬০-৭০-দশকের নকশাল আন্দোলনে উনি প্রভাবিত হয়েছেন, লাশ বয়ে যেতে দেখেছেন কলকাতার মাঝে খাল দিয়ে। উনি আবারো শিল্প সৃষ্টি করছেন, বাস্তবের মধ্যে থেকেই, কিন্তু তার সাথে এক জীবনদর্শনও তার গানে ধরা পড়ছে। যে দর্শন একসাথে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে বলে, শিহরিত হয় "লাল নিশান" দেখে, আবার এই স্বপ্নও দেখে যে "সেনাবাহিনী বন্দুক নয়, গোলাপের তোড়া হাতে কুচকাওয়াজ" করবে। আর এই গানকে প্রথম তুলে ধরছে সিপিএমের রাজনৈতিক মিটিং-মিছিল। শুভেন্দু মাইতির মতো কমিউনিস্ট আদর্শের মানুষ সুমনকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করছেন, গান গাইবার মঞ্চ তৈরী করে দিচ্ছেন। এরপর ধীরে ধীরে সারা বাংলায় একটু একটু করে, সমস্ত ৯০-এর দশক জুড়ে ঘরে ঘরে আলোচনার বিষয় হয়ে যাচ্ছে, "মরবো দেখে বিশ্ব জুড়ে যৌথ খামার।" মনে রাখতে হবে, তখন সোভিয়েত ভেঙে গেছে, নকশাল আন্দোলন শেষ, কিন্তু তবুও বাঙালি সমাজ-বদলানোর গানকে স্বাদরে গ্রহণ করছে।

২০০০ সালের কিছু আগে, সুমনের পরে বাংলা ব্যান্ডের উত্থান হচ্ছে। সেখানে আমরা নতুন করে পাচ্ছি ৭০-৮০-এর দশকে তৈরী হওয়া কিছু গান, মহীনের ঘোড়াগুলির পৃষ্ঠপোষকতায়। বাংলার সমস্ত বিখ্যাত ব্যান্ডই স্বীকার করে যে, তাদের উত্থানের পিছনে মহীনের ঘোড়াগুলির প্রতিষ্ঠাতা গৌতম চট্টোপাধ্যায়ই অনুপ্রেরণা। সেই গৌতমবাবু আবার ৭০-এর দশকে কংগ্রেস সরকারের তাড়া খেয়েছেন নকশাল আন্দোলনের জন্য। তাঁর এবং রঞ্জন ঘোষালের গানেও যে "ওরা কাজ করে, গ্রামে বন্দরে, শুধুই ফসল ফলায়, ঘাম ঝরায় মাঠে-প্রান্তরে"- এসবের কথা উঠে আসবে, তা খুব স্বাভাবিক। বাংলা ব্যান্ডের উঠে আসার পিছনেও আমরা একই ধরণের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের ছোঁয়া পাচ্ছি। 

এছাড়া সিপিএম পার্টি থেকেও কিছু ক্ষেত্রে (পার্টির স্বার্থেই) আমরা আধুনিক শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা দেখতে পাচ্ছি, আরো বিশেষভাবে নচিকেতার উঠে আসার মাধ্যমে। সুভাষ চক্রবর্তী নচিকেতার গানকে সামনে আনতে সাহায্য করছেন; যদিও সুমনকে রোখার জন্যই নাকি নচিকেতাকে তুলে আনে সিপিএম - এমনটা শোনা যায়। কিন্তু পরে আবার নচিকেতার গান "আমি সরকারি কর্মচারী" - ব্যানও করছে সিপিএমের সরকার। একই কাজ হয়েছে সলিল চৌধুরীর ক্ষেত্রেও। তাঁকেও পার্টির পক্ষ থেকে বিরূপ মন্তব্য শুনতে হয়েছে। কিন্তু এই যে বিকল্প শৈল্পিক ভাবনা গঠন করা এবং তাকে তুলে ধরা - এটা অসংগঠিতভাবে কমিউনিস্ট-ভাবধারার মধ্যে থেকে বাঙালি আত্মস্থ করেছিল। সংগঠিত এবং "রাষ্ট্রীয়" কমিউনিস্ট পার্টি পরে বারবার এই শৈল্পিক ভাবধারার বিরুদ্ধে গেলেও, বাঙালি তাঁর দর্শনটা হারায়নি। কোথাও যেন খুব অন্তরে, বাঙালি সামাজিকতার দর্শনকে লালন করেছে, যে দর্শন সমষ্টির কথা ভাবতে বলে, নিজের স্বার্থের থেকেও বড় উদ্দেশ্যের জন্য। তাই বারবার আধুনিকতার নতুন সংজ্ঞা আমরা পেয়েছি, কখনো তার নাম সুমন, কখনো সলিল, কখনো গৌতম। কোনো একটা উৎস ছিল এই সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের বিকাশ ঘটার। 

এবার এখনকার যুগে চলে আসুন। আমাদের সামনে এখন কেন্দ্রীয় সরকারে শুধু নয়, রাজ্যেও খুব বড় ক্রাইসিস। অথচ তার বিপক্ষে সংগীতের তেমন কোনো চলন নেই। ভালো গান হচ্ছে না, তা নয়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সময়টাকে ধরার বাসনাটা নেই। অথচ এখন YouTube-জাতীয় মিডিয়ামের মধ্যে দিয়ে গানের ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা আরো বেশি। কিন্তু সেই ধরণের শিল্পীকে আমরা যেন পাচ্ছি না। দীপাংশু প্যারোডি লিখছেন, বহু মানুষ শুনছেন। এর মানে, মানুষ কিন্তু সরকারের সমালোচনাটা শুনতে চাইছে। কিন্তু সেই শিল্পিত প্রকাশের পরিসরটা যেন কমে গেছে।

আমার মতে, এর একটা বড় দায় সিপিএমেরও। অনেকে ব্যঙ্গ করতে পারেন এই বলে যে, পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুর দায়ই তো সিপিএমকেই নিতে হয়। কিন্তু আগে যেভাবে গণসংগীত বা অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে দিয়ে সিপিএম সংস্কৃতিগত আধুনিকতার ধারক ছিল, সেই জায়গাটা সিপিএমের গণসংঠনগুলো হারিয়ে ফেলেছে। ৩৪ বছরের শাসনের জন্য সিপিএমের এই চলমান গতিতেও, মনে হয়, কোথাও যেন জং ধরে গেছিল। তাই একটা খুব বড় শূন্যস্থান তৈরী হচ্ছে, সমসাময়িক এবং আধুনিক শিল্পের।

সেটার আর একটা কারণ হতে পারে বিশ্বায়ন এবং individualism. সমগ্র পৃথিবীতে, এখন সকলেই খুব বেশি করে নিজের ব্যক্তিগত চাহিদা এবং আশাপূরণের কথা ভাবছে। সেখানে সমাজতাত্ত্বিক চিন্তাভাবনা বড়ই দুর্লভ। বাংলাও এই বিশ্বজুড়ে চলা ট্রেন্ডের বাইরে নয় আর। তাই মানুষের মনে অসন্তোষ থাকলেও তা দানা বাঁধছে না, তা জমে কালো মেঘের গর্জনে পরিণত হচ্ছে না, যে মেঘ চিৎকার করে আহ্বান করতে পারে। যা সলিল করেছিলেন, যা শুনে এখনো গায়ে কাঁটা দেয়। তবে সময় এখনো যে চলে গেছে তা নয়, এই লেখাটার পরেও হয়তো আশার সূর্য আছে। সুমনের গান সকলের সামনে আসতে প্রায় কয়েক বছর সময় লেগে গেছিলো। কে বলতে পারে? হয়তো কোনো নতুন "সুমন", অন্য কোনো নামে, নিজের ঘরে গিটার বাজিয়ে দুঃসাহসী কোনো কথাকে সুরের জ্বালে বাঁধছেন না? অপেক্ষা করছি, আশা করছি, কেউ আবারো জেগে উঠবে, গেয়ে উঠবে:

"যখন প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ কি শান্তি,
আমাদের বেছে নিতে হয় নাকো ভ্রান্তি,
আমরা জবাব দিই শান্তি শান্তি শান্তি।
আর রক্ত নয় নয়!"

Friday, March 23, 2018

Ticking Time Bomb - Part 2 (~১৫ মিনিট)


মার্ক জাকারবার্গ প্রথমে নিজেও মানতে চাননি যে, ফেসবুককে এভাবে অন্য কোনো দেশ নির্বাচনী কৌশলে কাজে লাগাতে পারে। তবে তিনি আঁচ করতে পারছিলেন ফেসবুকের বিশাল manipulating power-টাকে। এমনকি তাঁর নিজের রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা তৈরী হয়েছিল, আর তাই জন্যই ২০১৬-১৭-তে তিনি আমেরিকার ৫০টা রাজ্যের মধ্যে অধিকাংশ রাজ্য ঘুরে ফেলেন। আসলে যে দেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, সেখানে রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা সকলের মনেই জন্মায়। আর মার্কের হাতে তো ছিল আমেরিকার প্রায় সকল মানুষ সম্পর্কে খুব বিস্তারিত তথ্যভান্ডার। সিলিকন ভ্যালিতে কানাঘুঁষো শোনা যায়, সেই তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেই জাকারবার্গ বুঝেছিলেন যে ট্রাম্পের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হওয়ায় তাঁরও যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে। কিন্তু রাশিয়ান গ্রূপের খবর চাউর হওয়ার পর পরই জাকারবার্গ বুঝতে পারেন, ফেসবুকের সাথে যুক্ত থাকা অবস্থায় নির্বাচনের মতো বিষয়ে অংশ নেওয়াটা অসম্ভব। তাই তিনি তার রাষ্ট্রপতি হওয়ার বাসনা মুলতুবি রেখে ফেসবুকে মনোনিবেশ করেন। তবে এই রাশিয়ানদের কথা জানাজানি হওয়ার পরও নাটকের কিছু অংশ বাকি ছিল।

ফেসবুকের কাছে আছে বিশাল তথ্যভান্ডার, তাতে আছে হাজারো মানুষের হাজারো গতিবিধি-সম্পর্কিত data। এবং এই তথ্য ভীষণ সেনসিটিভ। ফেসবুক জানে আপনি কার সাথে কথা বলছেন, কাকে পছন্দ করছেন। ফেসবুক তার অজান্তেই তৈরী করে ফেলেছে ভয়ানক এবং দুরন্ত একটি মাধ্যম। এই যে বিপুল পরিমাণ তথ্য ফেসবুকের কাছে গচ্ছিত আছে, তা দিয়ে যে ঠিক কি কি করা যেতে পারে, তার আর কোন সীমা নেই। আপনি ফেসবুককে data দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকছেন, কিন্তু আপনার data থেকে আপনার বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন যে প্রভাবিত হতে পারেন, সেটা ভাবেননি হয়তো। বিজ্ঞাপন থেকে নির্বাচন ম্যানিপুলেশন - সমস্ত রকম কাজেই ব্যবহার করা যায় এই data। কিন্তু এই বিপুল তথ্য কি আদৌ সুরক্ষিত?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য আমাদের চলে আসতে হবে 2018-এর মার্চ মাসে। তবে তার আগে বলুন, আপনি ফার্মভিল খেলেছেন ফেসবুকে বা এমন কোনো কুইজ খেলেছেন যেটা বলে দেবে আপনার প্রিয় বন্ধু কে, বা আপনার প্রোফাইল কোন বন্ধু কত বার চেক করেছে - এই ধরণের কিছু? তাহলে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি - এসব আদৌ সুরক্ষিত কিনা সে বিষয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। কেন? তার জন্য একটি ছোট্ট গল্প জানা দরকার।

কোগান নামের একজন বিজ্ঞানী মনস্তত্ব নিয়ে গবেষণা করছিলেন বিশ্বখ্যাত কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে কয়েক বছর আগে। যারা গবেষণা করেন, তাদের জন্যে ফেসবুক এক ধরণের স্পেশাল অ্যাপ্লিকেশন (app) তৈরি করার পারমিশন দিত। রিসার্চাররা গবেষণার খাতিরে প্রচুর তথ্য ফেসবুক থেকে ডাউনলোড করতে পারেন সেই app-এর মাধ্যমে। তবে শর্ত একটাই, গবেষণা শেষ হওয়ার পরে সব তথ্য মুছে ফেলতে হবে। কোগান তাঁর রিসার্চের জন্য একটি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেন, ফেসবুকের ভিতরে, অনেকটা ফার্মভিল গেম অ্যাপ্লিকেশন বা ওই কুইজ অ্যাপ্লিকেশনগুলোর মতো, যেগুলো আপনারা অবসর সময়ে খেলে থাকেন। তিনি একটি নিরীহ প্রশ্নোত্তর app তৈরি করেন। কোগান তাঁর research grant থেকে কিছু টাকাও বরাদ্দ করেন কিছু লোকের জন্য, যারা প্রশ্নগুলোর সম্পূর্ণ উত্তর দেবেন। প্রায় ২,৭০,০০০ জন মানুষ সেই অ্যাপ ব্যবহার করেন।

এই অ্যাপ যখন কেউ ফেসবুকে খেলবে, সে তার নিজের ফেসবুকের data access-এর পারমিশনও দিয়ে থাকে সেই অ্যাপ টিকে। ফলত কোগান শুধু প্রশ্ন আর উত্তর নয়, সব অ্যাপ ব্যবহারকারীর ফেসবুক ডাটা-ও access করতে পারেন। বলা হচ্ছে, কোগান-এর সাথে এই সময়েই যোগাযোগ হয় একটি কোম্পানির, যার নাম Cambridge Analytica. এই কোম্পানিটি বিভিন্ন দেশে ভোটারদের প্রভাবিত করার কাজ করে থাকে, রাজনৈতিক দলগুলোর হয়ে। তারা কোগানের গবেষণার স্বার্থে ডাউনলোড করা ফেসবুক data কিনে নেয়। তবে তারা মাত্র ২৭০, ০০০ জন মানুষেরই data পেয়েছিলেন, তা নয়।

সেই সময়কালে ফেসবুকের সুরক্ষায় আরো গাফিলতি ছিল। কোনো একজন user-এর data-access permission পাওয়া গেলে, তার প্রায় সমস্ত বন্ধুদের অনেক তথ্যই পাওয়া যেত ফেসবুক থেকে। ফলত ২,৭০,০০০ জন মানুষের বন্ধুবান্ধবের নেটওয়ার্ক মিলিয়ে প্রায় ৫ কোটি মানুষের data কোগান ডাউনলোড করে ফেলেন। Cambridge Analytica এই বিপুল তথ্য পাওয়ার পরে, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আগে খুব সুক্ষভাবে ভোটারদের প্রোফাইল, তাদের রাজনৈতিক পক্ষ সম্পর্কে ধারণা তৈরী করে। এর জন্য তারা সাইকোলজির আর এক প্রফেসরের গবেষণাকেও কাজে লাগায়, যাতে প্রায় নিপুনভাবে বলে দেওয়া যায়, কোন ভোটার মোটামুটি কি রকম ভাবছে। এর পরে যারা swing voter (নিরপেক্ষ অথবা দ্বিধাগ্রস্থ), তাদের উদ্দেশ্যে ছুঁড়ে দেওয়া হয় কার্যকরী বিজ্ঞাপন। Cambridge Analytica officially ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইলেকশন ক্যাম্পেইন-এ কাজ করে। আর এর ফল আমাদের সবার প্রাপ্য ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে Cambridge Analytica বলছে, তারা শুধু আমেরিকা নয়, অনেক দেশেই তাঁদের data model-কে কাজে লাগিয়েছে, যেমন ব্রেক্সিটের সময় ব্রেক্সিটের পক্ষে, এমনকি ভারতেও।

নিউজ এজেন্সি চ্যানেল-৪ বলে একটি মিডিয়া এই সব তথ্য ফাঁস করে এই মার্চ মাসে, মাত্র কয়েক দিন আগেই। ফেসবুকের মার্কেট ভ্যালু এর পরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার নিচে নেমে যায় (যদিও শোনা যাচ্ছে, এসব আগে থেকে বুঝে মার্ক জাকারবার্গ তাঁর অংশের শেয়ারগুলি বেচে দিয়েছিলেন কিছুদিন আগে )। এই ঘটনার পরে মার্ক জাকারবার্গ একটি নিরামিষাশী ক্ষমাপ্রার্থনা করেন। অবশ্য এর থেকে বেশি আর করারও কিছু নেই। কারণ ফেসবুক এই পুরো ঘটনা সম্পর্কে অনেক দিন আগে থেকেই জানতো। তারা নাকি Cambridge Analytica-কে "অনুরোধ"-ও করেছে বারবার data delete করে দেওয়ার জন্য। Cambridge Analytica এখন বলছে যে, তারা সেটা delete করেও দিয়েছেন। এই ছেলেভোলানো কথায় মার্ক ভুলতে পারেন, কিন্তু আপনি ভুলবেন কি? এতো সূক্ষাতিসূক্ষ মানুষের প্রোফাইলিং data কেউ মুছে ফেলবে? ডেমোক্রেসিকে নিয়ন্ত্রণ করার এতো সহজ উপায় হাতছাড়া কেউ করবে?

এই ঘটনায় ফেসবুকের data সুরক্ষা তো প্রশ্নের মুখে পড়েছে বটেই। কিন্তু ফেসবুকের হাতে যে এতো বৃহৎ একটা সম্পদ এসেছে, এর ঠিক ভবিষ্যৎটা কোথায়, আমার মনে হয় সে সম্পর্কেও ভাবার সময় এসেছে। আসলে ফেসবুক নিজেকে ধীরে ধীরে এতটাই বৃহৎ একটি মেশিনারিতে পরিণত করেছে যে, ক্রমশঃ তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে শুরু করেছে। ফেসবুক শুধু এখন যোগাযোগের মাধ্যম তো নয়ই, এখন ফেসবুক দাঁড়িয়ে আছে মানসিক ব্যবহার ও গতিবিধি সম্পর্কে বিপুল তথ্যের সাগরের মাঝে। এই তথ্যের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকা উচিত? কোন বেসরকারি সংস্থা - ফেসবুকের মত? তাহলে তার অবস্থা তো এরকম হবে, সে তথ্য বেচে দেবে নিজেদের মুনাফার স্বার্থে। তাহলে কি সরকার এই তথ্য নিয়ন্ত্রণ করবে? তাহলে তো সে তার নিজের জনগণকেই ম্যানিপুলেট করতে কাজে লাগাবে এই তথ্যকে? তবে এই তথ্যের সঠিক অধিকারী কার হওয়া উচিত? কোনো নন-প্রফিট, জনগণের একত্রিতভাবে অধিকৃত সমবায় সংস্থার? কিন্তু তার পরিচালন পদ্ধতিই বা কি হবে? এমনকি আরো বড় প্রশ্ন সমাজে ফেসবুকের ভূমিকাটা ঠিক কি হওয়া উচিত?

আমরা কেউই ঠিক জানিনা। ফেসবুক বলেছিলো আমাদেরকে আরো বেশি যুক্ত করবে একে অপরের সাথে। কিন্তু ফেসবুকের filter bubble-এর জেরে, আমরা একে অপরের আরো দূরে সরে গেছি। শুধু পছন্দ করছি যে মতাদর্শগুলো আমাদের মনোপূতঃ। আমরা একে অপরের বিরুদ্ধে তৈরি করেছি আরো বৈরিতা হিংসা ঘৃণা indifference। ফেসবুক যারা তৈরী করেছিলেন, (মার্ক বাদে) তাঁদের অনেকেই পরামর্শ দিচ্ছেন ফেসবুক ছেড়ে দেওয়ার। ফেসবুক সামাজিক ও ব্যক্তিগত মানসিক দিকেও তর্কসাপেক্ষে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এখানে আমরা নিজেদের ইগোকে এক অসম উচ্চতায় নিয়ে চলেছি। অতীতকে পিছনে ফেলে ভবিষ্যতের দিকে সাধারণ অগ্রগতিকে রোধ করে দিয়েছি। মাঝে মাঝেই ফিরে যাচ্ছি অতীতের প্রেমিক-প্রেমিকার কাছে, যাদের অনেকদিনই ফেলে আসা উচিত ছিল, তারা এখনো পড়ে থাকছে জীবনে। আর এসবের মাঝে ফেসবুক গুঁজে দিচ্ছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনী, রাজনৈতিক সংস্থার প্রোপাগান্ডা। আপনি আপাতভাবে ভাবছেন যে আমার data নিয়ে ফেসবুকের কিছুই করার নেই। অথচ, ফেসবুক তার থেকে ঠিক খুঁজে বের করে নিচ্ছে কোনটা দরকারি। আমাদের সামগ্রিক সামাজিক অগ্রগতির পথে ফেসবুক ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা কেউ জানিনা। তবে এতো বিপুল তথ্যের মালিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার বিড়ম্বনাটা বোঝা যাচ্ছে।

আর বোঝা যাচ্ছে যে, বোমাটা কিন্তু আমরা তৈরী করে ফেলেছি। ক্রমাগত শান দিয়ে চলেছি সেই বোমায়, যাতে ওটা আরো শক্তিশালী হয়। চীনারা এই বোমাটা এড়াতে পেরেছে, কিন্তু বাকি বিশ্ব এই বোমার মোহতে এগিয়ে চলেছে। আর আমরা সবাই অপেক্ষা করছি এর পরের বিস্ফোরণটা কখন হয়। তবে ম্যাজিকটা এখানেই যে, এই বোমার বিস্ফোরণের তীব্রতা খুব বেশি হয়েও, এটি অতি সুক্ষভাবে মানবসভ্যতাকে আক্রমণ করছে। তাই এই বোমাটা সঠিকভাবে যখন তার ভয়াবহ রূপ দেখিয়ে ফাটবে, তখন আমরা বোধ হয় নিজেদেরকে বোঝার অবস্থাতেও থাকবো না। ঠিক যেমনভাবে আমেরিকানরা পারেননি। স্রেফ অপেক্ষা করে যাবো পরবর্তী বিস্ফোরণটার জন্য।

Ticking Time Bomb - Part 1 (~১১ মিনিট)

চলুন একটা গল্প বলি। গল্পটার বাস্তবতাটা যদিও খানিকটা বেশিই, তবুও এটাকে গল্পের ছলে সামনে আনাই শ্রেয়। সময়গত দিক থেকে সামান্য অবিন্যস্তভাবে গল্পটা বলবো। যারা ক্রিস্টোফার নোলান-এর স্টোরিটেলিং স্টাইলের সাথে পরিচিত, তাদের কাছে এই সময়ের দৌড়াদৌড়ি নস্যি। তবে বাকিরাও সহজে মানিয়ে নিতে পারবেন বলে মনে হয়।

যে সময়কালটা ধরবো, তা মোটামুটি ২০০৪-০৫ থেকে এই ২০১৮-এর মার্চ অব্দি। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, বেশ সাম্প্রতিক অতীতের কথা, তাই মাঝে মাঝেই গল্প তার কল্পনার বেড়া পেরিয়ে বাস্তবের আঙিনায় ঢুকে পড়বে। আর আপনারাও তখন আপনাদের বাস্তবের খাড়া-বড়ি-থোড় থেকে কল্পনার থোড়-বড়ি-খাড়ায় ঢুকে পড়বেন। 

প্রথমেই, আমরা ফিরে যাবো ২০০৪-০৫ সালে। এখন ঠিক যেখানে বসে গল্পটা লিখছি, তার খুব কাছাকাছিই এই গল্পের শুরু, খোদ বস্টন শহরে। এই শহরের লক্ষ লক্ষ ছাত্রের মধ্যে থেকে মাত্র ৪-৫ জন ছাত্রের মাথা থেকে বেরোনো এক আইডিয়া, সারা বিশ্বের এক বৃহৎ সংখ্যক মানুষের মধ্যে প্রভাব ফেলে দিল, শুধু ব্যক্তিগত স্তরে নয়, আন্তর্জাতিক, রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক স্তরেও। আপাতভাবে খুব নিরীহ একটি আইডিয়া। কলেজে ভর্তি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ছবি ও ব্যক্তিগত কিছু তথ্য-সম্বলিত একটি ওয়েবসাইট তৈরী করা হবে। সেই ওয়েবসাইটে এসে যে কেউ তার সহপাঠী বা সহপাঠিনী সম্পর্কে তথ্য জানতে পারবে।

কলেজ চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে ২০০৬-০৭ সালে ধীরে ধীরে যখন এই ওয়েবসাইটটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে, তখনও তা বেশ নিরীহই। ফেসবুকের কথা তখন বিশ্বের মানুষ সবে জানতে শুরু করেছেন। সকলে তাদের ব্যক্তিগত ভালোলাগা, মতাদর্শ এ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া শুরু করেছেন। পুরোনো বন্ধুদের খুঁজে পেতে শুরু করছেন। আবার যোগাযোগ হয়ে যাচ্ছে পুরোনো স্কুলের হারিয়ে যাওয়া সহপাঠীর সাথে, যার সাথে টিফিনবেলায় ঝগড়া হতো; আর স্কুল ছুটির পরে চুড়ান ও ফুচকা খেয়ে বাড়ি ফেরা হতো। তবে না, নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত করা এই লেখার উদ্দ্যেশ্য নয়। তাই বেরিয়ে আসুন, আমরা এবার চলে আসবো ২০১২ সালে। 

সারা দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশে ফেসবুক ছড়িয়ে পড়েছে। ফেসবুক শুধু আর পুরনো বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম নয়, ফেসবুক একটা স্টাইল, খবরাখবর পাওয়ার জায়গা, বিজ্ঞাপনের আস্তানা, আবার গ্রূপে আড্ডা মারার জায়গাও বটে। তার কিছু আগে থেকেই, পশ্চিমবঙ্গেও ফেসবুক গ্রূপে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে ফেসবুক থেকে শুরু হতে থাকলো সংগঠিত আন্দোলন, যেমন Jasmine Revolution। বিভিন্ন মিডিয়া গোষ্ঠী ফেসবুকে তাদের নিউজ দিতে আরম্ভ করলো। ফেসবুক এগিয়ে যেতে থাকলো নতুন দিগন্তের পথে। সোশ্যাল মিডিয়াই শুধু নয়, এক আদ্যন্ত মিডিয়া হয়ে উঠলো ফেসবুক। 

এর পাশাপাশি যেটা হতে থাকলো, বিজ্ঞাপনের স্বার্থে ফেসবুক সংগ্রহ করতে লাগলো আমাদের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে আরও আরও তথ্য। আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কি খাচ্ছেন, কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পড়ছেন, কোথা থেকে জামাকাপড় কিনছেন, কি পছন্দ করছেন, কি ভিডিও দেখছেন, কাকে কী বলছেন - সব তথ্য জমানো শুরু করলো। এমনকি আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শ ঠিক কি রকম হতে পারে, তা আপনি ফেসবুককে সরাসরি না বললেও, সে আপনার আচার আচরন দেখে মোটামুটি প্রেডিক্ট করতে শুরু করলো। মানুষের ব্যবহার সম্পর্কে এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্যভান্ডার - বিশ্ব ইতিহাসে আগে কোথাও কোনও দিন তৈরি হয়নি। ফেসবুকের মধ্যে তৈরী হতে থাকলো World's largest social data bank। এই বিপুল তথ্য ফেসবুক ব্যবহার করে সেই ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপনের জন্য। ফেসবুকের পারদর্শিতা এখানেই যে, সে একদম সঠিকভাবে সঠিক লোককে উপযোগী বিজ্ঞাপনটা দেখাতে পারে, কারণ সে খুব সুক্ষভাবে জানে আপনার পছন্দ ঠিক কোন ধরণের প্রোডাক্ট। এর ফলে ফেসবুকে বিভিন্ন কোম্পানি বিজ্ঞাপন দিয়ে লাভবানও হল। আপনি বিজ্ঞাপনে দেখা কোম্পানির জিনিস কিনলেন, বা সেই রেস্টুরেন্টে খাবার খেতে গেলেন। এতক্ষন পর্যন্ত ব্যাপারটা মোটামুটি ঠিকই ছিল। কিন্তু বিজ্ঞাপন কি শুধুমাত্র consumer product-এরই হয়?

এই প্রশ্নের খুব সরাসরি উত্তর পাওয়ার জন্য আমাদের এবার চলে আসতে হবে ঠিক 2016 সালে। আমেরিকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তোড়জোড় চলছে। সেই সময়কালে ফেসবুকের একজন প্রাক্তন-head লক্ষ্য করলেন, একটি আপাতভাবে-মনে-হওয়া Bernie Sanders-এর প্রচারের পেজ থেকে কিছু অদ্ভুত ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে ফেসবুকে। মানে যে বিষয়গুলোর বিপক্ষে Bernie Sanders কথা বলেন, ঠিক সেগুলোরই পক্ষে প্রচার করা হচ্ছে, অথচ ওনার স্বপক্ষে প্রচারের পেজ থেকে। পরে বোঝা যায়, কিছু লোকজন মিলে Sanders-এর বিপক্ষে তারই নাম দিয়ে উল্টো প্রচার করছিল। ততদিনে শুরু হয়ে গেছে ফেক নিউজের জমানা। যে নিউজ সত্যি নয়, তাকেই সত্যের মোড়কে জনগণের সামনে নিয়ে আসা হচ্ছে। আর ফেসবুক হয়ে উঠলো সেই ফেক নিউজের মূল কারখানা।

2017-তে জানা যায় আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য, Russian কিছু গ্রুপ ফেসবুকে প্রায় লক্ষাধিক ডলার ব্যয় করে আমেরিকান প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে প্রচারের জন্য।  তারা অন্য প্রার্থীদের বিপক্ষেও প্রচার করেছিল। যে রাষ্ট্রটি এতদিন অন্য দেশের নির্বাচনে নাক গলিয়ে এসেছে, তাদেরই নির্বাচনে তাদেরই দেশের একটি সোশ্যাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে মানুষকে যে ম্যানিপুলেট করা যেতে পারে, এটা অনেকেরই ধর্তব্যের বাইরে ছিল। রাশিয়ান গ্রুপগুলি ফেসবুকের বিজ্ঞাপন-মাধ্যমকে ব্যবহার করে। ফেইসবুকের কাছে যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম data আছে প্রচুর মানুষের সম্পর্কে, সেই তথ্যকে কাজে লাগিয়ে নিপুন দক্ষতায় ভোটার টার্গেট করা হয়। মানে ধরুন আপনি conservative কোনো ideology-তে বিশ্বাস করেন, তখন আপনাকে দেখানো হয় Republican party-র বিজ্ঞাপন বেশি বেশি করে। বা আপনি যদি দ্বিধাগ্রস্থ অথচ সামান্য-হিন্দু-ঘেঁষা ভোটার হন, তাহলে আপনাকে BJP-এর বিজ্ঞাপন দেখানো হবে। ফলাফল আমরা দেখতেই পাই, 2016 সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বের সর্বাধিক শক্তিশালী দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু এই গল্প শুধু বিজ্ঞাপনেই শেষ হয় না।

- বাকিটা পরের পার্টে

Monday, February 26, 2018

বামপন্থী বিশ্ব-মানবিকতা ও সচেতনতা

"নিকারাগুয়ায় নিঃসহায় নিম্নবিত্ত নিঃস্ব মানুষদের নিখিরি বানানো চলছে না, চলবে না। গুয়েতেমালায় গণতান্ত্রিক গরীব-গুর্বোদের জোর করে গণধর্ষণ, ওয়াক থু, ওয়াক থু। ... প্রলেতারিয়েতদের পাশে পলিটব্যুরো লড়ছে লড়বে। হনুলুলুতে হারেরেরে হার্মাদদের হুঙ্কারের হামলাবাজিকে, ওয়াক থু, ওয়াক থু।" - ওপেন টি বায়োস্কোপ সিনেমাতে, ঠিক এভাবেই বামপন্থীদের এককালের বিদেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধের স্লোগানগুলোকে উপহাস করা হয়েছিল। বিদ্রুপ করতে গিয়ে সামান্য অতিরঞ্জনের দরকার পড়ে, সেটুকু পরিমাণমতোই ছিল। কিন্তু সিনেমাতে এটা উপহাস হলেও, পরের দিকে এই মনোভাবটাই মেইনস্ট্রিমে উঠে আসে। কলেজে পড়াকালীন বেশি মাত্রায় শুনতে শুরু করি যে, কোনো একটা বাইরের দেশে কি হয়ে গেলো, সেই নিয়ে আমরা কেন মাথা ঘামাবো ! আমাদের চাকরি পেতে হবে, রাজ্যে আরো শিল্প দরকার - এসব না ভেবে, কেন আমরা "আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম"-এর মতো স্লোগানের পিছনে নিজের সময় ব্যয় করবো !

গত কিছুদিনে সিরিয়ায় বম্বিং-এর তীব্রতা বাড়ায়, দেখলাম অনেক মানুষ নিজেদের রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে ভাবছেন। সেখানে যুদ্ধ বন্ধ করতে বলছেন। অন্তত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এ নিয়ে সক্রিয়তা দেখিয়েছেন, সমবেদনা অনুভব করেছেন। শেষবার কলকাতা গিয়ে দেখে এসেছি, সিপিএম পার্টিটার শেষটুকু চিহ্নও প্রায় আর নেই। খুব আশাব্যঞ্জক অবস্থা ! কিন্তু এককালে পার্টিটার যে মনোভাবকে উপহাস করা হতো, সেই ভাবধারাকে ভিত্তি করেই যে আজ সিরিয়ার যুদ্ধের প্রতিবাদ করতে বলছে খুব সাধারণ মানুষও - সেটাও কম আশাব্যঞ্জক নয় (হয়তো ওটাই একমাত্র আশা)। ওখানে (এবং অন্যান্য জায়গায়) সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির যে শক্তি প্রদর্শন চলছে, তা নিয়ে আগে বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো আলাদা আলাদাভাবে মিটিং মিছিল করতো। এখনো হয়তো ছোট করে কোথাও কোথাও হয়। অচিরেই কিছুদিনের মধ্যে সেই ছোট সভাও বন্ধ হয়ে যাবে। তখনও আশা করি, বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তের নিপীড়িত মানুষদের জন্য বাঙালির সহমর্মিতা একইরকম থাকবে। তবে সেই আবেগের সাথে রাজনৈতিক সচেতনতাও যেন থাকে। কারণ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের geo-political অবস্থানগুলো বেশ জটিল, সেইটুকু বাস্তববুদ্ধি বাঙালির কাছে প্রত্যাশিত। বিশ্ব-মানবতার সাথে এই সচেতন একাত্মতাই বাঙালিকে বিশ্বের নাগরিক করে তোলে, পৃথিবীর ছবিতে "ব"-লাগানো কোনো লোগো নয়।

Tuesday, January 30, 2018

বিদায় কলকাতা ২০১৮ - Goodbye Kolkata 2018

কলকাতা,

তুমি দেখলাম বেশ সেজে উঠেছ। যদিও জানি এর মধ্যে নীল-সাদা টেন্ডারের রাজনীতি আছে। কিন্তু তা নিয়ে নাহয় বাকি বছরটায় বলবো, এখন নয়। এখন তোমার কল্লোলিনী রূপে মুগ্ধ হওয়ার সময়। যে মুগ্ধতা শুরু হয়েছে কৌশানীতে হোটেল-রুমের ঠিক বাইরেই, পাহাড়ের খাঁজে ভোরের সূর্যকে উঠতে দেখে। সেই সতেজ সূর্যের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছিল, পরিশুদ্ধ হয়ে যাচ্ছিলো পৃথিবীর সমস্ত কালিমা। সেই বিশুদ্ধতা তোমার মধ্যে নেই জানি, কলকাতা। তবু আমার চোখে শুভ্রতার ঠুলি পরে শুদ্ধতার রঙে তোমাকে একমাস রাঙাতে এসেছিলাম আমি।

এতে তোমার অনেক কিছুই ওলোটপালোট হয়ে গেলো। একটা ঝোড়ো হাওয়ার ক'দিন ধরে দাপাদাপির পরে এখন তোমার একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ভীষণভাবেই এলোমেলো। তবে আমি জানি, তুমি চেয়েই ছিলে এই অবিন্যস্ত কয়েকদিন। তাই বারেবারে আমায় ডেকে বেরিয়েছ তোমার বিভিন্ন দিকে, বুঝিয়ে দিয়েছো নিখাদ ভালোবাসায় কাছে-ডাকা কাকে বলে। সেটা এয়ারপোর্টের কাছে কোনো সাজানো ফ্ল্যাটে হোক, বা আগরপাড়ার কোনো বাড়ির ছাদ, বা ঠাকুরপুকুরের নিশ্চিন্ত গোছানো কোনো নতুন সংসার। শীতকালেও তুমি এই জায়গাগুলোর কোথাও উষ্ণতার অভাব রাখোনি। কিন্তু এতো উষ্ণতার পরেও বুঝিয়ে দিয়েছো, আশঙ্কা যদি কোথাও থাকে, তবে তা টাকা-ছাপানোর জায়গাটির পর পরই শুরু হয়ে যায়। তবে আমি সে ক্লেদ একেবারেই গায়ে মাখিনি।

চার-পাঁচ বছর সাইকেল না চালিয়েও, প্যাডেলে পা পড়লে, মানুষ যেমন ব্যালেন্স করতে প্রধানত ভোলে না, মোটামুটি সোজা সাইকেল চালিয়ে চলে যায়, তোমার কাছে আমার প্রত্যাবর্তন বারেবারেই তাই। তোমার জল-হাওয়ায় আমার সাবলীল অবস্থান; তোমার বিরিয়ানি, চিকেন রোল, লস্যিতে আমার স্বর্গ। সেই তুমিই তৈরী করেছো রঙিন পানীয়ের উন্মত্ত রাত, টোয়েন্টি নাইনের পরের পর গেম বা একসাথে চারজন ছায়ামূর্তির নির্ভেজাল আড্ডা। তখন তুমি আর জব চার্ণক বা সাবর্ণ রায়চৌধুরীর টেনে দেওয়া কোনো ভৌগোলিক সীমানা নয়, তুমি তখন সমস্ত বাস্তবিকতা ছাড়িয়ে কুর্গ, নৈনীতাল বা বকখালীতে ছড়িয়ে গেছো। আমাদের বাড়িতেও তুমি এসেছো প্রচুর আত্মীয়ের সমাগমে, নিখাদ আনন্দের অবসরে। অথবা একান্তে তোমার আঁচলের তলায় গিটারের ঝর্ণা ও মা-এর গান শোনা গেছে। তুমিই বুঝিয়ে দিয়েছো ভাইয়ের ভালোবাসার মানে খোঁচা-মারা, দাদুর ভালোবাসার মানে এমন এক আলিঙ্গন, যার গভীরতা আজ পর্যন্ত কোনো আলিঙ্গন এনে দিতে পারেনি, পারবেনা। তুমিই আমার ছয় বছরের পুরোনো বন্ধুতার অক্ষত অবয়ব। তুমি আমার গানের জগৎ, তুমিই আমার সত্যিকারের বেঁচে থাকা।

কলকাতা, তুমি আমাকে ভাস্কর চক্রবর্তীর শব্দচয়নে সামান্য উল্টো প্রশ্ন করতে শিখিয়েছো। তাই আমি শীতকালকে প্রশ্ন করেছিলাম, সুপর্ণা কবে আসবে। জানো কলকাতা, সুপর্ণা এসে তোমাকে নতুনভাবে তৈরী করে দিয়েছে, পার্ক সার্কাস থেকে ঢাকুরিয়া ব্রিজ হয়ে, সল্টলেক থেকে মোহরকুঞ্জের ফুলের বাগান ছুঁয়ে। সেই ছোঁয়ায় তৈরী রয়েছে সুন্দর অথচ অজানা ভবিষ্যৎ-এর স্বপ্নের কুঁড়ি। সেই স্বপ্নকে তুমি কি অমলিন করে রাখতে পারবে, কলকাতা? সময়মতো জল, বাতাস, রোদ দিয়ে? তোমার কাছে বারবার ফিরে এসে তো আমি শান্তি পাই যে, দুনিয়ার দ্রুত বদলে যাওয়া রুক্ষ মানচিত্রে তুমি চিরকাল তোমার শ্যামলিমাময়, শহুরে অথচ শালবনের জংলী মত্ত রূপ ধরে রাখবে। যদিও তুমি আমার অস্থাবরগুলো চিরকাল ধরে রাখতে পারোনি, কিন্তু তোমার ওপর আমি এখনো বিশ্বাস রাখি, কলকাতা। কষ্ট পাওয়ার প্রবল সম্ভাবনাতেও ঝুঁকি নিই। তাই তোমার কাছে আমি আবারও ছেড়ে যাচ্ছি ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি, ফেলে যাচ্ছি না। তুমি গচ্ছিত রেখো কলকাতা। তোমার ওপর আমার আস্থা আছে। তোমার কাছে ভালোবাসা ফিকে হয় না। তোমার চোখে, নাকে, গালে, কাঁধে, মুখে, ঠোঁটে আমাকে ছড়িয়ে যেতে দিও। দেখবে সময় কাটতে না কাটতেই আমি আবার তোমার কাছে ফিরে আসবো।

Tuesday, January 16, 2018

প্রশান্তি - Pacificity

"বোবা টানেল"-গানটার দু' লাইনের মানে জিজ্ঞেস করেছিল একবার এক বন্ধু (যার নামের মানে সমুদ্র)। "কার সাথে বলো শব্দ ছুঁড়ে ফিরবো বাড়ী মাঝরাতে, আমি তোমার কথা বলবো কাকে?" তখন কিছু একটা অর্থ বলেছিলাম। আজ আর একবার কিছু বলি।

ধরুন গোলপার্ক, দুজনকে দেখতে পাচ্ছেন, ক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটি ছেলে আর মেয়ে, হাত ধরে। কখনো একে অপরকে দেখছে। ওপরে হলুদ আর সাদা স্ট্রিটলাইটের আলো। চারপাশের দোকানগুলো থেকেও টিউবলাইটের আলো হালকাভাবে এসে পড়ছে ওদের দুজনের মুখে।

এরপর বাস এসে গেলো। বাসটা একটু আগে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। দুটো হাত তখন দেখছেন, ছেড়ে যাচ্ছে, আলাদা হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটি বাসের দিকে দৌড়ে গেলো, উঠে পড়লো। বাসটা মিলিয়ে গেলো দূরের অন্ধকারে। ছেলেটি এর পর হেঁটে যাচ্ছে গড়িয়াহাটের দিকে। গানের ওই লাইনগুলো তখন বেজে উঠছে ছেলেটির মাথায়। গানটার অন্য লাইনগুলো অপ্রয়োজনীয়। সাথে ছেলেটার মনে বয়ে আসছে একরাশ অনুভূতি। ছেলেটার তখন মেয়েটার জন্য "শান্তি পায়, বুকের ভিতর পায়রা ওড়ার শব্দ পায়, ওর চোখের দিকে তাকালে কিসের যেন ডাক শুনতে পায়।" এরপর দেখা যাচ্ছে, ফুটপাথ ও রাস্তায় যে সব লোকেদের আর গাড়িঘোড়ার ভিড় ছিল, তা সব উধাও হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। গড়িয়াহাটের চারদিক শুনশান হয়ে গেছে। শুধু হলুদ স্ট্রিটলাইটের আলো। কেমন যেন মাঝরাত নেমে এসেছে। ছেলেটার তখন আর কাউকে কিছু বলার দরকার নেই। প্রশান্তি ছেয়ে গেছে তার মনে।

Monday, January 08, 2018

ময়ূরাক্ষী - Movie Opinion

ম্যাসাঞ্জোর গেছিলাম একবার। ওরকম শান্ত, ধীর-স্থির জল যে নদীর হতে পারে, তা দেখে বেশ অবাকই লেগেছিল। নদীর বহমানতা থমকে গিয়ে সে সেখানে মানুষের হাতে বশবর্তী। কিন্তু সেই নদীই বর্ষাকালে গ্রামের পর গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে চলে যায়। মনে হয়, বাঁধা পড়ে থাকতে থাকতে ময়ূরাক্ষীর মনে জমতে থাকা কথাগুলো যে ভীষণ বেদনা তৈরী করে, তার জেরেই প্রবল বেগে স্রোত আসে বৃষ্টি হলে। আমাদের সম্পর্কগুলোও যেমন ভেসে যায় না-বলতে-পারা অভিমানের আঘাতে।

কোনো সিনেমা যখন ব্যক্তিগত জীবনের সাথে মিশে যায়, তখন তা মনের বেশি কাছের হয়ে যায়। কিছু সিনেমা আমাদের ব্যক্তিগত আশার প্রতিফলন ঘটায়, আবার কিছু সিনেমা আমাদের জীবনের উপেক্ষিত দিকগুলোকে সামনে এনে দেয়। "ময়ূরাক্ষী" দ্বিতীয় ধরণের অনুভূতিকে সামনে আনলো। সিনেমা শুরু হওয়ার পরে, অতনুবাবু প্রথম যখন সৌমিত্রবাবুর চশমার ক্যামেরায় ফোকাস করলেন আর ক্যামেরা ফলো করলো সেই চশমাকে, যা সৌমিত্রবাবুর হাত থেকে তুলে নিয়ে প্রসেনজিৎ আলতো করে রাখলেন টেবিলে, সেই তখন থেকেই ঢুকে পড়লাম ফিল্মের একদম ভিতরে। ওই ফোকাসটাই সিনেমা হল থেকে আমাদের নিয়ে গিয়ে ফেললো, সুশোভন (সৌমিত্র) আর আর্যনীল (প্রসেনজিৎ)-এর জীবনে, দ্বন্দ্বে ও সমস্যায়।

যদিও সিনেমায় অনেকগুলো চরিত্রের জীবন একসাথে চলছে, যেমন বাস্তবেও চলে, কিন্তু বারবারই (অতনুবাবুর কারগরিতে) আমরা ঢুকে পড়লাম সৌমিত্রের চোখ আর ঠোঁটের যন্ত্রনায়। একজন প্রফেসরের প্রগলভতা, পান্ডিত্য পেরিয়ে এসে জীবনের শেষ প্রান্তে তিনি অশীতিপর, কিন্তু তবুও তাঁর তীক্ষ্নতা হারিয়ে যাচ্ছে না। এমন বিবিধ অভিজ্ঞতার মিশেলকে স্তরে স্তরে মূলত মুখের মধ্যে ফুটিয়ে তোলার মতো অভিনেতা ভূ-ভারতে আছেন কিনা জানিনা। যদিও থাকেন, সৌমিত্রবাবুর এই কাজটা করে ফেলার পর অন্য কারোর দরকার পড়ে না। উনি যখন ক্যাফেতে বসে কফি খেতে খেতে যৌবনের সংগীত রচনা করছেন, তখন উনি আর ৮৪ বছরের বৃদ্ধ নেই, একজন যুবক সংগীত নির্দেশক হয়ে উঠেছেন। আবার যখন কারোর মৃত্যুসংবাদ ওনার মধ্যে বিহ্ববলতা সৃষ্টি করছেন, তখন তাঁর চোখে শূন্যতা। আমার মনে হয় না, সৌমিত্রবাবু ওনার যুবক বয়সের কোনো ফিল্মেই অভিনয়ের এই দ্যোতনা সৃষ্টি করতে পেরেছেন।

এই ধরণের একজনের পাশে কাজ করাটাই ভীষণ মুশকিলের। প্রসেনজিতবাবুকে দেখে মনে হয়েছে, উনি চেষ্টা করেছেন এই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে। অনেক জায়গাতেই তাঁকে এই কারণেই বেশ সাবলীল লেগেছে, কিন্তু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে মেকী। যেমন সৌমিত্রবাবু যখন প্রসেঞ্জিতবাবুর মন-খারাপের কথা প্রেডিক্ট করলেন, সেই জায়গায়। আবার বাবার পাশে না থাকতে পারা বা জীবনের বিভিন্ন অপূর্ণতা, ব্যর্থতা মাঝে মাঝেই ওনার চোখে দেখে যেন ভীষণ স্পষ্ট। এছাড়াও আশেপাশের অভিনেতাদের ভীষণই ইন্টিগ্রেটেড লেগেছে সিনেমার সিচুয়েশনের সাথে। Sudiptaa Chakraborty যেভাবে একজন স্রেফ পরিচারিকা হয়ে রয়েছেন, যেন অন্তরালের উপস্থিতি, অথচ কি প্রবল। আমরা দর্শকরাও যেন আস্বস্ত হই, যে সুদীপ্তা যদি থাকেন, সৌমিত্রবাবু ভালো থাকবেন। অবশ্যই এখানে চিত্রনাট্যের সাপোর্ট আছে, কিন্তু অভিনেতারা সেটাকে যথাযত স্তরে তুলে আনতে পেরেছেন। প্রসেনজিৎ, সুদীপ্তা, গার্গী, ইন্দ্রানী - এদের সকলকেই ধন্যবাদ।

অতনুবাবুর এই আলাদা ধরণের মুহূর্তগুলোকে উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। যদিও উনি এভাবেই আমাদের ভালো কিছু ছবি উপহার আগেও দিয়েছেন। উনি, কৌশিক গাঙ্গুলি, প্রদীপ্ত ভট্টাচার্য, ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরি - এরা আছেন বলে, আশা করি ভালো বাংলা সিনেমা ঠিক থাকবে। অতনুবাবু যেভাবে ধীরে ধীরে সিনেমাটিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, যেভাবে পুরোনো স্মৃতির রেফারেন্স টেনেছেন বিকিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গে, যেভাবে আমেরিকা-ফেরত বাঙালিকে গ্রাউন্ডেড রেখেও সুক্ষ distinction রেখেছেন, তার উদ্দেশ্যে শুধু প্রশংসাই হয়। ময়ূরাক্ষীর দ্বৈত চরিত্রকে নৈপুণ্যের সাথে পর্দায় আনার জন্য তাকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। তবে উনিও বোধ হয় বুঝেছিলেন, যে এতগুলো ক্লোস শটের একটা ফিল্মে সৌমিত্রবাবুর মতো দক্ষ অভিনেতা ভীষণ প্রয়োজনীয়, indispensable বলা উচিত। শুধু কখনো কখনো মনে হয়েছে, shot reverse shot-গুলোতে একেকটা শটের দৈর্ঘ্য খানিকটা কম হয়ে ক্যামেরাটা মুখে আর একটু ধরলে হয়তো বেটার হতো; কিন্তু আমার মতো সিনেমা-অশিক্ষিতের এ ব্যাপারে পরামর্শের অধিকার নেই। তাই এটা কেবলই মতামত। যেমন আর একটা মতামত সিনেমার শেষটা নিয়ে। ইন্টারমিশনেই ভাবছিলাম এই সিনেমার conclusion-টানা বেশ কষ্টকর। অতনুবাবু খুব একটা খারাপ করেননি কাজটা, কিন্তু আরো দক্ষ কিছু কি হতে পারতো? কিছু মেটাফোরের মাধ্যমে, শুধুমাত্র নতুন প্রজন্মকে জানলার বাইরে দিয়ে দুনিয়া দেখানো ছাড়া? জানিনা, কোথাও মনে হয়েছে, হলে মন্দ হতো না, কিন্তু এটাও মনের কাছেই থাকবে।

অসংখ্য ধন্যবাদ Atanuবাবুকে এরকম একটা movie-এর জন্য। আর বিশেষ ধন্যবাদ, Soumitra Chattopadhyay-এর এমন অভিনয়কে দেখার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য এবং এটাকে ডকুমেন্ট করে রাখার জন্য। ময়ূরাক্ষী শান্ত আর প্রবল, তার দুই চরিত্র নিয়েই আমাদের মনে থাকুক!

Monday, December 25, 2017

নদীর নাম - River's name

Boston, 25-Dec-17, 9:49 PM

তিতাস নামের মানেই কি এক মন-কেমন,
যেমন করে তোমার চোখে শোকপালন।

আনত মুখে কিসের কথা লুকোতে চাও,
ঠোঁটের ফাঁকে আটকে আছে আঘাতটাও। 

তোমার হাসি পাগল করে অনেককেই,
তার গভীরে একটুও কি দুঃখ নেই ?

থাকেও যদি, প্রিয় মানুষ, খবর পায় ?
ঠিক যেভাবে তোমার লেখা মেঘ ঘনায় ?

মেঘের পাশে আমার আছে নতুন ঘর,
মেলানকলি উষ্ণতায় ভীষণ জ্বর। 

ঘোরের মধ্যে গাইছি আমি নদীর নাম,
স্বীকারোক্তির কবিতারা হয়েছে গান। 

সুরের মধ্যে রং-হারানো ব্যর্থ প্রাণ,
নিজের প্রতি প্রেমের তানে উদীয়মান।

তোমার এসব অন্ধকারের সময়কাল,
পেরিয়ে এসে হাত বাড়িও সখ্যতার।